ভর্তিযুদ্ধ জয়ের নীল নকশা : কিছু অজনপ্রিয় টিপস

Keka, a girl who loves kacchi and dreams big through her thick pair of glasses.

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধ! ও বাবা! যেমন নাম তেমন কাজ। দুইটাই অনেক গম্ভীর। কাজের সাথে নামটার মধ্যেও যেন গাম্ভীর্য থাকে তাই হয়তোবা অ্যাডমিশন টেস্টকে এমন নাম দেওয়া হয়।  যাই হোক, এই সময়টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বুঝেশুনে পা ফেলতে হয়। আমার কাছে এই সময়কে স্নায়ুযুদ্ধের সময় লাগে। যে যতক্ষণ পর্যন্ত নার্ভ ঠিক রাখতে পারবে সেই তত বেশি সফল। তবে আমরা অনেকেই তীরে এসে তরী ডুবিয়ে ফেলি। ৩/৪ মাসের পরিশ্রম একদিনেই শেষ! বলো তো আমরা কিভাবে সেটা করি? পরীক্ষার হলে! হ্যাঁ, ঠিক তাই।

আমাদের তিন চারমাস ধরে যুদ্ধের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা করে কি লাভ যদি আমরা যুদ্ধের দিনই সেগুলো কাজে লাগাতে না পারি? তাই শুধু প্রস্তুতি নিলেই হবে না, তা সঠিক সময়ে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলেই তো যুদ্ধের জয়ী হতে পারবে।

Related image

আমরা অ্যাডমিশন টেস্টের পড়ালেখা করতে করতে অন্য কিছুকে তেমন মাথায় রাখি না। তবে এমন কিছু কিছু জিনিস আছে যেগুলো মাথায় রেখে কাজ করলে চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বাড়ে। আবার এইগুলোর কথা ভুলে গিয়ে কেবল পড়ালেখা করে গেলে কিন্তু ঐ অবহেলা করা জিনিস বা ব্যাপারগুলোই অনেক ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে

আমার অ্যাডমিশনের সময় আমি কিছু ভুল করেছিলাম। যদিও সৃষ্টিকর্তার রহমতে আমি এখন ভালো জায়গাতেই পড়ছি। যা চেয়েছি তা পেয়েছি। একটা আলহামদুলিল্লাহ স্ট্যাটাস ও দিয়েছিলাম!

আমি ভুল করেছি বলেই আমি চাই না তুমি সেই ভুল করো। কারণ, ভাগ্য তোমার সহায় না হতে পারে। আমি মনে করি অ্যাডমিশন টেস্টের আগেরদিন এবং টেস্টের দিন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তখন থেকেই আসলে মূল স্নায়ুযুদ্ধটা শুরু হয়। এই দুইদিন তুমি যত ঠান্ডা মাথায় কাজ করবে, ভাববে ততই তুমি এগিয়ে যাবে তোমার কাঙ্ক্ষিত জয়ের দিকে। আজকে তোমাদের সাথে তাই কিছু কথা বলতে যাচ্ছি যেগুলো পড়ালেখার বাইরের জিনিস হলেও আমি মনে করি মেনে চলা অত্যাবশ্যক। কিছু সাজেশন দিচ্ছি আরকি। ঐ যে বলেনা অ্যাডমিশন টেস্টের টিপস এন্ড ট্রিক্স, ধরে নাও তেমনই কিছু।

২.

পরীক্ষার আগের দিন :

যুদ্ধের আগের দিন! সব প্রস্তুতি শেষ করে এবার রণক্ষেত্রে নামবার পালা! তাই পরীক্ষার আগের দিনটি হওয়া চাই নির্ঝঞ্ঝাট। কোনোরকম ঝামেলায় জড়ানো যাবে না, কোনো ঝামেলা লাগানোও যাবেনা। পরীক্ষার আগের দিনে যা যা করা উচিত, যা যা উচিত নয় তা বলছি ।

পরিমাণমত স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া করা :

আমাদের অনেক এতই পড়ালেখা করি যে নাওয়া খাওয়াই ভুলে যাই। পড়তে পড়তে খাওয়ার কথা মনে রাখি না। আমি আবার উল্টো। ক্ষুধার্ত পেটে একদমই পড়তে পারি না। যাই হোক, পরীক্ষার আগের দিন যাতে পেটকে খাওয়া থেকে বঞ্চিত না করো সেইদিকে বিশেষ খেয়াল রাখবে। নাহলে, পরীক্ষার দিন এই খাওয়া দাওয়ার অভাবে শরীরে লেখার কোনো শক্তিই আসবেনা। প্রেশার লো হয়ে গেলে তো আরো খারাপ অবস্থাতে পড়তে হবে! তাই পরীক্ষার আগেরদিন পরিমাণমতো খাওয়া অবশ্য করণীয়।

আবার পরীক্ষার ১/২ দিন আগে এলাহী ভোজ না করাই ভালো। আমি বলেছিলাম না আমি কিছু কিছু ভুল করেছিলাম পরীক্ষার সময়ে? এটা তার মধ্যে প্রধান ছিল! আমি করেছিলাম কি, পরীক্ষার ঠিক দুইদিন আগে গিয়েছি দাওয়াত খেতে! একদম শাহী খাবার দাবার ছিল। আমি তো খাবারের ব্যাপারে একদমই সংকোচ করি না। তাই খেয়েছিও অনেক কবজি ডুবিয়ে। ফলাফল কী হলো জানো? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটের পরীক্ষার আগের দিন তিনবার বমি হয়েছে! এবং এতই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম যে একবার মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলাম! পরে স্যালাইন হাতে পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছিল। বমি হওয়ার কারণ, আমার ফুড পয়জনিং হয়েছিল। পরে সেই ফুড পয়জনিং থেকেই আমার পেটে অসুখ হয়ে যায়! তখন ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা। তাহলে বুঝো আমার অবস্থা! শুনতে এখন কিছুটা হাস্যকর শুনালেও আমার যে কী করুণ অবস্থা হয়েছিল সেটা আমিই কেবল জানি।

Image result for say no to fast food

তাই বলছি, যারা আমার মতো শাহী খাবার খুব পছন্দ করো তা কিছুটা সামলিয়ে রেখো নিজেদের। এসময় তাই পুষ্টিকর, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া উচিত। রিচ ফুড, ফাস্ট ফুড এসব যত পারো বাদ দিও।

তো বুঝতেই পারছো, পরীক্ষার আগের দিনের খাওয়া দাওয়াও কতো গুরুত্বপূর্ণ! কারণ এর থেকেই তো শক্তি আসে। শক্তি না থাকলে লড়বে কিভাবে? ৩/৪ মাসের সব পরিশ্রমই তো বৃথা যাবে।

অ্যাডমিট কার্ডের প্রিন্ট রেডি রাখা :

আমি লিখছি আর ভাবছি আমি এত এত ভুল কিভাবে করেছিলাম! আমার একটা অ্যাডমিশন টেস্টের আগের রাতের কাহিনী বলি। রাতের ৮টা বাজে। আমি কোচিং এর জন্য ঢাকায় ছিলাম ১ মাস ফুফুর বাসায়। আব্বু আম্মু সেদিন আসলো চিটাগং থেকে। রাতের ৮টা বাজে যখন আম্মু জানতে পারে আমার অ্যাডমিট প্রিন্ট করা হয়নি এখনো, কি গগনবিদারী চিৎকারটাই না দিয়েছিল। পরে অবশ্য তখনই গিয়ে করিয়ে এনেছি।

তোমরা যারা আম্মুদের এমন গগনবিদারী চিৎকার থেকে বাঁচতে চাও ভালোই ভালোই পরীক্ষার অন্তত দুইদিন আগে প্রিন্ট করে রেখে দেবে যাতে করে পরীক্ষার আগের রাতে পড়া বাদ দিয়ে বের হতে না হয়।

নতুন টপিক না ধরা :

এটা হয়তো অনেকবারই শুনেছো! পরীক্ষার আগের রাতে নতুন টপিক ধরলে সেটা আয়ত্তে তো আসেই না বরং সময়ের অপচয় হয়। কারণ, হুট করে একটা জিনিস পড়া শুরু করলে সেটা বুঝতে এবং পুরোপুরি দখলে আনতে কিছুটা হলেও সময় লাগে যেটা পরীক্ষার ঠিক আগের রাতের পাওয়া যায় না।

পর্যাপ্ত ঘুম এবং কম পড়া :

আমার মনে হয় পরীক্ষার আগের রাতে কম পড়াটাই শ্রেয়। বেশি পড়লে মাথায় লোড বেশি হয়ে যাবে এবং সবকিছু উল্টাপাল্টাও হয়ে যেতে পারে। তাই পরীক্ষার আগের রাতে মাথাকে এত প্রেশার না দেওয়াই ভালো। কারণ, পরেরদিন আরো মাথাকে সচল থাকতে হবে।

Image result for sleep

সারারাত জাগা যাবেনা। সারারাত জেগে পড়লে সেই পড়াটা পড়ে লাভ তো হবেই না দেখা যাবে পরীক্ষার সময় ঝিমুনি আসছে! আচ্ছা, একবার ভাবো, তোমার ৩/৪ মাসের কষ্টের পর তুমি পরীক্ষার হলে ১/২ ঘণ্টা ঝিমুতে ঝিমুতেই কাটিয়ে দিলে! ভাবতেই তো গা শিউরে উঠছে। এত মাসের পরিশ্রম ঝিমুনির জন্য বৃথা হয়ে গেলো!

তাই বেশি পড়ালেখা না করে সেদিন বরং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়াই শ্রেয়।

শান্ত থাকা :

পরীক্ষার আগের দিন যত পারো ঝামেলা এড়িয়ে যাবে। কোনো ঝগড়াঝাঁটি তো নয়ই বরং কোনো অতি উত্তেজনাকর খবর ও যাতে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। ওহ, আরেকটি কাহিনী মনে পড়লো। আমার অ্যাডমিশন টেস্টের আগের রাতে আমি পড়ছি, তখন আমার ফ্রেন্ড একটা আমাকে মেসেজ দিলো যে, আজকে তার আয়মান সাদিক ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছে। তার কোন কাজিন নাকি আইবিএ তে পড়ে উনি তার বাসায় এসেছিলেন। আমি তখন আয়মান ভাইয়াকে দেখা তো দূরের কথা, টেন মিনিট স্কুলে লেখালেখিও করতাম না। পরীক্ষার আগের রাতে এমন উত্তেজনাকর মেসেজ দেখলে আর পড়তে ইচ্ছা হয়!

সবচেয়ে ভালো হয়, সেদিনের জন্য মোবাইল অফ করে রাখলে।

পরীক্ষার দিন :

এবার যুদ্ধের দিন! এইদিনে কি করবে না করবে তা নিয়ে হয়তো ইতোমধ্যেই অনেকেই অনেক কিছু বলেছে তোমাদের। আমি তাই বেশি কিছু বলে পরীক্ষার আগে তোমাদের তেমন বিরক্ত করবো না। কিছু জিনিস বলব যেগুলা আশা করছি তোমাদের পরীক্ষায় দ্রুততার সাথে আন্সার করতে সাহায্য করবে!

জ্ঞানভিত্তিক প্রশ্ন আগে দাগাও :

আমি একবার এক মডেল টেস্ট দিতে গিয়ে বীরত্বের সাথে ম্যাথ আনসার করা শুরু করেছিলাম প্রথমে। আমি তো একের পর এক ম্যাথ সল্ভ করেই যাচ্ছি করেই যাচ্ছি মন দিয়ে। সময়ের দিকে আমার আর কোনো খেয়াল নেই। হুট করে দেখি! হায় হায় আমি তো এখনো ম্যাথ পার্টেই আছি, আর ঐদিকে সময় প্রায় ফুরিয়ে আসলো বলে! সেবার বেশি দাগাতে পারিনি। ভাগ্য ভালো আমার আমি মডেল টেস্টে এমন ভুল করেছি! আসল পরীক্ষায় করলে কি হতো!

Related image

তেমনি যেসব অংশ একটু মাথা খেটে বের করতে হয় বা এনালিটিকাল অংশ সেসব পরে আন্সার করাই যুক্তিযুক্ত। নাহলে দেখা যাবে ঐ পার্ট করতে করতে বাকিগুলো আন্সার করাই যাবে না। কারণ ধরো ম্যাথ একটা করে আন্সার দাগানোতে যে সময় লাগে সেই সময়ে তুমি অন্তত ৩টা বাংলার প্রশ্ন পড়ে উত্তর দাগিয়ে দিতে পারো। তাহলে ভেবে দেখো, ১টা ম্যাথ প্রশ্ন ছেড়ে আসা ভালো নাকি ৩টা বাংলা প্রশ্ন। বলতে গেলে যেগুলো চটপট করে আন্সার করা যায় সেগুলোই আগে ধরা উচিত।

আবার ইংরেজি অংশে কম্প্রিহেনশন অংশটিও পরে ধরা উচিত। কারণ, পুরো প্যাসেজ পড়তে পড়তে আবার সেই অনুসারে প্রশ্ন দাগাতে দাগাতে তুমি অন্য ৩/৪ টা প্রশ্নের উত্তর দাগাতে পারবে।

নিশ্চিত না হলে উত্তর না দাগানো :

আমি আমার ডি ইউনিটের অ্যাডমিশন টেস্টে ১০০টা প্রশ্নের মধ্যে আন্সার করেছিলাম মাত্র ৭৪টা। যাকেই জিজ্ঞেস করি, সেই আমার থেকে বেশি আন্সার করেছে। আমি তো ভয়ে অর্ধেক! হায় হায়! আমি এত কম আন্সার করলাম কেন? তার মানে কি আমি টিকব না?

পরে তো টিকেছি। অর্থনীতিতে পড়ছি এখন। এর মানে কি দাঁড়ায় জানো? ১০০% নিশ্চিত না হলে উত্তর না দাগানোই ভালো। আমি অনেক প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সন্দিহান ছিলাম তাই দাগাই নি। কারণ নেগেটিভ মার্কিং আছে তো। আমি আসলে কোনো রিস্ক নিতে চাচ্ছিলাম না।

তাই বলছি রিস্ক না নিয়ে যতটুকু জানো ততটুকুই দাগাও। অনেকে ৮০/৯০ এর উত্তর দিয়ে ১৫/২০ টা ভুল হলে ভালো নাকি ৭০ এর আন্সার করে ২/৩ টা ভুল হওয়া ভালো সেটা তোমরা ভেবে দেখো।

মূলত, আমার মতো এত এত ভুল করা মানুষ খুব বেশি সাজেশন দিতে পারছে না তোমাদের। তবে আশা করি, এইগুলো একটু কষ্ট করে মেনে চললে ভালো রেজাল্ট পাবে। আরেকটা বোনাস সাজেশন হলো ঘাবড়ে না যাওয়া। পরীক্ষার দিন হাজার হাজার মানুষ দেখবে, অনেককেই দেখবে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজিয়ে পড়েই যাচ্ছে তো যাচ্ছে! একদম ভয় পেয়ো না। আস্থা রাখো নিজের প্রতি। কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসবেই।

শুভকামনা রইল সবার প্রতি।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.