জেনে নিন ওয়েডিং ফটোগ্রাফির বেসিকস

March 20, 2022 ...

টুকটাক হাতখরচের টাকা জমিয়ে একটা ক্যামেরা কিনেই ফেললো রাফতি। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজিনদের ধরে এনে তাদের ছবি তুলে দিতো, মডেলদের তালিকা থেকে বাদ যেত না তার বিড়ালটাও! রাফতির ছবি তোলার প্রতি এই আগ্রহ দেখে তার ভাইয়ের এক ওয়েডিং ফটোগ্রাফার বন্ধু তাকে অ্যাসিস্টেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দিলে সাথে সাথে সেটা লুফে নেয় সে৷ ধীরে ধীরে এই কাজে অভিজ্ঞ হওয়ার পর রাফতি এখন নিজেই বিভিন্ন জায়গায় ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করে উপার্জন করে।

বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনের মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি করার জন্য ওয়েডিং ফটোগ্রাফির গুরুত্ব ও ওয়েডিং ফটোগ্রাফারদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আজকাল অনেকেই এই স্বাধীন পেশার দিকে ঝুঁকছেন, অনেকে এটা শিখতে চাইছেন।

ওয়েডিং ফটোগ্রাফারের গুণাবলি:

বই পড়ে, ব্লগ ঘেঁটে, ভিডিও দেখে, অভিজ্ঞ কোনো আলোকচিত্রীর সঙ্গে থেকে কিংবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোর্সে ভর্তি হয়ে ফটোগ্রাফি শেখা যায়। তাছাড়া বর্তমান সময়ে ওয়েডিং ফটোগ্রাফারদের চাহিদা অনেক, কারণ বিয়ে বাদেও মূল অনুষ্ঠানের আগে-পরে অনেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ফলে শিক্ষানবিশ পর্যায়ে ফটোগ্রাফি করেও মাসিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।

তবে যতই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাকুক না কেন, আপনি সেটা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে তা কোনো কাজেই আসবে না।

একজন ফটোগ্রাফারের অন্যতম গুণ হচ্ছে তার কমিউনিকেশন স্কিল, কারণ তাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে হয়। ক্লায়েন্টদের সাথে যতটা সম্ভব বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন, বুঝতে চেষ্টা করুন তারা কীভাবে তাদের প্ল্যান সেট করতে চাইছেন। অনেকেরই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে আড়ষ্টতা থাকে, বিরক্ত না হয়ে তাদের স্বাভাবিক করার চেষ্টা করুন। নিজেই তাদেরকে কিছু পোজ দেখিয়ে দিন, মাঝে মাঝে উৎসাহ দিন। কমিউনিকেশন স্কিলের পাশাপাশি ওয়েডিং ফটোগ্রাফারদের জন্য আরো জরুরি কিছু গুণাবলী হচ্ছে আপনার ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং পরিশ্রম।

যেভাবে কাজ পাবেন:

অ্যাসিস্ট করুন:

ওয়েডিং ফটোগ্রাফি শেখার প্রথম তিন মাস যত বেশি পারুন এই সেক্টর সম্পর্কে আইডিয়া নিন। নিজ এলাকার আশেপাশের ওয়েডিং ফটোগ্রাফারদের খুঁজে বের করুন, তাদের সাথে কাজ করার আগ্রহ দেখান। শুরুতেই হয়তো আপনাকে ছবি তুলতে দেওয়া হবে না, কিন্তু তাদের সাথে অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারবেন। কাজ করতে করতে একসময় বুঝে যাবেন যে কীভাবে লিড নিতে হবে।

wedding diary

সোর্স: ওয়েডিং ডায়েরি

নিজের পোর্টফোলিও তৈরি করুন:

আপনার পোর্টফোলিও দেখলেই আপনার কাজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। যার পোর্টফোলিও যত সমৃদ্ধ হবে, তিনি তত সহজে নিজেকে ও নিজের কাজকে অন্যদের কাছে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবেন। একটি ডোমেইন কিনে ব্লগ বা নিজের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখানে নিজের তোলা ছবিগুলো সাজিয়ে রাখতে পারেন। ইন্টারনেটে ফ্লিকার, ওয়ার্ডপ্রেস, টাম্বলারের মতো বেশকিছু ফ্রি পোর্টফোলিও সাইটও আছে। সেখানেও একাউন্ট তৈরি করতে পারেন।

নিজ সার্কেলে কাজ খুঁজে বের করা:

ওয়েডিং ফটোগ্রাফিতে মোটামুটি হাত পাকিয়ে ফেললে এবার কাজ খোঁজার পালা। পুরোনো ক্লাসমেট, কলিগ বা ফ্রেন্ড সার্কেলের মধ্যে কারো বিয়ে ঠিক হয়েছে?

তাকে নিজের পোর্টফোলিও দেখিয়ে বলুন যে আপনি তার ওয়েডিং ফটোগ্রাফার হতে আগ্রহী৷ প্রথম দিককার কিছু কাজে হয়তো আপনার পারিশ্রমিকটা বেশ কম থাকবে, তবুও চেষ্টা করবেন নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার। কারণ আপনারও কাজটা দরকার।

ক্যামেরার রকমফের: 

camera for wedding photography

বাজেটবান্ধব ক্যামেরা কিনুন; সোর্স: হাই পয়েন্ট ডিরেক্টরিস

দামি ক্যামেরা আর কয়েকটা লেন্স থাকা মানেই যে ভালো ছবি উঠবে, এটা আমাদের একটা ভুল ধারণা। অনেক সময় খুবই সাধারণ মানের ক্যামেরা দিয়েও দারুণ ছবি তোলা যায় যদি আপনি সেই বিষয়ে দক্ষ হন। বর্তমান সময়ে এসব বাজেটবান্ধব ক্যামেরার মধ্যে ফটোগ্রাফারদের পছন্দ Nikon D3500, Fujifilm X-T200, Sony ZV-E10 ইত্যাদি।

ক্যামেরার অনুষঙ্গ:

ছবি তোলার জন্য ক্যামেরার পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসও দরকার। চলুন সেগুলোর নাম ও কাজ সম্পর্কে জেনে আসা যাক:

স্পিডলাইট ও লাইটস্ট্যান্ড: 

ইনডোর শ্যুটিংয়ের জন্য লাইটিং সেটআপের কোনো বিকল্প নেই। সবচেয়ে ভালো হয় দিনের আলো ব্যবহার করে বাহিরে গিয়ে ছবি তোলা। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই এই কাজটা করার মতো পরিস্থিতি থাকে না। সেক্ষেত্রে ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসে স্পিডলাইট। এটা স্টিল শট নেওয়ার পাশাপাশি অ্যাকশন শট নিতেও সাহায্য করে, দামে কম হলেও মানে ভালো। স্ট্যান্ডটাকে যেখানে খুশি সেখানে সরিয়ে খুব সহজেই লাইট ব্যবহার করতে পারবেন।

মেমোরি কার্ড ও কার্ড কেস:

আপনার-আমার প্রিয় মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দী করতে ভালো মানের ক্যামেরার গুরুত্ব যতখানি, তা সংরক্ষণে মেমোরি কার্ডের প্রয়োজনীয়তা তার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। যেহেতু একেক ধরনের যন্ত্রে একেক ধরনের মেমোরি কার্ড ব্যবহার করা হয়, সেহেতু ক্যামেরার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মেমোরি কার্ড ব্যবহার করতে হবে।

ছবি তোলা শেষে দুর্ঘটনা এড়াতে ক্যামেরা থেকে মেমোরি কার্ড খুলে কেসে রেখে দিন। আপনার ক্যামেরা হারিয়ে যেতে পারে, কিংবা নষ্টও হয়ে যেতে পারে৷ আপনি পরে নতুন একটা ক্যামেরা কিনে নিতে পারবেন, কিন্তু মেমরি কার্ডে যেই মুহূর্তগুলোর ছবি তুলে রাখা, সেগুলো আর ফেরত পাওয়া যাবে না৷

প্রাইম লেন্স:

বিয়ের ফটোগ্রাফির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পোর্ট্রেট তোলা। আর প্রাইম লেন্স মূলত পোর্ট্রেট তোলার জন্যই বেশি ব্যবহার হয়, কারণ এই লেন্সের তোলা ছবি খুব বেশি জীবন্ত মনে হয়। আর যারা নতুন নতুন ছবি তোলা শিখছেন তাদের জন্য এটা এক প্রকার আদর্শ লেন্স।

ব্যাকাপ গিয়ার:

আপনার ক্যামেরার কোয়ালিটি যত ভালো হোক না কেন, দুর্ঘটনাবশত আপনার ক্যামেরার যেকোনো পার্টস নষ্ট হয়ে যেতেই পারে৷ সেক্ষেত্রে সবসময় এক্সট্রা পার্ট সাথে করে নিয়ে নিবেন।

যে ধরনের ছবি চাই:

wedding photo - wedding diary

নিতে পারেন এমন ক্লোজ শট; সোর্স: ওয়েডিং ডায়েরি

ছবি তোলার স্টাইল সম্পূর্ণ নির্ভর করে ফটোগ্রাফারের সৃজনশীলতার উপরে। এরপরেও প্রতিটা বিয়ের ছবির কিছু সাধারণ শট থাকেই৷

close bridal shot - wedding diary

ক্লোজ ব্রাইডাল শট; সোর্স: ওয়েডিং ডায়েরি

বিয়ের সাজে বর-কনের সিঙ্গেল ছবি, জামার ছবি, মেকওভার, ঘড়ি, পাগড়ি, গয়না কিংবা আংটির ক্লোজ শট- এ ধরনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় খুবই জনপ্রিয়।

বিয়েবাড়ির অন্দরমহলের সাজ, বাহিরের সাজ, ওয়েডিং ভেন্যু, সিলিং, ঝাড়বাতি, টেবিলে রাখা বিয়ের কার্ড, ফুলের বুকেট- এসবের ছবি ছাড়া ওয়েডিং এলবামটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়৷ এছাড়াও বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়দের সাথে খুনসুটির ছবি, ফরমাল পারিবারিক ছবি, আয়নায় মুখ দেখা, আংটি পরানো, বিয়ের খাওয়া, মূল ভেন্যুতে প্রবেশ করার সময় বর-কনের ছবিও তুলতে পারেন।

ছবি তোলার প্রস্তুতি:

চেকলিস্ট:

হুট করেই ছবি তুলতে চলে যাবেন না। যেদিন ছবি তুলবেন তার দুই-তিনদিন আগেই ওয়েডিং টাইমলাইন, চেকলিস্ট, শটলিস্ট ইত্যাদি তৈরি করে যাবেন। হবু বর-কনের সাথে কথা বলে তাদের আইডিয়াগুলো নিন। আর ব্যাকাপের জন্য অতিরিক্ত ব্যাটারি ও মেমোরি কার্ড নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ ফটোগ্রাফারদের জন্য ক্যামেরার চার্জ শেষ হয়ে যাওয়া ও মেমোরি ফুল হয়ে যাওয়া খুবই বিব্রতকর।

অবশ্যই সাথে দুইটা ক্যামেরা রাখতে হবে। এতে করে যেকোনো কিছুর ছোট ছোট ডিটেইলড শট নেওয়া সহজ হবে এবং ক্যামেরার ফোকাল লেন্থের বৈচিত্র্য ও শাটার স্পিড বাড়বে।

ক্লায়েন্টদের সম্পর্কে জানুন:

যেই দম্পতির ছবি তুলবেন, তাদের সাথে আগে কথা বলে ঠিক করে রাখুন যে তারা আপনার কাছ থেকে কেমন সার্ভিস চাচ্ছেন।

বিয়ের আগে এনগেজমেন্ট কিংবা হলুদে যদি আপনি তাদের ছবি তুলে থাকেন তাহলে তখনই বিভিন্ন পোজে ছবি তুলে দেখুন ছবি কেমন আসে। এরপর বিয়ের দিন সেরা পোজ ও এঙ্গেলে ছবি তুলুন। এতে করে বিয়ের দিন কোনো আড়ষ্টতা থাকবে না।

সময় ভাগ করুন:

কাজের জন্য সময়ের ভাগ করে নিন। ছবি তোলা ও ছবি এডিট করার জন্য আলাদা সময় বরাদ্দ রাখুন। যে কাজই করুন না কেন, তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী চুক্তিপত্র তৈরি করে নিন। আর ছবির জন্য অবশ্যই নিজের কপিরাইট রাখুন।

প্যাকেজ সেটিংস:

এখনকার ওয়েডিং ফটোগ্রাফাররা তাদের বিভিন্ন প্যাকেজগুলোকে ক্লায়েন্টদের আগ্রহের মাত্রা অনুযায়ী সাজিয়ে থাকেন। কাবিন, এনগেজমেন্ট, গায়ে হলুদ, বিয়ে, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং, বৌভাত, পোস্ট-ওয়েডিং শ্যুট- একেক কনসেপ্টের খরচ একেক রকম।

আবার কোন ক্যামেরায় ছবি তোলা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে খরচ। এসব প্যাকেজের মধ্যে থাকবে ক্লায়েন্ট কোন ধরনের শ্যুট চান, ক’টা ছবি থাকবে, অ্যালবাম কেমন হবে, কত দিনের শ্যুট হবে ইত্যাদি।

সৃজনশীলতা, ফটোগ্রাফি দক্ষতা, এডিটিং, কমিউনিকেশন ও বিজনেস স্কিলে পারদর্শী ফটোগ্রাফারদের এই ক্যারিয়ারে ভালো করার সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি।

আপনার কমেন্ট লিখুন