ভাষার ভালোবাসায় – ভাষা নিয়ে যা যা জানতে হবে

February 15, 2021 ...

তোমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি কী, যা ছাড়া তুমি একেবারেই অচল, তাহলে তোমার উত্তর কী হবে? টাকাপয়সা, মোবাইল ফোন নাকি আইসক্রিম ছাড়া তোমার চলেই না? উত্তর যেটাই হোক, চলো আমরা একটা দৃশ্য কল্পনা করে আসি

মনে করো, তুমি এমন একটা পৃথিবীতে চলে এলে যেখানে তোমার মনের অনুভূতি বা ভাব প্রকাশ করার কোনো মাধ্যমই নেই! তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ, কিন্তু তা ঠিক বোঝাতে পারছ না। তুমি খুউব খুশি, কিন্তু সেটা বলার কোনো উপায় নেই!

এবার আরেকটা দৃশ্যে চলে আসি যেটা আমাদের ভীষণ পরিচিত

একটা সুন্দর মুভি কিংবা ড্রামা অথবা গান যার ভাষা আমাদের পরিচিত নয়, বারবার সাবটাইটেল আর স্ক্রিনের দৃশ্যের দিকে চোখের নজর পরিবর্তন করতে করতে একবারও যে মনে হয়নিইশ! এর থেকে ভাষাটা জানতে পারতাম! কী ভালোই না হতো!এমন মানুষ পাওয়া কিন্তু দুষ্কর।

সামান্য সাবটাইটেলের বিরক্তি থেকে মুক্তি হোক কিংবা মনের বিশাল অনুভূতির মেঘকে ব্যক্ত করতেই হোক, ভাষা ছাড়া যে একটা মুহুর্ত কল্পনা করা সম্ভব না তা কিন্তু বলাই বাহুল্য। আজকে গল্পটা হবে আমাদের এই নিত্য প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ ভাষা আর তা শিখার বিভিন্ন উপায় নিয়েই।

ভাষা যেভাবে এলো

পুরো পৃথিবী জুড়ে একটা দু’টো বা একশো দু’শো নয়, প্রায় ৬,৫০০ ভাষা আছে। কিন্তু এই ভাষা ব্যাপারটা কবে আর কীভাবে এলো? এই বিষয়ে বিতর্কের শেষ নেই। প্রায় ৪০ হাজার বছর আগের গুহা চিত্রকে আমরা সেই সময়ের মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যম বলে ধরে নিতে পারি। কিন্তু ভাষা তো আদতে সৃষ্টি হয়েছে আরও আগে! বেশিরভাগ ভাষাবিজ্ঞানী ভাষার উৎস বা উৎপত্তি সম্পর্কে কথা বলতে নারাজ, কেননা তাদের মতে ভাষার উৎস নিয়ে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণই কল্পনাপ্রসূত!

৬০০০ বছর আগে যখন লিখালিখি শুরু হয়েছিল তারপর থেকে ভাষা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে জানা সম্ভব হয়েছে। আর লিপি আবিষ্কার তো সেদিনের ঘটনা!

cave language
গুহাচিত্র। Image Source: Touropia

তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে ভাষাগুলো কোনো না কোনোভাবে কিছু নির্দিষ্ট ভাষাগোষ্ঠী থেকে এসেছে। যদিও এই ভাষাগোষ্ঠীর সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। যেমন: বাংলা ভাষা এসেছে ইন্দোইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠী থেকে। এই ভাষা পরিবারের সদস্য আরও আছে হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, ফারসি, জার্মান ইত্যাদি। অর্থাৎ এই ভাষাগুলোর মধ্যে এত বৈচিত্র্য থাকলেও এদের মূল কিন্তু ছিল একই!

ভাষা কেন শিখব?

ইতিহাস তো জানা হলো। কিন্তু এতো এতো ভাষা, প্রশ্ন জাগতে পারে কোনটা শিখব আর কেনই বা শিখব? সাধারণত প্রত্যেক দেশেই মাতৃভাষার বাইরে একটি দ্বিতীয় ভাষা প্রচলিত থাকে। যার সাথে আমরা ছোটোবেলা থেকে কম বেশি পরিচিত হই। তবে এর বাইরে একজন মানুষ কোন ভাষাটা শিখবে তা সম্পূর্ণই ব্যক্তি বিশেষের স্বতন্ত্র্য ইচ্ছা। যেমন: কোরিয়ান কিংবা টার্কিশ ড্রামা দেখতে গিয়ে কোরিয়ান কিংবা তুর্কী ভাষা শিখতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করে।

ভাষা শেখাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ তা একটু দেখে আসি

১। দক্ষতা বৃদ্ধি:

গবেষণা বলছে বহুভাষিক মানুষেরা অন্য মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে ভালো বুঝতে পারে। ফলস্বরূপ যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা বেশি দক্ষ হয়। তাছাড়া কারো সাথে তার নিজের ভাষায় কথা বলতে পারাটা কিন্তু অনেক বড়ো একটা উপহার! কোনো ভাষা সম্পর্কে জানা মানে সেই জনগোষ্ঠীরই একজন হয়ে যাওয়া। বিপুল পরিমাণ মানুষের সাথে সখ্যতা বা যোগাযোগ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভাষা শেখার জুড়ি নে!

শুধু যোগাযোগের দক্ষতাই নয় গবেষণা আরও বলছে, যারা বেশি ভাষা জানে তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, একাধিক কাজ করার ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। তাছাড়া তাদের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, মুক্ত এবং ইতিবাচকভাবে চিন্তা করার প্রবণতাও বেশি হয়ে থাকে।

২। সংস্কৃতির সেতুবন্ধন:

ভাষা হলো কোনো সংস্কৃতির মূল বাহন। ভাষা জানা মানে সেই সংস্কৃতি, তার মানুষজন, তাদের জীবনযাপন, ঐতিহ্য, শিল্পসাহিত্য প্রভৃতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারা প্রথমেই যে উদাহরণটা দিলাম, সাবটাইটেল দেখে কোনো মুভি উপভোগ করা আর সেই ভাষা জেনে তারপর তা দেখার মধ্যে কিন্তু বিস্তর পার্থক্য আছে।

৩। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি:

গবেষণা বলছে, নতুন ভাষা শেখাটা মস্তিষ্কের সেরেব্রাল কর্টেক্স এবং হিপোক্যাম্পাস এলাকার আকার বৃদ্ধি করে। ব্যাপারটা অনেকটা ব্যায়ামের মাধ্যমে পেশির শক্তি বৃদ্ধির মত। সেই সাথে ডিমনেশিয়া এবং আলঝেইমারের মত স্মৃতি সংক্রান্ত অসুখ হওয়ার হারও অনেক কমে আসে। তাছাড়া মনোযোগ বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রুতি সক্ষমতার ব্যাপার তো আছেই।

৪। অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা:

বিদেশ ভ্রমণ থেকে শুরু করে ব্যবসা বাণিজ্যবিশ্বায়নের এই যুগে বিভিন্ন ভাষা শেখাটা একজন ব্যক্তিকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে। চাকরির বাজারেও মূল্যায়ন তাদের বেশি হয়। সাধারণত নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীর সমন্বয় এবং যোগাযোগ করার দক্ষতা অনেক বেশি মূল্যায়িত হয়। তাছাড়া আগেই বলেছি, সমস্যা সমাধানসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা প্রার্থীকে আরও এক ধাপ এগিয়ে রাখে। ২০১০ থেকে ২০১৫ এর মধ্যে আমেরিকায় দ্বিভাষী প্রার্থীদের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে।

৫। অন্যান্য:

ভাষা শিখে কিন্তু ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও কাজ করা সম্ভব! প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষার অনুবাদক, প্রতিলিপক এমনকি মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন হয়। ভাষার দক্ষতা সহজেই এই কাজে লাগানো যায়।

তাছাড়া অনেক ভাষাই কালের স্রোতে বিলুপ্তপ্রায় হতে চলেছে। সেই ভাষা শিখে ফেললে কিন্তু ভাষা সংরক্ষণের কাজও হয়ে যায়।

কীভাবে শুরু করব?

১। লক্ষ্য নির্ধারণ:

ভাষাটা আমি কেন শিখছি এটা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি নিজের ব্যক্তিগত অভিপ্রায় হয় এবং আগ্রহের জায়গা হয় তাহলে খুব সহজে শিখে ফেলা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে আগ্রহটা হারিয়ে যায়, এক্ষেত্রে শেখার জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং পরিকল্পনা করে এগোলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

২। লজ্জা বা সংকোচ ঝেড়ে ফেলা:

পাছে লোকে কিছু বলেএই ভয়ে অনেকেই শেখার প্রক্রিয়াগুলো এড়িয়ে যায়কে কী বলবে, কেন বলবে ধরণের সংকোচ প্রথমেই ঝেড়ে ফেলতে হবে।

৩। ভুল হতে দেয়া:

স্বাভাবিকভাবে যেকোনো কাজের শুরুতে ভুল হবেই। ব্যাকরণ থেকে শুরু করে উচ্চারণ সব ক্ষেত্রেই একবারেই নিখুঁত হওয়া সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এই ভুলোগুলো হতাশ করে দেয়। মনে রাখতে হবে যে, ভুল হওয়াটা শেখারই ধাপ। তুমি ভুল করছ মানে তুমি শিখছ। তাই ভুল করতে কখনো ভয় পাওয়া যাবে না। ভুল শুধরে নেয়ার মাধ্যমেই শিখে ফেলা যাবে তোমার কাঙ্ক্ষিত ভাষাটি।

Practice speaking your language
অনুশীলন করাটা জরুরি। Image Source: Effortless Learning

৪। বেশি বেশি শোনা:

ছোট বাচ্চারা যখন কথা বলতে শেখে ওরা কিন্তু প্রথমেই ঠিক বা ভুল নির্ধারণ করতে পারে না। কিন্তু তারপরও খুব দ্রুত ভাষাটা শেখে কারণ সে চারপাশ থেকে ভাষাটাকে ক্রমাগত শুনেই যাচ্ছে।

শোনা এজন্যই খুব জরুরি। যে ভাষা শিখতে চাও সেই ভাষার গান, মুভি, প্রামাণ্যচিত্র ইত্যাদি বেশি বেশি শুনতে হবে। এতে কথা বলার ধরণ, উচ্চারণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। সেই সাথে নিজের ভুলগুলোও শুধরে নেয়া যায়।

৫। কথা বলা:

একটা ভাষা ততক্ষণ অবধি পূর্ণতা পায় না যদি না তা দিয়ে যোগাযোগ করা না পারা যায়। এক্ষেত্রে ‘স্পিকিং’ বা বলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে ভালো হয় ওই ভাষার স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলতে পারলে। তাছাড়া বন্ধুবান্ধব মিলে কথা বলার অনুশীলন করলে খুব দ্রুত ভাষা আয়ত্তে চলে আসে। ব্যাপারটাকে বলা হয়পিয়ার প্র্যাক্টিসযদি একেবারেই অনুশীলন করার কাউকে না পাওয়া যায় তবে নিজে নিজে আয়না দেখেও কথা বলাটা অনুশীলন করা যেতে পারে।

৬। শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি:

অনেক সময় এমন হয় বাক্য তৈরি করতে অসুবিধা হচ্ছেই শুধু সঠিক শব্দ না জানার কারণে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হলো Vocabulary বা  শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি করা। বই, পত্রপত্রিকা পড়া বা মুভি দেখার মাধ্যমে শব্দ ভাণ্ডার বৃদ্ধি করা যায়।

৭। ইন্টারনেট ব্যবহার:

আজকাল ভাষা শিখতে বিভিন্ন সাইট থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্পিকিং প্র্যাক্টিস, লেখালেখি করা, ভুল শুধরে দেয়া কিংবা ভোকাবুলারি সবই পাওয়া যায় এক ক্লিকেই। শেখাটা আরও মজাদার করতে রয়েছে পাজল বা গেমিং-এর ব্যবস্থা। চাইলে এসব ব্যবহার করেও ভাষার জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। জনপ্রিয় কিছু মাধ্যম হলো DUOLINGO, MEMRISE, BUSUU ইত্যাদি।

৮। অনুশীলন:

অনুশীলন অনুশীলন এবং অনুশীলন। কোনো কিছুই আয়ত্ত্ব করা সহজ নয়। ভাষাটাও তাই। এ কারণে প্রতিনিয়ত অনুশীলন প্রয়োজন। এতে করে শেখার কাজটা সহজ এবং ত্বরান্বিত হয়। সত্যি বলতে অনুশীলন ব্যতীত ভাষা আয়ত্ত্ব করা বলতে গেলে প্রায় অসম্ভবই। যত বেশি অনুশীলন তত বেশি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনের পথ সুগম হয়ে যায়।

সবই তো জানা হলো, তাহলে আর দেরি কেন? হারিয়ে যাও ভাষার ভালোবাসায়।

তথ্যসূত্র

আপনার কমেন্ট লিখুন