ব্লগের গল্প

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৯৯৪-এ সোয়ার্থমোর কলেজে পড়তে থাকা জাস্টিন হল একদিন ভাবলো সে তার একটা পার্সোনাল হোমপেজ বানাবে। সে কি আর তখন জানতো যে Links.net নামের এই হোমপেজটাই ইতিহাসের প্রথম ব্লগ হিসেবে গণ্য করা হবে!

‘ব্লগ’ নামটার উৎপত্তি অবশ্য আরো পরে। ’৯৭-এ গিয়ে জন বারজার ঠিক করলেন তাঁর ‘Robot Wisdom’ নামের অনলাইন পেজটাকে তিনি ‘ওয়েবলগ’ নাম দেবেন। নামটা চেনা চেনা লাগতে পারে, কারণ আমরা অনেকেই হয়তো জানি যে সমুদ্রভ্রমণের সময় নাবিকরা তাদের গতিপথের একটা হিসেব রাখার জন্য ‘লগবুক’ ব্যবহার করে থাকেন। আর ইন্টারনেটের সমুদ্রে ব্রাউজ করতে করতে জন বারজার নিজেকে নাবিক ভাবতেই পারেন।

২০০৮ সালে মেরিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারি তাদের ‘ওয়ার্ড অভ দ্য ইয়ার’ হিসেবে ‘ব্লগ’কে গ্রহণ করে। ‘ওয়েবলগ’ থেকে ছোট করে নামটাকে ‘ব্লগ’ বানানোর পেছনে বড় ভূমিকা ছিলো প্রোগ্রামার পিটার মারহলযের। একদম প্রথম দিকে তো আর এখনকার মতো এতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ছিলো না, তাই ওই ব্লগ পেজগুলো সামলাতে বেশ বেগ পেতে হতো ব্লগ পেজের মালিকদের। তাও তার ভেতর Hurricane Bonnie, LiveJournal, Blogger ইত্যাদি কিছু ব্লগ মানুষের মনে একটা আলাদা স্থান করে নেয়।

ইন্টারনেটের যুগে ব্লগের প্রসারটা ঠিক কত বেশি ছিলো তার একটা ধারণা পেতে শুধু একটা পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই হয়। জেসি জেমস গ্যারেটের একটা গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ১৯৯৯ সালে মাত্র ২৩টি ব্লগ ছিলো সারা ইন্টারনেট জুড়ে, মাত্র ৭ বছর পর ২০০৬ সালে যেটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটিরও বেশিতে। আর এই ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশিতে!  

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

যে পথটা পাড়ি দিয়ে এসেছে ব্লগের দুনিয়া এই বিগত দুই যুগে, তার গল্পটা ঠাকুরমার ঝুলি বা হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের কোনো গল্পকেও হার মানায়। ২০০১-এ movabletype.org শুরু করে সেলফ-হোস্টেড প্ল্যাটফর্ম দেওয়া, যেখানে ব্লগাররা নিজেরাই যার যার পেজ তার তার মতো গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলো। ২০০২-এ আসলো Technorati, বিশ্বের প্রথম ব্লগ সার্চ ইঞ্জিন।

ঠিক ঐ বছরেই ঘটলো এক মজার ঘটনা। হেদার আর্মস্ট্রং নামে এক মহিলাকে তার চাকরি থেকে বহিষ্কৃত করা হলো তার ব্লগ Dooce.com তার সহকর্মীদের নিয়ে কিছু নেতিবাচক মন্তব্য করার জন্য। তারপর থেকে এখন ‘Dooce’ শব্দটার অর্থই হয়ে গেলো অনলাইন কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া!

২০০৩-এ একদিকে অডিওব্লগ শুরু হলো, অন্যদিকে AOL-র কাছে ২.৫কোটি টাকায় বিক্রি হলো জেসন ক্যালাক্যানিসের Weblogs। AdSense শুরু করলো ব্লগের সাথে মিল রেখে বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা কামানো, আবার WordPress আর TypePad-ও শুরু করলো তাদের যাত্রা। ওয়ার্ডপ্রেসে গিয়ে তোমরাও নিজেদের ব্লগ হোস্ট করতে পারো এখন। আর টাইপপ্যাড এখন ABC, BBC ও MSNBC-র মতো চ্যানেলের ব্লগ হোস্ট করে।

২০০৪-এ শুরু হলো ভিডিও ব্লগিং। আস্তে আস্তে শুরু হলো মাইক্রোব্লগিং; যেখানে বড়, লম্বা লেখার বদলে চলে এলো একটা নির্দিষ্ট শব্দসীমার ভেতর মনের কথা অনলাইনে সবাইকে জানানোর একটা সময়োপযোগী পন্থা। বহুল পরিচিত টুইটার বাদেও এখানে উল্লেখ না করলেই নয় Tumblr ও Posterous-এর কথা।

২০০৫-এ যখন গ্যারেট গ্র্যাফকে হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল ডিনারে দাওয়াত দেওয়া হলো শুধু তার ব্লগিংয়ের জন্য, তখন মানুষ আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলো যে ব্লগিং আসলে হারিয়ে যাবার জন্যে আসেনি; বরং খুব শক্তভাবেই নিজের খুঁটি গেড়েছে ইন্টারনেটের জগতে প্রভাব বিস্তার করতে। অবশ্য এর ভেতর যে সব গল্পই বিজয়ের ছিলো তা কিন্তু মোটেও ভেবে বোসো না যেন।

ব্লগিং করতে গিয়ে নিজের ভিন্নধর্মী চিন্তাধারার মনোভাব প্রকাশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে বহু মানুষকে, প্রাণও হারিয়েছে অনেকে। আমাদের বাংলাদেশেই তো তার রক্তাক্ত নজির পেয়েছি আমরা ২০১৫তে, যখন অভিজিৎ, নিলয়সহ ২.৫ বছরে খুন হয়েছিলেন ১০ জনেরও বেশি ব্লগার!

 
নিজেই করে ফেল নিজের কর্পোরেট গ্রুমিং!
 

২০০৭-এর পর থেকে ব্লগিংয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণটা একটু পড়তির দিকে থাকে। তারপর কয়েক বছর তেমন উল্লেখযোগ্য কাহিনী ঘটেনি বা ঘটলেও মানুষের অগোচরেই রয়ে গেছে। ২০১২-তে এসে আবার একটা অন্যরকম উত্তেজনার ভেতর দিয়ে গেছে ইন্টারনেট ইউজাররা, যখন ইভান উইলিয়ামস Medium শুরু করেন। এটা এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে শিল্পী-চিন্তাবিদ-রাজনীতিক থেকে শুরু করে আমজনতা সবাই তাদের বিভিন্ন চিন্তা, ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গি পৌছে দিতে পারে আর সবার মাঝে।

LinkedIn খুবই ভালো একটা পেশাদার ওয়েবসাইট যেখানে তুমি তোমার প্রোফাইল ঠিকভাবে গোছাতে পারলে বসে বসেই হয়তো চাকরি পেয়ে যেতে পারো। এই ওয়েবসাইটটা তোমাকে তোমার মতো কাউকে খুঁজছে এমন প্রায় সবার সাথেই কানেক্ট করার চেষ্টা করতে থাকে। আর নামীদামী ব্যবসায়ীরা তাদের নানান রকম উপদেশ ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করে থাকেন লিঙ্কডইন-এর ব্লগিং প্ল্যাটফর্ম Pulse-এ।    

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ও সবথেকে বেশি আয় করা ব্লগ হলো The Huffington Post; Business Insider, Mashable, TechCrunch, Engadget -ও খুব বেশি পিছিয়ে নেই। সেরা দশে আরো আছে Life Hacker, Gizmodo, Perez Hilton, Smashing Magazine & Tuts+  এর মতো কিছু অসাধারণ  ব্লগ।

বাংলাদেশের প্রযুক্তিতরীর পালেও ব্লগিংয়ের এই হিমেল হাওয়া লেগেছে বেশ কিছুদিন হলো। তবে এখনো অনেক দূর যাওয়া বাকি। তবুও আমাদের টেন মিনিট স্কুল, টেকটিউনস, সামহোয়্যার ইন ব্লগ এবং আরো যেগুলো ভালো ভালো ব্লগ আছে ওগুলো স্বপ্ন দেখায়। দেশটাকে সামনে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে আশায় বুক বাঁধতে সাহস যোগায়। স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, “Intelligence is the ability to adapt to change.” সুখ ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যেতে হলে প্রযুক্তি ও পরিবর্তনকে দূরে ঠেলা যাবে না। সহাস্যে আলিঙ্গন করতে হবে প্রগতির জন্য।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে সাদিকুল্লাহ মাহমুদ


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author
Junaid Aumi
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?