১.
সিঁথি, আমার ডিপার্টমেন্টের ফ্রেন্ড। ক্লাসে আমরা একসাথে বসি সবসময়। তবে সাইজে ছোট এই মেয়েটা আমাকে বড়ই বিরক্ত করে মাঝে মাঝে। কিছু হলেই বলবে, “এই কেকা মেজবান খাওয়াও। “আবার বলে, “তুমি আমার জন্য মেজবানের মাংস রেঁধে আনবে।“ ওর এসব কথাবার্তা শুনে আমি ভালোই মুশকিলে পড়ি। কারণ, ওকে যতই বোঝাতে চেষ্টা করি যে, আমি একা মেজবান খাওয়াতে পারব না এবং মেজবানের গোশত রান্না করা খুব চাট্টিখানি কথা না, কিন্তু সে ততই নাছোড়বান্দা। সে বুঝতেই চায় না। পরে আমি বুঝলাম, মেজবানকে সে শুধু একটা রান্নার আইটেম ভেবেছে।
কতগুলো মাংস দিয়ে একপদ রান্না করলেই মেজবান রান্না হয়ে যায়! মেজবান চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, আর সেখানে এই মেয়ে কিনা কিসব উল্টাপালটা জিনিস ভেবে বসেছে মেজবানকে। তাই চট্টগ্রামের মেয়ে হিসেবে আমার দায়িত্ব ওকে বুঝানোর। পাশাপাশি ভাবলাম, যেহেতু ওকে বুঝাবই, সেহেতু অন্য
২.
আচ্ছা এখন প্রথমেই আসি মেজবান অনুষ্ঠানের
তোমরা কেউ সিঁথির মতো মেজবানকে যাতে রান্নার আইটেম না ভাবো তাই আগেই বলে দিচ্ছি মেজবান হচ্ছে একটা অনুষ্ঠান। ভোজের অনুষ্ঠান। সেই প্রাচীনকাল থেকেই মেজবানি প্রথা চলে আসছে। ঠিক কোন সময় থেকে মেজবানের প্রচলন শুরু হয় তা বলা মুশকিল।
চট্টগ্রামের মানুষরা নিজ আনন্দ, দুঃখ সবসময় একে অপরের সাথে শেয়ার করতে ভালবাসে। তাই কোনো উপলক্ষ্য পেলেই তারা মেজবানের আয়োজন করে। আর তোমরা হয়তো জানোই, চিটাগাং এর প্রায় সবকিছুই দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশ ভিন্ন। আমাদের আঞ্চলিক ভাষাই সেটির প্রমাণ পদে পদে দেয়। তো যাই হোক, তাই আমরা কোনো উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষকে খাওয়ানো হয়। এক কথায় এটি হচ্ছে গণভোজের অনুষ্ঠান। মেজবান মূলত খাবার কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান বলে, এখানে সবাই একদম কবজি ডুবিয়ে খেতে পারে! বলা চলে, লিমিটলেস খাবার পাওয়া যায়! এবং আয়োজকরাও তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করেন যাতে কোনো অতিথি অসন্তুষ্ট হতে না পারেন। আর যারা চট্টগ্রামের খাবার দাবারের প্রশংসা শুনেছো বা খাবার খেয়েছো তারা কিছুটা আন্দাজ করতেই পারছো কিরকম উদরপূর্তির সম্ভাবনা থাকে।
কোর্সটিতে যা যা পাচ্ছেন:
বিসিএস প্রিলি লাইভ কোর্স
আচ্ছা এখন বলি কী কী উপলক্ষ্যে মেজবান দেওয়া হয়। একদম যেকোনো অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই মেজবান দেওয়া যায়। ধরো, তুমি তোমার মিডটার্ম পরীক্ষায় পাশ করলে, চাইলে সেজন্যও দেওয়া যায় মেজবান। উপলক্ষ্য আসলে যেকোনো কিছুই হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড় বড় উপলক্ষ্যগুলোর জন্যই মেজবানের আয়োজন করা হয়। সাধারণত যেসব অনুষ্ঠানের জন্য হয় সেগুলো হল, মৃত্যুর পর, মৃত্যুবার্ষিকীতে, জন্মবার্ষিকী, বিয়ে হলে, বিবাহবার্ষিকীতেও, পরিবারে নতুন সদস্য
তবে এ ক্ষেত্রে কিছু সমালোচনাও আছে। কারণ, সবকিছু নিয়ে মেজবান দেওয়াটা অনেক সময় বেমানান হয়। আমার একদম ব্যক্তিগত মতামত হল যে, ভালো উপলক্ষ্যে মেজবান দেওয়া যেতেই পারে বা কোনো সেলিব্রেশনের জন্য।
৩.
মেজবান কারা দেয় এবং কারা আমন্ত্রিত থাকে? তোমরা যদি এই ব্লগটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে থাকো তাহলে ইতোমধ্যে তোমাদের মাথায় এই প্রশ্নটি চলে আসার কথা।
এখন কথা হচ্ছে, আমি তুমি চাইলেই মেজবান দিতে পারব না। সাধারণত উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষজন এই আয়োজন করতে পারে। বিশেষত ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গই এই আয়োজন করে থাকে। আর এর জন্য অনেক অর্থও খরচ হয়। তাই বুঝতেই পারছো সিঁথি যখন আমাকে খালি মেজবান খাওয়াও বলে তখন আমাকে কতটাই বিপাকে পড়তে হয়! কারণ, আমার পক্ষে মেজবান আয়োজন করা আপাতত কল্পনাতীত।
এবার আসি কারা মেজবান আমন্ত্রিত থাকে। এক কথায় সবাই। হ্যাঁ, সবাই মানে সবাই। বড়, ছোট, মেজো, সেজো, লম্বা, খাটো, ধনী, গরিব, ছেলে, মেয়ে, বুড়ো, বুড়ি, নারী, পুরষ, পিচ্চি বাচ্চা-কাচ্চা সবাই! অনেক মেজবানেই দেখা যায় কোনো আমন্ত্রণ থাকে না, কারণ এখানে সবাই আমন্ত্রিত। যে কেউ এসে মেজবান খেয়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
সোশ্যাল মিডিয়া এর সদ্ব্যবহার: জেনে নাও কয়েকটি টিপস!
নামাজ পড়ার নিয়ম: কোন নামাজ কত রাকাত ও নামাজের ফরজ কয়টি?
তবে অনেক ক্ষেত্রে কিছু মানুষ শ
এই অতিথি আমন্ত্রণ ব্যাপারটা নিয়ে অনেক মজার ব্যাপার ঘটতো আগে। আগে কোনো পাড়ায় মেজবানের আয়োজন করা হলে, সে পাড়াতে তো অবশ্যই এমনকি পাশের পাড়া, তার পাশের পাড়া এভাবে করে পাড়ায় পাড়ায় রটিয়ে দেওয়া হতো মেজবানের কথা। ঢোল পিটিয়ে, টিনের চুঙ্গি ফুঁকিয়ে বলা হতো মেজবানের কথা। এভাবেই আমন্ত্রণ করা হতো সবাইকে। পরবর্তীতে মাইকিং করে জানান দেওয়া হতো। মাঝেমাঝে এসবের কিছুই করা হতো। তবুও হাজার হাজার মানুষ চলে আসতো। এবং সবাইকে সাদরে আপ্যায়ন করা হতো।
এখন অবশ্য অনেক জায়গায় কার্ড ছাপানো হয়। সেভাবেই মানুষকে নেমতন্ন পাঠানো হয় বা মোবাইল, মেসেজ, ইমেইল করেও জানানো হয়।
৪.
যেহেতু ফরমাল কোনো আমন্ত্রণ লাগে না মেজবানে আসতে তাই বুঝতেই পারছো মেজবানে শয়ে শয়ে মানুষের সমাগম হয়। মানুষের সংখ্যা হাজারের বেশি হলেও অবাক করার কারণ নেই। এরকম হাজার হাজার মানুষের সমাগম অহরহই হয়ে থাকে।
তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে কোথায় আয়োজিত হয় মেজবান অনুষ্ঠানটি? অবশ্যই মেজবানের জন্য বিশাল বড় জায়গা লাগে। বিশাল বড় মাঠে হয়। তবে আজকাল বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের ব্যবস্থা হয়ে থাকে। ফলে আরাম করে খাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের “কিংস অব চিটাগাং” বা “প্রিন্স অব চিটাগাং” এসবের মতো বড় বড় কমিউনিটি সেন্টারে বিশাল পরিসরে মেজবান আয়োজিত হয়।
মেজবান হচ্ছে মূলত মিলনমেলা। নানান বয়সী মানুষের মেলা বসে সেখানে। আড্ডা, আলোচনা এসব তাই চলতেই থাকে সেখানে। সম্পর্ক দৃঢ় করার এক ভালো সুযোগ এটি। আর অনেকেই খুব দলবল নিয়ে মেজবানে যায়। সেটি আরেক মজা! বিশেষ করে পিচ্চি বাচ্চারা তাদের এক বিশাল বড় গ্রুপ নিয়ে খেতে আসে!
৫.
এবার আসি মেজবানের মূল আকর্ষণ খাওয়াতে! খাওয়া মানেই এখানে গরু! মেজবান কত বড়ভাবে আয়োজন করা হচ্ছে সেটার উপর নির্ভর করে গরুর সংখ্যা কত হবে। এক থেকে দশ/বিশটি একদম মোটা তাজা গরু বরাদ্দ থাকে। আর এখানেই বলে রাখি, আমরা কিন্তু মাংস বলি না। আমাদের এখানে গোশত কথাটি প্রচলিত। মেজবানের খাওয়া অনন্য বৈশিষ্টের অধিকারি। পোলাও, বিরিয়ানি এখানে রান্না হয় না। খাবারের মেনুর মধ্যে থাকবে একদম ধোঁয়া উঠা সাদা ভাত (বেশিরভাগক্ষেত্রে সিদ্ধ চাল থাকে) এবং তার সাথে ৩/৪ রকমের গরু গোশতের পদ। তবে গরু ছাড়াও, মহিষ এবং ছাগলের গোশতের ও আয়োজন থাকে কিছু কিছু মেজবানে।
মেজবানি গরু গোশতের কিছু পদ আছে। সবগুলোই বেশি ঝাল এবং মশলাযুক্ত খাবার। এইগুলোই সবসময় মেজবানে পাওয়া যাবে।
১) ঝাল গরু গোশত
অনেক মশলা, তেল দিয়ে রান্না করা হয়। হরেক রকমের মশলা, তেল দিয়ে রান্না করাটা ঝাল এই আইটেমটি রান্না করার সময় সুগন্ধে চারপাশ মৌ মৌ করে।
২) চনার ডাল দিয়ে হাড্ডি
চনা হচ্ছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক শব্দ। ছোলার ডালকেই চনার ডাল বলা হয়। ছোলার ডাল দিয়ে গরুর হাড়, চর্বি মশলা, তেল দিয়ে রান্না করা হয়। আগের আইটেমটির তুলনায় ঝাল কিছুটা কম হয়। এর মধ্যে লাউ এবং মিষ্টি কুমড়া থাকে।
৩) নলা কাজি
এটাও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কথা। নলা হচ্ছে পায়া। গরুর পা কে অল্প মশলা দিয়ে রান্না করা হয়। ঝোল একটু বেশি থাকে। আর ঝোলকেই বলছি কাজি। আসলে নলা কাজি হচ্ছে সেটাই যেটাকে আমরা নেহারী। এর বদলে ছাগলের পায়াও রান্না করা হয়।
অনেক জায়গায় মুসলিম ধর্মালম্বী ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষদের আপ্যায়নের জন্য মাছের ব্যবস্থা থাকে। মাঝে মাঝে মাছ দিয়েও মেজবানি করা হয়।
এবার আসা যাক, রান্না হয় কিভাবে এবং কখন। সাধারণত, মেজবানের আগের দিনই সব কাটাকুটির কাজ সেরে ফেলা হয়। সারারাত ধরে কাজ করা হয়। এবং মেজবানের আগের দ
আহা! মেজবানি গোশতের কথা লিখতে লিখতেই আমার খুব খেতে ইচ্ছা করছে।
তবে যুগ এখন পাল্টিয়েছে। মেজবানি গোশত খেতে এখন আর মেজবানের জন্য বসে থাকতে হয় না। অনেক রেস্টুরেন্ট আছে যাদের অথেনটিক মেজবানের গোশত রান্না করে। আর চট্টগ্রামে তো সব জায়গাতেই কম বেশি পাওয়া যায়। রমজান মাস আসলে জায়গায় জায়গায় শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে মেজবানের গোশত বিক্রি করা হয়। এছাড়াও, “মেজ্জান হাইলে আইয়ুন”, “দমফুক” এসব জায়গায় পাওয়া যায়।
এবং ঢাকাতেও মেজবানের স্বাদ পেতে অনেক রেস্টুরেন্টে ঢুঁ মারতেই পারো। যেমন ধরো, “দাওয়াতে মেজবান”, “চাটগাইয়া তোলপাড়”, “প্রিয় মেজবান” ইত্যাদি। ফুডগ্রুপ গুলোতে একটু খুঁজলেই পাবে।
৬.
মেজবান হচ্ছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের ধারক বাহক। মেজবান যেন চট্টগ্রামকে তুলে ধরে সবার সামনে। প্রতি বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জে মেজবানের আয়োজন করে আসছে চট্টগ্রামের মানুষরাই। মূলত, এর পরিসর এখন এতই বিস্তৃত যে দেশের অন্যান্য জায়গায় তো বটেই এমনকি দেশের বাইরে অন্যান্য দেশের বসবাসরত চট্টগ্রামের মানুষরা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে মেজবানের আয়োজন করে। পশ্চিমবঙ্গের বসবাসরত চট্টগ্রাম হিন্দু সমিতি বিশাল বড় মাছের মেজবানের আয়োজন করে। সিডনিতে, লন্ডনে, আমেরিকাও বাদ নেই!
যাক গে, আমি ভাবছি সিঁথি নিয়ে একদিন চট্টগ্রাম যাব। একেবারে আসল মেজবান কি জিনিস সেটা ওকে চিনিয়েই ছাড়ব। তবে এর আগে প্রিলিমিনারি হিসেবে ওকে ঢাকাতেই মেজবানের গোশত খাওয়ানোর কথা দিয়েছি।
তোয়ারা বেজ্ঞুন্নেরেও মেজ্জাইন্না দাওয়াত (তোমাদের সবাইকেও মেজবানের দাওয়াত)
তথ্যসূত্র:
১. https://www.prothomalo.com/life-style/article/728074
২. http://www.risingbd.com/feature-news/273285
৩. http://en.banglapedia.org/index.php?title=Mezban
আমাদের কোর্সগুলোর তালিকা:
- Communication Masterclass by Tahsan Khan
- Facebook Marketing Course by Ayman Sadik and Sadman Sadik
- ঘরে বসে Freelancing by Joyeta Banerjee
- ঘরে বসে Spoken English Course by Munzereen Shahid
- Study Smart Course by Seeam Shahid Noor




আপনার কমেন্ট লিখুন