মাইগ্রেন: এক অসহ্য যন্ত্রণার নাম

A simple human being who lives in two universes in parallel. One you see, the other one is inside his head where there's nothing but thoughts and dreams! Currently a student of Shahjalal University of Science and Technology


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

কখনো আপনার এমন হয়েছে যে হঠাৎ মাথার একদিকে প্রচণ্ড ঝিনঝিনে ব্যথা হচ্ছে? ব্যথায় মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে! মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসছে! আলো ও শব্দ সহ্য হচ্ছে না? আমাদের অধিকাংশেরই এমন অভিজ্ঞতা রয়েছে, কারও বেলায় তা নিয়মিত। এই অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার নামই মাইগ্রেন। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫% মাইগ্রেনে আক্রান্ত।

মাইগ্রেন কী?

মাইগ্রেন শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ‘হেমিক্রানিয়া’ থেকে, যার অর্থ মাথার একদিকে ব্যথা।

রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক এম. এস. জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, সব মাথাব্যথাই মাইগ্রেন নয়। দৃষ্টিস্বল্পতা, মস্তিষ্কের টিউমার, মাথায় অন্য সমস্যার কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। মাইগ্রেন এক ধরনের প্রাইমারি হেডেক, যা নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব। চিকিৎসকের অধীনে এবং নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে এ রোগের চিকিৎসা করা উচিত।

মাইগ্রেন কেন হয়?

মাইগ্রেন কেন হয় তা পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এটি বংশগত বা অজ্ঞাত কোনো কারণে হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হরমোনের প্রভাব রয়েছে বলেও কিছু গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে। বিভিন্ন বয়সে নারী-পুরুষের আক্রান্ত হবার হারের পার্থক্য তারই সাক্ষ্য দেয়। এটি সাধারণত পুরুষের চেয়ে নারীদের বেশি হয়। নারীদের ঋতুস্রাবের সময় মাথাব্যথা বাড়ে।

যেসব কারণে মাইগ্রেন হতে পারে সেগুলোকে ‘ট্রিগার’ বলে। যেমন- চকলেট, পনির, কফি ইত্যাদি বেশি খাওয়া, জন্মবিরতিকরণ ওষুধ, দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত ভ্রমণ, ব্যায়াম, অনিদ্রা, অনেকক্ষণ টিভি দেখা, দীর্ঘসময় কম্পিউটারে কাজ করা, মোবাইলে কথা বলা ইত্যাদির কারণে এ রোগ হতে পারে। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, কোষ্ঠকাঠিন্য, অতি উজ্জ্বল আলো এই রোগকে বাড়িয়ে দেয়। মাইগ্রেনের ব্যথা চোখের কোনো সমস্যার জন্য হয় না।

অনেক সময় খাবার, পারফিউমের গন্ধ, সিগারেটের ধোঁয়া, খুব গরম বা ঠাণ্ডা থেকেও মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

লক্ষণ

মাথাব্যথা শুরু হলে তা কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। মাথাব্যথা, বমি ভাব এ রোগের প্রধান লক্ষণ। তবে অতিরিক্ত হাই তোলা, কোনো কাজে মনোযোগ নষ্ট হওয়া, বিরক্তিবোধ করা ইত্যাদি উপসর্গ মাথাব্যথা শুরুর আগেও হতে পারে। মাথার যেকোনো অংশ থেকে এ ব্যথা শুরু হয়। পরে পুরো মাথায় ছড়িয়ে পড়ে। চোখের পেছনে ব্যথার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। শব্দ ও আলো ভালো লাগে না। কখনো কখনো অতিরিক্ত শব্দ ও আলোয় ব্যথা বেড়ে যেতে পারে।

প্রচন্ড মাথাব্যথার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিবিভ্রম এবং বমির ভাব থাকতে পারে। সাধারণত রক্তে সেরোটোনিন অথবা ফাইভ এইচটির মাত্রা পরিবর্তিত হলে মস্তিষ্কে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। মস্তিষ্কের বহিরাবরণে যে ধমনীগুলো আছে সেগুলো মাইগ্রেন শুরুর প্রারম্ভে ফুলে যায় তাই মাথাব্যথার তীব্রতা ব্যাপক হয়।

মাইগ্রেনের কয়েকটি ধরন আছে। তার একটি হচ্ছে ক্লাসিক্যাল মাইগ্রেন। ক্লাসিক্যাল মাইগ্রেনের শুরুটা অধিকাংশ সময়েই আপনি বুঝতে পারেন। প্রাথমিক পর্যায়ে দৃষ্টিবিভ্রম হয়। চোখের সামনে আলোর ঝলকানি, চোখে সর্ষে ফুল দেখেন। হাত-পা, মুখের চারপাশে ঝিনঝিনে অনুভূতি হয়। শরীরের এক পাশে দূর্বলতা বা অবশভাব হতে পারে। এরপর শুরু হয় মাথাব্যথা, যা মাথার একপাশের একটি স্থান থেকে শুরু হয়ে আস্তে আস্তে সেই পাশের পুরো স্থানেই বিস্তৃত হয়। প্রচণ্ড দপদপে ব্যথা আপনাকে কাহিল করে ফেলে। প্রচুর ঘাম হয়। বমি কিংবা বমি ভাব হয়। আলো আর শব্দ একদম সহ্য হয় না। কথা বলতেও অনীহা লাগে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। চুপচাপ অন্ধকার ঘরে থাকতেই বেশি ভালো লাগে।

প্রতিকার

মাইগ্রেন হলে ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ রয়েছে। ব্যথার তীব্রতার উপর নির্ভর করে পেইনকিলার নেয়া যেতে পারে। সাধারণ প্যারাসিটামলেও অনেকের কাজ হতে পারে, তবে ব্যথা তীব্র হলে ওষুধের তীব্রতাও বাড়াতে হবে। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার ওষুধ খাওয়া উচিত না।

তবে ওষুধের পাশাপাশি মাইগ্রেনের ব্যথার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হচ্ছে যথাসম্ভব অন্ধকার ও শব্দবিহীন পরিবেশে ঘুমানো, অন্তত কয়েক ঘন্টা।

যেসব খাবার মাইগ্রেন প্রতিরোধে সহায়ক

১) ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার। যেমন- ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত, আলু ও বার্লি মাইগ্রেন প্রতিরোধক।

২) বিভিন্ন ফল, বিশেষ করে খেজুর ও ডুমুর ব্যথা উপশম করে।

৩) সবুজ, হলুদ ও কমলা রঙের শাকসবজি (বিশেষত পালংশাক) নিয়মিত খেলে উপকার হয়।

৪) ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি মাইগ্রেন প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তিল, আটা ও বিট ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম রয়েছে।

৫) আদার টুকরো বা আদার রস দিনে দুইবার পানিতে মিশিয়ে খেতে পারেন।

৬) প্রতিদিন রোদে ১০ মিনিট থাকতে পারলে ভালো হয়। সম্ভব না হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভিটামিন ‘ডি’ সাপ্লিমেন্ট খেতে পারেন।

৭) মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্যের অভাবের কারণে অনেক সময় মাথা ধরে। ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খান। লো ফ্যাট ডায়েট মেনে চলুন।

 

যেসব খাবার খাবেন না

১) চা, কফি ও কোমলপানীয়, চকলেট, আইসক্রিম, দই, দুধ, মাখন, টমেটো ও টক জাতীয় ফল

২) গমজাতীয় খাবার, যেমন রুটি, পাস্তা, ব্রেড ইত্যাদি

৩) ডিম, মাংস

৪) আপেল, কলা ও চিনাবাদাম

৫) পেঁয়াজ

তবে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন খাবারে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সবচেয়ে ভালো হয় একটা ডায়েরি রাখা। যাতে আপনি নোট করে রাখতে পারেন কোন কোন খাবার ও কোন কোন পারিপার্শ্বিক ঘটনায় ব্যথা বাড়ছে বা কমছে। এরকম এক সপ্তাহ নোট করলে আপনি নিজেই নিজের সমাধান পেয়ে যাবেন। তবে ব্যথা বেশি হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

মাইগ্রেন থেকে রেহাই পাওয়ার কিছু উপায়

মাইগ্রেন চিকিৎসায় তাৎক্ষণিক এবং প্রতিরোধক ওষুধের পাশাপাশি কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়।

১) প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে হবে এবং সেটা হতে হবে পরিমিত

২) কোনো বেলার খাবারই বাদ দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে সকালের নাশতা কখনোই বাদ দেওয়া যাবে না। অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দেয়।

৩) অতিরিক্ত বা কম আলোতে কাজ না করা।

৪) কড়া রোদ বা তীব্র ঠান্ডা পরিহার করতে হবে।

৫) উচ্চশব্দ ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বেশিক্ষণ না থাকা।

৬) বেশি সময় ধরে কম্পিউটারের মনিটর ও টিভির সামনে না থাকা।

৭) মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেলে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা (বিশেষ করে বমি হয়ে থাকলে)

৮) বিশ্রাম করা, ঠান্ডা কাপড় মাথায় জড়িয়ে রাখা উচিত।

 

মাইগ্রেন সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা

১) অনেকে মনে করেন মাইগ্রেন মানেই মাথা ব্যথা। এ ধারণা ঠিক নয়। মাইগ্রেনের অনেকগুলো লক্ষণের মধ্যে একটি হচ্ছে মাথা ব্যথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় মাথা ব্যথা ছাড়াও মাইগ্রেন আক্রমণ করতে পারে।

২) অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে, মাইগ্রেন কেবল মেয়েদেরই হয়। আসলে এটি নারী-পুরুষ যে কারোরই হতে পারে। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৮ ভাগ পুরুষ ও ১৮ ভাগ নারী এই সমস্যায় ভোগেন। আবার, শুধু বড়দের নয়, হতে পারে শিশুদেরও।

৩) অনেকের ধারণা মানসিক চাপ থেকেই মাইগ্রেন হয়। এটি ঠিক নয়। প্রায় ৭০% মাইগ্রেনের কারণ দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ হলেও আরও বহু কারণে আক্রমণ করতে পারে মাইগ্রেন।

৪) মাইগ্রেনের ব্যথা বেশিদিন থাকে না বলে ভুল ধারণা প্রচলিত আছে অনেকের মধ্যে। তবে মাইগ্রেন অনেকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। অনেক সময় মাইগ্রেন একমাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

৫) অনেকে মনে করেন মাইগ্রেন থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। এটি ঠিক নয়। যদিও মাইগ্রেনের কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই, তবে লক্ষণসমূহ বিচার করে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

মাইগ্রেনের চিকিৎসায় নতুন কার্যকরী ওষুধ

গবেষকরা বলছেন, মাইগ্রেন বা দীর্ঘ সময়ের মাথা ব্যথা সারাতে অন্য সব ঔষধ বা চিকিৎসা যখন ব্যর্থ হবে, তখন এই নতুন ঔষধ কাজ করবে। নতুন এই ঔষধটি হচ্ছে ইনজেকশন। মাসে একবার এই ইনজেকশন নেয়া যাবে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘এরেনুম্যাব’।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস অল্প সময়ের মধ্যে মাইগ্রেন রোগীদের কাছে এই ঔষধ নিয়ে যাবে; যদি এর দাম সামর্থের মধ্যে বা একটা যৌক্তিক পর্যায়ে থাকে। নতুন এই ঔষধের বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে এক চিকিৎসা বিষয়ক সম্মেলনে। গবেষকরা বলেছেন, এই ঔষধ গুরুতর মাইগ্রেন আক্রান্ত এক তৃতীয়াংশ মানুষকে সাহায্য করবে। একজন মাইগ্রেন রোগী মাসে যতবার এই রোগে আক্রান্ত হন, নতুন ঔষধ ব্যবহারে আক্রান্তের সেই হার অর্ধেকে নেমে আসবে। মাইগ্রেনে আক্রান্ত সকলের জন্য এটি এক সুসংবাদ বটে।

মাইগ্রেন নামের এই ভয়ানক যন্ত্রণাকে স্বাভাবিক মাথাব্যথা ভেবে দিনের পর দিন সহ্য করে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। প্রত্যেকের উচিত মাইগ্রেন সম্পর্কে জানা ও সচেতন হওয়া। সেইসাথে প্রতিরোধমূলক নির্দেশনাসমূহ মেনে চলা। কারণ যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই, “Prevention is better than cure”!

References:

    1. https://roar.media/bangla/main/health/migraine-a-terrible-pain/

 

    1. https://thedhakatimes.com/6800/tips-to-get-rid-of-a-headache-and-migran/

 

    1. https://www.bbc.com/bengali/news-43818370

 

    1. https://www.prothomalo.com/life-style/article/778462

 

    1. http://www.banglatribune.com/lifestyle/news/70889/মাইগ্রেন-সম্পর্কে-যত-ভুল-ধারণা

 

  1. http://www.kalerkantho.com/print-edition/a2z/2017/08/14/531248

     


    ১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.