বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের প্রস্তুতি ও খুঁটিনাটি

January 31, 2022 ...

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষেই আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার্থে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিতে হয়। বিজ্ঞান বিভাগে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি হয় বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণই, তাই যোগ্যতমের কাতারে নিজেকে রাখতে ঘাম ঝরাতে হবে ট্রেনিং পর্যায়েই। কথায় আছে, যুদ্ধের প্রস্তুতির সময়ের ঝরানো ঘাম, যুদ্ধের সময়ের রক্ত বাঁচায়। আর দিনশেষে ভর্তি পরীক্ষা তো একরকম যুদ্ধই। পূর্ববর্তী একটি ব্লগে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি সম্পর্কে জেনেছিলাম, আজকে জানবো সর্বোপরি দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের প্রস্তুতি নিয়ে। 

যা যা জানতে হবে 

প্রথমেই ঠিক করতে হবে, তুমি কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেবে। কারণ, দেশে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাই প্রায় ৬০টি। তাছাড়া অজস্র প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কিছু বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। যেমন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়/ইন্সটিটিউট প্রভৃতি। সেজন্য শুরুতেই নিজের লক্ষ্য স্থির করে নিতে হবে। সাধারণত, এই কাজটি এইচএসসির পরপরই এবং রেজাল্ট বেরোবার আগেই করে নিতে হয়। কারণ, রেজাল্ট বেরোনো পর্যন্ত দেরি করলে প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। 

এক্ষেত্রে বিভিন্ন সাবজেক্টে কতটা দখল আছে, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যুক্তিযুক্ত। যেমন, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এসবে দক্ষতা থাকলে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আর জীববিজ্ঞান, রসায়ন এসবে দক্ষতা থাকলে মেডিকেল কলেজ বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কৃষি, মৎস্য এবং জীববিজ্ঞান সম্পর্কিত অনুষদগুলোকে টার্গেট করতে পারো। আর যদি কোনো কারণে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান এসবে আগ্রহ, দক্ষতা বেশি থাকে, তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটগুলোকে সামনে রেখে আগাতে পারো। এতে বিভাগ পরিবর্তন করে অন্যান্য সেক্টরে পড়তে পারবে। 

এইসবের সাথে সব বিষয়ে SWOT জানা থাকা খুবই জরুরি। S বলতে স্ট্রেংথ তথা শক্তিমত্তা, W দিয়ে উইকনেস বা দুর্বলতা, O তে অপরচুনিটি তথা সম্ভাবনা আর ফাইনালি T দ্বারা থ্রেট অর্থাৎ আশঙ্কাকে বোঝায়। শিক্ষার্থীর নিজেকেই খুঁজে বের করতে হবে যেকোনো টপিকের কোথায় তার শক্তির জায়গা, কোন জায়গাটায় দুর্বলতা, কোথায়ই বা নিত্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করা সম্ভব আর কোনদিকটা একটু আলগা, আশঙ্কার দিকটাও আগলে রাখতে হবে। এভাবে প্রাথমিক ধাপ পেরিয়ে প্রস্তুতির পরের ধাপে প্রবেশ করতে হবে। 

বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক প্রস্তুতি

যখন তোমাদের আসল প্রস্তুতির পালা, শুরুতেই মোকাবিলা করতে হবে প্রশ্নপদ্ধতির। কারণ, দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেক ধাঁচে পরীক্ষা নিয়ে থাকে। প্রশ্নের মানবণ্টন হয়ে থাকে একেকরকম। তাই সেদিকটা দেখে রাখাই নিরাপদ। উদাহরণ দিতে গেলে বলা যায়, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শুধু বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলো (পদার্থ, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান) থেকে প্রশ্ন আসে, আবার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলোর সাথে বাংলা, ইংরেজি, আইসিটি ইত্যাদি থেকেও প্রশ্ন এসে থাকে। তাই এসব বিশ্লেষণ করে আগানোই ভালো। এক্ষেত্রে পুরাতন প্রশ্নব্যাংক এবং একেবারে নতুন বছরের ভর্তির সার্কুলার তথা বিজ্ঞপ্তি কাজে দেবে। 

এর মোকাবিলা করার জন্যও এইচএসসির পর থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কিছু ব্যাকাপ প্ল্যান নিয়ে রাখা অসময়ে কাজে দেয়। যেমন, তুমি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকো, তবে এর সাথে বাংলা, সাধারণ জ্ঞানে টুকিটাকি জ্ঞান থাকলে জাহাঙ্গীরনগরের প্রস্তুতি হয়ে যাবে। আবার ঢাবি ডি ইউনিটের প্রস্তুতি যদি কেউ নিতে থাকে, সাথে সে যদি জীববিজ্ঞানের হালকা প্রস্তুতি নেয়, তাহলে জাহাঙ্গীরনগরের জীব বিষয়ক ইউনিটগুলোতে পরীক্ষা দিতে পারবে। এভাবেই ম্যানেজ করে নেয়া সম্ভব, একটু আগে থেকে গুছিয়ে প্রস্তুতি নিলে। 

অনুষদ কেন্দ্রিক প্রস্তুতি

যখন তোমার ভার্সিটি বেছে নেয়া হয়ে গেল, এরপর পরই আসে অনুষদ বা বিভাগ কেন্দ্রিক প্রস্তুতি। এর কারণ হচ্ছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই দেখা যায় এক বিজ্ঞান বিভাগের জন্যই বেশ কয়েকটা ইউনিট খুলে বসে। এর জন্য শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ল না কমলো সেদিকে নজর না দিয়েই। তো যাই হোক, বিশেষায়িত অনুষদগুলোর জন্য প্রস্তুতিও বিশেষই হওয়া চাই, নচেৎ পাল্লা দিয়ে টিকে থাকা যায় না। এখানে সবথেকে কাজে আসবে যে জিনিস, সেটা হচ্ছে পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্ন সমাধান। এতে একটা পূর্ণাঙ্গ আইডিয়া হয়ে যাবে। তুমি যদি বাজার থেকে যেকোনো ভালো ব্র্যান্ডের প্রশ্নব্যাংক কিনে নিয়ে বিগত কয়েক বছরের প্রশ্ন সলভ করে ফেলো, এতেই বুঝে যাবে প্রশ্নপ্যাটার্ন কেমন হয়। 

বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতি

সবশেষে যখন তোমার ভার্সিটি, অনুষদ এইসব ভাবা শেষ, এখন আসবে আসল জায়গায়। বিষয় ভিত্তিক প্রস্তুতিতে জোর দিতে হবে। মূল বই, মূল বই এবং মূল বই!!! যে বিষয়েই বলা হোক, প্রস্তুতির শুরুটা হবে এইচএসসির টেক্সটবইটা দিয়েই, আর সিংহভাগ কাভারও হয়ে যাবে এই থেকেই। মেইন বই পড়ার পর সবথেকে কাজে আসবে বলতে গেলে প্রশ্নব্যাংক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক, সাল ভিত্তিক। তারপর আসবে অন্যান্য যদি সহায়ক বই থাকে যেমন, মডেল টেস্ট বা কনসেপ্ট বুক, সাপ্লিমেন্ট বুক, কন্সাইজ বুক ইত্যাদি। ভালো করে মনে রাখতে হবে, এই বইগুলো কোনোমতেই মূল বইয়ের পরিপূরক হতে পারে না। মূল বইয়ের পড়ার পর এসব কাজে আসবে, তার আগে নয়। 

পদার্থবিজ্ঞান

সত্যি বলতে ভর্তি পরীক্ষায় বাদ দেয়া বা দাগিয়ে পড়া বলতে কিছু নেই। একদম প্রায় সবই পড়তে হয়। পদার্থবিজ্ঞানে প্রস্তুতির জন্য উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ের প্রথম পত্র থেকে গতির সূত্র, মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ, স্থিতিস্থাপকতা, তাপ, গতিবিদ্যা, ভেক্টর ও স্কেলার রাশি, বেগ, ত্বরণ, বল ও বলের প্রকারভেদ, মাত্রা ও বিভিন্ন পদ্ধতিতে একক ইত্যাদি পড়তে হবে।

পদার্থ দ্বিতীয় পত্র থেকে স্থিরবিদুৎ, বিদুৎপ্রবাহের তাপীয় ও রাসায়নিক ক্রিয়া, চৌম্বক পদার্থ, আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, ইলেক্ট্রন, প্রোটন, পরমাণুসহ ইলেক্ট্রনের প্রতিটি অধ্যায় থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, সূত্রাবলি, ঘটনা ও কারণ, প্রভাব, পার্থক্য, গাণিতিক সমস্যার সমাধান জানতে হবে। পদার্থ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন গাণিতিক হয়। সে কারণে গাণিতিক সমস্যার সমাধানগুলো ভালোভাবে করতে হবে। এর সঙ্গে গাণিতিক সমাধান দ্রুত করতে পারার বিষয়টিও আয়ত্ত করতে হবে। কারণ কত সুন্দর করে তুমি কোনো প্রশ্নের উত্তর করতে পারো তার থেকে ভর্তি পরীক্ষায় যেটি বেশি দেখা হয়, তা হচ্ছে কত কম সময়ে তোমরা এটা সলভ করতে পারো। 

রসায়ন 

রসায়নের ক্ষেত্রেও কথা একই, বাদ না দেয়াই সেইফ। উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীর রসায়ন মূল পাঠ্য বইয়ের মধ্যে থেকে পদার্থের বিভিন্ন অবস্থা, পর্যায় সারণী, রাসায়নিক গণনা, জারণ-বিজারণ, রাসায়নিক বন্ধন, রাসায়নিক বিক্রিয়া, প্রতীক, সংকেত, যোজনী, গাঠনিক সংকেত, আণবিক সংকেত, রাদারফোর্ড, বোরের পরমাণু মডেল বিষয়গুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। মনে রাখবে রসায়ন কিছুটা মুখস্ত নির্ভর, তাই কষ্ট হলেও মনে রাখবে বিভিন্ন তথ্য উপাত্তগুলো। 

একটি বিষয় সবসময়ই মনে রাখতে হবে, এইচএসসির সিলেবাস তো বটেই, ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে হলে বইয়ের সব অধ্যায়ই ভালোভাবে পড়তে হবে। ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে হলে বইয়ের কোনো অধ্যায়ই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

উচ্চতর গণিত

উচ্চতর গণিতের জন্য প্রয়োজনীয় সূত্রগুলো একজায়গায় লিখে রাখবে। পরীক্ষার আগে সেসব যাতে একবার চোখ বুলিয়ে গেলেই হয়, এমন একটা দখল পড়ার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। আর পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্যায়ে প্রচুর অনুশীলন করতে হবে, অনুশীলন করতে করতে আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে। 

পড়ার টেবিলের সামনে বা এমন জায়গায় রাখবে যেখান থেকে সহজেই দেখা যায়। আর ফটোগ্রাফিক মেমরি বাড়াতে হবে, মুখস্তবিদ্যা থেকে যতটা সম্ভব সরে আসার চেষ্টা করতে হবে। সরলরেখা, কণিক, বৃত্ত, ত্রিকোণমিতিক অনুপাত, বিপরীত ত্রিকোণমিতিক অনুপাত, দ্বিপদী, বহুপদী এই অধ্যায়গুলো মনোযোগ দিয়ে করতে হবে। 

জীববিজ্ঞান 

জীববিজ্ঞানের দুটি অধ্যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণীবিজ্ঞান। উদ্ভিদবিজ্ঞান থেকে পাঠ্যবইয়ের সব অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার, আবিষ্কারকের নাম, প্রয়োজনীয় সংজ্ঞা, উদাহরণ, পার্থক্য, উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস, সালোক সংশ্লেষণ, শ্বসন, প্রস্বেদন, টিস্যু, টিস্যুতন্ত্র বিষয়গুলো পড়তে হবে। কিছুই বাদ দেয়া যাবে না, এগুলোতে শুধু বেশি জোর দিতে বলা হচ্ছে। 

প্রাণীবিজ্ঞান অংশের ম্যালেরিয়ার জীবাণু, হাইড্রা, দেহপ্রাচীর, কলা, কোষ, প্রাণীর বৈজ্ঞানিক নাম, পরিপাকতন্ত্র, রক্ত ও রক্ত সংবহনতন্ত্র, রেচনতন্ত্র, পেশিতন্ত্র, প্রাণীর প্রজননতন্ত্র ইত্যাদি বিষয় পড়তে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, প্রতিটি বিষয়ের যতটা সম্ভব খুঁটিনাটি বিষয় যেন তোমার আয়ত্তে থাকে।

শেষকথা 

সবকথার শেষকথা, মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে হবে। ভেঙে পড়া যাবে না, হাল না ছেড়ে শক্ত মনোবলের সাথে লড়ে যেতে হবে। ভর্তি পরীক্ষাটা আসলে কোনো স্প্রিন্ট দৌড় নয়, এটা আদতে একটা ম্যারাথন। তাই শেষতক যে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যায়, শেষ হাসিটা তার ঠোঁটেই ফুটে ওঠে। তাই কখনও মুষড়ে পড়বে না, কারণ সারাদেশের বাকি সব ভর্তি প্রত্যাশীও কিন্তু তোমারই মত সময় পার করছে। যারা এই চ্যালেঞ্জটা নিতে পারবে, তারাই দিনশেষে বিজয়ের হাসি হাসবে। 

আর তোমাদের ভর্তি প্রস্তুতিতে যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে সেজন্য আমরা ১০ মিনিট স্কুল থেকে নিয়ে এসেছি অ্যাডমিশন কোর্স! এতে এনরোল করে নিজের প্রস্তুতিকে তুমি দিতে পারবে পূর্ণাঙ্গতা, তাই আর দেরি না করে আজই এনরোল করে ফেলো আমাদের কোর্সটিতে। তোমাদের সবাইকে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের পৌঁছে দেয়াতেই আমাদের সফলতা!

আপনার কমেন্ট লিখুন