ভিন্নধারায় চিন্তা: একটি এয়ারপোর্টের গল্প


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

একটা এয়ারপোর্টের গল্প বলা যাক। মনে করো, একটা দেশের সবথেকে বড় এয়ারপোর্ট এটা। স্বভাবতই সবাই চেষ্টা করে এয়ারপোর্টটা যাতে ভালো থাকে, বিমানের যাত্রীরা যাতে সুখে-স্বাচ্ছ্যন্দে তাদের ফ্লাইট শেষ করতে পারে। এয়ারপোর্টের দায়িত্বে আছেন রবার্ট ফোর্ড। ছিমছাম ভালোমানুষ, এয়ারপোর্টে তেমন কোন সমস্যা হতেই দেন না!

মিস্টার ফোর্ডের মত অমায়িক মানুষকেও অবশ্য ভাবনায় পড়তে হয়। অদ্ভুত এক ভাবনা। এয়ারপোর্টের সব যাত্রীদের নিয়ে একদিন একটা জরিপ করা হয়। সেখানে তাদের এয়ারপোর্টের সমস্যাগুলো লিখতে বলা হয়। দেখা যায় যে, এয়ারপোর্টের সমস্যাগুলোর মধ্যে এক নম্বরে আছে লাগেজের সমস্যা। যাত্রীদের লাগেজ আসতে দেরী হয়, এই দেরী আর সহ্য হয় না যাত্রীদের।

মিস্টার ফোর্ড সমস্যা রাখতেই চান না। তিনি দ্রুত হিসাব করতে বসেন, এয়ারপোর্টের লাগেজ ক্লিয়ার করতে আসলে কতোটা সময় লাগে! পুরো হিসাব শেষে বের হয়, এয়ারপোর্টের লাগেজ ক্লিয়ারেন্সে প্রায় নয় মিনিটের মতো লাগে। এই সময়টা হয়তো খুব বেশি না, কিন্তু এতেই যাত্রীদের জীবন দুর্বিষহ  হয়ে ওঠে।

ভদ্রলোক কাজে লেগে পড়েন। সবাইকে জড়ো করে কাজ শুরু করে দেন। খুঁটিনাটি সব ভুল ধরা পড়ে, সেগুলো দ্রুতই সামলানো হয়। এক দুইজন অকম্মাকে বের করে দেন ফোর্ড, করিতকর্মা সব মানুষকে নিয়ে আসেন তাদের জায়গায়।

প্রচুর পরিশ্রমের পরে শেষমেষ কাজগুলো শেষ হয়।

পরদিন। ফোর্ড সাহেব আবারও হিসেবের খাতা নিয়ে বসেন। এবার তিনি বেশ আগ্রহী, নিশ্চিত থাকেন যে এইবার লাগেজ ক্লিয়ারেন্সের সময়টা বেশি লাগবেই না!

সময় বেশি লাগেও না। নয় মিনিট কমে ছয় মিনিটে এসে থামে। ফোর্ড তো মহাখুশি, এইবার নিশ্চয়ই যাত্রীরা আর কোন বিষয়ে কোন কমপ্লেন করতে পারবে না! যথারীতি নতুন নতুন ফ্লাইট আসে, যাত্রীরা মনে হয় এই দ্রুততার বিষয়টা খেয়ালও করে- অন্তত রবার্ট ফোর্ড তাই ভাবেন।

আবারো সময় আসে যাত্রীদের জরিপ করার, ফোর্ড এবং তার দল অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে- এবার দেখা যাক কী বলে যাত্রীরা, কী বলার আছে তাদের! 

সমস্যাগুলো পড়া শুরু করেন তিনি। বিধিবাম, ছয় মিনিটে কমিয়ে আনার পরেও সব সমস্যা সেই লাগেজ ক্লিয়ারেন্সের সময় নিয়েই! মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে তার। ছয় মিনিটের কমে তো লাগেজ ক্লিয়ার করা সম্ভবই না! তাহলে উপায়?

বিভিন্ন কর্মী বিভিন্ন উপায় নিয়ে আসে।

কেউ বলে, “যাত্রীদের বসার জন্যে আলাদা ভি আই পি রুম করে দেই আমরা, ওরা এসে সেখানে রেস্ট করবে এই ছয় মিনিট”

কেউ বলে, “যাত্রীদের বলে দেই আমরা, তারা পারলে ৬ মিনিটের কমে লাগেজ ক্লিয়ার করে দেখাক!”

অনেকে আরো এক কাঠি সরেস, তারা বলে, “যাত্রীদের আমরা বলবো জরিপে ভালো ভালো কথা বললে পরের ফ্লাইটে ডিসকাউন্ট পাবে!”

এত শত আইডিয়া, কোনটাই ফোর্ড সাহেবের মনে ধরে না। অবশেষে এয়ারপোর্টের প্রবীণ ক্লিনার আসেন। তিনিও একটা আইডিয়া দেবেন।

ক্লিনারের আইডিয়া শুনে সবাই হাসতে হাসতে শেষ। সবার ভাবটা এমন, “হাতি ঘোড়া গেল তল, ক্লিনার বলে কতো জল!” বাকিরা একবাক্যে বাতিল করে দিল এই আইডিয়াটা।

একজন করলেন না। নাম তার রবার্ট ফোর্ড। তিনি ভাবলেন, ব্যতিক্রমধর্মী যখন, একটু কাজে লাগিয়েই দেখা যাক না হয়?

আইডিয়া কাজে লাগানো হলো। অন্য সব আইডিয়া যেখানে ফেল মারলো, কোন উপকারে আসলো না, এই আইডিয়া সেখানে একেবারে ব্লকবাস্টার হিট হলো। পরের জরিপে যাত্রীদের আর কোন কমপ্লেনই থাকলো না!

কী ছিলো সেই যুগান্তকারী আইডিয়া? আন্দাজ করতে পারো? পারার কথা না। ক্লিনারের আইডিয়া খুবই সাধারণ। যেহেতু মানুষের লাগেজের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকতেই বেশি সমস্যা, তাহলে এয়ারপোর্টের ল্যান্ডিং থেকে লাগেজ পর্যন্ত দূরত্বটা বাড়িয়ে দেয়া হয় না কেন? ঘুরপথের রাস্তা হোক, এয়ারপোর্টের শুরুতেই এক দুইটা ক্যাফে বা ফাস্টফুডের দোকান খুলে দিয়েই হোক- এমন একটা ব্যবস্থা করলেই তো হয় যাতে যাত্রীদের লাগেজের কাছে আসতেই ছয় মিনিট লেগে যায়? ততক্ষণে তো সবার লাগেজই রেডি থাকবে!

চলে এলো Interactive Video!
শুনে কিন্তু প্রথম দফায় মনে হয় আত্মঘাতী পরিকল্পনা। মনে হয়, এমনিতেই বিরক্ত যাত্রীরা এবার আরো বেশি বিরক্ত হবে এই হাঁটাহাঁটিতে। কিন্তু খেয়াল করে দেখা গেলো, যাত্রীরা উলটো ঠিক সময়ে তাদের লাগেজ পেয়ে যারপরনাই খুশি! রবার্ট ফোর্ড আরো খুশি, মানুষটার ঝামেলা একেবারেই ভালো লাগে না!

এই গল্পটা থেকে একটা খুব কার্যকর শিক্ষা নিতে পারি আমরা সবাই। আমাদের জীবনেও অনেকরকম সমস্যা আসে, আমরা সেগুলোর সমাধানের চিন্তা করি সাধারণভাবে- কী করলে কী হবে এভাবে। এসবের পাশাপাশি এয়ারপোর্টের ক্লিনারের মতো যদি একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করতাম আমরা, তাহলে কিন্তু সমস্যাগুলোর সমাধান অনেক সহজেই করে ফেলতে পারতাম!

Thinking outside the box বা এই ভিন্নধারার চিন্তা করার বিষয়টা মাথায় রেখে এরপরে যেকোন সমস্যার মোকাবেলা করবে, দেখবে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে নিমেষেই!


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.