স্মার্টনেসের খোলসে মানসিক ব্যাধি!

Sadikullah Mahmud has a highly optimistic soul from his birth as his blood group is 'Be Positive'. This little kiddo is cursed by many people as he never returns the books that he borrows.

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

আদনানকে কখনোই আমার অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ছেলেটা সেই ছোটবেলা থেকেই আমার বন্ধু, স্পোর্টসে চমৎকার। দৌড়ে হয় সেকেন্ড না হয় থার্ড প্রাইজটা আনছে, সাংস্কৃতিক সপ্তাহে মঞ্চের আলো একাই কেড়ে নিচ্ছে, ফাইভে-এইটে ট্যালেন্টপুলে স্কলারশিপও পাচ্ছে! সব মিলিয়ে আদনান এমন একটা ছেলে, যাকে কিনা সব পরিবারের বাবা মা আদর্শ হিসেবে মানেন!

আদনানকে আমি অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম প্রায় সময়েই। বাবা মার কাছ থেকে সারাদিন আদনানের প্রশংসা শুনতে শুনতে মনের অজান্তেই আমি আদনানের মত হয়ে যেতে শুরু করি। পদে পদে ওর মত হওয়ার বেশ বড় রকমের একটা প্রচেষ্টা হঠাৎ করেই সবাই আমার মাঝে খুঁজে পেল! তবে যেই বিষয়টিতে আমি কখনোই নিজেকে আদনানের সাথে মেলাতে পারতাম না, সে বিষয়টি হল ফুটবল! ফুটবল ঠিক নয়, আসলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

একটা মানুষ কতটা ডুবে থাকতে পারে আরেকজনের জীবনে, সেটা আদনানকে না দেখলে বোঝা অসম্ভব। রাত জেগে প্রতিটা ম্যাচ দেখার বিষয়টা ঠিক আছে, কিন্তু সারা রুম জুড়ে রোনালদোর পোস্টার, বেশভূষায় রোনালদোর অনুকরণ, এমনকি চুলের ছাঁটেও ঐ রোনালদোর মতন হওয়ার চেষ্টা শুরু করলো আমাদের আদনান। আমরা সবাই বেশ অবাক হয়ে গেলাম!

সেসময় পড়তাম আমরা ক্লাস নাইনে। বয়সে বেশ ছোট, অত জ্ঞান বুদ্ধি নেই। এখন তো হাতে ইন্টারনেট এসে ছোট ছেলেমেয়েরাও বেশ এগিয়ে গিয়েছে। আদনানের এইরকম আচরণের সমাধান পেতে তাই আমার বেশ কয়েক বছর লেগে গেল! ফোনে বসে নেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে একদিন দেখি, আদনানের মত অবস্থা বর্ণনা করা Celebrity Worship Syndrome বা সংক্ষেপে CWD নামের একটি মানসিক ব্যাধির উদাহরণ হিসেবে। বলাই বাহুল্য, আমি আকাশ থেকে পড়লাম!

CWD- এই নামটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ‘Do you worship celebs?’- নামে জেমস চ্যাপম্যানের একটি প্রবন্ধে, ২০০৩ সালে, দ্যা ডেইলি মেইল পত্রিকায়। সাধারনভাবে CWD বলতে মানুষের এমন এক অবস্থাকে বোঝায়, যখন সে আরেকজন সেলিব্রিটি বা তারকার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের সাথে নিজেকে সাধারণের চাইতে বেশি মাত্রায় সম্পৃক্ত করে ফেলে।

CWD-র জন্য আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার একটি বিশাল তফাৎ সৃষ্টি হচ্ছে

এই তারকা খেলাধুলা, রাজনীতি, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন কিংবা পপ- যেকোন অঙ্গনের তারকা হতে পারেন। মোদ্দাকথা, মানুষের চোখে বেশ পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা প্রাপ্ত কোন মানুষের সাথে নিজেকে একটু বেশিই সম্পৃক্ত করে ফেলার যে চেষ্টা, সেটিই হলো CWD-র লক্ষণ, যেমনটা আমরা দেখতাম আমাদের আদনানের মাঝে!

CWD কিন্তু বেশ কয়েক রকমের হতে পারে। সাধারণভাবে পরিচিত কয়েকটি শ্রেণিবিভাগ ও সেগুলোর বর্ণনা নিচে দেয়া হলো:

১. Simple Obsessional:

এ ধরণের সিওডিতে তেমন কোন সমস্যা নেই। মানুষ তার পছন্দের তারকার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে চায়, কিন্তু জগতের নিয়ম মেনে সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে ওঠেনা। এই ধরণের CWD-র ভুক্তভোগীরা বিষয়টিকে মেনে নেন, কিন্তু এজন্য বেশ খানিকটা হীনম্মন্যতায় ভুগতে শুরু করেন।

২. Love Obsessional:

সোজা বাংলায়, এই CWD- তে মানুষ নিজের পছন্দের তারকাকে ভালবেসে ফেলেন। অনেক তারকার ছবি কিংবা ভিডিওর কমেন্ট সেকশন চেক করলে এরকম CWD-র শিকার বহু মানুষ কিন্তু আমাদের চোখে পড়ে!

৩. Erotomanic:

এই টাইপের CWD আক্রান্ত লোকেরা এক ধাপ এগিয়ে সবার চাইতে। তারা নিজেরা তো তারকাদেরকে ভালবাসেনই, সাথে এটাও ভেবে বসে থাকেন যে ঐ তারকারাও তাদেরকে অর্থাৎ যারা CWD আক্রান্ত-সেসব লোকদেরকে ভালবাসেন!

এছাড়াও আরো বেশ কয়েক রকমের CWD রয়েছে। কিন্তু আমাদের চারপাশে আমরা মূলত এই তিনটিই দেখতে পাই।

আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে কিন্তু এই CWD বেশ বাজে রকমের প্রভাব ফেলে চলেছে। CWD-র জন্য আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার একটি বিশাল তফাৎ সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন ধরুন, আনিকা নামের একটি মেয়ে হয়তো তার পছন্দের তারকাকে ভালবাসে, সে মনে প্রাণে চায় তার পছন্দের তারকাও তাকে ভালবাসুক। কিন্তু আদৌ কি বাস্তব জীবন এটি ঘটা সম্ভব? কখনোই না।

ফলাফল? আনিকার মত মানুষেরা চাওয়া ও পাওয়ার তফাৎটুকুর মাঝে টুপ করে বিষণ্ণতার সাগরে ঝাঁপ দেয়। অল্প কয়েকজন সাঁতরে এই সাগর থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও, বেশিরভাগই ডুবতে থাকে এই বিষণ্ণতার জলে। আমরা নিশ্চয় ২০০৯ সালের জুনের ২৫ তারিখের কথা ভুলে যাইনি! বিশ্বখ্যাত আমেরিকান গায়ক মাইকেল জ্যাকসন সেদিন মৃত্যুবরণ করেন। অবাক করার বিষয় হলো, সারা দুনিয়া জুড়ে মোট ১২ জন আত্মহত্যা করে বসেন মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যুর জন্য! এখন কি বুঝতে পারছেন যে কত শক্তিশালী হতে পারে এই CWD নামের মানসিক ব্যাধি?

আমাদের বর্তমান সমাজে আমরা স্মার্টনেসের সাথে CWD-কে জড়িয়ে ফেলছি। কে কোন সেলিব্রিটির প্রতি কত বেশি ডেডিকেটেড, সেরকম একটি প্রতিযোগিতা কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখতে পাই। মানুষ ভাবতে ভালবাসে, নিজেকে অন্য একজন তারকার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে ফেলাটা হাল আমলে একটি ফ্যাশন! কিন্তু এসবই যে আসলে একটি মানসিক ব্যাধির পর্যায়ে পড়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কি কারো খেয়াল আছে?

লাখ টাকার প্রশ্নটি হলো, আপনি কিংবা আমি, অথবা আমরা দুজনেই CWD আক্রান্ত নই তো? বিষয়টির উত্তর আসলে নিজে দেয়া বেশ কঠিন। সবচাইতে মজার বিষয়, CWD আক্রান্ত কেউ আসলে কখনো মেনে নিতে চায় না যে, সে আসলে এই ব্যাধিতে আক্রান্ত! ইন্টারনেটে একটু খুঁজলেই এরকম বহু লিংক খুঁজে পাওয়া যাবে যেখান থেকে সহজেই আমরা দেখে নিতে পারবো যে আমরা আসলেই CWD আক্রান্ত কি না। আমাদের উচিত, কারো মাঝে CWD-র লক্ষণগুলো দেখতে পেলে দ্রুতই তাকে এ বিষয়ে সচেতন করে তোলা।

একটু স্মার্টনেস দেখাতে যেয়ে যারা নিজেদের জীবনে ডেকে আনছে এই মানসিক ব্যাধি, তাদের চাইতে অভাগা এই দুনিয়াতে আর কেউ আছে কি?

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে আব্দুল্লাহ আল মেহেদী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.