পেরিক্লিস: গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছিলেন যিনি

January 22, 2019 ...

৪৯০ খ্রিস্টাব্দের ক্রোলার গাস নগরীতে একটি চমৎকার দিন শুরু হলো। আগরিসটি নামের মেয়েটির শিশু সন্তান হবে। সে খুশি সেই সাথে কিছুটা চিন্তিতও। কয়েকদিন আগে স্বপ্নে দেখেছিলেন, সন্তান হওয়ার জন্য তাকে একটি বিছানায় আনা হয়েছে। এই স্বপ্নের অর্থ কী তা বুঝতে পারেননি। যা হোক, গর্ভবতী মায়েরা এ ধরণের স্বপ্ন দেখেই থাকে।

আগারিসটির স্বামী জান্থিপাস  মাইকেলির যুদ্ধে পারস্যরাজ জেনারেলদের পরাজিত করেছিলেন। তাঁর উত্তরপুরুষ ক্লিসথেনিস স্বৈরতন্ত্রের বলপূর্বক ক্ষমতা দখলের সমাপ্তি ঘটান। তিনি আইন প্রণয়ন করেন, সরকার প্রতিষ্ঠা করেন, জনগণ যাতে সমঝোতার মাধ্যমে নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে এমন ব্যবস্থা করেছিলেন । এই অভিজাত পরিবারের মেয়েটি তাই তার অনাগত শিশুকেও এমনই যুদ্ধজয়ী কোন বীর হিসেবে কল্পনা করছিলেন।

অ্যাকামান্টিস গোষ্ঠীর সেই শিশু সন্তানটি জন্ম নিলো। আগারিসটি আর জান্থিপাসের সন্তান।

শিশুটিকে দেখতে গিয়ে গুঞ্জন শুরু হলো। সবই ঠিক আছে, কিন্তু মাথাটা এমন লম্বাটে কেন!

তখনও কেউ জানতো না এই শিশুটি আরও কয়েক বছর পরে কে হতে চলেছে, কী হতে চলেছে। কেউ জানতো না তার মাথার গঠনের ত্রুটিকে কেউ স্বীকারই করতে চাইবে না, কারিগরের নিপুণ মমতায় তার সমস্ত ভাষ্কর্যে শিরস্ত্রাণে ঢেকে যাবে তা। এথেন্সের কবিরা তাঁর মাথাকে বলতেন স্কাইল  বা পামজাতীয় মাথার মতো।

তিনি পেরিক্লিস।  গণতন্ত্রের আদি-পিতা ক্লিসথেনিস, সেই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার নায়ক এই পেরিক্লিস। যাঁর অবদানে এথেন্স হয়ে ওঠে গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ নগর-রাষ্ট্র, ‘হেলাসের রানী’।

xUDOW2FZdZr AdxkHL0ZksHxyut 9J3xiN3Bvhel7nCOhQp P9cO9aIYKBq0h 5r0GizaXzKdt


পেরিক্লিসের সকল ভাষ্কর্যেই মাথাটি শিরস্ত্রাণে ঢাকা
h

শৈশব

অভিজাত বংশে জন্ম নেওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই পেরিক্লিস গ্রিসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষগুলোর সান্নিধ্য পেয়েছেন। সংগীত শিক্ষা দিয়েছেন ডেসন। এরিস্টটলের মতে, তাকে সূক্ষ্ম বাকচাতুর্য শিক্ষা দিয়েছিলেন পাইথোক্লিদেস। জেনোর কাছেও শিক্ষা নিয়েছিলেন।

তবে পেরিক্লিস যার কাছে সকল বিদ্যার সেরা বিদ্যা লাভ করেছিলেন তিনি হচ্ছেন আনাক্সাগোরাস। তাঁকে সমসাময়িককালের লোকেরা মেধা বা বুদ্ধির প্রতীক বলে অভিহিত করেছিলেন। এরিস্টটল ও তাঁর ছাত্র আলেকজান্ডার দি গ্রেটের মতই আনাক্সাগোরাস ও পেরিক্লিস গ্রিক সভ্যতার শিক্ষক ও ছাত্রের পারফেক্ট কম্বিনেশনের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। তাই তাঁর সুযোগ্য ছাত্র পেরিক্লিস রাষ্ট্র পরিচালনায় বুদ্ধি-বিবেচনার পরিচয় দিবেন, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

688ZVh nPmbGZ5NnWrQC2h4WwUJPceyPqhrbws2VQZSK Jed3K6T2Pi e 8ppHNbWw5Iryc70I8Md64EV8o OXgHgW P0AeFRhnGyJuuYikPamcZwp7B tgifEyapnrTLq 7BS5A

গ্রিক দার্শিনিক আনাক্সাগোরাস

পেরিক্লিসের চেহারায় ছিল আত্মসংযমের দীপ্তি এবং আচরণে ছিল প্রশান্ত ভাব। তিনি যখন কথা বলতেন, কোনো প্রতিকূল অবস্থাযও তাকে বিচলিত করতে পারত না। তার শান্ত সমাহিত ভাব, ধীর, মৃদু উচ্চারণ, সবাইকে প্রবলভাবে অভিভূত করতো।

অথচ এই শান্ত মানুষটিকে নিয়ে এথেন্সের কিছু লোক আতঙ্কে থাকতো। পেরিক্লিস যখন তরুণ, তার চেহারা দেখতে  ঠিক স্বৈরাচারী পিসিসট্রাটুসের মতো ছিল। লোকেরা তার কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা ও  কথা বলার মাধুর্যের প্রশংসা করেছে, কিন্তু পিসিসট্রাটুসের সাথে চেহারার মিল দেখতে  পেয়ে আতঙ্কিতও হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, পেরিক্লিস নিজেও এই ব্যাপারটি নিয়ে আতঙ্কিত থাকতেন। তাঁর জমিদারি আছে, তিনি অভিজাত বংশ, তাঁর প্রতিপত্তিশালী বন্ধুবান্ধব রয়েছে- যে সকল কারণে তাকে হয়ত নির্বাসনে পাঠানো হতে পারে। এ ভয়েই তিনি রাষ্ট্রীয় কোন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন না। বরং সামরিক বাহিনীতেই নিজের কাজে মনোযোগী হতে লাগলেন।

পেরিক্লিসের এই সংযমী আচরণকেও অনেকে বাঁকা চোখে দেখতেন। একদিন তিনি বাজারে গিয়ে জরুরী কাজ করছিলেন, সে সময় তার কানে এলো বাজারের মধ্যে কিছু লোক তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছে। তিনি  নিঃশব্দে নিজের কাজ করে সন্ধ্যায় শান্তভাবে বাড়ি ফিরে এলেন। একটি লোক নাছোড়বান্দার মতো তার পেছনে লেগে রইল। লোকটি সারা পথ তাকে গালিগালাজ করতে করতে পিছুপিছু এলো। পেরিক্লিস যখন বাড়িতে পৌঁছলেন তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। তিনি একজন ভৃত্যকে ডেকে বললেন, একটি বাতি নিয়ে লোকটাকে পথ দেখিয়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দিতে দিয়ে আসতে।

পেরিক্লিসের গাম্ভীর্যকে অনেকেই ভাবতেন ভন্ডামি। তাদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, তারাও যেন এধরণের ভন্ডামি করে। হয়তো অভিনয় করতে করতেই তাদের মধ্যে মহত্ত্ব, জ্ঞান, ভালোবাসা জন্মাবে।

JA5U36LbeRKGqmktTmvRg6nJDrYlwkks5g1LIdnBmJi8QfBm0CQ7rsAKZMtWAzjNJ51RKdthqdw7CKEdE1Cik5pyU

আনাক্সাগোরাস ও পেরিক্লিস

পেরিক্লিসের জীবনের ভেতরকার মহিমা আনাক্সাগোরাসের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।  তিনি ক্রমাগত আনাক্সাগোরাসের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এবং প্রাকৃতিক বিজ্ঞান দিয়ে তার অলঙ্কারশাস্ত্র সমৃদ্ধ করেছেন। বিপুল প্রতিভা থাকলেও, দার্শনিক প্লেটোর মতে তিনি প্রকৃতিকে অধ্যয়ন করে উন্নত ধরনের বুদ্ধিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

এই বৈশ্বিক দৃষ্টি এবং বিশাল পাণ্ডিত্যের দরুন বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি সবসময় সফল হয়েছেন। ফলে সকলের চাইতে তিনি সবখানে উৎকৃষ্ট বলে প্রমাণিত হয়েছেন। এ কারণে তাকে বলা হয় অলিম্পিয়ান। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, তিনি জনসাধারণের জন্য অট্টালিকা নির্মাণ করেছেন বলে তাকে এই নামে ডাকা হত। আবার কারো মতে, জনস্বার্থে যুদ্ধ এবং শান্তিতে তিনি অসীম প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন বলে এ খেতাব পেয়েছিলেন।

তবে এটা স্বাভাবিক যে, তিনি বিচিত্র গুণাবলীতে ভূষিত বলেই এই বিশেষণে চিহ্নিত হয়েছিলেন।  সমসাময়িক কমেডি ও সাহিত্যে তার বক্তৃতা নিয়ে কৌতুক করা হয়েছে। বলা হতো তিনি বক্তৃতা করেন না, বজ্রপাত করেন,  তার জিহ্বায় রয়েছে বজ্রপাণি!

পেরিক্লিসের প্রতিদ্বন্দ্বীরা

সামরিক বাহিনীর জেনারেল সাইমনকে প্রায়ই যুদ্ধ অভিযানে গ্রীসের বাইরে যেতে হতো। স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছিল, ভবিষ্যতে সাইমনের সাথে পেরিক্লিসের সমস্যা হতে পারে। ধনী এবং গরীবদের মধ্যে দু’টো ভাগ তৈরি হচ্ছিল। দেশের ভিতরের সংকটময় পরিস্থিতির সময় পেরিক্লিস মুষ্টিমেয় ধনীদের পক্ষে নয় বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্রের পক্ষে যোগ দেন।

পেরিক্লিস ক্ষমতা দখল করতে পারেন, এরকম একটা আশঙ্কা ছিলো শাসকদের মধ্যে। তিনি এই বিতর্ক এড়াতে চাইছিলেন। পেরিক্লিস জনসাধারনের দলে যোগ দিয়েছিলেন, প্রথমত আত্ম রক্ষার উদ্দেশ্যে, দ্বিতীয়ত সাইমনের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয়ের অভিপ্রায়।

74VKxSVKb4jLOI4X7FJdeJiHvc9pznSLZtBKcm G8GTedNFvJZ0YsCQ7JLG7Gk9DUf2KzBn1Oy0k8OoFcX T 7csoR UuWJ8H105hjILkzCF8Xru7LZGhAFql2ZEEL03Woh N pP

সাইমনের প্রতিকৃতি

পেরিক্লিস জনসাধারণের মধ্যে এমনভাবে তার ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করলেন যে, সেখানে যা বিচারাধীন ছিল তা বিচারবহির্ভূত বলে বিবেচিত হলো। অর্থ ও আভিজাত্যের দিক দিয়ে সাইমনের স্থান ছিল সর্বোচ্চ। বর্বরদের সাথে যুদ্ধে তিনি অনেক গৌরবময় অর্জন করেছে, নগরীকে অর্থ ও যুদ্ধের লুণ্ঠিত মাল দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন। কিন্তু সাইমনের কিছু কার্যকলাপে দিন দিন জনগণ তাকে ঘৃণা করতে লাগলো। পেরিক্লিস এক পর্যায়ে সাইমনকে নির্বাসিত করতে সমর্থ হলেন। তার মত ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠানো থেকে বোঝা যায় যে, পেরিক্লিস জনসাধারণের উপর এক বিশাল কর্তৃত্ব অর্জন করেছিলেন।

আইডোমিনিয়াস অভিযোগ করেছেন, পেরিক্লিস প্রতারণার মাধ্যমে তার বন্ধু জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ইফিয়ালটিসের মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করেছেন। যে ইফিয়ালটিস তারই দলে থেকে, সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাকে সহায়তা করেছেন। তবে এ অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

সাইমনের অনুসারীরা পেরিক্লিসের শক্তি এবং সর্বপ্রধান ব্যক্তি হয়ে ওঠার ভয়ে তার বিরুদ্ধে এমন একজনকে দাঁড় করিয়ে দেয়, যিনি পেরিক্লিসের সাথে লড়াই করতে পারবেন। এই ভাবনা থেকে সাইমনের আত্মীয় থুকিডাইডিস, যিনি একজন বিজ্ঞ বিচক্ষণ ব্যক্তিগত পরিচিত ছিলেন পেরিক্লিসের বিরোধী শক্তি রূপে দাঁড় করানো হয়।

Y9lEmWDCXZv4Gz0tQsPQuWm p2Jkipm2P6S2Sz1f uga8JMvNiyH17rcliSa3 QAGzXVweBCJLB6wFb6CQXPOqROBdAj3BRVV81yIIBdRo96IWi DYyuU12YXlVI cMzaIPBbJii

থুকিডাইডিসের ভাষ্কর্য

সাইমনের চেয়ে যুদ্ধবিদ্যায় কম অভিজ্ঞ হলেও রাজনৈতিক ব্যাপারে ও বাকচাতুর্যে থুকিডাইডিস অধিকতর পারঙ্গম ছিলেন। তিনি প্রথমে নগরীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। পেরিক্লিসকে বিচারকার্যে ব্যস্ত রেখে অতি অল্পকালের মধ্যে সরকারের দুই দলের মধ্যে সমতা আনতে সমর্থ হন।

ইতিপূর্বে যেসব ভালো সৎ ও ভালো মানুষ বিশেষ কোনো মর্যাদা পায়নি তিনি তাদের একত্র করে একটি দল গঠন করেন। এই দলকে জনসাধারনের বিরোধী দল হিসেবে দাঁড় করিয়ে, তিনি সরকারের ভেতর ভারসাম্য আনেন।  

পেরিক্লিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো। জনসাধারনকে অত্যধিক মাত্রায় প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং তাদের ইচ্ছামাফিক নীতি নির্ধারণ করেছেন। তাদের খুশি করার জন্য নগরীতে সব সময় একটা না একটা উৎসবের আয়োজন করেছেন।  নাগরিকদের ছেলেমানুষের মতো আনন্দ উৎসবে মাতিয়ে রেখেছেন। এইভাবে বিভিন্ন সংকটকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন।

থুকিডাইডিস ও তার দলের অন্যান্যরা একদিন পেরিক্লিসের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিলো, পেরিক্লিস জনসাধারণ অর্থ অপব্যয় করছেন।

তাদের বক্তব্য শুনে পেরিক্লিস জিজ্ঞেস করলেন,

”আমি কি প্রচুর পরিমাণে ব্যয় করছি?”

প্রতিপক্ষের জবাব, ”অনেক অনেক”

তখন পেরিক্লিস বললেন, ”আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, যা ব্যয় করেছি তা আপনাদের খাতে নয়, আমার খাতে। তাহলে তো অট্টালিকার শিলালিপিতে আমার নাম খোদাই করে রাখা উচিত।”

এমন বাকপটু আক্রমণে প্রতিপক্ষ অবাক হয়ে গেলো। তাদের মনে হলো, আসলেই পেরিক্লিস গর্ব করার জন্য এমন কিছু করতে পারতেন। এরপর থেকে তারা আর এই প্রসঙ্গে কথা বলেনি।

একবার পেরিক্লিস তার গ্রামের খামারবাড়ি থেকে  একটি ভেড়া এনেছিলেন। ভেড়াটির ছিল একটি মাত্র  শিং। সেই সময় শক্তিশালী দল ছিলো দু’টি, একটি থুকিডাইডিস আর অপরটি পেরিক্লিসের।  ভেড়াটির কপালে শিংটি শক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে দেখে দৈবজ্ঞ লেমপন বলেন যে, ভবিষ্যতে সরকার তারই আয়ত্তাধীন হবে যা জায়গায় বা জমিদারিতে এই চিহ্ন বা আভাস খুঁজে পাওয়া যাবে।

তখন আনাক্সাগোরাস ভেড়াটির করোটি বিচ্ছিন্ন করে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের দেখালেন যে, মগজ ঠিকমত ডেভেলপ হয়নি বরং ডিমের মতো আয়ত হয়ে রয়েছে। ফলে যা দিয়ে শিং গজাবে তা ঠিকমতো পূর্ণতা পায়নি বলেই শিং গজিয়েছে একটি। এই ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য আনাক্সাগোরাস উপস্থিত সবার কাছে প্রশংসা পান। কিছুকাল পর থুকিডাইডিসকে পরাভূত করে রাষ্ট্র ও সরকারের সকল ক্ষমতা পেরিক্লিসের কাছে আসে।

ব্যক্তিগত জীবন

পেরিক্লিসের পৈতৃক জমিদারির এমনভাবে পরিচালনা ব্যবস্থা করেছেন যেন তদারকিতে কোনরকম গাফিলতি না থাকতে পারে। এ ব্যবস্থাটি এমনভাবেই করেছিলেন যাতে জমিদারি দেখাশোনার জন্য তাকে অহেতুক সময় নষ্ট না করতে হয়। জমিতে যাতে প্রতি বছর উৎপাদিত ফসল বাড়তে থাকে- এমনভাবেই তিনি পরিচালনা করতেন। সব ফসল একসাথে বিক্রি করে দেয়া হতো, তারপর মুনাফা দিয়ে সংসারের সকল প্রয়োজনীয় জিনিস বাজার থেকে কেনা হতো।

পেরিক্লিসের প্রথম স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদের পর তাঁর সাথে অ্যাসপাসিয়ার পরিচয়। কেউ কেউ বলেন রাজনীতিতে অ্যাসপাসিয়ার জ্ঞান ও কৌশলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পেরিক্লিস তাঁর প্রণয়প্রার্থী হয়েছিলেন।  

p9QrWpYFg1EiiAfpJMcqDvW4NWE

অ্যাসপাসিয়া

স্থাপত্যে-সাহিত্যে- সংস্কৃতি-অর্থনীতিতে অবদান

পেরিক্লিস মনে করতেন, রাষ্ট্র জনসাধারণের অতএব তাদের শুধু শাসন করা নয়, রাষ্ট্রের কর্ণধারদের দায়িত্ব তাদের জন্য বিনোদনের আয়োজন করা। এ কারণে তিনি নাট্যানুষ্ঠান, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নাগরিকদের আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করেন।

ফলে দেশে নাট্যচর্চার বিকাশ লাভ করে। পেরিক্লিসের আমলে বিশ্বের তিনজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকার- ইস্কিলাস, সফোক্লিস, ইউরিপাইডিস- স্বাধীনভাবে নাটক রচনা করেন। পেরিক্লিস নাট্যমঞ্চের দর্শনী মাফ করে দেন।

পেরিক্লিস জনসাধারণকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত করেন। জনসাধারণ যাতে সরকারি পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী হয়, তাই তিনি এই পদগুলোতে বেতন দেওয়া শুরু করেন। এথেন্স আদালতে বিচার কার্যে জনসাধারণের প্রতি জুরিগণ যাতে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন, এজন্য জুরিদের বেতন দেওয়ার প্রথা প্রচলিত হয়।

সঙ্গীতের জন্য পেরিক্লিস নির্মাণ করেন সঙ্গীতালয় এবং সেখানে প্যান-এথেনীয় সঙ্গীত উৎসবের আয়োজন করেন।

বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর ফিডিয়াসকে পেরিক্লিস বন্ধুত্বের মর্যাদা দেন। তিনি দেবী এথেনার পার্থেনন মন্দির তৈরি করান।  ভাষ্কর্যের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফিডিয়াসকে। ফিডিয়াস তৈরি করেন দেবী এথেনার অতিকায় অপূর্ব মূর্তি।

LR2JHI GrUMdxzw08vLEivSvJCicF2Sx5CLlnD0ny YaQP nwATCRlpVtvqCPY8uKNdUT5R6B 4M3i7HcUhNYBmQLsc5LqNR32yVIstRB4q6yPMkrZ77Zl0 0c0j7QH2 L3qbRW4

পার্থেনন মন্দির

শেষ কথা

পেরিক্লিস শাসক থাকা অবস্থায় প্রচুর যুদ্ধ করেছেন। এর মধ্যে চেরসোনিসের অভিযান, পেলোপনেসিয়ার যুদ্ধ, স্যামসের বিদ্রোহ দমন উল্লেখযোগ্য।

প্লেগের মহামারীতে এথেন্সে বহু লোকের মৃত্যু ঘটে। পেরিক্লিস প্লেগে আক্রান্ত হন। অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে এলে অন্তরঙ্গ বন্ধুরা তাকে ঘিরে বসে সোনালী দিনের স্মৃতিচারণ করছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি  মনোযোগ দিয়ে সব কথা শুনে শান্ত স্বরে বললেন, ”আমার জন্য কোন এথেন্সবাসীকে শোক চিহ্ন ধারণ করতে হয়নি”।

৪২৯ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে এই মহানায়ক মৃত্যু বরণ করেন।

তথ্যসূত্র:

১. https://en.wikipedia.org/wiki/Pericles

২. https://www.britannica.com/biography/Pericles-Athenian-statesman

৩. https://www.history.com/topics/ancient-history/pericles

৪. https://www.ancient.eu/pericles/

আপনার কমেন্ট লিখুন