ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা: শেষ সময়ে কীভাবে প্রস্তুতি নেবো?

March 23, 2022 ...

বিংশ শতকের সূচনালগ্ন, অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স। পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী ওঠে। নাথান কমিশন প্রণীত রূপকল্পে, ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয় এক নতুন অধ্যায়। ঔপনিবেশিক, সাম্রাজ্যবাদী, সামন্ততান্ত্রিক ব্রিটিশদের শাসন-শোষণে পরাস্ত ও দুর্বল পূর্ববঙ্গ নতুন প্রাণ ফিরে পাবার আশায় বুক বাধে। মাত্র তিনটি বিভাগ নিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা শুরু করে একটি স্বপ্ন, একটি জাতির বাতিঘর। ২০২১ সালে শতবর্ষে পা দেয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ কলেবরে বেড়েছে অনেকটুকুই। মাত্র ৮০০ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া ঢাবিতে বর্তমানে প্রায় ৩৬,০০০ জন নিয়মিত অধ্যয়ন করছেন। এই স্বপ্নিল রথের সারথি কীভাবে তুমিও হতে পারবে, আজকের নিবন্ধ সে বিষয়েই! তাহলে চলো জেনে নেওয়া যাক ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার শেষ সময়ের প্রস্তুতির আদ্যপ্রান্ত!

কেন ঢাবি? 

ইংরেজ আমলে কলকাতা বাংলার রাজধানী হয়, আর সেই সাথে ঢাকার গুরুত্ব কমতে থাকে। রাজধানী স্বভাবতই বেশি মনোযোগ পায়, পায় বড় বাজেট। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে পূর্ববঙ্গ বেশ খানিকটা অবহেলিত থেকে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল তৎকালীন অত্র অঞ্চলের অনগ্রসর মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ব্রিটিশদের এক ধরনের সহানুভূতি, এক ধরনের ক্ষতিপূরণ। কালের পরিক্রমায় ঢাবি তার লক্ষ্য ভালোভাবেই পূরণ করতে পেরেছে। 

একদিকে যেমন ঢাবি উৎপাদন করেছে ড. মো. ইউনুসের মত নোবেল লরেট, তেমনি তৈরি করেছে শেখ মুজিব, তাজউদ্দীনের মত জাতির ভাগ্যপরিবর্তনকারী রাজনীতিবিদ। শুধু তাই নয়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, আব্দুস সাত্তার খানদের মত বিজ্ঞানী যেমন এসেছে ঢাবি থেকে, তেমনি ঢাবি দিয়েছে ফজলুর রহমান খানদেরও। উল্লেখ্য, আধুনিক স্কাইস্ক্রেপার তথা গগনচুম্বী বিল্ডিং বানানোর গবেষণায় পুরো বিশ্বের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন এফ আর খান। প্রখ্যাত সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিন, শাইখ শিরাজ, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার নাফিস…  কী উপহার দেয়নি তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই লিস্টে নিজের নামটা অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে তোমাকে ভর্তি পরীক্ষাটা উৎরে যেতে হবে ঢাবি ক ইউনিটে। তবে, এসো আর কথা না বাড়িয়ে আসল আলাপ শুরু করা যাক।   

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত কার্জন হল; Image Courtesy: Wikimedia Commons

ঢাবি ক ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার মানবণ্টন 

বর্তমান সর্বশেষ মানবণ্টন অনুযায়ী, ঢাবি ক ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা হয় সর্বমোট ১২০ নম্বরের মধ্যে। বহুপদী সমাপ্তিসূচক প্রশ্ন (এমসিকিউ) অংশে থাকে ৬০ নম্বর। এছাড়া লিখিত অংশে থাকে ৪০ নম্বর। এবং এসএসসি এইচএসসির জিপিএ থেকে থাকবে ২০ নম্বর। অর্থাৎ কারও যদি পূর্বের বোর্ড পরীক্ষা খারাপও হয়ে থাকে, তবুও ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই। এই নম্বরের প্রভাব অতি সামান্য। এর আগের নিয়ম অনুযায়ী ২০০ নম্বরের মধ্যে ১২০ নম্বরই ছিল জিপিএর উপর, তার থেকে বর্তমানের পদ্ধতিই তুলনামূলক শিক্ষার্থীবান্ধব। এবার আসা যাক, কীভাবে প্রস্তুতি নিলে ভালো করার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ থাকবে। 

ঢাবি ক ইউনিটের প্রস্তুতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির সময় পাওয়া যায় বেশ কম। এইচএসসি পরীক্ষার পর মাত্র মাস তিনেক সময় হাতে থাকে, প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য। প্রস্তুতি তখনই সার্থক হবে যদি তা হয় পুর্ণাঙ্গ, নচেৎ তা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা কেবল ক্ষীণতরই হতে থাকে। শারীরিকভাবে যেমন ফিট থাকতে হবে, তেমনি মানসিকভাবেও নিজেকে চাঙ্গা রাখতে হবে। মন ভালো না থাকলে কিন্তু কিছুই করতে মন বসবে না, পড়াশুনা করতেও ইচ্ছা করবে না। তাই মোটিভেটেড থাকতে হবে। আর প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা করে প্রস্তুতি নেওয়া খুবই জরুরি। কারণ, একেক বিষয়ের জন্য প্রস্তুতির প্যাটার্ন একেক রকমের হয়ে থাকে। 

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা - historical photo from du
১৯৩৬ সালে ঢাবির সমাবর্তনে, বাঁ থেকে স্যার যদুনাথ সরকার (ইতিহাসবিদ), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক), স্যার জন অ্যান্ডারসন (চ্যান্সেলর ও বাংলার গভর্নর), আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (রসায়নবিদ) ও স্যার এ এফ রহমান (ভাইস চ্যান্সেলর) ; Image Courtesy: Wikimedia Commons

ঢাবি ক ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি

সাধারণত ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা তে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান এবং উচ্চতর গণিত থেকে প্রশ্ন আসে। এখন এখানে একটা কিন্তু আছে, কিন্তুটা হলো উচ্চতর গণিত বা জীববিজ্ঞান যে বিষয় তোমার চতুর্থ/ঐচ্ছিক বিষয়, তুমি চাইলে সেটির বদলে বাংলা বা ইংরেজি উত্তর করতে পারো। এক্ষেত্রে ঢাবি ঘ ইউনিট প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরা এগিয়ে থাকে। কারণ, তাদের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়ই বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান এই বিষয়গুলোতে পড়তে হয়। সেক্ষেত্রে তারা সহজেই চতুর্থ বিষয় বাদ দিয়ে তার ইচ্ছা অনুযায়ী বাংলা অথবা ইংরেজি উত্তর করতে পারে। 

বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রে, পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিতের সূত্রগুলো বেশি করে প্র্যাকটিস করতে হবে। সাধারণত সহজ সূত্র থেকে ম্যাথ বেশি আসে। এবং এমন সব ম্যাথ আসবে যেগুলো ক্যালকুলেটর ছাড়া করা সম্ভব, কারণ তোমরা সবাই জানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। অন্যদিকে জীববিজ্ঞান এবং রসায়নের স্পেশাল ইকুয়েশন বা বিক্রিয়াগুলো দেখে যেতে হবে। সাধারণত শেষ সময়ে পুরো পড়া নতুন করে পড়ার সুযোগ হয়না। তাই আগের করে রাখা নোটগুলোতে চোখ বুলিয়ে যাওয়া যায়। 

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার শেষ সময়ের প্রস্তুতি 

একদম শেষ সময়ে চলে আসলে তখনকার প্রস্তুতিকে আমরা মোটাদাগে দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। এক, পরীক্ষার পূর্বে আর দুই, পরীক্ষার সময়। পরীক্ষার সপ্তাহখানেক আগের মধ্যে তোমার পুরো সিলেবাস একবার বা ক্ষেত্রবিশেষে দু’বার রিভিশন দেওয়া হয়ে যাওয়ার কথা। তারপর শেষ মুহূর্তে মাথার উপর চাপ কম দিয়ে দেখে যেতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম আর ঘুম খুব জরুরি। অনেকেই এই দিকটায় একদম বেখবর থাকে, ফলত পরীক্ষার আগে অসুখ বাঁধিয়ে বসে। এবং শেষমেশ এত সাধের ক্যাম্পাসে আসার স্বপ্নে দিতে হয় গুড়েবালি। তাই স্বাস্থ্যের ঠিকমত যত্ন নিতে হবে। এবং সাথে সাথে পড়াও চালিয়ে যেতে হবে। 

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা - Sir Salimullah & Sir Nowab Ali
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই পুরোধা ব্যক্তিত্ব, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এবং স্যার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী (ডানে); Image Courtesy: Wikimedia Commons

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার পূর্বে

এই অংশটার ব্যাপ্তি হবে এইচএসসির পর থেকে পরীক্ষার একদম আগে আগে পর্যন্ত। এসময় সতর্ক থাকা এবং নিজেকে কন্ট্রোল করা খুব জরুরি। কারণ, অনেকেই ইন্টারমিডিয়েটের দুই বছর পড়াশুনার পর আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না। বিভিন্ন জায়গায় ট্যুর দেয়, কিছুদিন আড্ডা ফুর্তি করে, ভাবে সময় তো আছেই। আর ক’টা দিন যাক, তারপর এডমিশনের পড়া শুরু করবে। কিন্তু এই সময়টুকু খুবই দামী, প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। তাই পড়ার মোমেন্টাম যেন হারিয়ে না ফেলো, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দুয়েকদিন বিরতি নেওয়া স্বাভাবিক, তবে তারপর আবার ট্র্যাকে ফিরতে হবে। 

অনেকে কোচিং করে, অনেকে অনলাইন কোর্সে ভর্তি হয় , আবার অনেকে কোচিং ছাড়াই ভালো করতে পারে। কোচিং করা বাধ্যতামূলক না, তবে এর মাধ্যমে একটু নিয়মতান্ত্রিক পড়াশুনা হয়, যেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপকারী হয়ে থাকে। তবে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সবথেকে যে বিষয়টি তোমাকে এগিয়ে রাখবে তা হল বিগত বছরগুলোতে আসা প্রশ্ন সলভ। যখনই তুমি প্রশ্নব্যাংক সমাধান করতে থাকবে, তোমার আত্মবিশ্বাস নিজে থেকেই বাড়তে থাকবে। কারণ, ঢাবিতে প্রশ্ন রিপিট হয় না সত্য, তবে প্রশ্নের টাইপ কিন্তু রিপিট হয়। তাই পূর্বের প্রশ্ন সমাধান করা খুবই কাজে দেয়। আরেকটা কার্যকরী বিষয় হচ্ছে মডেল টেস্ট দিতে থাকা। এটা কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বা এনরোল করেও দিতে পারো, অথবা বাসায় বসে নিজেও ঘড়ি ধরে পরীক্ষা দিতে পারো। নিজেকে ঝালিয়ে নেয়ার এটাই মোক্ষম উপায়। 

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা - Science Library DU
সায়েন্স লাইব্রেরি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; Image Courtesy: Dhaka University Official Website

সাথে পূর্বসূরি সিনিয়র ভাইবোনদের থেকে নিয়মিত পরামর্শ নিবে, তারা কীভাবে পড়তেন, কোন স্ট্র্যাটেজি ধরে আগানো ভালো… এসব বিষয়ে। সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে সম্পূর্ণরূপে, নাহলে কোন ফাঁকে যে মাস কয়টা চলে যাবে বুঝতেও পারবে না। একদম দুশ্চিন্তা করা যাবে না, সবাই সবাইকে সাহস যোগাবে। বন্ধু বান্ধবদের সাথে দেখা হলে বা ফোনে যোগাযোগের সময়, “দোস্ত, কিছুই তো পড়ি নাই” এই জাতীয় কথার বদলে বলবে “দোস্ত, আমি জানি আমরা সবাই পারবো। শুধু নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টাটুকু করতে হবে।” এতে ইতিবাচকতা সবার মাঝে ছড়িয়ে যাবে। সবে মিলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। 

পরীক্ষার সময়

ভর্তি পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে এই অংশ শুরু হয়। এই সময়টা তুলনামূলক কম খাটুনির, কারণ যা পড়ার তা ইতোমধ্যে পড়া হয়ে যাওয়ার কথা। যারা এইচএসসিতে কিছুটা পিছিয়ে ছিল কিন্তু বেশ পরিশ্রম করেছে, শেষ ক’মাসে তারা এগিয়ে যায়। আর এই ক্রান্তিকালেও যাদের টনক নড়ে না, তারা শেষমেশ তুষারের দেশেই রয়ে যায়। একদম শেষে এসে শুধু হ্যান্ডনোট দেখতে থাকবে, আর সূত্রগুলোতে চোখ বুলাবে। ফটোগ্রাফিক মেমরি কাজে লাগাবে, যাতে দেখলেই হয়ে যায়। অন্য সময়ের মত কষ্ট করে যেন পড়তে না হয়। 

আর একদম প্যানিক করা যাবে না, মাথায় রাখতে হবে- শুধু এফোর্ট দেয়ার মালিক আমি, ফলাফল আমার হাতে না; এটা মনে ধারণ করতে পারলেই দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে। পরীক্ষার হল, ক্যাম্পাস এগুলো আগেই দেখে রাখবে এবং পারলে কোনো এক ফাঁকা দিনে পরীক্ষার বেশ আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে ঘুরে দেখে আসবে। এতে শেষ সময়ে অহেতুক উটকো দুশ্চিন্তার আরেকটা বোঝা কমবে।  

ঢাবি ক ইউনিট ভর্তি পরীক্ষা - DU at a glance
১০০ বছর পরে এসে ঢাবি কলেবরে বেড়েছে অনেকটুকুই; Image Courtesy: Department of Television, Film & Photography, Dhaka University

শেষকথা 

কথায় বলে, আত্মবিশ্বাসই বিড়ালকে বাঘে পরিণত করে, আর হীনমন্যতা বাঘকে নামিয়ে দেয় বিড়ালের কাতারে। তাই সবসময় মনে বল রাখতে হবে, কোনোমতেই হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। আমাকে দিয়ে হবে না, এমন চিন্তা যেন কখনই মনে দানা বাঁধতে না পারে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।  উপযুক্ত প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুত করে তোলো এবং নিজের প্রাপ্য আসনটি বাগিয়ে নাও- এই আমাদের কামনা। 

লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার কমেন্ট লিখুন