ঢাবি খ ইউনিট প্রস্তুতি: কিভাবে জিতবে ভর্তি যুদ্ধ?

March 29, 2022 ...

দেশের সর্বপ্রাচীন ও গৌরবময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনটি এমন প্রশ্নের উত্তরে ছেলে থেকে বুড়ো সবাই চোখ বুজে বলবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব স্বর্ণালী অতীত ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সেই সাথে প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের লিস্টটাও অনেক লম্বা। এমন অনেক কারণেই  উচ্চমাধ্যমিকের পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  ঢাবি খ ইউনিট এ ভর্তি হওয়া।

প্রতি বছর অত্যন্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় শতবর্ষী এ বিদ্যাপীঠের ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষা না বলে বরং ভর্তিযুদ্ধ বলাই যুক্তিযুক্ত। পরীক্ষা হয় ৫টি ইউনিটে। মোট ৭১৪৮টি সিট বরাদ্দ থাকে স্বপ্নবাজদের জন্য। এই ৫টি ইউনিটের মধ্যে একটি হল ঢাবি খ ইউনিট বা বি ইউনিট, যা মূলত মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিটের জন্য মোট আসনসংখ্যা ২ হাজার ৩৭৮টি। বুঝতেই পারছ, প্রতিযোগিতাটাও হয় তুমুল। তবে প্রস্তুতি ভালো হলে এই ভর্তি যুদ্ধ জয় করা কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়।  আজকে জেনে নেব ঢাবির খ ইউনিট প্রস্তুতি নিয়েই বিস্তারিত।

ঢাবি খ ইউনিট প্রস্তুতি: কিভাবে জিতবে ভর্তি যুদ্ধ?
Source: Dhaka Tribune

ঢাবি খ ইউনিটে আবেদনের যোগ্যতা

খ ইউনিট ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ২০২০-২০২১ অনুযায়ী-

  • ২০১৫ বা পরবর্তী সালগুলোয় মাধ্যমিক এবং ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবে।
  • মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ-র যোগফল চতুর্থ বিষয়সহ অন্তত ৮.০০ হতে হবে। (মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে স্বতন্ত্রভাবে অন্তত জিপিএ ৩.০০ থাকতে হবে)
  • নির্দিষ্ট বিভাগ বা ইন্সটিটিউটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত গ্রেড বা নম্বরের শর্ত পূরণ করতে হবে।
  •  A Level শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৫ সালের IGCSE/ O Level এ অন্তত ৫টি এবং ২০২০ এর IAL/ GCE/ A Level পরীক্ষায় ২টি বিষয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবে।

ঢাবি খ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার মানবন্টন

  • ভর্তি পরীক্ষায় MCQ (Multiple Choice Questions) ও লিখিত উভয় পদ্ধতিই থাকবে।
  • পরীক্ষার সময় ১ ঘন্টা ৩0 মিনিট যার প্রথম ৪৫ মিনিট এমসিকিউ এবং পরের ৪৫ মিনিট লিখিত পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ।
  • পরীক্ষায় এমসিকিউ অংশে মোট ৬০টি প্রশ্ন থাকবে যেখানে প্রতিটি প্রশ্নের মান এক করে।
  • লিখিত পরীক্ষায় মোট ৪০ নম্বর বরাদ্দ থাকবে।
  • MCQ অংশে প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ করে কাটা যাবে। 

[ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি ইউনিট ২০২০-২০২১ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী]

এক নজরে পরীক্ষার বিষয় ও নম্বর বণ্টন দেখে নেয়া যাক-

পরীক্ষার ধরন      সময় বিষয় প্রশ্নসংখ্যা       নম্বর
      MCQ  

   ৪৫ মিনিট

বাংলা/ Elective English* ১৫টি ১৫*১= ১৫
General English ১৫টি ১৫*১= ১৫
সাধারণ জ্ঞান ৩০টি ৩০*১= ৩০
                                                                                                  মোট= ৬০

 

পরীক্ষার ধরন 

সময়

বিষয়

নম্বর
               

লিখিত

৪৫ মিনিট বাংলা/ Elective English* ২০
General English ২০

                                                                                          মোট= ৪০

*Elective English বিষয়টি কেবলমাত্র  A Level শিক্ষার্থীদের জন্য

মেধাতালিকা

  • মূল পরীক্ষায় (বহুনির্বাচনী ও লিখিত) ১০০ এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ১০ করে মোট ২০ নম্বর এবং এই ১২০ নম্বরের ওপর ভিত্তি করে মেধাতালিকা তৈরি করা হয়।
  • এমসিকিউ এবং লিখিত উভয় পরীক্ষা মিলিয়ে সর্বমোট পাস নম্বর ৪০। ৪০ নম্বর না পেলে একজন প্রার্থীর অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
  • পাশাপাশি MCQ অংশে- বাংলায় ন্যূনতম ৫ নম্বর, জেনারেল ইংলিশে ন্যূনতম ৫ নম্বর, সাধারণ জ্ঞানে ন্যূনতম ১০ নম্বর এবং সব মিলিয়ে ন্যূনতম ২৪ নম্বর পেলে উত্তীর্ণ বলে বিবেচিত হবে।
  • লিখিত অংশে- প্রার্থীকে ন্যূনতম ১১ নম্বর পেতে হবে যার মধ্যে বাংলাতে ন্যূনতম ৫ এবং জেনারেল ইংলিশে ন্যূনতম ৫ পাওয়া আবশ্যক। [বিজ্ঞপ্তি ২০২০-২১]

ঢাবি খ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি

বাংলা:

  • গুরুত্ব দাও পাঠ্যবইকে: খ ইউনিট ২০২১ এর সার্কুলারেই বলা হয়েছে পাঠ্যবইকে গুরুত্ব দিতে। পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত গদ্য, পদ্য বা রচনাগুলোর মূলভাব, উদ্ধৃতির অন্তর্নিহিত ভাব, ব্যাখ্যা, লেখক/ কবি পরিচিতি, পাঠ পরিচিতি ইত্যাদি অংশ গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করাটা জরুরি। 
  • ব্যাকরণ অংশ: সারাংশ / সারমর্ম লিখন, বানান শুদ্ধি ও প্রমিতকরণ, বিরামচিহ্ন, সংক্ষিপ্ত অনুচ্ছেদ লিখন, ব্যাকরণ-সম্পর্কিত বিষয়াবলি (সংজ্ঞার্থ ও দৃষ্টান্ত) এবং অনুবাদে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে ৯ম-১০ম শ্রেণির ‘বাংলা ভাষার  ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ বইটি থেকে ভর্তি পরীক্ষার টপিকগুলোর ওপর বেসিক ধারণা নেওয়া যেতে পারে। 

ইংরেজি:

  • বেসিক ক্লিয়ার রাখো: ইংরেজি গ্রামারের বেসিক ক্লিয়ার থাকলে প্রশ্নের উত্তর দেয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই প্রথমেই গ্রামার এর বেসিক টা ক্লিয়ার করা জরুরি। তাছাড়া Right form of verbs, Tense, Article, Subject Verb-agreement, synonym- antonym, Narration, Changing Sentence, Spelling, Phrase & Idioms, Vocabulary  ইত্যাদি কে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে।
  • লিখিত অংশের জন্য: Comprehension, Short paragraph, Story writing, Explanation (explain with the reference to the context), Rearranging, Translation, Punctuation, Gap filling with and without clues, Sentence Making, Changing and Transformation of sentences,  বেশ গুরুত্বপূর্ণ। 
  • পাঠ্যপুস্তক: ইংরেজির জন্যও পাঠ্যপুস্তক গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯-২০২০ সেশনে পাঠ্যবইয়ের কবিতা ও প্যাসেজ থেকে প্রশ্ন হয়েছিল। তাই বইয়ের টপিক গুলো বুঝে পড়তে হবে এবং প্রয়োজনের নোট করে রাখতে হবে।

বি ইউনিটের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ইংরেজি বিষয়ে খারাপ করে। দেখা যায় শুধুমাত্র ইংরেজিতে পাশ নম্বর না পাওয়ার কারণে অনেকে উত্তীর্ণ হতে পারে না।  এর অনেকগুলো কারণের একটি হল ইংরেজি ভীতি। অথচ নিয়মিত অনুশীলন করার মাধ্যমে ইংরেজিতে খুব ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব।

সাধারণ জ্ঞান:

  • গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি:

মোটাদাগে সাধারণ জ্ঞান থেকে আসা প্রশ্নকে দুটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। একটি হলো বাংলাদেশ সংক্রান্ত ও আরেকটি হল আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি।  সেইসাথে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পৌরনীতি ও সুশাসন, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা, ভূগোল, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নদ-নদী, স্থাপনা, মানচিত্র, মুক্তিযুদ্ধ, বিখ্যাত বই ও লেখক, গুরুত্বপূর্ণ দিন ইত্যাদির ওপর জোর দেয়া যেতে পারে।

  • গুরুত্ব দাও সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর ওপর:

বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সময়ের খবরা-খবর কিংবা ঘটনাবলি থেকে অনেক প্রশ্ন আসতে দেখা যায়। এজন্য এ বিষয়ে বিশেষ করে গুরুত্বারোপ করা জরুরি। প্রতিদিন খবরের কাগজ কিংবা প্রত্যেক মাসের কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স সংগ্রহ করে বিশেষ খবর গুলো নোট করে রাখা যেতে পারে।

আরও যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি

  • বিগত বছরের প্রশ্ন পর্যালোচনা: প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা পেতে বা প্রশ্নের প্যাটার্ন বুঝতে বিগত বছরের প্রশ্ন পর্যালোচনা করাটা জরুরি। দেখা যায় প্রশ্ন  রিপিট না হলেও অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রশ্ন চলে আসে।
  • নিয়মিত অনুশীলন: এ বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজি, বাংলা বা সাধারণ জ্ঞান প্রত্যেকটি বিষয়ই নিয়মিতভাবে পড়তে হবে। সাম্প্রতিক বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে। সবগুলো বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই হিসাবে নিয়মিতভাবে অনুশীলন করাটা জরুরি।
  • প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা হতাশা থেকে প্রস্তুতি খারাপ হয়। চেষ্টা করতে হবে যথাসম্ভব নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখাতে। নিয়মিত ঘুম, প্রার্থনা ও সর্বদা উৎফুল্ল থেকে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হবে।

অনুশীলন, অধ্যাবসায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে যেকোনো কঠিন বাঁধা বা বন্ধুর পথ অতিক্রম করা সম্ভব। ভর্তিযুদ্ধেও এই স্ট্র্যাটেজিগুলো মেনে খুব সহজেই তুমি পৌঁছে যেতে পারো তোমার স্বপ্নের কাছাকাছি। প্রস্তুতি চলুক পুরোদমে!

আপনার কমেন্ট লিখুন