কী এই হ্যাকিং?

May 20, 2019 ...

“কেউ একজন আমার ফেসবুক একাউন্ট হ্যাকিং করে নেয়ার চেষ্টা করেছে।”

“আমার একাউন্ট হ্যাক করে কেউ আমার সব টাকা নিয়ে নিয়েছে।”

এই ধরনের হ্যাকিং সংক্রান্ত অভিযোগ আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। তথ্যপ্রযুক্তির যত উন্নতি হচ্ছে হ্যাক বা হ্যাকিং সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমাদের কাছে আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু হ্যাকিং কী? কারা হ্যাকার? কীভাবে আসলে তারা হ্যাক করে? এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। তাই আজকের লিখাতে চেষ্টা করব হ্যাকিং এবং হ্যাকিং সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য তুলে ধরতে। তাহলে দেরি না করে শুরু করা যাক…

sqoj6EG2V Qaafogib8mtPCOu FAPzavi3KgNcOVGvYdMBNWvgZwY7tBCKdHVMbrpVcqzcr8dnd10P9BIRyFU9

হ্যাকিং কী?

কোন ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া যদি অন্য কোন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে বা নেটওয়ার্কে বা কম্পিউটারে প্রবেশ করে সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গ্রহণ করা, মুছে ফেলা বা এমন কোনভাবে পরিবর্তন করা যা ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকারক হয়, তাহলে তাকে হ্যাকিং বলা হয়। হ্যাকিং এর মাধ্যমে অনলাইন জগতে প্রায় সবকিছুই করা সম্ভব। যেমন: অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চুরি করা, কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, ভাইরাস বা কোন ক্ষতিকর প্রোগ্রামের মাধ্যমে আক্রমণ এই সব কিছুই হ্যাকিং এর মাধ্যমে করা সম্ভব।

হ্যাকিং অনেক ধরণের হতে পারে। মোবাইল ফোন, ল্যান্ড ফোন, গাড়ি ট্র্যাকিং, বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ও  ডিজিটাল যন্ত্র সবকিছুকেই হ্যাকিং এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।  হ্যাকাররা সাধারণত বিভিন্ন নেটওয়ার্ক, ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের ত্রুটি বের করে সেই ত্রুটির ওপর ভিত্তি করেই হ্যাক করে।

হ্যাকিং এর ইতিহাস

গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে মূলতঃ ম্যাসাচুসেট ইনস্টিটিউড অফ টেকনোলজি (MIT) এর কিছু শিক্ষার্থী তাদের মেধার সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য গঠন করে বিশেষ একটি দল, যারা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় চিন্তা ও দক্ষতায় অনেক এগিয়ে। যেকোনো প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধানের জন্য MIT এর এই দলই শেষ ভরসা। এই দলেরই প্রত্যেক সদস্যকে বলা হত হ্যাকার।

সত্তরের দশকে আবির্ভাব ঘটে ফ্রিকদের। এরাও এক ধরণের হ্যাকার কিন্তু তাদের কাজের ধরণ অনুযায়ী এই নামকরণ করা হয়। এরা টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে বিনা খরচে কথা বলতো টেলিফোনে। ১৯৭০ সালে টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করার জন্য John Thomas Draper নামে একজন ফ্রিকারকে একাধিক-বার গ্রেফতার করা হয়। যিনি Captain Crunch নামেও পরিচিত।

এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার Homebrew Computer Club এর দু’জন সদস্য “blue boxes” নামে একধরণের ডিভাইস তৈরি করে যা দিয়ে টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে ফ্রী-তে কথা বলা যেত। এই দুজন পরে “Berkeley Blue” ও “Oak Toebark” নামে পরিচিতি লাভ করে। আর শুনে তাজ্জব হবেন যে এরা দুজন ছিলো “Berkeley Blue” (Steve Jobs) and “Oak Toebark” (Steve Wozniak) যারা পরবর্তীতে Apple Computer প্রতিষ্ঠা করেন।

হ্যাকার

যেই ব্যাক্তি হ্যাকিং করা বা হ্যাকিং এর সাথে জড়িত তাকেই হ্যাকার বলে। হ্যাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিক খুঁজে বের করার কাজে বিশেষভাবে দক্ষ। একই সঙ্গে তিনি অন্য কম্পিউটার বা নেটওয়ার্ক ব্যবস্থায় অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম। কোনো কম্পিউটারের সিস্টেম বা নেটওয়ার্কে দুর্বলতা খুঁজে বের করে সেই সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ভাঙ্গাই হ্যাকারদের প্রধান কাজ।

হ্যাকারদের চিহ্নিত করতে Hat বা টুপি এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর ভিত্তি করেই হ্যাকারদের ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

  1. White Hat Hacker
  2. Grey Hat Hacker
  3. Black Hat hacker
67F aMZo7xWe qxW3I9msUyoTe KbqMJPjG8FMH 67 zTh63ZLqwQkIAJuLOgEbBMIpmduHap6gMx gjvz005AfW1GPobB7Lh kcdRZWFLFal

হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার (White Hat Hacker)

হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার বলা হয় তাদের যারা, কোনো সিকিউরিটি সিস্টেমের দুর্বলতা বা ত্রুটি খুঁজে বের করে ঐ সিকিউরিটি সিস্টেমের মালিককে বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সেই ত্রুটিগুলো সম্পর্কে অবগত করেন যেন তারা ভবিষ্যতে যেকোন সাইবার হামলা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। এই সিকিউরিটি সিস্টেমটির মধ্যে রয়েছে কোনো কম্পিউটার বা কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের ওয়েবসাইট বা কোনো সফটওয়ার। হোয়াইট হ্যাট হ্যাকারদের প্রধান কাজ হল সাইবার ওয়ার্ল্ডের নিরাপত্তা প্রদান করতে সাহয্য কর। এই ধরনের হ্যাকারদেরকে ইথিক্যাল হ্যাকারও বলা হয়ে থাকে।

গ্রে হ্যাট হ্যাকার (Grey Hat Hacker)

গ্রে হ্যাট হ্যাকাররা হচ্ছে দু’মুখো সাপের মত। কারণ এরা যখন একটি আপারেটিং বা সিকিউরিটি সিস্টেমের ত্রুটিগুলো বের করে তখন সে তার নিজের ইচ্ছা মত কাজ করবে। তার যদি ইচ্ছা হয় ঐ সিকিউরিটি সিস্টেমের মালিকে ত্রুটি জানাতে তাহলে সে জানাবে আবার তার যদি ইচ্ছে হয় ইনফরমেশনগুলো নষ্ট করবে বা চুরি করবে তাহলে সে তাও করতে পারে। আবার সে তার নিজের স্বার্থের জন্যও তথ্যগুলো ব্যবহার করতে পারে। বেশির ভাগ হ্যাকাররাই এ ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে।

ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার (Black Hat Hacker)

এই ধরনের হ্যাকাররা সাইবার জগতে বিভিন্ন অপরাধের সাথে যুক্ত থাকেন। এরা বিভিন্ন সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের দুর্বলতা খুঁজে নিজেদের আর্থিক অথবা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করে থাকেন। কোনো সিস্টেমের সিকিউরিটির মধ্যে কোন ত্রুটি খুজে পেলে তারা সেটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। সিস্টেমের ডেটাবেজ নষ্ট করা, ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়া, তথ্য চুরি করা সহ বিভিন্ন ধরণের অবৈধ কাজ করে থাকেন।

ZRc0zzHv NRDI6NfXxpAXnTsyVloEb1Vg 7JoB5tOHLhaUTPb5nlFlnYRKGjy

এই তিন প্রকারের হ্যাকার বাদেও আরো কিছু হ্যাকার রয়েছে যারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী এবং বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং প্যাটার্ন অনুসরণ করেন। যেমন:

স্ক্রিপ্ট কিডি

এরা প্রোগ্রামিংয়ের বিষয়ে তেমন দক্ষ নয়। নিজেরা কোনো হ্যাকিং টুলস তৈরি করতে পারে না, অন্য হ্যাকারদের বানানো টুলস বা স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে হ্যাকিং করে থাকে। কোনো সিস্টেম হ্যাক করার পর এরা সঠিকভাবে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে বা পরিচয় গোপন রাখতে পারে না।

 

ক্র্যাকার

অনেক সময় ক্ষতিকারক হ্যাকার ব্লাক হ্যাট হ্যাকারদের ক্র্যাকার বলা হয়। এদের শখ বা পেশাই হচ্ছে বিভিন্ন পাসওয়ার্ড ভাঙ্গা, Trojan Horse তৈরি করা এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক সফটওয়ার তৈরি করা। এসব ক্ষতিকারক সফটওয়ারকে তারা নিজেদের কাজে ব্যবহার করে অথবা বিক্রি করে।

এলিট হ্যাকার

এরা হ্যাকারেরা খুবই দক্ষ। কোনো সিস্টেমকে হ্যাক করার পাশাপাশি দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের পরিচয় গোপন করতে পারে। এরা নতুন নতুন হ্যাকিং কৌশল আবিষ্কার করে থাকেন। এরা প্রোগ্রামিংয়ে বিশেষ দক্ষ হয়ে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের হ্যাকিং টুলস এবং সফটওয়ার এরাই মূলত তৈরি করে থাকেন।

8Vdmh6UNe crMhRjuYNhHCxOmtGPM4BGzpOul1XINoypkzirRN21O9JL wFWyc6vpw9hop3dlgIGXT9UXTHfH3da1ciEPE18JvISoQBIt8pzgiKcUYm sUUbi

হ্যাকিং থেকে বাঁচার উপায়

১. এমন কোন লিংক বা সাইটে সাইন ইন করা যাবে না যেটা অপরিচিত বা আপনি ইমেইল বা অপরিচিত কোন মাধ্যমে থেকে পেয়েছেন।

২. অপরিচিত কোন সফটওয়ার ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।

৩. এন্টিভাইরাস বা আপনার সিস্টেমকে নিরাপত্তা দিতে পারে এমন সফটওয়ার ব্যবহার করতে হবে।

৪. যেকোন ব্যক্তির সাথে নিজের ব্যক্তিগত তথ্যের পাশাপাশি ইমেইল বা পাসওয়ার্ড আদান প্রদান থেকে বিরত থাকতে হবে।

৫. আপনি একজন ডেভলপার হয়ে থাকলে আপনাকে অবশ্যই সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে আরো ভালো করে নিজের সিস্টেমের সিকিউরিটি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে হ্যাকিং একটি অপরাধ। অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করার কোনো অধিকার আমার বা আপনার কারো নেই। তথ্যপ্রযুক্তির বহুল ব্যবহারের পাশাপাশি তাই আমাদের সকলের উচিত হ্যাকিং এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

পড়তে পারেন হ্যাকিং সম্পর্কিত জনপ্রিয় বই সমূহ রকমারি ডট কম এ

Referance

http://www.techbengal.com/hacking/1917

https://www.techopedia.com/definition/26361/hacking

https://www.malwarebytes.com/hacker/

https://en.wikipedia.org/wiki/Hacking

https://economictimes.indiatimes.com/definition/hacking


 

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন