আমার চোখে বুয়েট

কাজ-টাজ নিয়ে বসে থাকতে ভালবাসি, কাজ ছাড়া একেকটা দিন ভয়ংকর অসুন্দর আমার জন্য :)

পুরোটা পড়ার সময় নেই ? ব্লগটি একবার শুনে নাও

২০০২ সাল হয়ত, বাসায় নতুন কম্পিউটার আনা হলো, কাকা কম্পিউটারের কোচিং দিবে। দিলো কোচিং, অনেকেই এসে শেখা শুরু করলো। আমি সবে ক্লাস টুতে, কম্পিউটার ধরা নিষেধ, কারণ এটা খুবই স্পর্শকাতর কিছু, বাচ্চারা ধরা মাত্রই নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে তো আর মানা নেই, তো দাঁড়িয়ে থাকতাম। ধীরে ধীরে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড আর এক্সেল শিখে ফেললাম! মাঝে মাঝে সিপিইউ-এর বিভিন্ন অংশ খুলে দেখানো হত, হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। তখন কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো, কী হবা বড় হয়ে, ভাব নিয়ে বলতাম, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার!BUET, Dream, Engineering University, inspiration

ছোট মনের ভাবনাগুলা এমনই ছিল, ব্যাটারি দিয়ে তার লাগিয়ে খেলনা গাড়ির মোটর ঘুরিয়েই একটা অসাধারণ অনুভূতি এসে পড়তো, আহারে কত বড় ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গেছি! একটা লাইট জ্বালাতে পারলে আনন্দে লাফাতাম। একবার এক ছোট্ট ঘটনা, মোটর ঘুরাতে গিয়ে নারীর নখের আঁচড় খেয়েছিলাম। পাশের বাসার নিতু দিদিকে বললাম, এই মোটরটা ধরো। আমি করলাম কী, তিনটা পেন্সিল ব্যাটারির সাথে সংযোগ করলাম। নিজেও ভাবতে পারিনি এত জোরে মোটর ঘুরবে! বেচারি ভয়ে মোটর তো ছাড়েই না, উলটা আমার হাতে দিয়ে দিলো খামচি। সেই খামচির দাগ এখনো অল্প অল্প বুঝা যায়।

এই ক্যাম্পাস আরো অনেক অনেক ওয়ার্ড এক্সেল শেখা, ব্যাটারি দিয়ে মোটর চালানো মানুষকে স্বপ্ন দেখাক যুগ যুগ ধরে।

বুয়েট জিনিসটা এতটাই ব্যাপক যে দু’চোখে জায়গা হয় না।

তখনও জানতাম না বুয়েট কে বা কী! স্কুলে থাকতে এগুলা নিয়ে আলাপও হতো না। জীবনে বুয়েটের কাউকে দেখিও নাই। এভাবেই স্কুল লাইফ পার হলো। ততদিনে লোকমুখে শুনে বুঝলাম বুয়েট আসলে একটা ব্যাপক জিনিস, অনেক কষ্ট করে বুয়েটের পূর্ণরূপটা মুখস্ত করলাম, তাও ইঞ্জিনিয়ারিং আর টেকনোলজিতে ভেজাল লাগিয়ে ফেলতাম।

কলেজে উঠে একজন ম্যাডামের চোখে পড়ে গেলাম, নাসরিন ম্যাডাম। কেউ উনাকে দেখতে পারে না, উনি নাকি শুধু ফাংশন পড়ান। আসলেই সেটা করেন; উনার যে কয়টা ক্লাস করেছি, ফাংশনই পড়িয়েছেন। উনি একদিন বললেন, “আমার আগে একটা স্টুডেন্ট ছিল, নাম পার্থ, সে বুয়েটে পড়ে। এবার আরেকটা পার্থ আসলো, তুমিও টিকবা!” এই প্রথম কেউ এইরকম কথা বললো! যদিও পোলাপান পঁচিয়ে ছাড়েনি, তবুও ভিতরে ভিতরে কিছু একটা হয়ে গিয়েছিল হয়ত। যদিও সেই জন্যে সেই অনুপাতে পড়া শুরু করিনি।

আমার জীবনে দেখা প্রথম বুয়েটিয়ান শাফি ভাই (বুয়েট ১২, সিভিল)। উনার ক্লাস শুরু হবার কিছুদিন পর উনি আমাদের কলেজে এসেছিলেন। আগে থেকেই পরিচয় ছিল, স্কুলের বড় ভাই হিসেবে, কিন্তু এখন একজন বুয়েটিয়ান হিসেবে! উনাকে দেখে উনার চারিদিকে মোটামুটি একটা জটলা পেকে গিয়েছিল! উনি সবাইকে উপদেশ দিচ্ছিলেন কীভাবে পড়লে বুয়েটে চান্স পাওয়া সম্ভব। সবাই আদর্শ শ্রোতার মত সব শুনছিলো। আমি ড্রিবলিং করে কাছে গেলাম।

– “শাফি ভাই ভালো আছেন?”

– “হ্যাঁ, তুমি পার্থ না?”

– “জ্বী ভাইয়া। ভাইয়া তো বুয়েটে টিকে গেলেন! আমাদের যে কী হবে, কী ভিক্টোরিয়াতে ভর্তি হলাম, কিছুই হইলো না।”

– “তুমি বুয়েটে টিকবা, তোমার চেহারায় একটা বুয়েট বুয়েট ভাব আছে।”

এইটা শুনে হাসব নাকি কাঁদবো বুঝলাম না। পঁচাইলো না তো? দুই মাসের উপরে চুল কাটি না, শেভ করি না আধা মাস! এবড়ো-থেবড়ো কাকতাড়ুয়া টাইপ অবস্থা!

তবে হ্যাঁ, ঐদিন উনাকে দেখে ভিতরে একটা রিএকশান হয়েছিল। ঠিক পড়ালেখার আগ্রহ না, বুয়েট সম্পর্কে এম্বিশান! কী সেই বুয়েট। মানুষ যার কথায় এক নামে পাগল, কী হয় সেখানে! কিছু কিছু শুনে স্বপ্নের পরিধি, ব্যাস, ব্যাসার্ধ সব বাড়লো। শুধু কমলো পড়ালেখা।

পরীক্ষা শেষ, উদ্ভাসে ভর্তি হলাম। প্রথম দিন ক্লাস নিলো রনি ভাইয়া(২০০৩ ব্যাচ)। উনার ক্লাসে এত্তগুলা নতুন জিনিস শিখলাম। দুই বছর যে ঘাসটাও কাটি নাই সেটা বুঝলাম। বুয়েটিয়ানরা এত্ত কিছু পারে! কেমনে পারে? আমিও যদি পারতাম!

তারপর যেই মানুষটাকে দেখেছি উনি হলেন এরিক ভাই। উনার মত মজার মানুষ কমই দেখেছি! একটা জিনিস যে সহজে বুঝানো যায় তা উনাকে না দেখলে বুঝা যাবে না। একদম ঠান্ডা মাথার মানুষ। এই মানুষদের দেখে মনে হত এই মুহূর্তে যদি পার্থ এরিক হয়ে যেত। আর বন্ধুদের মুখে শুনতাম বাবু ভাই, রাসেল ভাই উনাদের কথা। উনাদের একটা ক্লাসও পাইনি। উনারা শুধু বেইলি রোডে ক্লাস নিতেন। এগুলা ঠিক না। ফার্মগেট আসলেও মৃধা মহলে আসতো না।

তবে আমি যেহেতু খারাপ মানুষ তাই চুরি করে মেইন ব্রাঞ্চে গিয়ে ক্লাস করতাম। মজা লাগতো। একদিন এক ভাইয়া বললো, দেখো, বুয়েটে যারা পড়বা, তারা আর যাই পাও আর না পাও, হাজার হাজার টি-শার্ট পাবা| শুধু মাত্র টি-শার্ট পাবার জন্যে হলেও বুয়েটে পড়া উচিত!

এগুলার মাঝে কোচিং শেষ হলো, বুয়েটের স্বপ্নে যখন কঠিন হাবুডুবু, তখনই হয়ে গেল পরীক্ষা। বুয়েট পরীক্ষা ছিল আমার জন্মদিনে, তাই সেটা আরো স্পেশাল, সেটা মানে জন্মদিনটা। যাই হোক…

বুয়েটে টিকে গেলাম, স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

BUET, Dream, Engineering University, inspiration

“বুয়েটের হাফ-ওয়াল”, ফটোগ্রাফার: তানভীর আহমেদ তমাল

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৩।

বুয়েটে প্রথম কোন প্রোগ্রামে থাকা। ঢুকেই হাঁ। এখানে না সব সারাদিন পড়ালেখা করা মানুষ থাকে, এনারা এত আয়োজন কেমনে করলো!

তারই মাঝে কেবল একজনকে চিনতাম। ধ্রুব ভাইয়া(২০০৮ ব্যাচ, মেকানিক্যাল)।

কেউ বিশ্বাস করবে কি না জানি না, সেদিন সারাদিন উনার পিছনে পিছনে ঘুরেছিলাম। সেদিন বুয়েটের অসাধারণ একটা স্বাদ পেলাম। সেটা ভাষায় বোঝানো সম্ভব না।

বুয়েট একটা সময় শুধু স্বপ্ন ছিল, সেটা আজ বাস্তব।

সেই পিচ্চিকালের ওয়ার্ড, এক্সেল শিখে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি, ব্যাটারি তার জোড়া লাগিয়ে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারও হতে পারি নি। এসে গেছি মেকানিক্যালের বারান্দায়, তার চেয়ে বড় কথা স্বপ্নের ঠিকানা বুয়েটে।BUET, Dream, Engineering University, inspiration


পড়াশোনা সংক্রান্ত যে কোনো তথ্যের জন্য, সরাসরি চলে যেতে পারেন ১০ মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইটে: www.10minuteschool.com

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি আপনার লেখাটি ই-মেইল করুন এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.