পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং নিয়ে যে সকল তথ্য তোমার জানা থাকা জরুরি

June 18, 2019 ...

কয়েকটি ভিন্ন পরিবেশে এবং ভিন্ন পরিস্থিতির মাধ্যমে তিনটি গল্প উপস্থাপন করি।

১. সাইফুদ্দিন নিজের ও তার পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমাচ্ছে কাজের জন্য। গন্তব্য দুবাই। বাংলাদেশের সরকার থেকে দুবাই যাওয়ার ভিসা সে আগেই নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো দুবাই নেমে। সাইফুদ্দিন দুবাই কেনো এসেছে, এখানে সে কোথায় থাকবে, কতদিন থাকবে এরকম নানা প্রশ্ন করা শুরু হলো তাকে। নিরাপত্তার খাতিরে সব প্রশ্নের উত্তরই তাকে দিতে হলো। না হলে যে সে আর এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে পারবে না।

২. তেমন কোনো জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই “ওয়েলকাম টু মালয়শিয়া” বলে সামনের জনের পাসপোর্টটি এগিয়ে দিলো রিসিপশন থেকে। কিন্তু তারেক যখন গেলো তখন তাকে হতে হলো নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। যদিও সে আগের জনের মতোই ছুটি কাটাতে এখানে এসেছে, কিন্তু তার ব্যাপারে কেনো যেনো বাড়তি সতর্কতা। কোন হোটেলে উঠবে, কতোদিন থাকবে, কোথায় কোথায় যাবে বলে ঠিক করেছে এসব কিছুর উত্তর তার দিতে হচ্ছে।

৩. ভ্রমণের জন্য মালদ্বীপ যাচ্ছে সিয়াম। ইমিগ্রেশনে যাওয়ার আগে সে অন অ্যারাইভাল ভিসার জন্য আবেদন করলো এবং প্রায় সাথে সাথেই ভিসা পেয়ে গেলো। প্রায় কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই সে ৩০ দিনের জন্য মালদ্বীপ ভ্রমণের ভিসা পেয়ে গেলো।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নতুন পাসপোর্ট – Dhaka Tribune

তিনটি গল্পের পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এই ঘটনাগুলোর পিছনে যা কাজ করছে, তা হলো ভ্রমণকারীদের পরিচয় বাহক। অর্থাৎ তাদের পাসপোর্ট। বিদেশে থাকার সময় অন্যদের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো পাসপোর্ট। একই পাসপোর্ট দিয়ে তুমি দুই জায়গায় দুই রকম আচরণ পেতে পারো। আবার একই পাসপোর্ট ব্যবহার করে একই জায়গায় দুইজন ব্যক্তি দুই রকম আচরণ পেতে পারে। এখানে চলে আসে পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং এবং এর বাহকের পরিচয়ের ব্যাপারটি।

একটু ভেঙে বলি। শুরুতে পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং নিয়ে বলা যাক। পাসপোর্টের এই র‍্যাঙ্কিং দিয়ে মূলত পরোক্ষভাবে বাহকের নাগরিকত্ব মূল্যায়ন করা হয়। এর মাধ্যমে জানা যায় বাহকের দেশের প্রতি অন্য দেশগুলোর মূল্যায়ন বা দৃষ্টিভঙ্গি কেমন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক সংস্থা হেনলি অ্যান্ড পাসপোর্ট পার্টনার্স এই র‍্যাঙ্কিংটি তৈরি করে থাকে। র‍্যাঙ্কিংটি করা হয় মূলত ভিসা পলিসির উপর নির্ভর করে।

প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে হেনলি অ্যান্ড পাসপোর্ট পার্টনার্স বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে থাকে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (IATA) এর কাছ থেকে। তাদের থেকে পাওয়া তথ্যের পাশাপাশি ১৯৯টি ভিন্ন পাসপোর্ট এবং ২২৭টি ভ্রমণযোগ্য স্থানের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া হয়। বিশ্বাসযোগ্য সকল মাধ্যমের থেকে তথ্য নিরীক্ষণের পরে এই পাসপোর্টের র‍্যাঙ্কিং করা হয়। এই র‍্যাঙ্কিং তৈরি করতে তাদের প্রায় পুরো বছর সময় লেগে যায়।

hC4zaBHTcctS Bv0BRH36xdvmhpDl8dgrLmVa7AZ1qdhtyvFwLDUoCpWAmZcOovviJ5otAVKBOSczNw1k 5yhqjZYnYeZg1qBPP3NieezsTn11gWto5oSocW9FwZh6vYtLJKEiMAo7L7HYfqFw
International Air Transport Authority – www.iata.org

এখন কথা হলো র‍্যাঙ্কিংটি কীভাবে করা হয়? কোনো একটি দেশে বা অঞ্চলে ভ্রমণের জন্য যদি পাসপোর্টের বাহকের কোনো ভিসা দরকার না হয় অথবা যদি অন অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা পায়, তাহলে সেই পাসপোর্ট পায় ১ পয়েন্ট। আর যদি কোনো দেশে ভ্রমণের জন্য ভিসার দরকার হয়, তাহলে পায় ০ পয়েন্ট। এভাবে সব ভ্রমণ অঞ্চল মিলিয়ে যেই পাসপোর্টের ভিসা ফ্রি স্কোর (VFS) যতো বেশি, তার র‍্যাঙ্কিংও ততো উপরের দিকে। আর এভাবেই তৈরি হয় পাসপোর্ট পাওয়ার র‍্যাঙ্ক।

২০১৯ সালের পাসপোর্ট পাওয়ার র‍্যাঙ্ক-এ বাংলাদেশের VFS বা ভিসা ফ্রি স্কোর হলো ৪১। অর্থাৎ ২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশকে ৪১টি দেশ ভিসামুক্ত ভ্রমণ অথবা অন অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা দিচ্ছে। এই স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পাওয়ার র‍্যাঙ্কিং এর বর্তমান অবস্থান হলো ৯৭। সময়ের সাথে সাথে সংখ্যাটি পরিবর্তিত হয়। দুটি দেশের মাঝে কূটনীতিক সম্পর্ক কেমন তার উপর নির্ভর করে দেশ দু’টি তাদের নাগরিকদের ভিসা মুক্ত ভ্রমণের সুবিধা দিবে কি দিবে না।

NQHdNFTWHqqNcAWk3rgC42Rj2cw2YralyowGbTH4DeTDmIvJ0o2QphLdO1e2vvlfb 4MCN Znm6GwQ8Wtah9cRFlQvFu0P QEvwJLHHDqihDEFkZaM4HKO4XgSwf5oJKDrdnsQ3WmhqFAHgIA
Henley & Partners এর সমাবেশ – Henley & Partners

পাসপোর্ট র‍্যাঙ্কিং এর জন্য আরেকটি বিষয় বিবেচনা করা হয় এবং তা হলো পাসপোর্টের গুণগত মান। কোনো একটি পাসপোর্টের মান যতো ভালো হবে, তা নকল করা ততো কঠিন। সেই সাথে ঐ পাসপোর্টের দামও জড়িত। পাসপোর্টের দাম ও মান থেকে বোঝা যায় সেই দেশের আর্থিক অবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা কীরকম। বাংলাদেশের পাসপোর্ট প্রিন্টিং এর কাজ করে “Polish Security Printing Works”।

খরচের কথা বিবেচনা করলে তা পাসপোর্ট ডেলিভারি সময়ের উপর নির্ভর করে। সাধারণ আবেদনে পাসপোর্ট পেতে ২১ দিন সময় লাগে এবং ভ্যাট সহ এর খরচ পরে ৩,৪৫০ টাকা। জরুরি ভিত্তিতে আবেদন করলে পাসপোর্ট ফিস দিতে হয় ভ্যাট সহ ৬,৯০০ টাকা, যা ৭ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। পাসপোর্ট রি-ইস্যু করার বেলাতেও একই পরিমাণ খরচ ও সময়ের হিসাব করা হয়। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্ট রি-ইস্যু করার বেলায় মেয়াদ পরবর্তী প্রতি বছরের জন্য ৩৪৫ টাকা করে সাধারণ ফিস দিতে হয়।

পাসপোর্ট ফিস জমা দিতে হয় সোনালি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক এবং ট্রাস্ট ব্যাংকের যে কোনো একটিতে। আর আবেদন করার জন্য অঞ্চলভিত্তিক আলাদা আলাদা পাসপোর্ট অফিসও আছে। বাংলাদেশ সরকারের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট www.dip.gov.bd  ভিজিট করলেই এর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারবে।

বাংলাদেশের তিন ধরণের পাসপোর্ট – Dhaka Tribune

এবার আসি বাহকের পরিচয়ের ব্যাপারে। বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য তিন ধরণের পাসপোর্ট সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে। সবার আগে আসে সাধারণ পাসপোর্ট, যেটি হলো সবুজ কভারের। এটি দেশের সাধারণ নাগরিকদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভ্রমণে যেমন, ছুটি কাটানো, পড়াশোনা কিংবা কোনো ব্যবসায়িক ভ্রমণের কাজে লাগানো হয়। এরপর হলো সরকারী পাসপোর্ট। বাংলাদেশ সরকারের অধীনে যতো সরকারী কর্মকর্তা রয়েছেন, তারা বৈদেশিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই পাসপোর্টের সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর কভার হলো নীল রঙের। এরপর হলো কূটনৈতিক পাসপোর্ট। বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের সকল সরকারী সদস্য এই পাসপোর্ট ব্যবহারের সুবিধা পান, যার কভার হলো লাল রঙের। মূলত পাসপোর্টের কভার দেখেই অনেক সময় বাহকের নাগরিকত্ব যাচাই করা হয়।

mQtPowyGMo6ZemwkD7O 6vftNJ5gFBvTqxpbs4EwY9XUk1AEWA4ujK Js49zC3FWoEb3Aie48D5yYQ3NmY SrkN5QxDzJud6IrGpiTe7ScTO59rcevpvgWWtjC2p3xO E5GwgWW 3IPznMnslQ
পাসপোর্ট বানাতে তোমার যা যা লাগবে – Just Ask Gemalto EN

এখন পাসপোর্ট র‍্যাঙ্কিং এর সাথে যেহেতু ভিসা ফ্রি স্কোর জড়িত, তাই যে সকল দেশ বাংলাদেশকে ভিসা ফ্রি ভ্রমণের সুবিধা দেয় এবং কীভাবে ভিসা ফ্রি ভ্রমণ করা যায় তা একটু জানা দরকার। আগেই বলেছি বাংলাদেশকে বর্তমানে ৪১টি দেশ ভিসা মুক্ত ভ্রমণ বা অন অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা দিচ্ছে। যে সকল দেশ আমাদের ভিসা মুক্ত ভ্রমণের সুবিধা দিচ্ছে, তাদের তালিকা হলো – বাহামাস, বার্বাডোজ, ভুটান, ডমিনিকা, ফিজি, গামবিয়া, গ্রেনাডা, হাইতি, ইন্দোনেশিয়া, জ্যামাইকা, লেসথ, মাইক্রোনেশিয়া, সেইন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, সেইন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্যা গ্রেনাডিন্স, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো এবং ভানুয়াটু। আর যেসকল দেশ অন অ্যারাইভাল ভিসার সুবিধা দেয় সেগুলো হলো, বলিভিয়া, ক্যাম্বোডিয়া, ক্যাপ ভার্ডে, কমোরোস, জিবুতি, ইথিওপিয়া, গাবন, গিনি-বিসসাও, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মাওরিতানিয়া, মোজাম্বিক, মায়ানমার, নেপাল, কাতার, রাওয়ান্ডা, সামুয়া, সেচেলেস, সোমালিয়া, তৈমুর-লিসত, টোগো, টুভ্যালু, উগান্ডা এবং উজবেকিস্তান।

এসকল দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের দেশ থেকে কোনো ভিসার আবেদন করতে হবে না। পাসপোর্টের মেয়াদ ৬ মাস থাকতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, রিটার্ন টিকেট এবং অন্তত ৫০০ মার্কিন ডলার নিয়ে যেই দেশে ভ্রমণ করতে চাও, সেই দেশে যেতে হবে। এরপর ইমিগ্রেশনে যাওয়ার আগে রিসিপশন থেকে অন অ্যারাইভাল ভিসার আবেদন করতে হবে এবং প্রায় সাথে সাথে তুমি নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য সে দেশে ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে যাবে। দেশভেদে ভ্রমণকালের সময়সীমা কমবেশি হতে পারে। এই সময়সীমা ১ সপ্তাহ থেকে ৯০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। তবে তা নির্ভর করে কোন দেশ কেমন সুবিধা দিচ্ছে।

অর্থাৎ আমাদের পাসপোর্ট র‍্যাঙ্কিং কতো তার উপর নির্ভর করছে আমরা অন্যান্য দেশে ভ্রমণের সময় কীরকম সুবিধা পাবো বা কীরকম জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হবো।

রেফারেন্স –

  1. https://www.passportindex.org/about.php
  2. https://www.dhakatribune.com/bangladesh/2016/09/17/powerful-bangladeshi-passport/
  3. https://csglobalpartners.com/visa-free-travel-mean/
  4. https://www.henleypassportindex.com/methodology
  5. https://ipfs.io/ipfs/QmXoypizjW3WknFiJnKLwHCnL72vedxjQkDDP1mXWo6uco/wiki/Bangladeshi_passport.html

 

আপনার কমেন্ট লিখুন