বিরিয়ানি: উপমহাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য

February 16, 2019 ...
পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

‘’বিরিয়ানি”- এটা এমন এক শব্দ যার আলাদা করে আর কোন পরিচয় লাগে না। ৪00  বছরের  ঐতিহ্যবাহী  এই খাবারের আবেদন যে এখনও অটুট আছে, তাতো এর জনপ্রিয়তা দেখলেই বোঝা যায়। তুমি যদি আমারই মতন জিভে জল আনা এই  বিরিয়ানির,  একজন দারুন ভক্ত হয়ে থাকো তাহলে চলো জেনে নেই,  প্রিয় এই খাবরটি কি করে ভারতবর্ষের সেরা একটি খাবারে পরিণত  হল সেই গল্পটি।

NfdSTi3Az2B0aNXqErxpkb2J3m45Y EupbaHi7zB UVBunLSxWgRj9qmNcfUdvW 61LxUZ0bi5OdGN2qA TYcrTWM0iDFXNTSeO9PJlElnRNB

বিরিয়ানি শব্দটি এলো যেভাবে :


যদিও মনে হতে পারে  ‘বিরিয়ানি’  যেন ভারতবর্ষেরই নিজস্ব এক শব্দ। আসলে কিন্তু এই শব্দটি এসেছে সেই সুদূর পারস্য থেকে । ফারসি শব্দ ‘বিরিয়ান’ আর ‘বিরিঞ্জ’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে ‘বিরিয়ানি’র। ‘বিরিয়ান’ শব্দের অর্থ হলো ” রান্নার আগে ভেজে নেয়া” আর “বিরিঞ্জ” অর্থ হলো “চাল”। বিরিয়ানি রান্নার আগে ঘি দিয়ে ভেজে নেয়া হয় সুগন্ধি চাল, আর সে কারণেই বিরিয়ানির এমন নামকরণ। মজার কথা হলো, আমাদের দেশের অনেক অঞ্চলেই বিশেষত বৃহত্তর ময়মনসিংহের অঞ্চলে যে “বিরান করা” শব্দটি ব্যবহৃত হয় তা কিন্তু এই ফারসি শব্দ থেকেই এসেছে।

বিরিয়ানির ইতিহাস নিয়ে যত কথা:


বিরিয়ানির জন্ম নিয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। তবে সব গল্পের মাঝে যে মিলটা দেখা যায় তা হলো, বিরিয়ানির উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার পশ্চিমাংশ থেকে। এইসব হাজারো গল্পের মাঝে তিনটি গল্পই সবচেয়ে বেশি ঐতিহ্যবাহী ও প্রচলিত। 
ধারণা করা হয় তুর্কি মঙ্গল বিজয়ী তৈমুর ১৩৯৮ সালে বিরিয়ানি কে ভারতবর্ষের সীমানায় নিয়ে আসেন। শোনা যায় একটা বিশাল মাটির হাঁড়িতে চাল, মসলা মাখা মাংস, ঘি সব একসাথে পুরে ঢাকনাটা ভালো মতো লাগিয়ে দেয়া হতো। এরপর গনগনে গরম একটা গর্তে হাঁড়িটা কে মাটি চাপা দিয়ে রাখা হতো সবকিছু সেদ্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। সেদ্ধ হয়ে গেলে হাঁড়ি টা বের করে নিয়েই তৈমুরের সেনাবাহিনীকে খাওয়ানো হতো সেই খাবার যাকে এখন পুরো বিশ্ব চেনে বিরিয়ানি নামে।


আর একটি প্রচলিত ধারণা হলো ভারতবর্ষে বিরিয়ানি এসেছে আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরে। ভারতবর্ষে বিশেষ করে মালাবারের দক্ষিণ উপকূলে তুরস্ক ও আরব ব্যবসায়ীদের বেশ আনাগোনা ছিল। তাদের কাছ থেকেই নাকি বিরিয়ানির উৎপত্তি হয়েছে।

তবে এসব গল্পের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ও সমাদৃত হল  মুঘল সম্রাজ্ঞী মমতাজ মুহল এর গল্পটি। আমরা সবাই জানি সম্রাট শাহাজাহান এর তাজমহল তৈরীর অনুপ্রেরণা হলো, তার অনিন্দ্য সুন্দরি স্ত্রী মমতাজ মহল। কিন্তু তার আরো একটা পরিচয় আছে। ইতিহাস বলে ভারতবর্ষে বিরিয়ানির  সূচনাটা নাকি তিনিই করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে যে, একদিন মমতাজ মহল সৈন্যদের ব্যারাকে যান তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে। তবে সেখানে গিয়ে দেখেন,  সৈন্যদের খুবই করুণ অবস্থা। তাদের ভগ্ন স্বাস্থ্য তাকে এতই ভাবিয়ে তুললো যে তিনি তৎক্ষনাৎ সৈন্যদের বাবুর্চি কে ডেকে আনলেন। আর নির্দেশ দিলেন চাল ও মাংস দিয়ে এমন একটা খাবার তৈরি করতে যা সৈন্যদের পুষ্টি দেবে ও স্বাস্থ্যও ফিরিয়ে আনবে। আর তারপর যে খাবার টা তৈরি করা হলো, সেটাই আজকের বিরিয়ানি নামে পরিচিত। দারুন স্বাদের এই বিরিয়ানি  এরপর খুব সহজেই  চলে এলো মুঘলদের খাবারের পাতে।  আর মুঘলরা ভারতের যেখানেই  গিয়েছেন, সেখানেই  বিরিয়ানি কে ছড়িয়ে দিয়েছেন।  এরপর সেখান থেকেই একেক স্থানে বিরিয়ানি পেয়েছে একেক মাত্রা।  একারণে বিরিয়ানি তে আজ  এত বৈচিত্র , এত  রকমভেদ!

wLpsFhCfBvI6PYYioqcOjJcWgcrYAIYoNMt UUUsg90 CWAnqZJieavsxJZ9gJviPPVoLJ80voLObLh QQipdiRscRRoNbbd7VO09qCn1F Ac5PpVRbWIBp5mDtlQmuEAA

অতুলনীয় স্বাদের রহস্য:


সারা বিশ্বজুড়ে বিরিয়ানির প্রকার প্রায় কয়েক শ তো হবেই। বিচিত্র সব বিরিয়ানির বিচিত্র সব নাম। এই সব বিরিয়ানির স্বাদে যতই বৈচিত্রতা থাকুক  না কেন, রান্নার পদ্ধতি তে আসলে তেমন কোনো বড় ফারাক নেই। আসল বৈচিত্র লুকিয়ে আছে মসলার ব্যবহারে। বিরিয়ানির অতুলনীয় স্বাদের মূল কারণ হলো ‘দম’ এ রান্না হওয়া, আর মশলার স্বাদ তো আছেই।
যে হাঁড়িতে বিরিয়ানি রান্না করা হয় তাতে ঢাকনাটা ময়দার তাল বা ডো(dough) দিয়ে এমনভাবে আটকে দেয়া হয় যেন ভেতরের বাষ্প কোনভাবেই  বাইরে আসতে না পারে। অল্প আচেঁ  হাঁড়িটা বসিয়ে,  ধীরে ধীরে বিরিয়ানিটা রান্না হওয়ার এই পদ্ধতিকেই ‘দম পোক্ত’ বা দমে রান্না হওয়া বলে। আর এই দমে রান্না হয় বলেই, সুগন্ধি চাল, ঘি, জাফরান, গোলাপজল, কেওড়াজল আর বিভিন্ন মসলার স্বাদ ও সুঘ্রাণ  সবকিছুই মিশে একাকার হয়ে যায়, আর বিরিয়ানি পায় তার অতুলনীয় স্বাদ।

jkEJWOxZjUPt88VWGpGIVLrySpRAlNSyHzZHOzGiy5OoPb9dS9rh wh AFDO9Bgqy5b42xsPZB tlRP4Eq5f1iUqHPk0Xp4NDeuoJVCSN9vJE22penpsenrf 8PC5Z3tAg

কাচ্চি বিরিয়ানি:

আমাদের দেশে বিরিয়ানি মানেই যেন কাচ্চি বিরিয়ানি। পুরান ঢাকার মানুষের কাছে এই কাচ্চির সমাদরটা যেন একটু বেশিই। পুরান ঢাকার কিছু দোকানের কাচ্চি যেমন ঐতিহ্যবাহী ঠিক তেমনি বিশ্ববিখ্যাত। কাচ্চি শব্দটা এসেছে উর্দু শব্দ ‘কাচ্চা’ থেকে যার অর্থ কাঁচা। বিরিয়ানি মূলত ২ ধরনের হয়ে থাকে, কাচ্চি আর পাক্কি। উর্দু শব্দ পাক্কির অর্থ হলো রান্না করা বা পাঁক করা। কাচ্চি বিরিয়ানি রান্নার সময়, হাড়িতে চাল ও কাঁচা আলুর ওপর টকদই ও মশলায় মেখে রাখা কাঁচা মাংসের আস্তরন দেয়া হয়। তারপর ভালো করে ঢাকা চাপা দিয়ে দমে রান্না করা হয়। মূলত খাসি বা পাঠার মাংস টা দিয়েই কাচ্চিাটা রান্না  হয়। মশলা মাখা মাংস, সুগন্ধি চাল, ঘি, জাফরান, গোলাপজল সবকিছুর স্বাদ ও সুঘ্রাণ একসাথে হয়ে  দমে রান্না হতে হতে তৈরি হয় অতুলনীয় স্বাদের কাচ্চি।

আর অন্যদিকে পাক্কি বিরিয়ানি রান্নার ক্ষেত্রে, মাংসটাকে আলাদা কষিয়ে রান্না করা হয়। আর চালটাকে আগে থেকেই ঘিয়ে ভেজে আধা সেদ্ধ করে নেয়া হয়। এরপর সব একসাথে মিশিয়ে দমে দিয়ে রান্না করা হয়।

তেহারি ও বিরিয়ানির মধ্যে পার্থক্য :

পুরান ঢাকার বিরিয়ানি যেমন বিখ্যাত, তেমনি সমান  জনপ্রিয় তেহারি। তেহারি আসলে বিরিয়ানিরই একটা  পরিমার্জিত রূপ। তেহারি বিরিয়ানির চেয়ে অনেক মসলাদার এবং ঝাল হয়।  তবে তেহারির বিশেষত্ব হল  এতে প্রচুর পরিমাণ গরুর মাংস এবং কাঁচা মরিচ ব্যবহার  করা হয় । এটা মূলত এক ধরনের পাক্কি বিরিয়ানি। তেহারিতে গরুর গোশতের ছোট ছোট টুকরা ব্যবহার করা হয় আর  বিরিয়ানির চেয়ে  মাংসের পরিমাণটাও কিছু কম থাকে।  মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চড়া দামের কারণে  খরচ বাঁচাতে  এই খাবারের উৎপত্তি  হয়েছিল। পুরান ঢাকার তেহারির বিশেষত্ব হলো , পুরো তেহারিটাই সরিষার তেলে রান্না করা হয়। আর এই সরিষার কড়া ঝাঁঝ তেহারিকে করে তোলে  অনন্য।

 বিরিয়ানির বৈচিত্রতা ও ঢাকাই  বিরিয়ানি :

Bs0bMzVfXtVLngPOlKfAFLE0q18GYYGwTp3cz5i6ByLXDNOzl6k9K8EtaCv9vwlnrVNpC

পুরো পৃথিবী তো দূরের কথা কেবল এই ভারতবর্ষেই  যে কত প্রকার বিরিয়ানি আছে, তাই হয়তো গুনে শেষ করা যাবে না। তবে এর মাঝে ঢাকাই, হায়দ্রাবাদি, সিন্ধি, লখনৌই, বোম্বাই, থালেশ্বরী, কোলকাতাই, মালাবারি ইত্যাদি বিরিয়ানি উল্লেখযোগ্য।

 এবার আসি  ঢাকাই বিরিয়ানির  ঐতিহ্যের   কথায়। “ঢাকাই কাচ্চি “  নিঃসন্দেহেই ঢাকা  শহরের অন্যতম  একটি ট্রেডমার্ক। মুঘলদের হাত ধরে যেসব মোগলাই  খাবার  ঢাকা শহরে এসেছে, তার মাঝে  বিরিয়ানিই যে সেরা তা কিন্তু বলাই যায়।  ঢাকায় বিরিয়ানির কথা বললেই যে নামটি সবার আগে আসে তা হলো “হাজীর বিরিয়ানি”। ১৯৩৯  সালে হাজী গোলাম হোসেন সাহেবের হাত ধরেই শুরু হয় এ বিরিয়ানির  পথচলা, যার কদর এখনো একটুও কমেনি।

  বলা যায় হাজীর   বিরিয়ানি থেকেই ঢাকায় শুরু হয় এই বিরিয়ানি শিল্প। ধীরে ধীরে  ফখরুদ্দিন  বিরিয়ানি , চানখারপুলের হাজী  নান্নার  বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনুর বিরিয়ানি  ইত্যাদি হয়ে উঠেছে সেই শিল্পেরই অংশ।  আর এখন কেবল  নতুন ও পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে  ঢাকাই বিরিয়ানির  জৌলুস এখন ছড়িয়ে  গিয়েছে  সুদূর প্রবাসেও।

বিয়ে  কিংবা যে কোন অনুষ্ঠান বা আয়োজনে  বিরিয়ানি সবসময়ই  প্রথম পছন্দ আমাদের। আসলে বিরিয়ানি কে না ভালোবাসে বলো? তুমিও যদি  বিরিয়ানির দারুণ ভক্ত হয়ে থাকো  তাহলে কিন্তু   কমেন্ট করে জানিয়ে দিতে পারো তোমার পছন্দের বিরিয়ানি কোনটি ? কোথাকার বিরিয়ানি তোমার কাছে সেরা  মনে হয় বা কার হাতের বিরিয়ানি  তোমার সবচেয়ে প্রিয় !

References:

1.  https://www.thebetterindia.com/60553/history-biryani-india/

2. https://www.desiblitz.com/content/the-history-of-biryani

3. http://www.withaspin.com/2014/02/02/tehari/

4.  http://www.bd-pratidin.com/various/2015/10/03/102764

5. https://roar.media/bangla/main/food/history-of-biryani/


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন