আর্চি শিলার: স্বপ্ন যার পূরণ হল সিএ-র হাত ধরে

December 27, 2018 ...
image 3

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড। ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলি আর অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক টিম পেইন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের সাথে আছেন ম্যাচ রেফারি, ধারাভাষ্যকার, সেই সাথে আরো একজন।

ম্যাচ রেফারির সংকেত পেয়েই অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক টিম পেইন আকাশে ছুঁড়ে মারলেন টস কয়েন। সাথে সাথে রচিত হলো নতুন এক ইতিহাস। ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য লিপিবদ্ধ হলো বক্সিং ডে টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলের এই কীর্তি!

কোহলি আর পেইনের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলো আরেক অস্ট্রেলীয় খেলোয়াড়, যে আবার অস্ট্রেলিয়া দলের সহ-অধিনায়ক। আর তাকে ঘিরেই যত এলাহি কাণ্ড!

অস্ট্রেলিয়ার সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছেন দলে একদমই নতুন এক ক্রিকেটার, নাম আর্চি শিলার। কিন্তু এখানে ইতিহাস গড়ার কী আছে?

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, অস্ট্রেলিয়ান এই সহ-অধিনায়কের বয়স মাত্র সাত বছর! মাত্র সাত বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দলে সহ-অধিনায়ক হিসেবে জায়গা করে নিয়ে এই অনন্য কীর্তি গড়েছে এই ছোট্ট শিশু!

ভাবছো, তা কীভাবে সম্ভব? কত ডাকসাইটে খেলোয়াড়রা যেখানে অফ ফর্মের কারণে দল থেকে বাদ পড়ে যায়, সেখানে এই পুঁচকে দলে সুযোগ পেলো কেমন করে?

সেটা জানার জন্য একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে আমাদের!

গোড়ার কথা

‘মেইক আ উইশ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংস্থা। ১৯৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হয় সংস্থাটির। উদ্দেশ্যটা ছিল ভীষণ রকমের সুন্দর।

আমাদের আশেপাশে এমন অনেক শিশুই আছে, যারা মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত। হয়তো আর কিছুদিন, ব্যস! তারপরেই নিভে যাবে তাদের জীবনপ্রদীপ! এমন সব শিশুদের নিয়েই কাজ করে এই অলাভজনক সংস্থাটি।

শিশুদের পৃথিবীটা হয় বিচিত্র রঙে রাঙানো। কত শত স্বপ্ন বাসা বাঁধে তাদের মনে! এর মধ্যে কিছু স্বপ্ন হয়তো একেবারেই অলীক। আবার কিছু স্বপ্ন এমনও থাকে, যেগুলো পূরণ করা একটু কঠিন হলেও, একেবারে অসম্ভব নয়। সুযোগ পেলে হয়তো সেই স্বপ্ন কোনো একদিন বাস্তবায়ন করে ফেলতে পারতো এরা। কিন্তু আফসোস, এদের জীবন পঞ্জিকার পাতা গুলো যে একে একে ঝরে পড়ছে!

তাদের এসব স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য কাজ করে মেইক আ উইশ ফাউন্ডেশন। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া অনুদানের টাকায় চলে সংস্থাটির কার্যক্রম, শিশুদের স্বপ্ন পূরণের কাজ চলতে থাকে পুরোদমে। কেউ হয়তো হতে চায় পুলিশ অফিসার, কেউ হতে চায় সুপার ম্যান, কেউ হতে চায় শহরের মেয়র, কেউ আবার স্বপ্ন দেখে যুদ্ধে যাবার। ‘মেইক আ উইশ ফাউন্ডেশন’ যথাসাধ্য চেষ্টা করে এসব শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে।

তারপর?

এরকমই এক শিশু আর্চি শিলার। সদ্য ছয় পেরিয়ে সাত বছর বয়সে পা দেয়া এই শিশু জন্মের পর থেকেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। হৃৎকম্পন অনিয়মিত তার। মাত্র তিন মাস বয়সেই চিকিৎসকের ছুরি-কাঁচির নিচে ছোট্ট হৃৎপিণ্ড সঁপে দিতে হয়েছে তাকে। এখন পর্যন্ত মোট তেরোটা অপারেশন হয়ে গেছে তার। চিকিৎসকরা বলেছেন, আরো অনেকগুলো অপারেশন লাগতে পারে। তার বেঁচে থাকা নিয়েই আসলে সংশয়ে রয়েছেন চিকিৎসকরা। বেশিরভাগ দিনই তাকে কাটাতে হয় হাসপাতালের বিছানায়, দম বন্ধ করা পরিবেশে! একটা ছোট্ট শিশুর জন্য এই পরিবেশ তো দম বন্ধ করা বটেই!

কিন্তু ছোট্ট আর্চির যে দু’ চোখ ভরা স্বপ্ন, সেটার কী হবে? স্পিন বোলিং করে সে। বন্ধুদের সাথে সময়-সুযোগ পেলেই নেমে পড়ে ব্যাট, বল আর প্যাড নিয়ে। অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের অধিনায়ক হতে চায় আর্চি, খেলতে চায় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে। এই স্বপ্ন কেমন করে পূরণ করবে সে?

স্বপ্ন পূরণের সারথি

এগিয়ে আসলো ‘মেইক আ উইশ ফাউন্ডেশন’। তাদের কাজই তো এসব নিয়ে! যোগাযোগ করলো ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সাথে। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড সব দেখে-শুনে সিদ্ধান্ত নিলো আর্চির স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করার।

ঠিক এক মাস আগের ঘটনা, নভেম্বরের ২৬ তারিখ। আর্চি তখন মনমরা হয়ে জানালার পাশে বসে আছে। উদাস ভঙ্গিতে চেয়ে আছে নিঃসীম দিগন্তের ওপারে, কল্পনার ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছে স্বপ্নের রাজ্যে।

হঠাৎ মায়ের ডাকে পাশের ঘরে গেলো আর্চি। মা-বাবা দুজনেই বসে আছেন, হাত নেড়ে নেড়ে তাকে ডাকছেন।

আর্চি অবাক বিস্ময়ে দেখলো, অস্ট্রেলিয়ার কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার তাকে কল করেছেন, সুদূর আরব আমিরাত থেকে! প্রবল উৎসাহে কথা বলতে শুরু করলে আর্চি।

“হ্যালো, আর্চি! আমি জাস্টিন ল্যাঙ্গার বলছি।”

“হ্যালো, জাস্টিন!”

“তোমার জন্য খুব আনন্দের একটা সংবাদ আছে, আর্চি! তোমার বোলিং এর কিছু হাইলাইটস আমি দেখেছি, আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে তোমার স্টাইল। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভারতের বিপক্ষে বক্সিং ডে টেস্টের জন্য তোমাকে আমরা অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডে সুযোগ দেবো!”

এটা শোনার পর আর্চির প্রতিক্রিয়া কেমন হয়েছিলো, সেটা কল্পনা করাও একরকম অসম্ভব!

আর্চিকে দলে খেলানো হচ্ছে না স্বাভাবিক ভাবেই। কোচ প্রথমদিনেই তাকে বলে দিয়েছেন, “তোমাকে আমরা মূল একাদশে রাখবোই, এই নিশ্চয়তা দিতে পারছি না, আর্চি! তবে তুমি অনুশীলন চালিয়ে যাও নিয়মিত।”  অসি কোচের মুখ থেকে এমন কথা শুনে আর্চি ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে স্বাগতিকদের গলার কাটা হয়ে থাকা বর্তমানে বিশ্বসেরা ব্যাটসম্যান বিরাট কোহলির উইকেট এনে দিবেন জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে বলেছিলো, “আমাকে যদি সুযোগ দাও, আমি তোমাকে বিরাট কোহলির উইকেটটি এনে দিতে পারবো!”  সেই সাথে কোচের দেয়া পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে গেছে আর্চি।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্টেই দলের সাথে যোগ দেয় আর্চি। প্রথম দেখাতেই দলের সবাই আর্চিকে বরণ করে নেয়, ড্রেসিং রুমে নিজের হিরোদের সাথে সময় কাটানোর সুযোগ হয় আর্চির। আর্চির প্রিয় খেলোয়াড় নাথান লিয়ন, তার সাথেই ট্রেনিং সেশনে যোগ দেয় আর্চি। অন্য সব খেলোয়াড়দের মতোই সেও ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করে; স্ট্রেচিং, ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং নিয়ে! অনুশীলনের পাশাপাশি সবাইকে নানারকম উপদেশও দেয় এই ছোট্ট দেবশিশু; কীভাবে ভারতকে সহজে হারানো যায় তা নিয়ে! তার মতে, “মাছের বাজারেও এরকম অনেক ব্যাটসম্যান আছে। প্রতিপক্ষকে আউট করা কোনো ব্যাপারই না!”

অনুশীলন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও দলের সঙ্গে ছিলো আর্চি। প্রিয় ক্রিকেটার নাথান লিয়নের কাছ থেকে একটি কমপ্লিট ক্রিকেট সেটও উপহার পেয়েছে সে। উপহার পাওয়ার পর তার মুখের সেই অপরূপ হাসি যে কাউকে মুগ্ধ করবে নিঃসন্দেহে!

3y HZIJGZ9gGJa jUgkA5jxM2LywFoIW03WSd9SOvee7jNzLoKscFY7TvxyKIFVolMv4 WNmyI2mPD0BhmXdYb cArZIPeT6afrMKAlSzDCOkGYy

স্বপ্ন এবার সত্যি হলো!

মেলবোর্নে বক্সিং ডে টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলের ১৫ তম সদস্য হিসেবে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হয় আর্চি শিলার। মেলবোর্নে ম্যাচটি শুরুর আগে আর্চিকে পরিয়ে দেয়া হয় যেকোনো নবাগত ক্রিকেটারের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের বস্তুটি, ব্যাগি গ্রিন বা টেস্ট ক্যাপ!  পরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ার কোচ জাস্টিং ল্যাঙ্গার নিজে। এরপর নিয়মিত অধিনায়ক টিম পেইনের সাথে টস করতে মাঠের দিকে এগিয়ে যায় আর্চি।

টস সেশনেও আর্চি পেয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। ভারত টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিলে আর্চির কাছে ‘সতীর্থ’ এবং অধিনায়ক পেইনের জন্য কোনো মতামত আছে কি না জানতে চাওয়া হয়। তখন আর্চি জানায়, “ছক্কা মারো এবং উইকেট তুলে নাও।”

ভারতের টস জিতে ব্যাট করতে নামার সিদ্ধান্ত যে ভুল হয়নি, সেটি জানিয়েছে পেইন নিজেও। পেইন বলেন, “আর্চি টস জিতলে প্রথমে ব্যাট করার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। তবে আমি তাকে বলেছিলাম, আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই!”

আর্চিও বলছে, “আমার বাবা বলেছেন, এই পিচ রান তোলার জন্য বেশ ভালো।”

873HWAcgWHIgHqa laEdJUjoBA0JCWoGA8W MqBpOohPHe5fVY4tNjujZ2rpTpRLA4AL5YUDcKHvWeRf1Uzz6L 3EwbWZEtpmrmh0GMVuj1yRN5TOLS4hFHdl6kdudW7wQ5digI5

শেষ কথা

আর্চির স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। যথাযথ ভাবে হয়তো পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে প্রতীকী ভাবে হলেও স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার, ছোট্ট এই দেবশিশুর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে এক টুকরো স্বর্গীয় হাসি।

আর্চির অদম্য মনোবলের কাছে হার মেনেছে সমস্ত প্রতিকূলতা। আর্চির এই ঘটনাকে মনে হতে পারে এক অসুস্থ শিশুর প্রতি কিছু মহৎপ্রাণ লোকের মানবিকতার নিদর্শন, তবে একমাত্র বদান্যতার ফলেই এমনটা ঘটেছে, সেটা কি পুরোপুরি সঠিক? আর্চির হিমালয়সম মনোবল কি তাকে সাহায্য করে নি তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে?

অটুট মনোবলই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর হয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে যখন কেউ এগিয়ে যায়, তাকে থামানো অসম্ভব। নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করলে কেউ কখনো সফল না হয়ে থাকতে পারে না। কোনো কাজে ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, সেই কাজে সফল হওয়ার ইচ্ছার অনুপস্থিতি। তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে পারোনি? আসলে তুমি স্বপ্ন পূরণ করতেই চাও নি!

আর্চির স্বপ্নপূরণে এগিয়ে এসেছিলো এক দাতব্য সংস্থা। মানবিক মূল্যবোধের যথার্থ প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে।

আমাদের শিক্ষা গ্রহণের অন্যতম উদ্দেশ্য মূল্যবোধ অর্জনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হওয়া। যথার্থ মানবিক মূল্যবোধ অর্জন করতে পারলেই পৃথিবীটা ভীষণ সুন্দর হয়। শ্রদ্ধেয় ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার তাঁর এক উপন্যাসে বলেছিলেন, “একজন বিখ্যাত মানুষ দিয়ে কী হয়? কিচ্ছু হয় না। অথচ একশ জন খাঁটি মানুষ দিয়ে একটা দেশ পাল্টে দেয়া যায়।”

আমাদের এই ছোট্ট, ছবির মতো সুন্দর দেশটা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। এই দেশটাকে পাল্টে দেয়ার জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের মানুষ। একেবারে খাঁটি মানুষ, যাদের মধ্যে অণু পরিমাণ খাঁদ নেই। এরকম মানুষের একটু বেশিই দরকার এই দেশে।

আর মনুষ্যত্বের সাধনায় যদি আমরা আত্মনিয়োগ করি, আমাদের দেশটাও একদিন হয়ে উঠবে রূপকথার সেই স্বপ্নপুরী, গড়ে তোলা যাবে স্বপ্নের সোনার বাংলা।

তোমরা প্রত্যেকে হয়ে উঠবে সেই সোনার বাংলা গড়ার এক একজন কারিগর।

দক্ষ কারিগর!

তথ্যসূত্র:

https://archieswish.com.au/?utm_source=maw&utm_medium=homepage&utm_campaign=archie-2018


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন