ক্লাসে মনোযোগী হবার ১০টি সহজ উপায়

June 14, 2018 ...

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

প্রতিদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ক্লাসের জন্য দৌড় দিতে হয় অর্পাকে। অর্পার জন্য ক্লাসে প্রতিদিন একইরকমভাবে মনোযোগী হওয়াটা খুব কষ্টকর। আম্মু প্রতিদিন ঘুম থেকে টেনে তুলে ক্লাসের জন্য পাঠাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ক্লাসে গিয়ে অর্পার ক্লাসের প্রতি মনোযোগ আসছে না।

2
Source: Columbia University

আমাদের সবার জন্যই উপরের ঘটনাটি কিন্তু কোন না কোনভাবে সত্য। ক্লাসে টানা মনোযোগ রাখা অথবা সকালের ঘুম ফেলে ক্লাসে যাওয়া দুটোই কিন্তু খুব কষ্টকর, তাই না? কিন্তু আমরা সবাই জানি, ক্লাসে বসে না ঝিমিয়ে বা অন্যদিকে মনোযোগ না দিয়ে, ক্লাসগুলো খুব ভালোভাবে করাটা আমাদের জন্য অনেক প্রয়োজন। ক্লাসের প্রতি মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয়তো আমরা করতে পারি কিন্তু তবুও ক্লাসে গিয়ে মন বসে না আমাদের অনেকেরই।

Hartley and Davies-এর একটি গবেষণায় জানা গিয়েছে, প্রতি ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর পর আমাদের মনোযোগ কমে যায়। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, আমরা চাইলেও একটানা মনোযোগ ক্লাসে রাখতে পারবো না। এরপর যদি আমরা আরো বেশি অমনোযোগী থাকি তাহলে সেই ক্লাস থেকে আমরা কতটুকু উপকৃত হবো?

তাই ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য আমাদের মানসিক ভাবে প্রস্তুতিও যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি চাইলেই কিছু ছোট ছোট বিষয় খেয়াল রাখলে সহজেই আমরা ক্লাসে মনোযোগী হতে পারি। জন্য আমাদের চিন্তাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাসটা, গড়ে তুলতে হবে। শুনতে খুব কঠিন শোনালেও খুব সহজভাবেই কিন্তু এই অভ্যাসটা আমাদের আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারি। জেনে নিতে পারো কীভাবে সহজেই আমরা ক্লাসে মনোযোগী হতে পারি।

. সরিয়ে ফেলো মনোযোগ নষ্টের হাতিয়ার:

আমাদের ক্লাসে মনোযোগী হবার অন্যতম ভালো মাধ্যম হল, যে জিনিসগুলো আমাদের মনোযোগকে ক্লাসের দিক থেকে সরিয়ে তার দিকে মনোযোগী হবার জন্য আর্কষণ করছে সেগুলোকেই দূরে সরিয়ে ফেলা। মানে হলো মোবাইল, গেইম প্যাড-এগুলো এখন আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় হলেও ক্লাসের সময় এগুলোকে দূরে রাখতেই হবে। একটা বিষয় সবসময়ই মাথায় রাখতে হবে, ক্লাসে তুমি অমনোযোগী হয়ে পড়ছো, এটা বোঝার সাথে সাথেই খেয়াল করবে তুমি তাহলে কোথায় মনোযোগ দিচ্ছো? যা করছো তা না করে পুনরায় ক্লাসে মনোযোগ দাও।

এটা তো গেলো ক্লাসে কোন জিনিসগুলো তোমার মনোযোগ নষ্ট করছে। এছাড়াও যে সহপাঠীরা ক্লাসে সবসময় কথা বলছে, অমনোযোগী থাকছে, তাদের সাথে না বসে অন্য কোথাও বসো। এই অভ্যাসগুলো ক্লাসে মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

. সময়ের দিকে মনোযোগী হও:

ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার অন্যতম আরেকটি উপায় হলো বর্তমান সময়ের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। অর্থাৎ, যে সময়ে তোমার ক্লাস চলছে সে সময়টুকুতে অন্য কিছু নিয়ে না ভাবা। ক্লাসের পর কই যাবে, আজকে কী টিফিন দিবে,বা সন্ধ্যায় কখন খেলতে যাবে, এরকম কোন কিছু নিয়ে না ভেবে, যে ক্লাসটি চলছে তার দিকে মনোনিবেশ করো। কোন দিবাস্বপ্ন নয়, যা হচ্ছে তার দিকে মনোযোগ দাও, এই অভ্যাসটি গড়ে তোলা কঠিন কিন্তু বারবার চেষ্টায় একবার এই অভ্যাসটি  আয়ত্তে এসে গেলে তোমার জন্য অনেক বেশি উপকার হবে।

তোমাকে নিজে নিজেই শিখতে হবে কীভাবে তোমার ভাবনাগুলোকে আবদ্ধ রাখবে আর ক্লাসের লেকচারগুলোতে মনোযোগ দেবে। যদি অমনোযোগী হয়ে যাও, তাহলে ভাবনাগুলোকে ধরে ফেলোনিজে নিজেও ভাবো ক্লাসে মনোযোগ দিতেই হবে। তারপর আবার মনোনিবেশ করো। আয়ত্তে আনা একটু কষ্টকর হলেও বারবার চেষ্টা তোমাকে সফল করবেই।

. পুনরায় মনোনিবেশ:

মনোযোগ দাও তোমার মস্তিষ্ক কী করছে সেইদিকে। যদি খেয়াল করো বর্তমানে যা হচ্ছে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে তোমার মস্তিষ্ক অন্য কিছু ভাবছে, তাহলে সেই ভাবনা থেকে মস্তিষ্ককে সরিয়ে নিয়ে এসে নতুন করে মনোযোগ দাও। শিক্ষক যা বলছেন তার সাথে তাল মিলিয়ে তাকে ওই বিষয়ে কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস করো। এই অভ্যাসটির চর্চা বারবার করতে হবে, যাতে করে মনোযোগ ক্লাসের বাইরের বিষয়ে না চলে যায়।

“মনোযোগ একটি দক্ষতা। এই দক্ষতাটি অন্যান্য দক্ষতার মতোই অর্জন করতে হবে।”

মিউজিকের সাথে নিজের পড়ার বিষয়গুলো নিয়ে ভাবার চেষ্টা করে দেখতে পারো। তোমার মস্তিষ্ক যা প্রয়োজন তা নিয়েই ভাবতে পারছে কিনা সেটার চর্চা করতেই হবে। মনোযোগ একটি দক্ষতা। এই দক্ষতাটি অন্যান্য দক্ষতার মতোই অর্জন করতে হবে।

কথা বলো শিক্ষকের সাথে:

প্রত্যকের কোন কিছু শেখার ধরণ ভিন্ন। হয়তো তোমার শিক্ষক যেভাবে বোঝাচ্ছেন বা শেখাচ্ছেন তোমার সেটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, সে বিষয় নিয়ে শিক্ষকের সাথে কথা বলো। এছাড়া ক্লাসের পড়ার বিষয় নিয়ে পরের দিন এসাইনমেন্ট করতে পারো, এরপর যেকোন সমস্যা নিয়ে শিক্ষককে বলতে পারো। তুমি যদি নিজের পড়ার প্রতি বেশি মনোযোগী হতে পারো তাহলে সে বিষয়ে কোন সমস্যা অনুভূত হলে শিক্ষকের কাছে সহায়তাও পাবে নিজের মনের মতো।

bucket list, events, life, life hacks, life skills, management, time management

শিক্ষকদের সাথে পড়াশোনার বিষয় নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগের ব্যাপারটি ক্লাসের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়ক। কারণ যখন শিক্ষকদের সাথে তোমার নিয়মিত যোগাযোগ থাকবে ওই বিষয়গুলোর প্রতি তোমার আলাদা আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এতে করে ওই বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ বাড়বে।

. ক্লাসের আগের প্রস্তুতি:

মনোযোগের মতো বিষয়টি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নিয়েই আয়ত্তে আনতে হয়। ক্লাস শুরুর আগেই বিগত ক্লাসে কী পড়ানো হয়েছিলো সেগুলো দেখতে পারো, হোমওয়ার্কে চোখ বুলিয়ে নিতে পারো অথবা যে বিষয়ের ক্লাস সেই বিষয়ের বইটা একটু ঘেঁটে দেখতে পারো। ক্লাস শুরুর আগেই নিজের একটা মানসিক প্রস্তুতি তোমাকে অধিক মনোযোগী হতে সহায়তা করবে। এছাড়াও খাতা বের করা, পেন্সিলটা শার্প করা এসব কাজ একটা পরিবেশ তৈরি করে, যা থেকে তুমি নিজে থেকে মানসিক ভাবে তৈরি হতে পারো মনোযোগের সাথে ক্লাস করার জন্য।

. বসার স্থান পরিবর্তন:

ক্লাসে গিয়ে কই বসবো, এই নিয়ে প্রায়ই আমরা বিপাকে পড়ে যাই। কিন্তু তোমার নিয়মিত বসার স্থান পরিবর্তন করে সামনের বেঞ্চে এসে বসতে পারো। এতে করে তোমার মন এবং মস্তিষ্ক সবসময় সতর্ক থাকছে যে শিক্ষক তোমাকে দেখছেন, এই সর্তকতা তোমার মনোযোগ বৃদ্ধির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

বার বার যখন মস্তিষ্ক একই সংকেত পাবে, ধীরে ধীরে তখন কিন্তু তা অভ্যাসে পরিণত হবে। এছাড়া যখন তুমি বন্ধুদের থেকে ক্লাস এর সময়ে দূরে বসছো, চাইলেও তাদের সাথে কথা বলার সুযোগটি আর থাকছে না। আর এই অনুশীলন তোমার ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক হবে।

.নোট তৈরি করা:

শিক্ষক ক্লাসে যা পড়াচ্ছেন তা যদি তুমি খাতায় নোট করে নিতে পারো তাহলে ক্লাসে মনোযোগী থাকার বিষয়টি তোমার জন্য অনেক বেশি সহজ হয়ে যাবে। কারণ শিক্ষকের পড়ানোর সব বিষয় আর তোমার খাতায় লিখে রাখার বিষয়বস্তু যখন একই হচ্ছে তখন তোমার মস্তিষ্ক শিখছে এবং সেই বিষয়গুলিতে মনোযোগ দেবার চেষ্টা করছে। এছাড়া ক্লাসে নোট করার অভ্যাসটি তোমাকে বাসায় গিয়ে পড়া মুখস্থ এবং একইসাথে মনে রাখার জন্য অনেক বেশি সাহায্য করবে আর তাই ক্লাস নোট করা অভ্যাসটি এখনি আয়ত্তে নিয়ে আসো।

গবেষণা এবং অনুসন্ধান:

ব্যাপারটি খুবই স্বাভাবিক যে ক্লাসে পড়ানো সব বিষয় তুমি ভালোভাবে বুঝতে পারবে না। এতে করে হতাশ হয়ে যাওয়ার কিছু নেই। বাসায় এসে ক্লাসে পড়ানো বিষয়গুলি যদি ভালোভাবে গবেষণা করতে পারো তাহলে তুমি নিজেই অনেক কিছু বুঝতে পারবে। এক্ষেত্রে 10 Minute School হতে পারে তোমার গবেষণা এবং অনুসন্ধানের খুব ভালো একটি মাধ্যম। আর তাই যে বিষয়গুলো বুঝতে পারোনি সেগুলো অনলাইনে খুঁজে দেখতে পারো। এতে করে অনেক অজানা তথ্য,  বিষয়ের প্রতি তোমার মনোযোগ বেড়ে যাবে

. রুটিন তৈরি করো:

মনোযোগী না হওয়ার অভ্যাসটি অন্যান্য খারাপ অভ্যাসের মতই। আর তুমি যখন অনুধাবন করতে পারবে যে তুমি ঠিকমতো ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছো না, তখন থেকেই সবকিছুর জন্য একটি রুটিন তৈরি করবে। সেই রুটিন মোতাবেক পড়াশুনা করবে এবং ক্লাসের পড়াগুলো তৈরি করে ফেলবে।

একইসাথে সেই রুটিনে খেলাধুলা বা অন্য যে কাজগুলো করে তুমি আনন্দ পাও সেজন্য কিছু সময় বরাদ্দ করে রাখবে। রুটিন তৈরি করার উদ্দেশ্য হলো মস্তিষ্ককে একটি অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে আসা, যখন তুমি ক্লাস করছো তখন যেন পুরো মনোযোগ ক্লাসে দিতে পারোএকই সাথে যখন খেলাধুলা করছো তখন যেন পুরো মনোযোগ খেলার মধ্যেই থাকে।

১০মনোযোগ বৃদ্ধিতে চর্চা:

মস্তিষ্ককে ভালোভাবে কাজ করাতে হলে নিয়মিত মস্তিষ্ককে জানাতে হবে যে তুমি একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে চাও। অর্থাৎ মনোযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তোমাকে অবশ্যই নিয়মিত চর্চার বিষয়টির দিকে মনোযোগী হতে হবে। মনে রাখবে, তুমি যতবার তোমার মস্তিষ্কে জানাবে যে তুমি মনোযোগী হতে চাও, ততবার তোমার মস্তিষ্ক সতর্ক হয়ে যাবে। তার মানে বারবার মস্তিষ্কে এই বার্তাটি পাঠাতে হবে মনোযোগী হওয়া জন্য যে, তোমার ইচ্ছে রয়েছে। যেকোনো বিষয়ের চর্চা সেই বিষয়টিতে তোমাকে অবশ্যই সফলতা এনে দেবে।

এছাড়াও নিয়মিত ঘুম, পরিমিত আহার এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস তোমাকে শারীরিক সুস্থতা দান করবে। ভুলে যেও না, সুস্থতা মনোযোগ বৃদ্ধির একমাত্র চাবিকাঠি। তাই নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি  স্বাস্থ্যের দিকেও হতে হবে মনোযোগী।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন