মাত্র চার মিনিটেই ইতিহাস গড়লেন যে তরুণ!

Tashfikal Sami is a diehard wrestling & horror movie fan. Passionately loves bodybuilding, writing, drawing cartoons & a wannabe horror film director. He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের কৌতূহল অসীম। সে পাহাড়ে চড়তে চায়, আকাশে উড়তে চায়, সমুদ্রের তলদেশ ঘুরে দেখতে চায়। হাজার বছর ধরে অসম্ভব মনে করে আসা এই স্বপ্নগুলোও মানুষের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার ফলে সত্যি হয়েছে। আজ থেকে ছয় দশক আগে তেমনি এক তরুণ শারীরিক সক্ষমতার দৌড় নিয়ে মানুষের চিন্তার সীমানা প্রাচীর ভেঙে দেন এক নিমেষে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সেই অসম্ভবকে সত্যি করার বিজয়গাঁথা।

হতাশাই যার সম্বল

স্যার রজার ব্যানিস্টারের (Sir Roger Bannister) জন্ম লন্ডনের এক খেটে খাওয়া সাধারণ পরিবারে। ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার, কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংগতির কথা ভেবে ছোট্ট রজারের কাছে সহজেই অনুমেয় ছিল যে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর খরচ বাবা-মা যোগাতে পারবেন না।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপুল ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতি শিশু রজারের মনোজগতে গভীর রেখাপাত ফেলে, জীবনের প্রতি জন্ম নেয় বিবমিষা।

দৌড়ে খুললো স্বপ্নের দ্বার 

হাইস্কুলে রজার দৌড়ে বিশেষ প্রতিভার প্রদর্শন করেন। একজন অপেশাদার দৌড়বিদ হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। এই দক্ষতাকে পুঁজি করেই রজার পূরণ করলেন তার আশৈশব স্বপ্ন- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ! বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে ১৯৪৮ সালের অলিম্পিকে দৌড়ের ইভেন্ট তাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে, তিনি সিদ্ধান্ত নেন পরবর্তী অলিম্পিকে অংশ নেবেন। ততদিনে সমগ্র ব্রিটেনে ছড়িয়ে পড়েছে দৌড়বিদ হিসেবে তার সুনাম। যুদ্ধ বিধস্ত দেশটিতে আশা ও সম্ভাবনার প্রতীক হিসেবে তরুণ প্রজন্মের ধ্বজাধারীতে পরিণত হন রজার। সময় গড়িয়ে ১৯৫২ এর অলিম্পিক দুয়ারে আসলে চড়তে থাকে দেশবাসীর প্রত্যাশার পারদ- এবার অলিম্পিকে ১৫০০ মিটারে একটি সোনা এনে দেবেন রজার!

আবারও মুখ থুবড়ে পড়া

কিন্তু না, রজার সেযাত্রা দেশবাসীর প্রত্যাশা মেটাতে পারেননি। অলিম্পিক কমিটি একদম শেষ মুহূর্তে ইভেন্টের সময়সূচী পরিবর্তন করে, ফলে রজারের ব্যায়াম ও বিশ্রামের শিডিউল ব্যহত হয়। সোনার পদক জেতার কথা যার, সেই রজার দৌড় শেষ করেন চতুর্থ অবস্থানে থেকে!

হতাশায় মুষড়ে পড়া রজার বারবার জীবনের নির্মম পরিহাসে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভাবলেন দৌড় নামক ভালবাসার আলয়টি মুছেই ফেলবেন মন থেকে চিরতরে।

জীবনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শপথ

প্রায় দুইমাস হতাশার চোরাবালিতে ডুবে থাকা রজার সিদ্ধান্ত নিলেন, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। বারবার জীবনের কাছে হার স্বীকার করার মানে হয়না। প্রবল পরাক্রমের সাথে জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে হবে -সংকল্প করলেন তিনি। মনে মনে খুঁজতে থাকলেন এমন অনতিক্রম্য কোন বাধা- যা পেরোনোর কথা কেউ কল্পনাও করেনি আগে।

চার মিনিটের জুজু

খ্রিষ্টপূর্ব ৭২০ অব্দে দৌড়কে প্রথম অন্তর্ভুক্ত করা প্রাচীন অলিম্পিয়ায় স্পোর্টস ইভেন্ট হিসেবে। তারপর হাজার বছর পেরিয়ে গেছে, অজস্র প্রতিবন্ধকতা হার মেনেছে মানুষের প্রচেষ্টার কাছে, কিন্তু একটি চ্যালেঞ্জ বরাবরই অধরা থেকে গেছে-

পৃথিবীর ইতিহাসে চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দৌড় সম্পন্ন করতে পারেনি কেউ কোনদিন।

যুগে যুগে শীর্ষ দৌড়বিদেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন এই মিথটিকে ভুল প্রমাণ করতে। ব্যাপারটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে বিজ্ঞানী স্বাস্থ্যবিদ সবাই সায় দেন- মানুষের যে শারীরিক কাঠামো, তাতে চার মিনিটের কমে এক মাইল অতিক্রম অসম্ভব।

কঠিন নয়,

বিপজ্জনক নয়,

বিলকুল অসম্ভব!

রজার ব্যানিস্টারের মাথায় ব্যাপারটা একদম পাকাপাকি ভাবে গেঁথে গেল।

সবাইকে ভুল প্রমাণের পালা

রজার ততদিনে ডাক্তার হওয়ার পথে অনেকদূর এগিয়ে গেছেন। নিজেই বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন, মানুষের পক্ষে অবশ্যই চার মিনিটের কম সময়ে এক মাইল দৌড়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব!

কিন্তু তার মতো অখ্যাত এক মেডিকেল স্টুডেন্টের কথা সবাই হেসেই উড়িয়ে দিল। তিনি তখন দাঁতে দাঁত চেপে সংকল্প করলেন, নিজেই দৌড়ে সবাইকে ভুল প্রমাণ করবেন।

অনিশ্চয়তার দোলাচলে পেন্ডুলামের মতো দুলতে লাগলো তার মন

প্রচলিত অনুশীলনে রজারের ভরসা ছিল না। তিনি নিজে অভিনব এক পন্থায় নিবিড় অনুশীলনে মগ্ন হলেন। ধীরে ধীরে ফলাফল চোখের সামনে ফুটতে শুরু করলো। মেডিকেলের পড়াশোনার পাশাপাশি দৌড়ের অনুশীলনের অমানুষিক পরিশ্রম অবশেষে সার্থক। রজার আজ তৈরি পৃথিবীকে এক অপার বিস্ময় উপহার দিতে!

ঝড়ো হাওয়ার দাপটে এলোমেলো স্বপ্ন

১৯৫৪ সালের ৬ই মে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রেকর্ড ভাঙা একটি দৌড়ের জন্য প্রয়োজন আদর্শ পরিবেশ- বাতাসের দাপট থাকবে না, পথ হবে শুকনো খটখটে, দৌড়বিদদের উৎসাহ দেবার জন্য থাকবে বিপুল সংখ্যক দর্শক!

কিন্তু সেই দিনটি ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, পথ ভিজে আছে পানিতে, কনকনে হাওয়া বইছে, এবং দর্শক সমাগত হয়েছে টেনেটুনে হাজার তিনেকও হবে না।

রজার তখনও মেডিকেলে ডিউটি করছেন। জানালা দিয়ে দমকা হাওয়ার দাপট তার বুকের ভিতরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিলো। দৌড়ের জন্য এর চেয়ে বাজে পরিবেশ আর হয়না। অনিশ্চয়তার দোলাচলে পেন্ডুলামের মতো দুলতে লাগলো তার মন, তবে কি জীবনের খেলায় হাল ছেড়ে নতি স্বীকার করে নেবেন আবারও?

বুকে বিশ্বাস যদি থাকে

রজার তবু মনের সবটুকু জোর করে সিদ্ধান্ত নিলেন দৌড়ে অংশগ্রহণ করবেন। রেসট্র‍্যাকে যখন তিনি পৌছালেন, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। দমকা হাওয়া বইছে আকাশে। রজার একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, “আমি আজ যা করতে চাই তা মানুষের সাধ্যের বাইরে। আমার পায়ের পেশিতে যদি না কুলায়, তবে আমার হৃদয় আমার শরীরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই দৌড়ে যদি আমার মৃত্যুও ঘনিয়ে আসে, তবে ইতিহাস রচনা করেই ফিনিশিং লাইনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো!”

ছয়জন বাঘা বাঘা প্রতিযোগীকে নিয়ে শুরু হলো দৌড়। রজার সবার সামনে ছিলেন। তাকে টপকে আরেক প্রতিযোগী এগিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আরও একজন! শঙ্কিত হয়ে পড়লেন রজার। প্রাণপণ দৌড়ে আবার সবাইকে পেছনে ফেলে সামনে তিনি। ঐযে দেখা যায় ফিনিশিং লাইন। কিন্তু পা যে আর চলছে না! রজারের মনে জ্বলে উঠলো জীবনের যত বঞ্চনা আর হাহাকারের আগুন। “পারতে আমাকে হবেই!” বুকে বারুদের তেজ নিয়ে ছুটে চললেন তিনি। সবার আগে ফিনিশিং লাইন ছুঁয়ে দর্শকের আলিঙ্গনে সিক্ত হলেন তিনি, বুক তখনও হাঁপরের মত উঠানামা করছে। পৃথিবী যেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার অধীর উৎকণ্ঠা ফলাফলের অপেক্ষায়।

ধারাভাষ্যকার ঘোষণা করছেন মাইকে, “প্রথম হয়েছে রজার ব্যানিস্টার! তার সময় লেগেছে তিন মিনিট..”

তারপরের কথাটুকু চাপা পড়ে গেল সহস্রাধিক জনতার বিজয়োল্লাসের হুংকারে! ইতিহাস আজ বদলে গেছে চিরদিনের জন্য! রজার অবশেষে বিজয় করেছেন হাজার বছর ধরে টিকে থাকা এই প্রতিবন্ধকটিকে!

রজারের সময় লেগেছিল ৩ মিনিট ৫৯.৪ সেকেন্ড!

মধুরেণ সমাপয়েৎ

এই অসাধ্য সাধনের পর রজার ব্যানিস্টারকে আর কখনো ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি পড়ালেখা শেষ করে একজন বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্ট হন এবং নার্ভাস সিস্টেমের উপর গবেষণায় অসামান্য অবদান রাখেন। পৃথিবী বদলে দেওয়া এসকল অনন্য কীর্তির জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে “স্যার” খেতাব দেয়।

মজার ব্যাপার হলো তার চার মিনিটের কমে এক মাইল দৌড়ানোর রেকর্ড মাত্র ৪৬ দিন পরই আরেক দৌড়বিদ ভেঙে দেন! এবং তারপর আরো বহু দৌড়বিদ চার মিনিটের অনেক কম সময় নিয়ে এক মাইল দৌঁড়েছেন! প্রশ্ন জাগে মনে, তবে এতদিন কেন কেউ এ কীর্তি গড়তে পারেননি?

উত্তরটা খুব সহজ- “বিশ্বাস”

স্যার রজার ব্যানিস্টারের অটল বিশ্বাস ছিল তিনি পারবেন। বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়ে মানুষ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে, ইতিহাস তার সাক্ষী হয়ে রইলো।

স্যার রজার ব্যানিস্টার আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেলেন, লক্ষ্য যতই দুরূহ হোক, কখনো বিশ্বাস হারিয়ো না। বিশ্বাস থাকলে বিজয় আসবেই!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.