রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের ঐতিহাসিক সংলাপ

Adnan Mahmud noticed the innermost connection between a paper and a pen, and became a witness to the celestial magic they produce.

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

অবশেষে স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞানী আইনস্টাইন! একজন বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে কালজয়ী মহাপুরুষ এবং আরেকজন জগতের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। কী এমন কথা হতে পারে তাঁদের মধ্যে? সত্যি বলতে, অনেকসময় গুণীদের পক্ষেও কিছু ঘটনা জীবনবৃত্তান্তে টুকে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কিছু ঘটনা লেখকের মনের গহীনে বাস করে, মানুষের জ্ঞানের আড়ালে থেকে যায়, ইতিহাসের পাতায় সেগুলোর অক্ষররূপে কোনো স্থান নেই। যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকায় সেগুলো কিংবদন্তির আকার ধারণ করে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর এমনই এক অনন্য মনীষীর নাম, যিনি এক অর্থে তাঁর জীবনের কোনো ভাবনা ফেলে দেবার মতো মনে করেননি। যেকোনো ঘটনা (তা যত সামান্যই হোক না কেন) সুন্দর বঙ্গানুবাদ করে গুছিয়ে রাখা ছিল তাঁর এক নিত্যদিনের অভ্যাস।

আমরা জানি, বিশ্বকবি একাধারে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান অর্জন ও পরমকে জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এক তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছিলেন। অসংখ্য দেশ ভ্রমণের ফলাফল যেমন তাঁর জ্ঞানের উন্মেষ, তেমনই এক বিশ্বস্বাক্ষী হয়ে সমগ্র সংসার ও অভিজ্ঞতাকে ভালোবাসতে শেখা। এই লেখার অভ্যাস থেকেই তাঁর সঙ্গে আইনস্টাইনের সংলাপটিও চলে আসে পাঠকদের হাতের নাগালে। যা আমাদের হাজারো প্রশ্নের মহোৎসবে নিয়ে যায়।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন অনুজ হলেও বুদ্ধি, দীপ্তি ও জ্ঞানে তাঁর সমসাময়িক সকল বিজ্ঞানীদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর গবেষণার কাগজ তখন রীতিমতো ছাপানো হতো বলে রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক ভাবনার প্রতি সজাগ ছিলেন এবং তাঁকে নিতান্তই শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।

রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করেন ১৯২৬ সালে, যদিও প্রথম সাক্ষাতের কোনো আলাপ-আলোচনার প্রমাণ নেই। তবে এ সত্যি, যে দুজনের মধ্যে চিঠি লেখালিখি হতো। যার মাধ্যমে তাঁরা একে-অপরকে দার্শনিকভাবে, আদর্শিক দিক দিয়ে ও ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বুঝতে শেখেন, একে-অপরের ভাবনা ও মতবাদ নিয়ে প্রবল আগ্রহ প্রদর্শন করেন। তারপর দ্বিতীয়বারের জন্য তাঁদের কথা হয়, আর সেই কথোপকথনকে আজ অব্দি বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম কথোপকথন হিসেবে গণ্য করা হয়।

জুলাই ১৪, ১৯৩০। কবিগুরু তখন অক্সফোর্ডে কিছু বক্তৃতার কার্যক্রম শেষ করে বার্লিনে পাড়ি জমান। সেখানকার ক্যাপুথ নামক এক খোলামেলা স্থানে, নির্জন বাতাবরণের নিচে আইনস্টাইনের কাঠের তৈরি বাড়ি। তুষারাচ্ছন্ন, বন্য, শান্ত আঁকাবাঁকা রাস্তায় দু’হাত পেছনে রেখে, হালকা ঝুঁকে কবিগুরু হেঁটে চলেছেন। পাশে অমিয় চক্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ কী নিয়ে ভাবছেন, স্বয়ং অমিয় চক্রবর্তীও জানেন না। ভানুসিংহ কাব্যিক মনের প্রশান্তি ও স্থিরতার মধ্য দিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন। এজন্য হয়তো প্রশ্ন না করে অমিয়বাবুও নীরবে হেঁটে চলেছেন। চিঠি অনুযায়ী হাঁটতে হাঁটতে সদ্য পাইন গাছের সারি দেখতে পান কবি। হাস্যোজ্জ্বল তিনি, পৌঁছে গেছেন তাঁর গন্তব্যে, আইনস্টাইনের বাড়িতে। ক্যাপুথের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যকে আলিঙ্গন করে, গায়ে নীল রঙের আলখাল্লা আর চোখে সেই শৈশবের কৌতুহল নিয়ে ঘরের চেয়ারটিতে বসেন রবীন্দ্রনাথ। মুখোমুখি আরেকটি চেয়ারে আইনস্টাইন।  কে জানতো, এখানেই স্থান পাবে জ্ঞানের গভীর কূপ?

[বলে রাখি, মূল সংলাপটি ইংরেজি থেকে বাঙলায় অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদ করতে হলে অনেকসময় বিভিন্ন শব্দের ঐতিহাসিক এবং ভৌগলিক ব্যবহার নিয়ে সজাগ থাকা অত্যাবশ্যক। ফলে এখানে ভাবার্থ ঠিক থাকলেও মূল বক্তব্যের অনুবাদ আক্ষরিকভাবে করা সম্ভব হয়নি। তবুও এই অনুবাদের যেকোনো ভুল-ত্রুটির দায়ভার আমি ব্যক্তিগতভাবে নিচ্ছি। সাথে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখারও অনুরোধ রইল। যথাসম্ভব ভুল-ত্রুটি বর্জন করতে এটি বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রেলিজ্যন অব ম্যান’ বা ‘মানবধর্ম’ বইটি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।]

নিম্নের কথোপকথনটি রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের মধ্যকার:

Related image

রবীন্দ্রনাথ
: 

আপনি ইদানীং গণিত দিয়ে বিশ্বকে জানার প্রচেষ্টায় আছেন আর আমি এ দেশে চিরন্তন জগৎ ও বাস্তবতা সম্পর্কে আমার ডিসকোর্সসমূহ দিয়ে চলেছি।


আইনস্টাইন: 

হ্যাঁ। আপনি কি এ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন দৈবী সত্তায় বিশ্বাস করেন?

রবীন্দ্রনাথ: বিচ্ছিন্ন নয়, মানুষের অমেয় ব্যক্তিত্ব এ ব্রহ্মান্ডকে অনুভব করে। অর্থাৎ বিশ্বের কোনো কিছুই মানুষের বোধশক্তি বা চেতনার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। এভাবে বলা যেতে পারে, বিশ্বের সকল সত্য আদতে মানবসত্য
বিষয়টির জটিলতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমি কিছু বৈজ্ঞানিক ধারণা ধার নিয়েছি। আমরা জানি যে পদার্থ প্রোটন ও ইলেকট্রন দ্বারা গঠিত, এবং তাদের মধ্যকার স্থানটি শূন্য। প্রতিটি প্রোটন বা ইলেকট্রন এক অদৃশ্য শক্তি বা বলের সান্নিধ্যে নির্দিষ্ট সীমার সাথে আবদ্ধ থাকে। দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার কারণে তা ধরতে পারি না বলে পদার্থটি আমাদের চেতনায় কঠিন হয়ে প্রকাশিত হয়।
একই অর্থে মহাজগতের এক মহোৎসবই মানুষের সংসার। বিভিন্ন ব্যক্তি-ভাবনার মধ্যে বিরাজ করে যে মানবিক সম্পর্ক, সেই সম্পর্কের সুরেই বাঁধা পৃথিবীতে এই মানুষের ঐক্য। এভাবে সমগ্র বিশ্ব প্রতিটি মানুষের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে সত্য বলে আমরা যা জানি, তা একান্তই মানবসত্য। আমরা এই চিন্তাকেই এতকাল ধরে শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয়ভাবনার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে চলেছি।

আইনস্টাইন: বিশ্বের স্বরূপ হিসেবে দু’টি ধারণার আঁচ পাওয়া যায়- ১) মানব নির্ভর বাস্তবতা এবং ২) মানব নিরপেক্ষ বাস্তবতা।

রবীন্দ্রনাথ: বিশ্বব্রহ্মান্ড যখন মানবসত্তার চেতনার সঙ্গে একই সুরের সেতু বাঁধে, তখন তাকেই আমরা সত্যরূপে জ্ঞান করি এবং তা সুন্দর- এমনটা অনুভব করি।

আইনস্টাইন: এটিই হলো বিশ্ব সম্পর্কে একটি নিরেট মানবিক ধারণা।

রবীন্দ্রনাথ: এ ব্যতীত অন্য কোনো প্রকার ধারণা থাকা সম্ভব নয়। এ জগৎ মানবসত্য- এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও একই অর্থে মানবের বৈজ্ঞানিক ধারণার বাইরে নয়। অর্থাৎ আমাদের অনুপস্থিতির মানে জগতেরও না-থাকা। এই বাস্তবতা একান্তই আমাদের চেতনা নির্ভর। একটি যুক্তি ও অনুভূতির দাঁড়িপাল্লায় এর সত্যতা ব্যক্ত করা যায়, যা একটি অভিজ্ঞতার দাঁড়িপাল্লা- যা আমাদের চেতনার অন্তর্গত।

আইনস্টাইন: এটি আদতে একটি মানুষের চেতনার উপলব্ধি। 

রবীন্দ্রনাথ: অবশ্যই। তবে এক চিরায়ত সত্তার উপলব্ধি। আমাদের অশেষ আবেগ, কাজের মধ্য দিয়ে এর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে হয়। কোন প্রকার সীমাবদ্ধতায় এটি বাধা পড়ে না। বিজ্ঞান ব্যক্তি নিয়ে চিন্তিত নয়, তা বিজ্ঞানের কাজও নয়। বিজ্ঞান বিশ্বের ধর্ম নিয়ে ভাবে এবং এই ধর্মের সত্য ব্যক্তিগত সত্য নয়। ধর্ম এই সত্যকে জ্ঞান করে। আর এই সত্যই আমাদেরকে এক সুরে, এক কম্পনে, এক রাগায় অন্তর্ভুক্ত করে। ব্যক্তির সত্তা তখন বিশ্বসত্তায় রূপান্তরিত হয়। ধর্ম ঐ সত্যের মধ্যে এক বিশেষ অর্থ যোগ করে। আমরা সত্যকে জানি কারণ আমরা এই সত্য থেকে আলাদা নই।

আইনস্টাইন: তবে সত্য ও সুন্দর কি মানুষের চেতনা অনির্ভর?

রবীন্দ্রনাথ: না।

আইনস্টাইন: মানুষের অনুপস্থিতিতে কি অ্যাপোলো ভেলভেদেরকে সুন্দর বলা যাবে না?

রবীন্দ্রনাথ: না।

আইনস্টাইন: আমি সুন্দরের ক্ষেত্রে মতবাদটি মানতে পারব। তবে সত্যের ক্ষেত্রে মানতে পারছি না।

রবীন্দ্রনাথ: কেন নয়? সত্যের উপলব্ধি তো মানুষের মধ্যেই বিরাজ করে।

আইনস্টাইন: আমি আমার বিশ্বাসটি সত্য বলে প্রমাণ করতে পারব না। এটাই আমার ধর্ম।

রবীন্দ্রনাথ: সুন্দর সবসময়ই বিশ্বসত্তার সঙ্গে এক হয়ে আছে, আলাদা নয়। আর বিশ্বের ধর্মকে সবদিক দিয়ে বোঝা গেলেই তা সুন্দর। আমরা সবাই আমাদের নিজস্ব ভুলভ্রান্তি, অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই সত্যকে জ্ঞান করতে পারি। সত্যকে জানার আর কী উপায় থাকতে পারে?

আইনস্টাইন: সত্যকে সবসময় মানব অভিজ্ঞতার ঊর্ধ্বে হতে হবে। ধারণাটিকে আমি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারবো না। কিন্তু এটা আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি। একটা উদাহরণ দেয়া যাক- আমি বিশ্বাস করি পিথাগোরাসের সূত্র এমনিতেই সত্য। কোনো মানুষের চেতনা থাকুক বা না থাকুক। যদি মানব চৈতন্য ছাড়া আর কোন বাস্তবতা থাকে, তাহলে ঐ বাস্তবতার সাপেক্ষে আরেকটি বাস্তবতা থাকবে। একটিকে অস্বীকার কথার অর্থ অপরটিকেও অস্বীকার করা।

রবীন্দ্রনাথ: যে সত্তা বিশ্বসত্তার সাথে অদ্বৈতভাবে মিশে আছে, তাকেই সত্য বলা যায়। নইলে আমাদের নিজস্ব সত্য, যাকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলা হয়, যা যুক্তিবিদ্যার মাধ্যমে পাওয়া যায়, তা কখনো সত্য হতে পারে না। ভারতীয় দর্শনে ‘ব্রহ্ম’ বলে একটি ধারণা আছে যার অর্থ ‘পরম সত্য’। আমাদের ব্যক্তিগত মন থেকে তা কখনো পাওয়া যায় না। এ সত্যকে পেতে হলে চেতনাকে বিশ্বের সাথে বিলীন হয়ে যেতে হয়। তবে এই ধরণের সত্য বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না। এখানে যে সত্য নিয়ে আমরা কথা বলছি তা মানব মনের কাছে কীভাবে সত্য ‘সত্য’ হয়ে ওঠে তা নিয়ে। একে মায়া বা ভ্রমও বলা যেতে পারে।

আইনস্টাইন: তাহলে আপনার মতে, ভারতীয় দর্শনে এই মায়া বা ভ্রম ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য।

রবীন্দ্রনাথ: এই পুরো প্রজাতিই একটি মূলের অন্তর্গত। তাই সব মানব মন একসাথে সত্যকে অনুভব করে। আর সেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য একই বিন্দুতে মিলিত হয়। কোনো পার্থক্য নেই।

আইনস্টাইন: জার্মান ভাষায় ‘প্রজাতি’ বলতে পুরো মানবজাতিকে বোঝায়, সাথে বনমানুষ, ব্যাঙও প্রজাতির অন্তর্গত।

রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞানের আদলে আমরা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে সত্যের এমন রূপে পৌঁছি যা পুরো বিশ্ব মানবের মনে বিদ্যমান।

আইনস্টাইন: প্রশ্ন এখনও সত্য মানব চেতনা নির্ভর নাকি অনির্ভর, ওটা নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথ: আমরা যাকে সত্য বলি, তা সাবজেকটিভ ও অবজেকটিভ উভয় বোধের এক যৌক্তিক মিশ্রণ। যা শুধুমাত্র এক সুপারহিউমান দ্বারাই সম্ভব।

আইনস্টাইন: আমরা আমাদের ব্যক্তি জীবনেও মানুষ থেকে এক স্বাধীন সত্যকে অনুভব করি। সেই অনুভূতিগুলোকে ঠিকভাবে কাজ করানোর জন্য এটা করি। উদাহরণ দিই- যদি এই ঘরে কেউ না থাকে, তবুও টেবিলটি তার স্থানেই থাকবে।

রবীন্দ্রনাথ: হ্যাঁ, এটা ব্যক্তির চেতনার বাইরে থাকবে, কিন্তু বিশ্বমনের বাইরে তো নয়। আমার যে চেতনা দিয়ে আমি টেবিলের অস্তিত্ব জ্ঞান করি, সে একই চেতনা দিয়ে টেবিলের অস্তিত্ব বোঝা সম্ভব।আইনস্টাইন: রুমে কেউ না থাকলেও টেবিলের অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আপনার মতে এই ধারণাটি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আমাদের অস্তিত্ব ছাড়া টেবিলের অস্তিত্ব কী তা আমাদের ধারণার বাইরে।

রবীন্দ্রনাথ: বিজ্ঞান প্রমাণ করছে যে টেবিল একটি কঠিন পদার্থ- তা একটি দৃশ্যমান অনুভূতি। তাই মানব চেতনা বলে কিছু না থাকলে টেবিলের প্রসঙ্গেরও কোনো মূল্য নেই। তাই এটা মেনে নিতেই হয়, যে আমাদের বস্তুজগৎ অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন ঘূর্ণায়মান তড়িৎ শক্তির আবহ দ্বারা তৈরি।
আর যতদূর ব্যাপারটা সত্য নিয়ে, সত্যকে বোঝার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব হলো এই, যে বিশ্বচেতনা ও আমাদের ব্যক্তি চেতনা আদতে এক, এগুলো যে আলাদা নয় তা মানব উপলব্ধি করতে পেরেছে। তবুও এই দুইয়ের মধ্যে মিলের প্রচেষ্টাই চালাচ্ছে বিজ্ঞান, দর্শন ও আমাদের মূল্যবোধ। মানুষের বাইরে কোনও বাস্তবতা থাকলে তবে মানুষের জন্য সেই বাস্তবতার কোনও মূল্য নেই।
যদি এমন কোনও চেতনা থাকে যার সাথে ঘটনা কোনও নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে না, অথচ সঙ্গীতের স্বরের মতো সময়ের সাথে ঘটে, এ ধরণের চেতনার সামনে পিথাগোরাসের সূত্রের কোনো মানে নেই। একটি মথের ধর্ম কাগজ খাওয়া, তার কাছে সাহিত্যের কোনো মানে নেই। কিন্তু মানবজাতির জন্য কাগজের চেয়ে সাহিত্যের মূল্য অনেক বেশি। তাই এমন সত্য যদি থাকে যা মানুষের বোধ ও যুক্তির বাইরে, ঐ সত্যের একক কোনো মূল্য নেই যতক্ষণ না আমরা মানুষ এবং মানুষের চেতনা নিয়ে ঘোরাফেরা করছি।

আইনস্টাইনতাহলে তো বলা যায় আমি আপনার চেয়ে বেশি ধার্মিক।

রবীন্দ্রনাথ: আমার ধর্ম হলো মানব চেতনা ও বিশ্বচেতনার মধ্যে এক মিলন ঘটানো। এটাই আমার সদ্য হিবার্ট লেকচারের বিষয়, যাকে আমি ‘মানবধর্ম’ বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

এখানেই দুই নোবেল বিজয়ীর দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক আলাপের শেষ। এতগুলো ভাবিয়ে তোলার মতো বিষয় দিয়ে ভরপুর এই সংলাপে যেমন ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের আদর্শিক ভিন্নতার আঁচ পাওয়া যায়, তেমনি তাঁদের মধ্যে ধর্মীয় ভাবনার মিলও পরিলক্ষিত হয়। রেকর্ড অনুযায়ী তাঁদের ৩০-এর দশকে চারবার সাক্ষাৎ হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত বাকি সময়কার কোনো সংলাপ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ডায়েরি কিংবা প্রবন্ধে উল্লেখ করেননি- সম্ভবত আলাপগুলো ব্যক্তিগত হবার কারণে। তবে জানা যায়, উভয়ের মধ্যে মত বিনিময় ছাড়াও সংগীতের রাগও বিনিময় হয়। আইনস্টাইন রবীন্দ্রনাথকে বেহালা বাজিয়ে যেমন তাক লাগিয়ে দেন, তেমনি আইনস্টাইন প্রবল অনুরাগের সঙ্গে অনুভব করেন এই বাউল মানুষটির অসংখ্য ঘর-ঘরানার ম্যহফিল।

১৯১৩ সালে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই বাঙালির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এভাবে তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ, তাদের সংস্কৃতি দেখা, বোঝা ও আত্মস্থ করার পাশাপাশি সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বক্তৃতা দিতে লাগলেন। জনপ্রিয়তা সবখানে থাকলেও বিশেষ করে জার্মান মানুষদের জন্য রবীন্দ্রনাথ এক বিস্ময়ের প্রতীক। কবি গ্যেটে ইউরোপের জনপ্রিয় কয়েকটি ‘লিডার’ সংগীতের রচয়িতা এবং বেটোফেন সেই গানের সুরকার। গানের অনুভূতি, সুর, শব্দচয়ন, কল্পনার দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ একাধারে গ্যেটে ও বেটোফেনকে ছাড়িয়ে গেছেন বলে জার্মানদের ধারণা। ফলে জার্মানিতে সব বয়সের মানুষ তাঁকে ভালোবাসতেন। রীতিমতো এই তারকা জার্মানির শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর সঙ্গে কী কথা বলতে পারেন, তা জানার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল সাংবাদিকদের মধ্যে।

রবীন্দ্রনাথ আইনস্টাইনের বাড়ি থেকে বের হতেই সাংবাদিকরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি তো জগতের সেরা বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলে এলেন। আপনার তাঁর বিজ্ঞান ভাবনা কেমন লাগলো?’ রবীন্দ্রনাথ তখন সব সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তো কোনো বিজ্ঞানীর সঙ্গে আলাপ করি নি। আমার আলাপ হয়েছিলো এক অসামান্য কবির সঙ্গে।’

কবিগুরুর কথা বুঝতে না পেরে তারা অতঃপর আইনস্টাইনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কবিকে পাশে পেয়ে আপনার কেমন লাগলো?’ আইনস্টাইন রসিক মানুষ। তিনি একটু হেসে বললেন, ‘কোথায়! আমি তো আলাপ করি এক অসামান্য বিজ্ঞানীর সঙ্গে!’

রবীন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের কথোপকথনের মধ্যে যদি একটি দার্শনিক পার্থক্য ব্যক্ত করা যায়, তবে তা এই, যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সত্যে একটি মানব চেতনার অস্তিত্ব অনুভব করতেন। তাঁর মতে এই মানবসত্য একান্তই সত্য বলে পরিগণিত হবে যদি তাঁর মানব চেতনা ও বিশ্বচেতনা এক হয়ে মিলিত হয়। অর্থাৎ, এই সত্য, যা মানবসত্য, শুধু মানুষের জন্যই সত্য এবং মানব চেতনার সত্য ছাড়া সত্যের আর কোনো রূপ নেই। তাছাড়া ‘চরম সত্য’ বলে কিছু থাকলে তা মানুষ ব্যতীত আর কোনো চেতনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

সেখানে আইনস্টাইনের সত্যের রূপ ছিল অনেকাংশেই একটি মানব অনির্ভর সত্য। অর্থাৎ, মানুষের চেতনা থাকুক বা না থাকুক, টেবিল টেবিলের স্থানেই থাকবে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, টেবিলকে ‘টেবিল’ বলে ধরে নিতে হলে মানুষের চেতনার উপস্থিতি একান্তই গুরুত্বপূর্ণ- এটি আইনস্টাইন অস্বীকার করেছিলেন। তবে তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো বিষয় হলো, বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ কবিগুরুর উপলব্ধি করা পথেই চলছে এবং সময়ের সাথে সাথে তাঁর ধারণাটিই বৈজ্ঞানিক সত্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে বাস্তব বলে আমরা যেটাকেই ধরে নিই না কেন, তা একান্তই মানব চেতনার তৈরি কাঠামো- একান্তই মানবসত্য, মানবধর্ম।

বাস্তবতা ও সত্যতা মানব চেতনা নির্ভর, কি নির্ভর নয়- তা নিয়ে এখনো অনেক মত আছে, মতবিরোধ আছে। বিতর্ক আছে। তুমি কী মনে করো? বাস্তবতা ও সত্য কি মানব চেতনা নির্ভর? নাকি বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের চেতনার কোনো সম্পর্ক নেই? বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে এটি এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হিসেবে থেকে গেছে। প্রশ্নটির ব্যাখ্যায় এই কবি এবং বিজ্ঞানীর সংলাপ আজও ইতিহাস একটি স্তম্ভাকারে স্মরণ করে।

পরিশেষে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে আমার অমেয় শ্রদ্ধা।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.