মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস জেনে হয়ে উঠুন একজন প্রো মোবাইল ফটোগ্রাফার!

January 20, 2023 ...

আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে একটা কথা আমি প্রায়ই শুনে থাকি যে, “আমার তো ভালো ক্যামেরা বা ডিএসএলআর নেই, আমি কীভাবে মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে অন্যদের মত এত ভালো ছবি তুলবো?”

আসলে আমরা যদি একবার কোনো কিছু না করতে পারার ছুতো বের করতে পারি, তাহলে একের পর এক ছুতো আসতেই থাকবে। অপূর্ণতা সবার জীবনেই আছে, তাই বলে থেমে থাকলে কি হবে? বরঞ্চ যা আছে তা নিয়েই আপনাকে এগিয়ে যেতে হবে।

আমাদের কাছে দামী ক্যামেরা না থাকলে কী হয়েছে? মোটামুটি মানের এন্ড্রয়েড মোবাইল ক্যামেরা তো আছে? এটা নিয়েই নেমে পড়ুন না! আর মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম, মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস সহ মোবাইল ফোটোগ্রাফির আদ্যোপান্ত বলার জন্য আমি তো আছি নাকি? 

মোবাইল ফটোগ্রাফি আসলে কী?

মোবাইল ফোটোগ্রাফি হচ্ছে মোবাইল ডিভাইস- অর্থাৎ আরও স্পষ্ট করে বললে মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা।  মোবাইল ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রটা খুব দ্রুতই উন্নত হয়েছে বলা চলে। কথাটা বললাম কারণ, কয়েক দশক আগেও “মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা যাবে” এই ব্যপার মানুষের কল্পনার বাইরে ছিলো। যেখানে ছবি তোলার জন্য বিশাল বিশাল সব ক্যামেরার ব্যবহার করা হয়, সেখানে হাতের ছোট্ট মোবাইল ক্যামেরা দিয়েই যে নিখুঁত ছবি তোলা যাবে তা ভাবতো না কেউ।  মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম জেনে যে একজন ভালো ফটোগ্রাফার হওয়া সম্ভব, এটি তো স্বপ্নপ্রায় ব্যপার। 

কেন করবেন মোবাইল ফটোগ্রাফি? 

প্রযুক্তিগত উন্নতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যে, যেকোনো মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতেই আমরা ছবি তুলি। সেজেগুজে বেড়াতে যাওয়া, বন্ধুর স্কলারশিপ পাওয়া, বাবা-মায়ের এনিভার্সারি থেকে শুরু করে প্রতিদিনের ক্লাস শেষে বন্ধুদের নিয়ে ফুচকা খাওয়া – সবকিছুরই ছবি তুলে রাখা আমাদের অভ্যাস মতো হয়ে গিয়েছে। এর প্রধান কারণ মোবাইল দিয়ে ছবি তোলার সুবিধা। মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম আর কিছু মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস জানলে এর চমৎকার কিছু সুবিধা আছে, যা বলতেই হয়।

মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস
Photo: freepik

মোবাইলের সহজলভ্যতা: 

আশেপাশে তাকালে খুব কম মানুষই আপনি দেখবেন, যাদের কাছে ছবি তোলা যায় এমন একটা মোবাইল নেই। আমরা সহজে আমাদের মোবাইল হাতছাড়া করিনা। অনেকে তো বাথরুমেও মোবাইল সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এর মানে হচ্ছে, আপনার ছবি তোলার যন্ত্রটি প্রায় সারাক্ষণ আপনার সাথেই আছে। চট করে একটা সুন্দর মুহূর্ত বন্দী করে ফেলতে হলে সবথেকে সহজ অপশন কিন্তু এটাই!

ছবি আদান-প্রদানে সুবিধা: 

আমার বোনের বিয়ের সময় ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো আমি পেয়েছি বিয়ে শেষ হয়ে যাবারও আরও অনেক পরে। অথচ মোবাইল ফোন দিয়ে টুকটাক যে কয়টা ছবি তুলেছি ওগুলো সাথে সাথেই আমার দেশের বাইরে থাকা বন্ধুদের দেখাতে পেরেছি। ছবি পেতে এত অপেক্ষা কী ভালো লাগে, যেখানে মোবাইল ফোনের মতো তৎক্ষণাৎ ছবি পাওয়ার চমৎকার একটা উপায় আছে?

ঠিক এক কথা খাটে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রে। মোবাইল স্টোরেজেই ছবি থাকায় যেকোনো মুহূর্তে সেটা আপনি শেয়ার করতে পারেন আপনার সোশ্যাল মিডিয়ার বন্ধুদের সাথে। এর জন্য আপনার ক্যামেরা থেকে ছবি আসার অপেক্ষা করতে হয়না।

হাতেনাতে ছবি এডিট:

মোবাইল ক্যামেরার ছবি তৎক্ষণাৎ এডিট করা যায় মোবাইল ফোনে থাকা এপ্লিকেশন দিয়েই। এমনকি মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম জানলে, সেই ছবি এডিট করা কম্পিউটারে বসে এডিট করা থেকে বেশী সহজ। যাত্রাপথে গমগম ট্রেন হোক কিংবা পাড়ার টঙ, যেকোনো জায়গায় বসেই এডিটের কাজ আপনি করতে পারবেন।

ব্যাকআপ এর সুবিধা: 

মোবাইল ফটোগ্রাফির সবথেকে ভালো ব্যপারগুলোর মাঝে একটা হলো, ছবি তোলার সাথে সাথেই আপনার ছবির ব্যাকআপ তৈরী হয়ে যাবে। এতে করে ডিভাইস হারিয়ে গেলেও, ছবি হারিয়ে যাবার কোনো ভয় নেই। এর জন্য অবশ্য আগে থেকে ব্যাকআপ অপশন চালু করে রাখতে হয়।

সহজেই মুহূর্ত বন্দী:

ধরুন আপনি একজন বিড়ালপ্রেমী। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ একটা ছোট বিড়াল কে দৌড়াতে দেখলেন। আপনার ছবি তুলতে ইচ্ছা করলো। আপনার কাছে আছে একটা স্মার্টফোন, আর ব্যাগে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা। এখন বিড়ালটি  আপনার সামনে থেকে চলে যাবার আগে দ্রুত আপনি কোন ডিভাইসটি ব্যবহার করবেন? অবশ্যই মোবাইল ফোন! মোবাইও ফোনে ছবি তোলার আনুষ্ঠানিকতা কম থাকায় সহজেই আপনার প্রিয় মুহূর্ত বন্দী হয়ে যাচ্ছে।

মোবাইল ফটোগ্রাফি বনাম প্রফেশনাল ফটোগ্রাফি:

মোবাইল ফটোগ্রাফির জনপ্রিয়তা দিনদিন বেড়েই চলছে। কারণ, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরার সাথে একটা ভালো মানের স্মার্টফোন ক্যামেরার পার্থক্য দিনদিন কমে আসছে। একটা ছোট ‘অল ইন ওয়ান’ ধরণের যন্ত্র যদি বিশাল ক্যামেরার কাছাকাছি মানের ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তাহলে এটি জনপ্রিয় হবেনা কেন?

তবে যেন-তেন ছবিই কিন্তু একজনকে ‘মোবাইল ফটোগ্রাফার’ বানিয়ে দিতে পারেনা, ঠিক যেমন ডিএসএলআর থাকলেই একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার হয়ে যাননা। মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম জানার পাশাপাশি ভালো করার জন্য খেয়াল রাখতে হয় অনেক অনেক দিক। ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার এই মোবাইল ফটোগ্রাফির কিছু প্রো টিপস নিয়েই আজকের এই লেখায় হাজির হয়েছি, যেগুলো মেনে চললে আপনিও হতে পারবেন একজন প্রো মোবাইল ফটোগ্রাফার!

মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম: মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস

১. মোবাইল ক্যামেরার লেন্স পরিষ্কার করা:

আমাদের ফোন বেশিরভাগ সময় আমাদের হাতে থাকে, ব্যাগ কিংবা পকেটের মধ্যে থাকে৷ যার ফলে আমাদের ব্যাক ক্যামেরায় ধুলার আস্তরণ, স্ক্র‍্যাচ, আঙ্গুলের ছাপ পড়ে যায়। এই অবস্থায় ছবি তুলতে গেলে দেখা যাবে ছবি তো ভালো আসবেই না, উলটো ছবি ঝাপসা বা ব্লার হয়ে যাবে। কারণ লেন্সে ধুলোবালি জমে যাওয়ার ফলে আলো ক্যামেরার সেন্সরে আসতে পারে না। যার কারণে ছবিতে একটু অন্ধকার অন্ধকার ভাবটাও চলে আসে। আপনি যত ভালো ছবি তুলবেন না কেন, লেন্স পরিষ্কার না থাকলে কোনো লাভ হবে না। লেন্স পরিষ্কার রাখতে নরম পরিচ্ছন্ন কাপড় সাথে রাখবেন৷ সেটা দিয়ে আলতো করে লেন্সে ঘষলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

২. আলোর দিকে লক্ষ্য রাখুন:

এটি সবথেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস। মোবাইলে শুধু ক্যামেরা থাকলেই হবে না, তা ব্যবহার করাও জানতে হবে। আপনার ক্যামেরা কত ভাল সেটা চিন্তা করার আগে আলো কোনদিক দিয়ে আসলে ভাল হবে, সেই কথাটা ভাবতে হবে। কেননা আলোর উপরেই আপনার ছবির কোয়ালিটি নির্ভর করছে। যেমন এখন দিনের কোন সময়, কোন দিক দিয়ে আলো আসছে, আবহাওয়া রৌদ্রজ্জ্বল নাকি মেঘলা, সূর্য তোমার সামনে না পেছনে, আর্টিফিশিয়াল লাইট ইউজ করলে সেটা কোনদিকে বসাবে- এমন নানান বিষয় ছবি তোলার আগে ভাবতে হবে।

একজন ভালো ফটোগ্রাফার সবসময় আলোর দিকে লক্ষ্য রাখেন। কারণ আলোর বিষয়টি নিয়ে মাথা না ঘামালে যেই সমস্যাটা হবে তা হলো, খুব ছোট ছোট তারতম্য কিন্তু আপনার পুরো ছবিকে বদলে দিতে পারে। তাই ছবি তোলার আগে আলোর বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন।

৩. ফোকাস ঠিক রাখা:

লক্ষ্যবস্তুকে ফোকাস করতে চাইলে মোবাইলের স্ক্রিনটি লক্ষ্যবস্তুর দিকে সেট করে শুধু আলতো করে টাচ করতে হবে। তাহলে একটা গোল বা চারকোনা হলুদ রঙের আকৃতি দেখা যাবে। সেইটাই হলো আপনার ফোকাস পয়েন্ট। আপনার ফোকাস পয়েন্ট যার উপরে থাকবে, শুধু সেটাই ফোকাস করা হবে৷ চারপাশের জিনিসগুলোর তুলনায় সেখানকার ব্রাইটনেস ও শার্পনেস থাকবে তুলনামূলকভাবে বেশি।

মোবাইল ক্যামেরা
Photo: Freepik

৪.  Adjust Exposer Manually:

ফোকাস করার সাথে সাথেই অটোমেটিকভাবে এক্সপোজার ফাংশনটি কাজ করতে শুরু করে। এক্সপোজারের মাধ্যমে ছবিটির ব্রাইটনেস কেমন হবে তা সেট করা যায়। কিন্তু আপনারা চাইলে আঙ্গুল মোবাইলের স্ক্রিনের উপর রেখে একটু উপর-নিচ করলেই ব্রাইটনেস বাড়াতে বা কমাতে পারবেন।

৫. জুম করা এড়িয়ে চলুন:

 মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম এর মাঝে এটি অন্যতম। মূলত কোনো ছবি কাছ থেকে তুলতে আমরা ক্যামেরা জুম ইন করে থাকি। মোবাইল স্ক্রিনের উপর দুই আঙ্গুল দিয়ে সামনে পেছনে করলে জুম ইন ও জুম আউট সহজেই করা সম্ভব। কিন্তু জুম করার সমস্যাটা হলো এর মাধ্যমে ছবি খুব বাজে ভাবে ফেটে যায় এবং ছবির কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে যায়। কারণ ফোনের জুম সেটিংসটি হলো ডিজিটাল জুম, অপটিক্যাল জুম না।

জুম করার ফলে একটি ছবিকে ক্রপ করলে যেমন দেখায়, ঠিক তেমনই দেখাবে৷ তাই কোনো দূরের ছবি তুলতে চাইলে হেঁটে সামনে আগানোটাই শ্রেয়। কিন্তু তাও যদি জুম করে ছবি তোলার ছাড়া কোনো উপায় না থাকে, যেমন: সমুদ্রের মাঝখানে অবস্থিত কোনো দ্বীপের ছবি তোলার ক্ষেত্রে জুম করেই ছবি তুলতে হবে। কিন্তু জুম করতে যেয়ে ছবির কোয়ালিটি যাতে ভাল হয়, সেইটাও মাথায় রাখা প্রয়োজন।  

৬. নিজের মোবাইল ক্যামেরা স্থির রাখুন:

এমন অনেক মানুষ আছেন যারা কোনো কিছু স্থির হয়ে ধরে রাখতে পারেন না। তাদের হাত অনবরত কাঁপতে থাকে। আবার যাদের এমন হাত কাঁপে না, তাদের মধ্যে অনেকেই হাতে ক্যামেরা নিয়ে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না। ফলে ছবি তোলার সময় দেখা যায় ছবি ঝাপসা এসেছে।

Tripod
Source: Freepik

এক্ষেত্রে ট্রাইপড ইউজ করতে পারেন৷ ট্রাইপডের মাধ্যমে আপনার ডিভাইসটি তার মধ্যে সেট করে দিয়ে শুধু ক্লিক করলেই হলো! ব্যস, মনের মতন ছবি পেয়ে যাবেন। এছাড়াই মোবাইলটা কোনো একটা জায়গায় সোজা করে রেখে টাইমার দিয়ে দিলেও কাজ হবে৷ যারা  IOS ইউজার, তারা তাদের ডিভাইসে ইয়ারফোন লাগিয়ে সাউন্ড বাটনে ক্লিক করেও সহজেই ছবি তুলতে পারবেন।

৭. কম্পোজিশন:

ছবির কম্পোজিশন ভালো না হলে ছবিটি দৃষ্টিনন্দন হবে না। আর ছবি সঠিকভাবে কম্পোজ করতে চাইলে সেটিংসে যেয়ে Grid অপশনটি অন করুন। এরপর দেখা যাবে লম্ব বরাবর ২টি এবং আনুভূমিক বরাবর ২টি লাইন তৈরি হয়েছে৷ এবার সেই ২টি লাইন দিয়ে তৈরি ৬টি বক্সগুলোর ভেতরে নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে ছবির বিষয়বস্তু সেট করে নিতে হবে। যেমন: একটা ছবির কোন অংশটা মাঝের বক্সে রাখবো, আকাশের অংশটুকু পুরো উপরের বক্স জুড়েই দিবো, নাকি অর্ধেক দিবো ইত্যাদি। একে Rules of Third বলা হয়।

৮. ভিন্নভাবে ছবি তুলুন:

সবসময় ট্রেন্ডি বা সাধারণ স্টাইলে ছবি না তুলে একটু নিজের মতন করে কিছু তোলার চেষ্টা করুন। সবসময় কেনো চোখের সামনে যা আসছে সেগুলোর ছবি তুলবেন? নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগান। একটু হাঁটু গেড়ে নিচে বসে দেখুননা কত রকম ছবি তোলার বিষয় আপনার পদতলে ঘোরাঘুরি করছে! ছোট ছোট ঘাসফুল, ঘাসফড়িঙয়ের ছবি একটু নতুন আঙ্গিকে তোলার চেষ্টা করুন। মোবাইল ক্যামেরার সুবিধা হলো এই ক্যামেরা এমন এমন জায়গার ছবি তুলতে পারবে, যেখানে বড় ক্যামেরাগুলো পৌছাবে না৷ সেইগুলো আপনার মুঠোফোনে বন্দি করে ফেলুন।

৯. Birds Eye View:

Bird's eye view
Source: Dhaka Tribune

আচ্ছা আপনারা কি জানেন যে পাখি যখন ওড়ে, তখন সে নিচের জিনিস কীভাবে দেখে? নিচের দৃশ্যগুলো একদম খাড়াভাবে সে দেখে৷ আর তার দেখার এই ভঙ্গিকে বলা হয়- ‘Birds Eye View’। তাই আপনি কোনো এক উঁচু জায়গায় উঠে একদম খাড়া নিচু করে নিচের দিকের জিনিসগুলোর ছবি তোলার চেষ্টা করুন। এটি আপনার ছবি তোলার স্কিলকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।

১০. ব্যাকগ্রাউন্ডকে এক করে ফেলতে:

কোনো কোনো জিনিসের ছবি তোলার পর দেখা যায় আপনার ফোকাস করার বস্তুটির থেকে আশেপাশের জিনিসগুলো বেশি রঙিন হয়ে উঠেছে। তখন কী করবেন? চিন্তার কোনো কারণ নেই৷ তখন ছবির ইফেক্ট চেঞ্জ করে শুধু সাদা-কালো করে দিলেই হবে। ফলে এক্ষেত্রে ব্যাকগ্রাউন্ডে এই দুটো ছাড়া আর কোনো রং-ই থাকবে না৷ ফলে সবার মনোযোগ সেই ফোকাস করা জিনিসটাকেই টানবে। 

১১. একের অধিক ক্লিক:

কোনো কিছুর একটা ছবি তুলেই তৃপ্তি পাওয়ার কিছু নেই। ছবি তোলার সময় হয়তো আপনার মনে হতে পারে যে ছবিটা সুন্দর হয়েছে। কিন্তু যখন গ্যালারিতে যেয়ে দেখবেন ছবিটা কেমন হয়েছে, তখন আপনার তা ভালো নাও লাগতে পারে। কিন্তু তখন আপনি আফসোস ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেন না। তাই ছবি তোলার সময় একসাথে অনেকগুলো ছবি তুলে ফেলুন। যেসব ছবি ভালো আসবে না, সেগুলো ডিলিট করে দিলেই হবে।

১২. প্যানারোমা মোড:

Panaroma
Source: Pocket Photography

প্যানারোমা মোডের সাহায্যে আপনি একটা ফ্রেমে একই সাথে আপনার চারদিকের দৃশ্য ক্যাপচার করতে পারবেন। যেমন: সিটিস্কেপ, ল্যান্ডস্কেপ ইত্যাদি। মোবাইলের সেটিংসে যেয়ে প্যানারোমা অপশনে ক্লিক করার সাথে সাথে প্যানারোমা মোড চালু হয়ে যাবে৷ এরপর স্ক্রিনে দেখানো তীর চিহ্নটির সাথে সাথে আপনিও ক্যামেরা ঘুরাতে থাকুন। যখন পুরো দৃশ্য ফোনে বন্দি করা হয়ে যাবে, তখন একবার ক্লিক করেই পুরো ছবিটি চলে আসবে। সাধারণত কোনো দৃশ্যের ছবি তুলতে প্যানারোমা মোডে ছবি তোলা হয়। 

১৩. অতিরিক্ত এডিটিং এড়িয়ে চলুন: 

আজকাল এমন এক শ্রেণির মানুষের দেখা মিলে, যারা যেকোনো সাধারণ ছবিতেও অতিরিক্ত HDR ইফেক্ট ব্যবহার করে। HDR ইফেক্ট ব্যবহারের ফলে ছবির শার্পনেস তো নষ্ট হবেই, এর পাশাপাশি ছবির কোয়ালিটিও বাজে হবে। তাই  HDR ইফেক্ট যদি ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে Snapseed এর  HDR ইফেক্টটা ব্যবহার করা উচিত। এটি আরেকটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস।

১৪. বিভিন্ন এঙ্গেলে ছবি তুলুন:

সবসময় একই এঙ্গেল যেমন সামনে থেকে সোজাসুজি ছবি না তুলে ফোনটা একটু বাঁকা করে ছবি তোলার চেষ্টা করুন। এতে ছবিতে নতুনত্ব আসবে। আমরা যদি ইন্সটাগ্রাম ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবিগুলো দেখে থাকি, তাহলে বোঝা যাবে যে শুধুমাত্র ছবি তোলার এঙ্গেল চেঞ্জ করেই তারা তাদের স্টাইলে ভিন্নতা আনেন।

১৫. সদা প্রস্তুত:

হাতের কাছে ফোনটা না থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি তোলার বিষয় আপনার হাত থেকে ফসকে যাবে। তখন মনে হবে, “ইশ! ফোনটা যদি হাতের কাছে রাখতাম।” বিশেষ করে আপনি যখন কোথাও বেড়াতে যাবেন, যেমন: পাহাড়ে, সমুদ্রে যেকোনো জায়গায়, তখন ফোনের ক্যামেরা সবসময় অন রেখে দেবেন। চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় থাকলে সাথে দুইটা পাওয়ার ব্যাংকও নিয়ে রাখবেন। যাতে করে কোনো মূহুর্ত যেন আপনি মিস না করে ফেলেন।  

১৬. ফ্ল্যাশের কথা ভুলে যান:

মূলত ছবিতে আলোর অনুপস্থিতিতে আমরা ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু ফ্ল্যাশ ইউজ করলে ছবির মান খারাপ হয়ে যায়, বিশেষ করে দিনের বেলায় ফ্ল্যাশ ইউজ করলে। তাই পর্যাপ্ত আলো থাকাকালীন আমরা ফ্ল্যাশ ইউজ করবো না।

১৭. নেগেটিভ স্পেস নিয়ে কাজ করুন:

নেগেটিভ স্পেস বলতে বোঝানো হয় অতিরিক্ত খালি জায়গা। ধরুন আপনি এখন একটা মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবি তোলার সময় আপনাকে মাঝখানে না রেখে ফ্রেমের এক পাশে রাখা হলো এবং বাকি অংশটা জুড়ে শুধু মাঠকেই প্রাধান্য দেওয়া হলো৷ অর্থ্যাৎ এখানে নেগেটিভ স্পেস ব্যবহার করে ছবি তোলা হয়েছে। আজকাল নেগেটিভ স্পেস ব্যবহার করেও খুব সুন্দর সুন্দর ছবি তোলা যাচ্ছে।

১৮. Look for Symmetry:

Symmetry বলতে কোনো কিছুর Mirror Image বোঝানো হয়। কিন্তু শুধু আয়নার প্রতিফলনই না, একই ধরণের ছবি পাশাপাশি রেখে ছবি তোলাকেও Symmetry বলে। এইধরণের ছবি তুলতে হলে Grid Line ব্যবহার করা যেতে পারে।

 ১৯. Leading Line ব্যবহার করুন:

লিডিং লাইন বলতে এমন এক ধরণের লাইন বোঝানো হচ্ছে, যা সরাসরি সকলের চোখে পড়বে। যেমন: উপর থেকে তোলা সিড়ির ছবি, রেল লাইনের ছবি, পাহাড়ি রাস্তার ছবি ইত্যাদি।

২০. প্যাটার্ন অনুযায়ী ছবি তোলা:

ছবি শেয়ারিংয়ের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় সাইট হলো ইন্সটাগ্রাম এবং পিন্টারেস্ট। এখানে গেলেই দেখা যাবে যে কী অসাধারণ হয় একেকটা ছবি! আপনার তোলা ছবিগুলোর মূল বিষয় হতে পারে নানান ধরণের জ্যামিতিক প্যাটার্ন, যেমন: বৃত্ত, চতুর্ভূজ, ত্রিভূজ ইত্যাদি। এই প্যাটার্নগুলো বিভিন্ন কালারের হলে তো কোনো কথাই নেই! সকলের দৃষ্টি ওখানেই আটকে থাকবে।

 

মোবাইলে ভালো ছবি তোলার নিয়ম
Photo: Freepik

২১. ছবির এক অংশ রঙিন:

মনে করুন আপনি একটা ছবি তুললেন। যার সম্পূর্ণ অংশ সাদাকালো কিন্তু শুধু একটা জায়গায় লাল। ধরা যাক, আপনি হলুদ রঙের একটা শাড়ি পরেছেন, সাথে লাল টিপ। একটু এডিট করে আপনার পুরো ছবিটা আপনি সাদাকালো করে ফেললেন, শুধুমাত্র আপনার কপালের টিপটা লাল। আপনার মনে হয় না এমনটা করলে ছবিটা অনেক নান্দনিক হয়ে উঠবে? চাইলেই এমন নানাভাবে এডিট করে আপনি আপনার এডিটিং স্কিলটাও যাচাই করে নিতে পারবেন।

২২. Candid ছবি তুলুন:

নিজের ক্যান্ডিড ছবি নয়, কোনো চলমান জিনিস বা কর্মরত মানুষদের ছবি তুলুন। তাই বলে ফেক ক্যান্ডিড তুললে কিন্তু কোনো লাভ হবে না!

এছাড়াও মোবাইল ফটোগ্রাফি করার ক্ষেত্রে যেই বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন- 

  • ছোট ছোট সব জিনিস মুঠোফোনে বন্দি করার চেষ্টা করুন।
  • Abstract Photo তোলার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। এধরণের ছবিতে কখনো পুরো একটা জিনিসের ছবি তোলা হয় না। কিছু অংশ তোলা হয়।
  • ছবি তোলার ক্ষেত্রে যে জিনিসটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাহলো ধৈর্য। ধৈর্য ছাড়া আপনি কখনোই একজন ভালো ফটোগ্রাফার হতে পারবেন না। একই ছবি বারবার তুলতে থাকুন, যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা আপনার মনমতো হয়।
  • White Balance এর মাধ্যমে কালার মডিফাই করতে পারবেন।
  • সবসময় একটা সাব্জেক্টেই নিজের ফোকাস ঠিক রাখবেন।
  • Brightness, contrast, saturation কীভাবে এডজাস্ট করতে হয়, এগুলো জানতে হবে।
  • ফোন কেনার সময় এর ম্যানুয়ালে ক্যামেরায় কী কী ফাংশন আছে, তা জেনে নিবেন।
  • সেলফি তুলে কখনো ফটোগ্রাফি হয় না। পোর্ট্রেট ছবি তুলুন।
  • ছায়া এবং প্রতিফলন নিয়ে কাজ করুন।

কীভাবে শিখবেন মোবাইল ফটোগ্রাফি:

প্রথমে নিজেই নিজেকে শেখানো দিয়ে শুরু করুন। মোবাইল স্ক্রিনে টাচ করে ছবি ক্যাপচার তো সবাই-ই করতে পারে। আপনি উপরের মোবাইল ফটোগ্রাফি টিপস গুলো মাথায় রেখে ছবি ক্লিক করা শুরু করুন। দেখবেন ইতোমধ্যেই আপনি অনেকের থেকে ভালো ছবি তোলা শিখে গেছেন। এর পরবর্তী ধাপে যদি এগুতে চান, তাহলে প্রফেশনালিও শিখতে পারেন মোবাইল ফটোগ্রাফি।

বাংলায় যারা সবকিছু বেশি ভালো বোঝেন, তাদের জন্য সবথেকে ভালো হবে আমাদের টেন মিনিট স্কুলের ফ্রি মোবাইল ফটোগ্রাফি কোর্সটি। এখানে হাতেনাতে বোঝানো আছে মোবাইল ফটোগ্রাফির আদ্যোপান্ত।

মোবাইল ফটোগ্রাফি নিয়ে বাইরের কিছু ওয়েবসাইটেও অনলাইন কোর্স পাওয়া যায়। আমি কয়েকটি কোর্সের লিংক দিয়ে দিচ্ছি।

  1. Smartphone photography, Capturing landscapes
  2. SmartPhone Photography: Take Amazing pictures with a Phone
  3. Smartphone Photography: Improve Every Picture You Take With Your Phone

সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কিছু বিষয় মেনে চললে, আর ইচ্ছাশক্তি থাকলে শুধুমাত্র মোবাইল ক্যামেরার সাহায্যেই আপনি হয়ে উঠবেন একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার। তাই দেরি না করে আপনার হাতে যে ডিভাইসটি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন। সাথে এক চিমটি ধৈর্য ও সাহস দিতে যেন ভুল না হয়!     

 

সূত্র:

https://iphonephotographyschool.com/mobile-photography-tips/

https://blog.blitzwolf.com/mobile-photography-pro.html

https://blog.hubspot.com/marketing/good-pictures-phone-tips

https://www.androidcentral.com/10-android-photography-tips-beginners

https://iso.500px.com/35-mobile-photography-tips-thatll-help-you-take-incredible-smartphone-shots/

https://iphonephotographyschool.com/mobile-photography-tips/


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি আপনার লেখাটি ই-মেইল করুন এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন