বিটকয়েন: ধরাছোঁয়ার বাইরে যে মুদ্রা!

কিছু মানুষ রয়েছে যারা “চাকরি নেব না, চাকরি দেব” এই মন্ত্রে বিশ্বাসী। আমার বন্ধু তাকী তাদেরই একজন। উদ্যেক্তা হিসেবে কিছু করার জন্য সে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যাচ্ছে। তাই, সারাবিশ্বে বিটকয়েন নিয়ে তোলপাড় শুরু হবারও আগে থেকেই সে বিটকয়েন নিয়ে কিছু একটা করার জন্য খুব আগ্রহী ছিল। কিন্তু বিটকয়েন কী?-সেটা নিয়ে একটু পড়ালেখা করে সে বেশ বিচলিত হয়ে গেল!

বিটকয়েন নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং বিতর্কের কোন শেষ নেই! তাই, সে ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে শুরু করল। প্রথমেই সে বুঝতে চাইল যে, বিটকয়েন আসলে কী? ১ বিটকয়েন সমান কত টাকা? বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে? ইত্যাদি।

বিটকয়েন কি?

বিটকয়েন কী?-এ প্রশ্নটি অনেকের কাছেও শোনা যায়। তাকীর একই প্রশ্ন। সে ইন্টারনেট থেকে খুঁজে দেখল, বিটকয়েন কী। চলুন আমরাও জেনে নিই, বিটকয়েন কি সে সম্পর্কে। বিটকয়েন তৈরি করা হয় ২০০৯ সালে। সাতোশি নাকামোতো নামক এক ব্যক্তিকে বিটকয়েনের স্রষ্টা বলা হয়। কিন্তু তাকী আশ্চর্য হয়ে দেখল যে এখনো পর্যন্ত উনার পরিচয় রহস্যাবৃত! তাকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি! অবশ্য বিটকয়েন কি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে, এরপর ১ বিটকয়েন সমান কত টাকা লিখে সার্চ করলো।

বিটকয়েনের দাম দেখে তাকীর উৎসাহ আরও বেড়ে গেল! সে নেট ঘেঁটে দেখতে পেল যে একটি বিটকয়েনের মূল্য ২,১৬১,০২২.৫১ ডলার। তবে, বিটকয়েন এর দাম অনেক ওঠানামা করে। এরপর তাকী জানতে চাইল যে বিটকয়েন আসলে কীভাবে তৈরি হয়। বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে, সেটা জানতে গিয়ে সে দেখল যে বিটকয়েনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এই মুদ্রা কাগজে ছাপা হয় না কিংবা সোনা, রূপা অথবা তামা দিয়েও এই কয়েন বানানো হয় না। প্রকৃতপক্ষে বিটকয়েন একটি ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা দিয়ে শুধু অনলাইনেই বেচাকেনা করা যায়। বিটকয়েন আরও হরেক রকম দিক থেকে অনন্য।

কোন রাষ্ট্র বিটকয়েনের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ নয়, ফলশ্রুতিতে বিটকয়েনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোন সর্বস্বীকৃত সংস্থাও নেই। তার মানে হচ্ছে কখন, কতগুলো বিটকয়েন বানানো হবে, বাজারে বিদ্যমান বিটকয়েন কোথায় রয়েছে অথবা বিটকয়েন জালিয়াতি দেখার জন্য কেউ নেই। বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে সে সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার পর তাকীর মনে হল যে ঠিক কীভাবে বিটকয়েন বিনিময় হয়, বিটকয়েন বেচাকেনা শুরু করার আগে সেটাও জানা দরকার!

বিটকয়েন এর ইতিহাস

সাইবারপাঙ্ক নামের একটি জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হলো ১৯৮০’র দশকে। সরকার ও প্রশাসনবিরোধী একটা মনোভাব নিয়েই এটি তৈরি হয়। এদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, সরকারের বা প্রশাসনের হাতে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ থাকলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কেননা সরকার প্রায়শই সবকিছুতে নজরদারী করে থাকে। ফলে এই গোষ্ঠীটি অর্থ লেনদেনে ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য পরামর্শ দেয়। সেই পদ্ধতির উপর ভিত্তি করেই বর্তমানের এই বিটকয়েন। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পুরো বিশ্বেই অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। ওই সময়ই একটি থিসিস পেপার এর আবির্ভাব হয় যার শিরোনাম ছিলো

বিটকয়েন: আ পিয়ার-টু-পিয়ার ক্যাশ সিস্টেম। এই পেপার এর লেখক ছিলেন সাতোসি নাকামোতো ছন্দনামের এক ব্যক্তি। নাকামোতো তার এই ৯ পৃষ্ঠার পেপারে বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। কিভাবে কোন প্রকার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়া সরাসরি এই ডিজিটাল মূদ্রা একে অপরের কাছে আদান প্রদান করতে সক্ষম। নাকামোতো সাইবারপাঙ্কের সেই ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

বিটকয়েন বিনিময় পদ্ধতি

বিটকয়েনকে অনেক সময় পৃথিবীর সর্বপ্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিটকয়েন কিভাবে কাজ করে? বিটকয়েনের মত ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় হয় কম্পিউটারের পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। এই নেটওয়ার্কের মুখ্য উদ্দেশ্যই হচ্ছে ডাটা শেয়ার করা। এই ডাটা হরেক রকমের হতে পারে। যেমন: চলচিত্র, গান, ডকুমেন্ট প্রভৃতি। তাকী তখন কিছুটা দ্বিধায় ভুগতে শুরু করল। ডিজিটাল ডাটা নকল করা সম্ভব, তাহলে কি নকল বিটকয়েনও বানানো সম্ভব? কিন্তু তাকীর সেই দুশ্চিন্তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। বিটকয়েন ডিজিটাল মুদ্রা হওয়ার পরও যে কেউ চাইলেই নকল বিটকয়েন তৈরি করে জালিয়াতি করতে পারে না। তার মূল কারণ হচ্ছে কোন ভিডিও বা অডিও ফাইলের মত বিটকয়েন চাইলেই নকল করা যায় না।

আদতে বিটকয়েন ব্লকচেইন নামক একটি বিশাল বৈশ্বিক ডাটাবেজের একটি এন্ট্রি। ব্লকচেইন বিটকয়েনের সমস্ত বিনিময়ের হিসাব রাখে। এখন পর্যন্ত ব্লকচেইনে ১৪৮,৯৪৫ মেগাবাইট ডাটা জমা হয়েছে।

কিন্তু এই ব্লকচেইনের হিসাব কে রাখে? তাকী দেখেতে পেল যে যেহেতু বিটকয়েনের কোন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ নেই, সেহেতু ব্লকচেইনের হিসাব রাখার জন্যও কোন স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ নেই। বিটকয়েন অ্যাকাউন্ট (যাকে “ওয়ালেট” বলা হয়)-এর মধ্যে বিনিময়ের হিসাব রাখার কাজটি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা করে থাকেন। তাকী ঠিক করল সেও বিটকয়েন বিনিময়ের হিসাব রাখবে। সে প্রথমেই একটি বিশেষ ধরণের সমস্যা সমাধানকারী কম্পিউটার কিনে ফেলল। তারপর, নিজের বাসার ছাদে একটি শক্তিশালী সোলার প্যানেল বসিয়ে দিল। কারণ, এই কম্পিউটারগুলো ব্যবহার করতে প্রচুর বিদ্যুৎ শক্তি প্রয়োজন হয়। তাকীর পক্ষে বিদ্যুৎ বিল দিয়ে এই খরচ চালানো সম্ভব নয়। তার চেয়ে নিজস্ব সোলার প্যানেল দিয়ে সে অনেক অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে।

এবার তাকী কম্পিউটারে বসে হিসাব রাখা শুরু করল। বিটকয়েনের যখন বিনিময় হয়, তখন বিনিময়কারীরা সেই বিনিময়ের ঘোষণা দেন এবং তাকীর মত হিসাবরক্ষকেরা ব্লকচেইনে সেই তথ্যটি হালনাগাদ করে। অনেকে একই তথ্য হালনাগাদ করার ফলশ্রুতিতে দেখা যায় যে কেউ যদি জালিয়াতি করার চেষ্টা করে, সেই চেষ্টা ধরা পড়ে যায়। তথ্য হালনাগাদ করতে করতে তাকীর প্রথম ব্লক যখন পূরণ হয়ে গেল, তখন সে নতুন ব্লক ব্যবহার করা শুরু করল। এভাবে একের পর এক ব্লক ব্যবহার করে তাকী তথ্যের ব্লকচেইন বানাতে লাগল। তাকী ব্লকচেইন হালনাগাদ করার সময় বিটকয়েন বিনিময়ের তিনটি বিষয়কে লিপিবদ্ধ করে থাকে। যথা:

  1. প্রেরকের ওয়ালেট নম্বর
  2. প্রাপকের ওয়ালেট নম্বর
  3. কয়টি বিটকয়েন পাঠানো হচ্ছে

কিন্তু এত মানুষের কাছে অ্যাকাউন্ট নম্বরের তথ্য থাকা তাকীর কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হল। যে কেউ চাইলেই আরেকজনের বিটকয়েন ওয়ালেট থেকে নিজের ওয়ালেটে বিটকয়েন পাঠিয়ে দিতে পারে। একদিন টিএসসিতে চা খেতে খেতে এই ঝুঁকির কথা সে নাহিয়ান ভাইকে বলল। তখন নাহিয়ান ভাই ওকে বললেন, “এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্যই ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করা হয় এবং এজন্যই বিটকয়েনকে একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি বলা হয়।” তাকী: “কিন্তু ভাই, এই ক্রিপ্টোগ্রাফি কীভাবে কাজ করে?” নাহিয়ান ভাই: “বিটকয়েনের ওয়ালেটের ক্ষেত্রে দুইটি চাবি/কী ব্যবহার করা হয়। একটি হচ্ছে প্রাইভেট কী এবং অপরটি হচ্ছে পাবলিক কী। এই চাবি দুইটি অনন্য এবং এর দ্বারাই বিটকয়েনের বিনিময়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। ধরা যাক, আমি বিটকয়েনের ডাটা পাঠাব, প্রাইভেট কী দিয়ে আমি সেই ডাটা চিহ্নিত করে দিব। 2 2 পরবর্তীতে আমার পাবলিক কী দিয়ে ডাটাটি যাচাই করা হয়, যদি প্রাইভেট কীর চিহ্ন এবং পাবলিক কীর চিহ্ন মিলে যায়, তাহলে সবাই বুঝতে পারবে যে ডাটাটি আসলেই আমি পাঠিয়েছি। এই দুইটি চাবির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে ক্রেডিট কার্ড নাম্বার অথবা স্বাক্ষরের মত এটি নকল করা যায় না।” তাকী: “বাহ! যাক, দুশ্চিন্তা মুক্ত হলাম!” নাহিয়ান ভাই: “হ্যাঁ, বিটকয়েন চুরি করা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। বিটকয়েনের তুমুল জনপ্রিয়তার পেছনে এটাও একটা কারণ।”

বিটকয়েন তৈরির উপায়

তাকীর মত হিসাবরক্ষকেরা বিটকয়েনের ব্লকচেইনের হিসাব রাখার কাজটি অনেক সময়, অর্থ এবং শ্রম দিয়ে কাজটা করে। এর পেছনে তাদের সবারই একটি বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে। ব্লকচেইনে নতুন একটি ব্লক যোগ করার জন্য একজন হিসাবরক্ষক ১২.৫ টি বিটকয়েন লাভ করেন। যারা এই কাজটি করেন, তাদেরকে মাইনার (Bitcoin Miner) বলা হয়। কারণ, তারা স্বর্ণখনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলনের মতই কম্পিউটারে বসে বিটকয়েন উত্তোলন করেন। কেবল মাইনারদের পুরস্কৃত করতেই বিটকয়েন তৈরি করা হয়।

বিটকয়েন এর সুবিধা

  • বিটকয়েন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উন্মুক্ত আর্থিক ব্যবস্থা।
  • ২৪ ঘন্টাই লেনদেন করতে পারবেন।
  • বিটকয়েনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর দ্রুত ও সস্তা হতে পারে।
  • বিটকয়েন হল এমন সম্পদ যা আপনার কাছ থেকে জোর করে জব্দ করা যাবে না (যদি সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করা হয়)।
  • বিটকয়েন একটি ছদ্মনামে পরিচালিত ব্যবস্থা এবং যে কেউ যাচাই বা ক্রেডিট ট্রেস ছাড়াই ইন্টারনেটে তাদের ওয়ালেট খুলতে পারে।
  • এটি বিশেষত দুর্বল ব্যাঙ্কযুক্ত অঞ্চল এবং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে উপকারী।
  • আপনি যেভাবে টাকা খরচ করেন বিটকয়েন সেভাবেই ব্যয় করতে পারবেন।
  • বিটকয়েন সহজে বহনযোগ্য সম্পদ।
  • অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির তুলনায়, বিটকয়েনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি, জনপ্রিয়, লিউকুইড, সবচেয়ে উন্নত ইকোসিস্টেম ও সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা আছে।
  • বিটকয়েন কোন সরকার, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাজনীতিবিদদের উপর নির্ভর করে না।
  • অর্থের একচেটিয়া দখলমুক্ত।

বিটকয়েন এর অসুবিধা

  • ইন্টারনেট প্রাপ্যতার উপর নির্ভরশীল হওয়ায় অফলাইনে কাজ করা যায় না।
  • যেহেতু বিটকয়েন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, লেনদেনের গতি এবং বিটকয়েন মাইনিং দক্ষতা এবং নেটওয়ার্ক ট্রাফিকের উপর নির্ভর করে সেবার মানে ত্রুটি হতে পারে।
  • সমস্ত দোকান বা পরিষেবা প্রদানকারী বিটকয়েন গ্রহণ করে না। তবে সংখ্যা বাড়ছে।
  • বিটকয়েন লেনদেন অপরিবর্তনীয়। অর্থাৎ একবার আপনার মানিব্যাগ থেকে টাকা বের হয়ে গেলে, এটি ফেরত পাওয়ার কোন উপায় নেই।
  • বাংলাদেশের মত দেশে সরকারি ও আইনত জটিলতা আছে।
  • বাংলাদেশের মত কম রিসোর্সের দেশে বিটকয়েন মাইনিং করা খুবই কষ্টকর।

বিটকয়েনের দুষ্প্রাপ্যতা

তাকী প্রথম ব্লক যোগ করে ১২.৫ টি বিটকয়েন পেয়ে খুব খুশি হয়ে গেল। কিন্তু তার খুশি বেশিক্ষণ বজায় থাকল না। কারণ, প্রথম দিকে একটি ব্লক ব্লকচেইনে যোগ করার জন্য ৫০ টি বিটকয়েন দেয়া হত। কিন্তু প্রতি ২১০,০০০ ব্লক ব্লকচেইনে যোগ হলে পুরস্কৃত বিটকয়েনের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। তাই, পরবর্তীতে ৫০ থেকে ২৫ টি বিটকয়েন এবং বর্তমানে ১২.৫ টি বিটকয়েন পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে পুরস্কৃত বিটকয়েনের সংখ্যা এভাবেই আরো কমতে থাকবে। বিটকয়েনের নীলনকশা এমনভাবে করা হয়েছে যার ফলে বিটকয়েনের যোগান হবে সুনির্দিষ্ট এবং সীমিত।

বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২১৪০ সালে সর্বশেষ বিটকয়েনটির সৃষ্টি হবে। এই সীমিত এবং সুনির্দিষ্ট যোগানই বিটকয়েনকে করে তুলেছে এত মূল্যবান। ভবিষ্যতে বিটকয়েনের মূল্য কেমন হবে, কতদিন এই উচ্চহার  বজায় থাকবে, সেটা নিয়ে তুমুল মতবিরোধ রয়েছে।

বিটকয়েন মাইনিং
বিটকয়েন মাইনিং
Source: pixabay.com

বিটকয়েন ও প্রচলিত অর্থের পার্থক্য

  1. বিটকয়েনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে এই মুদ্রা কাগজে ছাপা হয় না, সোনা, রূপা অথবা তামা দিয়েও এই কয়েন বানানো হয় না।
  2. প্রকৃতপক্ষে বিটকয়েন একটি ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি যা দিয়ে শুধু অনলাইনেই বেচাকেনা করা যায়। কিন্তু প্রচলিত মুদ্রা দিয়ে অফলাইন ট্রানজেকশন করা যায়।
  3. কোন রাষ্ট্র বিটকয়েনের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ নয়, ফলশ্রুতিতে বিটকয়েনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোন সর্বস্বীকৃত সংস্থাও নেই। কিন্তু প্রচলিত অর্থের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে থাকে।
  4. কতগুলো বিটকয়েন বানানো হবে, বাজারে বিদ্যমান বিটকয়েন কোথায় রয়েছে তা দেখার উপায় নেই। কিন্তু প্রচলিত অর্থ সরকার চাইলেই নজরে রাখতে পারে।

বিটকয়েন এর দাম

১ বিটকয়েন সমান কত টাকা?

বিটকয়েন এর দাম টাকায় দেয়া হল:

বিটকয়েন টাকা
১ বিটকয়েন ২,১৬১,০২২.৫২
২ বিটকয়েন ৪,৩২২,০৪৫.০৪
৩ বিটকয়েন ৬,৪৮৩,০৬৭.৫৬

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২৩

১ বিটকয়েন সমান কত ডলার?

বিটকয়েন এর দাম ডলারে দেয়া হলো:

বিটকয়েন ডলার
১ বিটকয়েন ২০,৮৪৫.১০
২ বিটকয়েন ৪১,৬৯০.২০
৩ বিটকয়েন ৬২,৫৩৫.৩০

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২৩

বিটকয়েন কি বাংলাদেশে বৈধ ২০২৩?

বাংলাদেশে বিটকয়েন এখনও বৈধ না। তবে শীঘ্রই সেটা হবে বলে আশা করাই যায়। আমাদের পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধতা পেয়েছে। তাই আশা করাই যায়, বাংলাদেশও সে পটহে হাঁটবে। এছাড়াও প্রশাসন থেকে কিছুটা ইতিবাচক কথাও শোনা যাচ্ছে এ নিয়ে। যেহেতু পেপালের মত জনপ্রিয় একটি প্ল্যাটফর্ম আমাদের দেশে নেই, সেহেতু বিটকয়েন এলে খুব দ্রুতই তা এ দেশের অর্থনৈতিক কাজে গতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিটকয়েন -এর ভবিষ্যত

এখন তাকীর মনে জমেছে হাজারও প্রশ্ন। সেগুলোর জবাব তবে জেনে নেয়া যাক, বড় চাচার থেকে।

বিটকয়েন কি শুধুই নতুন বিত্তশালী শ্রেণির সৃষ্টি করছে?

না, না, তা কেন হবে। বিটকয়েন এমন একটি মুদ্রা, যার লেনদেনে কোন অর্থ মধ্যস্থতাকারী কোন সংস্থাকে দিতে হয় না। আগে অনলাইনে অর্থের লেনদেন করতে গেলে কিছু অর্থ সবসময় পেপ্যালের মত সংগঠন পেত। এখন ব্যাঙ্ক ছাড়াও অর্থের লেনদেন সম্ভব। আমরা এমন এক যুগে বসবাস করি, যখন উবারের মত গাড়ির কোম্পানির নিজস্ব কোন গাড়ি নেই, কিন্তু তবুও কোম্পানিটা মানুষকে পরিবহন সেবা দিয়ে চলেছে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে এরকম বিকেন্দ্রীভূত একটি মুদ্রার সৃষ্টি সময়ের দাবী ছিল।

যদি মানুষ নিজেদের মাঝে অর্থের লেনদেন করতে পারে, তাহলে কি ব্যাঙ্কের আর দরকার থাকবে?

এজন্যই তো বিটকয়েন একটা বিপ্লব সৃষ্টিকারী মাধ্যম। ১ বিটকয়েন সমান কত টাকা সেটা তো কতটা বেশি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনও হতে পারে যে বিটকয়েন ব্যাঙ্কের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে ফেলতে সক্ষম হবে। বর্তমানে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর আধিপত্য শুধু অস্ত্র দিয়েই নির্ধারিত হয় না। এই আধিপত্য নির্ধারিত হয় তাদের মুদ্রার শক্তি দিয়েও। যদি সারা বিশ্বে একটি বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা দিয়ে লেনদেন হয়, তাহলে এই শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্য বিস্তার করা কঠিন হবে।

তাছাড়াও বিটকয়েন যেহেতু কোন নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা নয়, কোন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বিটকয়েনের মূল্য নির্ধারণে কোন প্রভাব ফেলবে না।

বিটকয়েন কি আসলেই টিকে থাকবে?

বিটকয়েন আসলে টিকে থাকবে কি না, সেটা বলা মুশকিল। তবে যেকোন মুদ্রার মূল্যই নির্ধারিত হয়, সেই মুদ্রার ওপর মানুষের কতটুকু আস্থা আছে, সেটার ওপর ভিত্তি করে। এখন বিটকয়েন বিভিন্ন জায়গায় মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হচ্ছে। গির্জায় দান করা থেকে শুরু করে ল্যাম্বোরগিনি কেনা, সব কাজই এখন বিটকয়েন দিয়ে করা যাচ্ছে। তার মানে আস্তে আস্তে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

বিটকয়েন -এ বাবল হতে পারে?

হতেই পারে। বিটকয়েনের পেছনে যে ব্লকচেইন প্রযুক্তি রয়েছে, সেই প্রযুক্তির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের পৃথিবীকে বদলে দেবার। বিটকয়েন শুধুই একটি মুদ্রা। বিটকয়েনের মত আরও অনেক মুদ্রা ইতোমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ব্লকচেইন প্রযুক্তি অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বিপ্লব ঘটাবে. শেষ পর্যন্ত বিটকয়েন টিকবে নাকি অন্য কোন মুদ্রা টিকবে, সেটা বলা কঠিন।

সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের ক্ষেত্রে যেমন ফেসবুকের আগে মাইস্পেসের মত অনেক ওয়েবসাইট ছিল। শেষ পর্যন্ত সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের কনসেপ্ট টিকেছে, শুধু মাধ্যমের ভিন্নতা এসেছে। বিটকয়েনের ক্ষেত্রেও এরকম কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু ব্লকচেইন প্রযুক্তি অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বিপ্লব ঘটাবে।

বিটকয়েন মাইনিং করা কি ঠিক?

বিটকয়েন মাইনিং করার আগে জানা দরকার, বিটকয়েনের বাবল হবার মূল কারণ হচ্ছে হুজুগে মানুষ। তারা না বুঝে শুনেই বিটকয়েন কেনা শুরু করেছে। কিন্তু যারা বিষয়গুলো বোঝে, তারা ঠিকই বিটকয়েন মাইনিং করে লাভ করতে পারবে।

বিটকয়েন -এ বিনিয়োগ করা কি ঠিক হবে?

বিটকয়েন এখনো কেউই পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। এজন্য বিটকয়েনে বিনিয়োগ করার সময় এমনভাবে বিনিয়োগ করতে হবে যেন সেই টাকা হারালেও সমস্যা না থাকে। নিজের সর্বস্ব দিয়ে বিনিয়োগ করা যাবে না। যা করার বুঝে শুনে করতে হবে। তোর সাথে তো আমি আছি। আমি তোকে সাহায্য করবো। যেহেতু এখনো বাংলাদেশে বিটকয়েন ব্যবহার করা সম্ভব না, তাই আপাতত আমরা অপেক্ষা করবো।

বিটকয়েন: লাভ না লোকসান?

তাকী তার বড় চাচার বাসায় এসেছে। বড় চাচার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে সে বসে আছে। একটা প্রকাণ্ড ঘরভর্তি বই, ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল আর দুটি চেয়ার। তাকী এবং তার চাচা মুখোমুখি বসে আছে। বিটকয়েন কি এসব নিয়ে তাকীর এখন প্রাথমিক ধারণা রয়েছে, কিন্তু এরপরও সে নিশ্চিত নয় যে তার কী করা উচিত। এজন্যই চাচার কাছে এসেছে।

তাকী বললো, “চাচা, আমি বিটকয়েন মাইনিং করা শুরু করেছি। কিন্তু এই কাজটা আমার কতদিন করা উচিত, কিভাবে করা উচিত কিংবা আদৌ করা উচিত কি না, আমি আসলে নিশ্চিত নই। এজন্যই তোমার শরণাপন্ন হলাম।”

এখন তাকীর সে প্রশ্নগুলোর উত্তর নিয়েই এই সেকশন।

বাংলাদেশে বিটকয়েনের ব্যবহার নিষিদ্ধ কেন?

বড় চাচা: “বিটকয়েনের মত বিকেন্দ্রীভূত একটি মুদ্রার বিষয়ে সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে যে তা জঙ্গিবাদ, অর্থপাচারের মত বে-আইনি কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। এজন্যই মূলত নিষিদ্ধ করা।” তাকী: “তাহলে বিটকয়েন কি এত এগিয়ে যাওয়া প্রযুক্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার সম্ভব হবে না?” বড় চাচা: “ভবিষ্যতে হয়তো সম্ভব হবে। আগামী জুনের মাঝে বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলাদেশে বিটকয়েন কিভাবে কাজ করবে, তা ঠিক করার জন্য একটি কমিটি তৈরি করবে। বিটকয়েন এখন একদম নতুন। তাই, সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগবে।”

বিটকয়েন এর দাম এতো বেশি হওয়ার কারণ কী?

বড় চাচা: “বিটকয়েনের মত কোন কিছুর আবির্ভাব যে আমার জীবদ্দশায় দেখতে পাবো, তা কখনোই ভাবিনি! তবে এরকম হঠাৎ করে কোন মুদ্রা/পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এটাকে বলা হয় “বাবল”। এরকম “বাবল” এর আগেও দেখা গেছে।”

তাকী: “চাচা, এই বাবল আসলে কেন হয়?”

বড় চাচা: “বাবলের বিষয়টা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাবলের উদাহরণ দিয়ে বুঝাই। বিটকয়েন বাবলের আগে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাবল ছিল নেদারল্যান্ডের সপ্তদশ শতাব্দীর “টিউলিপ ম্যানিয়া”।

একসময় এই টিউলিপের দাম ছিল একজন দক্ষ কারিগরের দশ বছরের মজুরির সমান। এই বাবল তৈরির মূল কারণ ছিল মানুষের লোভ এবং বঞ্চিত হবার ভয়। সকলে মনে করছিল যে এখন যদি টিউলিপের মালিকানা লাভ না করি, তাহলে আমিও পিছিয়ে যাবো এবং সহজেই দ্রুত লাভ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হব।

এভাবে যখন সবাই টিউলিপের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল, তখন টিউলিপের দাম বহুগুণ বেড়ে গেল। কিন্তু যখন এক পর্যায়ে সবাই এটা বেচে দিতে শুরু করল, তখন দাম অনেক কমে গিয়েছিল। এই দাম কমে যাওয়াকে বাবল ফেটে যাওয়া বলে। দাম কমে যাওয়ার ফলে বহু মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং নেদারল্যান্ডের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছিল।”

তাকী: “বিটকয়েন কি এই বাবল ঘটাতে যাচ্ছে?”

বড় চাচা: “ঘটাতেই পারে। বিটকয়েনের উত্থানের কাহিনীর সাথে টিউলিপ ম্যানিয়ার অনেক মিল রয়েছে। বিটকয়েনের ক্ষেত্রেও বঞ্চিত হবার ভয়ে নতুন বিনিয়োগকারীরা প্রতিনিয়ত দলে দলে যোগ দিচ্ছে। এজন্যই বিটকয়েনকে একবিংশ শতাব্দীর ডিজিটাল টিউলিপ বলা হয়। যতদিন বিটকয়েন এর দাম বাড়তে থাকবে, ততদিন অনেকেই লাভ করবে!

সমালোচকেরা বলছেন যে বিটকয়েনের মূল্য কোন কারণ ছাড়াই বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে গত বছর বহু মানুষ বিটকয়েন কেনা শুরু করেন। তারা হুজুগে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই এই কাজটি করছেন। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ দিক হচ্ছে, যেকোন সময় বিটকয়েন এর দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

বিটকয়েন এর দাম
বিটকয়েন এর দাম
Source: pixabay.com

বিটকয়েনের দাম কমে গেলে কি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

বড় চাচা: “যারা শেয়ার মার্কেটের ঝানু ব্যবসায়ী, তারা সাধারণত কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তারা ঠিকই নিজেদের লাভ বুঝে নেয়। আমেরিকায় যখন ২০০৭-০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিল, তখন সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বড় বড় শেয়ার ব্যবসায়ীরা বরং বাজে বাজে শেয়ার সাধারণ মানুষের কাছে উচ্চমূল্যে বেচে দিয়ে মন্দার সৃষ্টি করেছিল।”

তাকী: “বিটকয়েন কি এমন কিছুই করবে?”

বড় চাচা: “প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এখন সবাই বিটকয়েন কিনতে চাইছে। কিন্তু কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে বিটকয়েন মার্কেটের জটিলতা বোঝা কঠিন। যতদিন বিটকয়েন এর দাম বাড়তে থাকবে, ততদিন অনেকেই লাভ করবে। কিন্তু যখন দাম কমতে শুরু করবে, তখন দক্ষ শেয়ার মার্কেট বিশেষজ্ঞ ছাড়া সবাই খুব ঝামেলার মাঝে পড়ে যাবে।”

তাকী: “তাহলে বিটকয়েন কি মাইনিং করা বন্ধ করে দিব?”

বড় চাচা: “হুম, কঠিন প্রশ্ন। না, এখনি বন্ধ করিস না।”

তাকী: “কেন?”

বড় চাচা: “পৃথিবীর সব জিনিসেরই ভালো, খারাপ দুটি দিকই রয়েছে। বিটকয়েনের যেমন অনেক ঝুঁকি আছে, তেমন অনেক ভালো দিকও আছে। সেই দিকগুলো নিয়ে তোর সাথে কালকে কথা বলবো। এখন তুই আসতে পারিস। সন্ধ্যা সাতটা বাজে, এখন আমার বই পড়বার সময়।”

তাকী: “ঠিক আছে, চাচা।”

শেষ কথা

নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিটকয়েন অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে দিয়েছে।


আমাদের কোর্সগুলোতে ভর্তি হতে ক্লিক করুন:

  1. ঘরে বসে Spoken English Course (by Munzereen Shahid)
  2. Microsoft Word Course (by Sadman Sadik)
  3. Microsoft Excel Premium Course (by Abtahi Iptesam)
  4. Microsoft PowerPoint Course (by Sadman Sadik)
  5. Microsoft Office 3 in 1 Bundle

  1. Web Design Course (by Fahim Murshed)
  2. Communication Masterclass Course (by Tahsan Khan)
  3. Facebook Marketing Course (by Ayman Sadiq and Sadman Sadik)
  4. Data Entry দিয়ে Freelancing Course (by Joyeta Banerjee)
  5. SEO Course for Beginners (by Md Faruk Khan)

১০ মিনিট স্কুলের ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com


আপনার কমেন্ট লিখুন