অ্যানিমেশন শিখতে যা যা দরকার

February 8, 2022 ...
আপনি কি আঁকা-আঁকি করতে ভালোবাসেন? তাহলে এই ব্লগটা আপনার জন্য! যারা আঁকা-আঁকি করেন, তাদের কাছে অ্যানিমেশন খুবই আকর্ষণীয় একটা বিষয়। কিন্তু অ্যানিমেশন বলতে আমরা বুঝি ওয়াল্ট ডিজনি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ছবি হাতে এঁকে একটা সিনের এক ভগ্নাংশ তৈরি করছেন। আসলেই অ্যানিমেশন কি এতটা কঠিন কোনো কাজ?

অ্যানিমেশন কী: 

অ্যানিমেশন বলতে আমরা অনেকেই শুধু কার্টুনই বুঝে থাকি। অ্যানিমেশন ও কার্টুন দুটো একই জিনিস, আবার আলাদাও! অ্যানিমেশন হচ্ছে কার্টুন তৈরির প্রক্রিয়া আর কার্টুন হচ্ছে অ্যানিমেশন দিয়ে তৈরি প্রোডাক্ট! কার্টুন সাধারণত টুডি ও হাতে আঁকা হয়ে থাকে, অনেকক্ষেত্রে স্টিল ছবি বা ক্যারিকেচারও ব্যবহার করা হয়। যেমন: মীনা কার্টুন, ঠাকুরমার ঝুলি, টম অ্যান্ড জেরি, ব্যাটম্যান ইত্যাদি। আর অ্যানিমেশনের কাজ সাধারণত ডিজিটালি করা হয় এবং এটার প্রক্রিয়াটা একটু জটিল। টয় স্টোরি থেকে শুরু করে ফ্রোজেন, স্পিরিটেড অ্যাওয়ে, কুংফু পান্ডা হালের মিনিয়ন; একটু হলেও অ্যানিমেশন দুনিয়ার খোঁজ রাখেন, অথচ এদের চেনেন না, এমন মানুষ বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

অ্যানিমেশনের প্রকারভেদ:

১. 3-D Animation:

থ্রিডি, যাকে সিজিআই (কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজরি) নামেও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে ফিচার ফিল্ম, লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্র ও ভিডিও গেমগুলোর জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যানিমেশনের ধরন হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতিতে ক্যারেক্টারের মুভমেন্ট থেকে শুরু করে কম্পোজিশন, টেকনিক্যাল স্কিল সবই খুব সুন্দর ও নিখুঁত ভাবে উপস্থাপন করা হয়। আপনি খুব সহজেই অ্যানিমেশনের চরিত্র ও তার যেকোনো অংশকে যেকোনো দিকে ইচ্ছেমতো নাড়াচাড়া করাতে পারবেন।

২. 2D Hand-Drawn Animation:

প্রথম ধরনের টুডি অ্যানিমেশনকে বলা হয় হ্যান্ড-ড্রন অ্যানিমেশন। এটি হলো ক্লাসিক হাতে আঁকা অ্যানিমেশন যার সাথে আপনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এখানে অ্যানিমেটরকে প্রতিটা ফ্রেম হাতে আঁকতে হয় আর প্রতি সেকেন্ডে ১২টি ফ্রেম ব্যবহার করা হয়।

৩. 2D Vector Animation:

বাচ্চাদের কাছে এই কার্টুন অ্যানিমেশন খুবই জনপ্রিয়। এর জন্য খুব সহজেই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্যরেক্টারের প্রতিটা শারীরিক অংশ ইচ্ছামতো নাড়ানো যায়। বেসিক ধারণা দিয়েই আপনি চমৎকার ভেক্টর অ্যানিমেশন তৈরি করতে পারবেন।

৪. Motion Graphics Animation:

এই ধরনের অ্যানিমেশন সাধারণত কমার্শিয়াল এবং প্রমোশনাল কাজে ব্যবহার করা হয়। অ্যানিমেটেড লোগো, কমার্শিয়াল অ্যাপ্লিকেশন, টিভি প্রোমো, মোশন ওপেনিং টাইটেল- এসবই মোশন অ্যানিমেশনের কাজ।

৫. Stop Motion Animation:

এই অ্যানিমেশনের সকল চরিত্র ও বস্তু বাস্তব। এই অ্যানিমেশন শুরুই হয় মডেলের ছবি তোলার মাধ্যমে। এরপর মডেলটি বিভিন্ন জায়গায় সরিয়ে বারবার ছবি তুলে পরপর সাজিয়ে ভিডিও বানানো হয়। এইভাবে তৈরি হয় স্টপ মোশন অ্যানিমেশন।

অ্যানিমেশন সফটওয়্যার:

অ্যানিমেশন তৈরি করার জন্য একটা সফটওয়্যার প্রয়োজন। সেটা হতে পারে পেইড-ননপেইড উভয়ই। চলুন তাহলে ইউজার ফ্রেন্ডলি তেমন কয়েকটা সফটওয়্যারের নাম জেনে আসা যাক!

 ১. CelAction2D:

উইন্ডোজ সাপোর্টেড এই সফটওয়্যার টু-ডি ড্রয়িংয়ের জন্য দারুণ উপযোগী৷ তবে এর জন্য আপনাকে মাসে ৭১ ডলার গুনতে হবে৷

২. Cartoon Animator 4:

থ্রিডি থেকে ফোরকে টুডি ড্রয়িংয়ের উপর এটা চমৎকার কাজ করে। উইন্ডোজ বা ম্যাকে পিএসডি টুল ও ওয়াকম দিয়ে কাজ করতে পারবেন।

৩. Clip Studio Paint:

সবধরনের ডিভাইসে এই সফটওয়্যার কাজ করে। ফ্রেম বাই ফ্রেম অ্যানিমেশন তৈরি করার এই সফটওয়্যারের জন্য প্রতি মাসে ২.২৯ ডলার দিতে হবে।

৪. Adobe Animate:

উইন্ডোজ ও ম্যাক সাপোর্টেড এই সফটওয়্যার মূলত সবাই ব্যবহার করে থাকেন। কারণ এটা যথেষ্ট ইউজার ফ্রেন্ডলি।

৫. Adobe Character Animator:

অটো লিপসিংকিং ফিচার থেকে শুরু করে অটোমেটিক ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন ফিচার, হাঁটা, অনুভূতি, শ্বাস-প্রশ্বাস ইত্যাদি প্রক্রিয়া খুব সহজে এখানে আঁকা যায়।

অ্যানিমেশন তৈরি:

এখন যেহেতু আমরা অ্যানিমেশনের মূল ধারণাগুলো বুঝতে পেরেছি, তাহলে চলুন এবার অ্যানিমেশন বা কার্টুন তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যাক।

১. গল্প:

ইউটিউবে অন্তিক মাহমুদের ভিডিওগুলো দেখেছেন? তার ভিডিও শুরুই হয় একটা গল্প দিয়ে। আর অ্যানিমেশন তৈরি করার প্রথম ধাপটাই হচ্ছে গল্প ঠিক করা। এমন একটা গল্প যেটা আপনি ভালো বলতে পারেন এবং দর্শকও সেটা দেখতে পছন্দ করবে।

আপনি যদি শুরুতেই কোনো গল্প ঠিক না করতে পারেন, তাহলে আপনি যত সুন্দর করেই পরবর্তী ধাপগুলো করেন না কেন, কেউ আপনার ভিডিও উপভোগ করবে না। আপনি যত বেশি সময় গল্পের পেছনে দেবেন, তত কম সময় আপনাকে প্রোডাকশনের পেছনে দিতে হবে।

২. স্ক্রিপ্ট:

writing script

ইমেজ সোর্স: Maryville University

“পানির নিচে ডলফিনটাতো জঙ্গলের মতন, হেই দাদা জঙ্গলের মতন।” লাইনটা কি কোথাও শুনেছেন? শামীমা শ্রাবণী তার ছোট্ট সহশিল্পী ইয়ামিনকে নিয়ে অল্প কয়েকদিনেই ইউটিউব বাজিমাত করে দিয়েছেন। এর মূল কারণ হলো তার মজাদার স্ক্রিপ্ট।

একবার গল্পের ধারণাটা শব্দে প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলে, পরবর্তী ধাপ হল স্ক্রিপ্ট লেখা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গল্পের ধারণাটিকে শব্দের মধ্যে নিয়ে আসা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে প্রযোজনায় নামার আগেই আপনি গল্পের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে পারেন।

৩. কনসেপ্ট আর্ট:

স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত করাত পর ভিজ্যুয়াল স্টাইল প্রতিষ্ঠার শুরু হয় অ্যানিমেশনের কনসেপ্ট আর্ট অর্থাৎ স্টাইল ও ছবির প্যাটার্ন তৈরির কাজ দিয়ে। স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী হাতে আঁকা হয় প্রতিটি দৃশ্য। তখনই ঠিক হয়ে যায় যে কোন দৃশ্যে কোথায় কীভাবে কোন চরিত্রগুলো দেখা যাবে। সাথে ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য কী কী প্রয়োজন, চরিত্রগুলোর সাথে আর কোনো জিনিস দেখা যাবে নাকি ইত্যাদি আঁকা হয়।

৪. স্টোরিবোর্ড

অ্যানিমেশন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটা হচ্ছে স্টোরিবোর্ড। স্টোরিবোর্ডিং আপনাকে আপনার অ্যানিমেশনের সম্পূর্ণ স্পট স্টোরি এবং পেসিং ইস্যু দেখতে সাহায্য করে। একটা চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত আর কয়টি চরিত্র আছে, কার সঙ্গে কী সম্পর্ক- সব লিখে ফেলতে হবে। কোনো একটা চরিত্রের হয়তো বিশেষ কোনো গুণ আছে, সেগুলো সব টুকে রাখতে হবে। বেশিরভাগ মানুষ স্ক্রিপ্টের চেয়ে স্টোরিবোর্ডের মাধ্যমে নিজের আইডিয়া তুলে ধরতে বেশি আগ্রহী।

৫. অ্যানিমেটিক:

drawing cartoons

ইমেজ সোর্স: The Next Web

চরিত্র তো দাঁড় করানো হলো, এবার দৃশ্য ধরে ধরে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় চরিত্রগুলো ও এদের পারিপার্শ্বিক জিনিস আঁকার পালা। এই প্রক্রিয়াকে বলে অ্যানিমেটিক। মূলত আপনার স্টোরিবোর্ডের মোবাইল ভার্সন হচ্ছে অ্যানিমেটিক। কারণ এখানে আঁকার পাশাপাশি ছবি, সংগীত ও ডাবিংয়ের খসড়া করে নিতে হবে। তারপর তিনটা মিলিয়ে নিলে অ্যানিমেশনের একটা প্রাথমিক চেহারা দাঁড়িয়ে যাবে। এর মাধ্যমেই বোঝা যাবে অ্যানিমেশনটা কেমন হতে যাচ্ছে।

৬. প্রিভিস:

অ্যানিমেশনের কাজ শুরু করার আগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে প্রিভিস বা প্রি-ভিজ্যুয়ালাইজেশন। প্রিভিস হলো অ্যানিমেটিকের পরবর্তী ধাপ, যার উপর থ্রিডি মডেল ব্যবহার করা হয়।

প্রতিটা চরিত্রের উপর খুব বেসিক অ্যানিমেশন ইফেক্ট দিতে হবে যাতে বোঝা যায় কাজ শেষে এটা কেমন দেখাবে। কারণ অ্যানিমেশন খুবই দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া। এই ধাপের পরবর্তী ধাপগুলোয় কোনো ভুল পাওয়া গেলে সেটা ঠিক করতে অনেক সময় লাগবে আর এইটাই আমাদের গল্পে গুরুতর পরিবর্তন আনার শেষ সুযোগ।

৭. অ্যানিমেশন:

animating

ইমেজ সোর্স: Maryville University

অবশেষে আমরা অ্যানিমেশনের জন্য প্রস্তুত!

এখানেই আমরা চলচ্চিত্রে জীবন নিয়ে আসি। এখানে অ্যানিমেটরের কাজ হচ্ছে কী-ফ্রেমগুলো আঁকা, মানে চরিত্রগুলোর প্রতিটি কাজের মূল ছবি। এই কাজটা খুবই সূক্ষ্মভাবে করতে হবে। ধরা যাক, কোনো চরিত্র কিছু একটা খাচ্ছে। সেটা বোঝাতে হাতের অনেক অবস্থানের ছবি লাগবে। হাত পায়ের উপর রাখা, ওপরে উঠল, প্লেটের দিকে হাত বাড়ালো, খাবার ধরলো, হাত টেনে মুখের কাছে আনলো। প্রতিটা মুখভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গি ভালোভাবে দেখে আঁকতে হবে। তারপর সেগুলোকে পর পর জুড়ে দিলে মনে হয়, চরিত্রটি কোনো খাবার মুখে দিলো।

making face for animation

চরিত্রগুলোর মূল চেহারা আঁকার সময় তাকে চারদিক থেকে দেখতে কেমন লাগবে সেটার উপর ভিত্তি করে আরো চারটা ছবি আঁকতে হবে, যাকে বলা হয় ‘টার্ন অ্যারাউন্ড’। এরপর ‘এক্সপ্রেশন শিট’ এ চরিত্রটির সব মুখভঙ্গি যেমন: হাসি, মুচকি হাসি, অট্টহাসি, কান্না, অল্প কান্না, বেশি কান্না, আনন্দ, ভয়, রাগ, হতাশা, বিরক্তি ইত্যাদি। আর বানাতে হবে মানুষ কথা বলার সময় অনবরত ঠোঁট নাড়তে থাকার স্টাইল বা ‘লিপ’। এটা মূলত নির্ভর করে শব্দের স্বরধ্বনিগুলোর ওপরে। ‘অ’ বলতে যেমন ঠোঁট একভাবে নড়ে, এরকম ‘আ’, ‘ই’, ‘উ’, ‘এ’ ও ‘ও’র জন্য আলাদা আলাদা ভাবে ঠোঁট নড়বে।

এরপর আঁকতে হবে আশেপাশের প্রপস ও ব্যাকগ্রাউন্ড, যাতে অ্যানিমেশনটাকে বাস্তব বলে মনে হয়। ডিজনি অ্যানিমেশনগুলো কখনো খেয়াল করেছেন? কোনো চরিত্রের চুল নাড়ানোর জন্যও অ্যানিমেটররা ফ্রেমের পর ফ্রেম ছবি এঁকে যান।

৮. লাইটিং:

অ্যানিমেশন তৈরি করা অনেকটা ছবি আঁকা আর সিনেমা তৈরি করার মিশেল। ছবি আঁকার সময় যেমন আলো-ছায়ার ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়, আবার সিনেমা তৈরির সময় কোন জায়গায় লাইট বেশি পড়ছে বা কোন জায়গায় কম পড়ছে সেটা দেখা হয়, অ্যানিমেশনেও এই ব্যাপারটার দিকে খেয়াল রাখা হয়।

৯. কালার গ্রেডিং ও কারেকশন:

color grading and correction

ইমেজ সোর্স: Love Fun Art

অ্যানিমেশনের কাজ প্রায় শেষ, এবার একটু রঙ ঘষা-মাজা করার পালা। একটি দৃশ্যে রঙের ব্যবহার বা কালার টোন কেমন হবে তা নির্ভর করে অনেক কিছুর ওপর। কালার কারেকশন হলো প্রতিটা শটের রঙগুলোর মধ্যে যাতে মিল থাকে সেই প্রক্রিয়া। যাতে পুরো ভিডিও জুড়ে আমরা একটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সঠিক রঙ পাই। কোথাও যেন বেশি সাদা বা কালো রঙ দেখা না যায়, সেদিকে আলাদা লক্ষ্য রাখতে হবে।

তারপরে অ্যানিমেশনের উপর কালার গ্রেডিং প্রয়োগ করতে হবে, যা ভিডিওর একটা ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরি করার চেষ্টা করে এবং  একটা স্বতন্ত্র চেহারা দেয়। কারণ ভিডিও ফুটেজে কখনোই রঙয়ের ভারসাম্য ঠিক থাকে না। এই ভিডিওটিকে চূড়ান্ত ভিডিও ফুটেজে রুপান্তরিত করতে আপনাকে হোয়াইট ব্যালেন্স এবং টোন সেটিংস নিয়ে কাজ করতে হবে। এই সেটিংসগুলো আপনার ভিডিও ফুটেজের সামগ্রিক রঙ এবং ভিডিওটি দেখতে কেমন দেখাবে তা নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় টেক্সচার। এর সঠিক ব্যবহারেই ফুটে ওঠে অ্যানিমেশনের আসল সৌন্দর্য।

১০. সাউন্ড ডিজাইন:

সাউন্ড হিসেবে এমন কোনো শব্দ বা মিউজিক ট্র‍্যাক ব্যবহার করুন যা আপনার ভিডিওর সাথে মানানসই। চাইলে ভয়েস ওভারের মাধ্যমে আপনি নিজেই সেসব আওয়াজ করতে পারবেন। সেটা হতে পারে হাঁটা-চলার শব্দ, চড় মারার শব্দ কিংবা কোনো ডায়ালগ।

আপনার কমেন্ট লিখুন