বিনোদনের মুখোশে ৮ Time killer

December 10, 2017 ...

পুরোটা পড়ার সময় নেই ? ব্লগটি একবার শুনে নাও !

আমাদের জীবনে সময় খুবই মূল্যবান। বিশেষত, ব্যস্ততার এই যুগে সময় নষ্ট করার কোন মানেই হয় না। তবুও প্রতিনিয়ত সময়ের একটা অংশ নষ্ট হয়। আমরা এমন কিছু কাজে আমাদের মূল্যবান সময় দেই যেগুলো আদতে কোন কাজেই আসে না! সময় নষ্ট করার জন্যে বলা যায় ৮টা কাজ বেশি দায়ী।

মজার ব্যাপার হলো, এগুলোর অনেকগুলোই আমরা প্রতিনিয়ত করে আসছি, এবং তাতে কোন সমস্যাও নেই। সমস্যা তখনই, যখন দরকারি কাজ ফেলে আমরা এসবের পেছনে সময় নষ্ট করে যাই।

১। ড্রাগস:

এটা শুধুই সময় নষ্টকারী কাজ নয়। এটা একইসাথে জীবন-ধ্বংসকারীও বটে। আমি গত এক বছরে বাংলাদেশের প্রচুর বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ঘুরে এসেছি, শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি, এবং এতে একটা ভয়ংকর সত্যের দেখা মিলেছে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর শিক্ষার্থী এই ড্রাগস এর নেশায় আসক্ত হচ্ছে দিনকে দিন।

হতাশা, ডিপ্রেশনসহ নানা কারণে যেখানে নতুন কোন কাজ করে মনটাকে চাঙ্গা রাখা যেতো, সেখানে এই শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছে ড্রাগসের অন্ধকার পথ। আর এর ফলাফল হচ্ছে ভয়াবহ। নিজের ক্যারিয়ার তো বটেই, জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে যায় অনেক সময় এই ড্রাগসের কারণে।

3 1
তোমরা যারা এই লেখাটা পড়ছো, তোমাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, চেষ্টা করো ড্রাগস থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার। আর তোমার কাছের মানুষগুলোকে, তোমার বন্ধুদের এই ভয়াল ড্রাগসের ছোবল থেকে দূরে রাখার চেষ্টাটাও চালিয়ে যাও। ড্রাগস মুক্ত তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশকে নতুন ভোর এনে দেবে, এই স্বপ্নটা কিন্তু সবারই!

২। টিভি:

না, টিভি দেখাকে মোটেও আমি ড্রাগসের সাথে তুলনা করছি না। আমাদের জীবনে বিনোদনের দরকার আছে, আর টিভি একটা সুস্থ বিনোদন মাধ্যম। তাছাড়া টিভি থেকে বিনোদনের পাশাপাশি শেখাও যায় অনেক কিছু। সমস্যাটা হয় তখনই, যখন এই টিভি দেখাটা হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রণহীন। ফানি বাংলা নাটক দেখে দিন পার করে দেয়া, কিংবা নুডলস দিয়ে মুরগির রোস্ট বানানোর অনুষ্ঠানের পেছনে বড় একটা সময় লাগালে সেটা হতে পারে তোমার ক্যারিয়ারের জন্যে ক্ষতিকর।

টিভি দেখা নিয়ে কোন সমস্যা নেই, কিন্তু সেটাকেও রাখতে হবে কন্ট্রোলে। ছোটবেলার কথা মনে আছে? আব্বু আম্মু বলতো যে দুই ঘন্টা পড়লে আধা ঘন্টা টিভি দেখতে দেয়া হবে? সেটাও দিনে একবার মাত্র? এই অভ্যাসটা ধরে রাখার চেষ্টা করো। তাহলেই সময় নষ্ট আর হবে না।

2 3

৩। গসিপ:

“দোস্ত, জানিস? ওই মেয়েটার না এক মাসেই ব্রেক আপ হয়ে গেছে!”
“এই শোন, আবুলের ভাই হাবুল কিন্তু তোর ক্রাশের সাথে লাইন মারে!”
“সেদিন তোর গার্লফ্রেন্ডকে দেখলাম আরেকজনের সাথে রিকশায়, কাহিনী কী? নিজের প্রেমিকাকে সামলাতে পারিস না?”

এই কথাগুলো বলতে অনেকেই অনেক মজা পায়। গসিপ করা, কু-কথা, কানকথা ছড়ানো, এসব করতে অনেকেরই বেশ ভালো লাগে। সমস্যা হলো যে, এই আবুলের ভাই হাবুলের খোঁজ নিতে যে সময়টা নষ্ট হলো, এই সময়টা পড়াশোনায় বা কোন রিসার্চে দিলে অনেক কাজে লাগতো।

কিন্তু, অকারণে এসব গসিপে সময় নষ্টের কারণে সেটা আর হলো কই? বিষয়টা হলো যে, এসব গসিপ করে আদতে তোমার নিজের কোন লাভ হয় না। বরং অনেকের বিশ্বাসভঙ্গের কারণ হও তুমি, নষ্ট হয় তোমার সময়। তাই আজ থেকেই প্রতিজ্ঞা করো, এসব গসিপের কথা ছুঁড়ে ফেলে দেবে। এই সময়টা লাগাবে নিজের উপকারে, অন্যের অপকার খুঁজে নয়!

৪। ফেসবুক:

“আরে, এই লেখাটা তো ফেসবুকে পড়ছি! তাহলে কি এই লেখাটা পড়েও আমার সময় নষ্ট হচ্ছে?”

চার নম্বর সময় নষ্টকারী কাজের মধ্যে ফেসবুককে দেখে তোমারো নিশ্চয়ই এমন কথাই মনে হচ্ছে? এখানে তোমার একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ফেসবুক এমন একটা জায়গা, যেখানে তুমি চাইলে সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারো অন্যের প্রোফাইলে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট করে বা কারো সাথে চ্যাটিং করে। আবার এখানেই তুমি এরকম কার্যকর লেখা পড়তে পারো, চাইলেই বিভিন্ন দরকারি ইভেন্টে মানুষের কাজে আসতে পারো।

এজন্যে ফেসবুকের পেছনে যেটুকু সময় তুমি দাও, চেষ্টা করবে সেটি যেন তোমার কাজে লাগে। এঞ্জেল তামান্নাকে হাই দিয়ে চ্যাট শুরু করে সময় নষ্ট না করে, ফেসবুককে কাজে লাগাও। তাহলেই দেখবে তোমার সময় আর নষ্ট হচ্ছে না।

৫। ইউটিউব:

“কিন্তু ইউটিউবে তো টেন মিনিট স্কুলের ভিডিও দেখি, সেটাও কি সময় নষ্টের কারণ?”

এমন প্রশ্ন যদি মাথায় চলে আসে, তাহলে এটা জেনে রাখো যে, ফেসবুকের মতো ইউটিউবও এমন একটা জায়গা, যেখানে তুমি রাতদিন কাটিয়ে দিতে পারো ফানি ক্যাট ভিডিও বা ট্রেন্ডিং ভিডিওগুলো দেখে। আবার, এখানেই তুমি চাইলে বিশ্বের যেকোন বিষয় নিয়ে ক্লাস দেখতে পারো, শিখে নিতে পারো অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের খুঁটিনাটি।

বিনোদনের আগে কাজ, এটা মাথায় রেখো

তাই ইউটিউবকে আমি বলবো না সময় নষ্টের কাজ, কিন্তু অযথা র‍্যান্ডম ভিডিও, যেগুলো তোমার কোন কাজেই আসছে না- এমন ভিডিও দেখে সময় নষ্ট কোরো না। সেসব ভিডিওই দেখো, যেগুলো তোমার কাজে দেবে। হ্যাঁ, বিনোদনের ভিডিওর দরকার আছে। কিন্তু তোমার মূল্যবান সময়ের সবটাই ফানি ভিডিওর পেছনে ব্যয় করো না।

৬। আড্ডাবাজি:

বন্ধু ছাড়া জীবন অচল, বন্ধুদের সাথে বসে ‘চিল’ না করলে ভালোই লাগে না- এরকম মনে হয় অনেকেরই। সত্যি কথা বলতে কী, বন্ধুদের সাথে ঘোরাফেরায় যে বিনোদনটা হয়, সেটা আসলেই অনেক কাজে দেয়। কিন্তু এই আড্ডাবাজি যদি তোমার দিনের সিংহভাগ সময় নিয়ে নেয়, তাহলে সেটা হবে সময় নষ্টকারী কাজগুলোর অন্যতম।
1 5
বন্ধুদের সময় দিতে হবে, সেটা তোমার জন্যে দরকারি। কিন্তু এটা মাথায় রাখতে হবেই যে, দিনের কাজগুলোও যেন ঠিকভাবে হয়, আড্ডা মারা বা ‘চিল’ করতে গিয়ে যেন তোমার দরকারি কাজগুলো পড়ে না থাকে।

৭। গেমস:

কম্পিউটার গেমস বলো, বা মোবাইল গেমস – এগুলো যদি তোমার নেশায় পরিণত হয়, এগুলোর কারণে যদি তোমার দৈনন্দিন কাজ আটকে যায়, তাহলে এগুলোকে অবশ্যই সময় নষ্ট করে এমন কাজের লিস্টে রাখা দরকার। হ্যাঁ, গেমস খেললে অনেকসময় মাথা পরিষ্কার হয়, তোমার কাজকর্মে দ্রুততা আসে। কিন্তু এই গেমসই যদি তোমার জীবনে নেশার আরেক নাম হয়ে পড়ে, তাহলে এগুলো খেলা কমিয়ে দেয়া উচিত।

৮। টিভি সিরিজ:

টিভি সিরিজ দেখা বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে খুব বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। গেম অফ থ্রোনস, ব্রেকিং ব্যাড, পার্সন অফ ইন্টারেস্ট – বাহারি নামের চমৎকার এই সিরিজগুলো একবার শুরু করলে আর শেষ করতে ইচ্ছা করে না। এক একটা এপিসোডের পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় সেগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা তো আছেই!

টিভি সিরিজ আমারও খারাপ লাগে না, সময় পেলে, একটু বিনোদনের দরকার হলে আমিও চোখ বুলাই টিভি সিরিজে। বুদ্ধি প্রখর হয়, মনে শান্তিও আসে। কিন্তু ওই যে, সময় পেলে, হাতে কাজ না থাকলে তখনই। সব কাজ ফেলে যদি টানা টিভি সিরিজ দেখতে বসে যাও, আর তার রেশ যদি সারাদিন থাকে, তাহলে টিভি সিরিজ দেখা কমিয়ে ফেলা উচিত তোমার। মনে রাখবে, আগে দরকারি কাজ, তারপরে বিনোদন। এর উল্টোটা যেন না হয়!

আমার এই লেখাটার উদ্দেশ্য কিন্তু মোটেও তোমাদের আদর্শ অভিভাবক হয়ে জ্ঞানী জ্ঞানী কথা শোনানো নয়! তরুণ প্রজন্মের একজন হিসেবে আমি জানি, আমাদের জীবনে বিনোদনের কতোটা দরকার।

আমার কথা একটাই, আর সেটা হলো তুমি বিনোদন নাও, কিন্তু সেটা যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। পড়ালেখা ও দৈনন্দিন দরকারি কাজের সাথে মিলে মিশে যদি বিনোদনও নিয়ে নিতে পারো, তবেই না তুমি সুখী সফল মানুষ হবে!
এই লেখাটি লিখতে সহায়তা করেছে অভিক রেহমান
এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের ‘নেভার স্টপ লার্নিং‘ বইটি থেকে। পুরো বইটি কিনতে চাইলে ঘুরে এসো এই লিংক থেকে!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন