প্যারালাল ইউনিভার্সের অস্তিত্ব: বিজ্ঞান কী বলে? দ্বিতীয় পর্ব

March 9, 2019 ...

প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে লেখা এর আগের পর্বটিতে আমরা দেখেছি কোয়ান্টাম মেকানিক্স এ কেট এর গল্পে কীভাবে বিড়ালকে ‘Zombie Cat’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। যেখানে বিড়ালটি একই সাথে বাক্সের ভিতর জীবিত এবং মৃত থাকে।

এই কোয়ান্টাম Zombie বিড়াল থেকে কী করে প্যারালাল ইউনিভার্স আর মাল্টিভার্স এর ব্যাপার বোঝা যায় চলুন দেখে নেয়া যাক-

কোয়ান্টাম ধারণা:

আপনারা হয়ত কোয়ান্টাম বিড়াল এর গল্পটা নিয়ে বেশ সন্দেহে পড়েছেন। আমরা কি কখনো অর্ধেক জীবিত-অর্ধেক মৃত বিড়াল দেখেছি? দেখিনি তো! এমনকি আপনারা হয়ত এটাও বলে ফেলতে পারেন, “যেহেতু এমন Zombie বিড়াল কখনও দেখিনি, সেহেতু কোয়ান্টাম মেকানিক্স কাজ করে না। এইসব গল্প শুনে লাভ নেই”

কিন্তু আমরা আজ অবধি যত রকমের পদার্থবিদ্যার তত্ত্ব পেয়েছি তার মাঝে কোয়ান্টাম মেকানিক্সই ইউনিভার্স এর সর্বোৎকৃষ্ট ধারণা করে থাকে। এজন্য কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর কথাগুলো হেলাফেলা করবার মত নয়। আর সেকারণেই এই কোয়ান্টাম বিড়ালকে আমাদের প্যারালাল ইউনিভার্স এর ব্যাখ্যা থেকে ছুঁড়ে ফেলবার উপায় নেই।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স কেনো বলছে যে বাক্সে একটি Zombie বিড়াল আছে যেটিকে কেউ দেখেনি এটা আমাদের কোনো না কোনোভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। আর এই কাজটির জন্য আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন নিলস বোর। প্রথমবারের মত বোরই এই কোয়ান্টাম বিড়াল এর সমস্যা সমাধানে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন।

ভাষান্তরিত করে বোর এর কথাগুলো হচ্ছে, “আমি কখনও এমন ভূতুড়ে কোয়ান্টাম বিড়াল দেখিনি। কিন্তু গাণিতিক হিসেব দেখে বোঝা যাচ্ছে যে সেখানে একটি অদ্ভূত বিড়াল আছে। অর্থাৎ আমার মাঝেই বিশেষ কিছু আছে যেটি আমি বাক্সের দিকে তাকালেই বিড়ালটিকে জীবিত বা মৃত – যেকোন একটি অবস্থা বেছে নিতে বাধ্য করছে। আমি যখন বাক্সের দিকে তাকাচ্ছি, তখনই বিড়ালটি কোনভাবে জীবিত বা মৃত অবস্থা থেকে হয়ত জীবিত নয়ত মৃত অবস্থা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু একইসাথে জীবিত ও মৃত অবস্থাতে থাকছে না।”

Gpx61L44axJD6QreAGCDLFcFOOMwlzPjh7qaDf2tzlkpxC9LG WZZdvTW3xmJiW3YQsO0IRNGYT6evWf1MAvwiZGvizUWMA2NYB44zw6Ih 7bNBqiuH5vCISkk5fAi5aOBq9m2r

বোরের মতে, কেউ একজন যখন বাক্সের এই প্রক্রিয়াটির দিকে তাকায় তখন সেটিতে একটি অবস্থা ঘটে। আর অনেকটা জাদুর মত জীবিত-মৃত এর দুইটি অবস্থা থেকে যেকোন একটি অবস্থা ঘটে। যদিও এটা দিয়ে বোঝা যায়না আমরা ঠিক কী কারণে এই কোয়ান্টাম অর্ধেক মৃত অর্ধেক জীবিত বিড়াল দেখতে পাইনা। তবুও অনেকেই এই কোয়ান্টাম বিড়াল এর সমস্যা নিয়ে এত বেশি চিন্তায় পড়ে যায় যে, তারা বোরের এই সমাধানকেই বেছে নেন।

কিন্তু বোরের এই ব্যাখ্যাতেও বেশ কিছু প্রশ্ন ছিল। যেগুলোর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এগুলো হচ্ছে-

১. মানুষ তাকানোর পরেই কী করে কোয়ান্টাম এর মত অবস্থা একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় চলে যায়? অর্থাৎ ইলেকট্রন, ডিটেক্টর, বন্দুক, বিড়াল – আলাদা আলাদা ভাবে কোয়ান্টাম অবস্থায় চলে গিয়ে বিড়াল এর জীবিত বা মৃত থাকার অবস্থা কীভাবে সৃষ্টি হয়?

২. বিড়ালটির কি কোনো ক্ষমতা আছে যে কারণে ইলেকট্রন, ডিটেক্টর বা বন্দুক একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় চলে যায়?

৩. ডিটেক্টর বা বন্দুক কেন ইলেকট্রন এর মত অবস্থায় যেতে পারে না?

অনেকেই এর মাঝে প্রথম প্রশ্নটির বেশ কিছু উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের উত্তরগুলো অনেকটা এরকম যে, বিড়ালের এই জীবিত বা মৃত থাকার অবস্থাটা মানুষের খেয়াল করার ফলেই সৃষ্টি হয়। আবার অনেকে বলেছেন যে, মানুষ পর্যবেক্ষণ করতে গেলেই সেটি বাক্সের ভিতরকার কোয়ান্টাম অবস্থাকে যেকোন একটি অবস্থায় পাঠিয়ে দেয়।

উত্তরগুলো শুনে অনেকটা ধাঁধার উত্তরে ধাঁধা শোনানোর মত অবস্থা মনে হতে পারে। এছাড়া আমাদের কাছে এখনও দ্বিতীয় এবং তৃতীয় প্রশ্নটি ধোঁয়াশার মত লাগছে। তাহলে কীভাবে এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমরা পেতে পারি?

এক শব্দে এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে-

“মাল্টিভার্স”

5Q2pYP z7qFEX dRfvYxvP wk3ueEQMg3a2gUJ7yjTM RUQNa8mYv3hLSugAOaQKTGzec9vO62S8PMVlrkMSp9 ta ZaQtCno gNDkKF5Aqv2Is3vVLDYrgUznST0paQZED2W5CX

 

মাল্টিভার্স:

১৯৫০ সালে হিউ এভারেট থ্রি নামের এক ব্যক্তি আমরা কেন আমাদের আশেপাশে ‘Zombie Cat’ দেখতে পারিনা তার একটি ব্যাখ্যা দিলেন।

এভারেট এর মতে আমাদের নিজেদেরকে কিংবা পর্যবেক্ষককে বিশেষ কিছু ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং আমাদের নিজেদেরকেও ইলেকট্রন, ডিটেক্টর, বন্দুক আর বিড়ালের মত একটি কোয়ান্টাম বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা উচিৎ।

এখন আমরা আমাদের সেই কোয়ান্টাম বিড়াল এর বাক্সটিকে নিই। এবং আলাদাভাবে পর্যবেক্ষককে  সেখানে যুক্ত করি। কেট চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করি যে পর্যবেক্ষক কোয়ান্টাম অবস্থায় আছেন। আর তিনি এখনও বাক্সের ভেতরে তাকাননি এবং তিনি জানেন না যে বাক্সের ফলাফল কী।

পর্যবেক্ষক বাক্সে তাকিয়ে দেখার আগে বাক্সের অবস্থা যেমন থাকবে-

CRM qXvUyc0z2yP8Rs eOJl18caLKvb9ny8DWd0FH6Iwb5FpfgaHw5pIQ3R83 4Nt I1tH nzhVTW9adQcGz5n3dUuvyvWuzDVeZLkPG8U5TD2CLfXfutQxUOOn W2OOlriq0Omj

এখন তিনি বাক্সের ভিতর তাকিয়ে দেখেন এবং ডিটেক্টর, বন্দুক আর বিড়ালের মতই দুইটি ভাগে ভাগ হয়ে যান। অন্য কোয়ান্টাম বস্তুগুলোর মত তারও আরেকটি প্রতিরূপ সৃষ্টি হয়। যেখানে ফলাফল হিসেবে একজন দেখেন মৃত বিড়াল আর আরেকজন দেখেন জীবিত বিড়াল।

JsQYbSQpF2asglIq01aHZnOw W d8APLzP8bRsQGB2aFspRSqQOETjFzasXOmUWYe88aRuSCrr49JQYqVsiXiwRokPMQPCovP LWFI3BmdnfLUnUDds Z1V FGSuJ8n0giNJd7e

এখন মনে করুন আপনি পর্যবেক্ষক এর দুইটি প্রতিরূপকেই জিজ্ঞেস করলেন যে, পরীক্ষাটির ফলাফল কী ছিল। বিড়ালটি কি মারা গিয়েছিল? একজন বলবে – হ্যাঁ, মারা গিয়েছিল আর আরেকজন বলবে – না, মারা যায়নি।

পর্যবেক্ষককে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে তিনি একইসাথে বিড়ালটিকে জীবিত আর মৃত দেখেছেন কিনা তবে হয়ত তিনি প্রশ্নকর্তাকে পাগল ভাবতে পারেন।

কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর সূত্র অনুযায়ী আমরা জানতে পারছি যে, পরীক্ষা শেষে ফলাফল হিসেবে জীবিত ও মৃত – দুই রকমের বিড়ালই সেখানে আছে। কিন্তু প্রতিবারই পর্যবেক্ষক কেবল এক ধরণের বিড়ালকেই দেখতে পারবেন। তিনি হয় জীবিত বিড়াল দেখবেন, নয়ত মৃত বিড়ালকে। কখনোই তিনি একইসাথে জীবিত ও মৃত বিড়াল দেখতে পারবেন না।

এভারেট এর মতে, পর্যবেক্ষক বাক্সে তাকিয়ে দেখার সাথে সাথেই আলাদা আলাদা সময়রেখায় বিভক্ত হয়ে যান এবং একজন আরেকজনকে দেখতে পারেন না। আর এতে করে একজন কেবল একটি ফলই দেখতে পারেন। আর সে কারণে আমরা কখনোই একইসাথে জীবিত ও মৃত বিড়াল দেখতে পারি না।

এতক্ষণ পর্যন্ত যে কথাগুলো বলছিলাম সেখানে কেট দিয়ে দুইটি আলাদা অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছিল যেখানে একটি বিড়াল জীবিত আর আরেকটি মৃত এবং এগুলোকে আলাদা সময়রেখায় হিসেব করেছি। কিন্তু আমরা এখানে ইউনিভার্স শব্দটি অনায়াসেই ব্যবহার করতে পারি। কারণ বাক্সে তাকানোর সাথে সাথেই আরেকটি ইউনিভার্স এ সময়রেখা তৈরির মত অবস্থা তৈরি হচ্ছে। আর এটিকে প্যারালাল ইউনিভার্স এর ব্যাপার বলা চলে। যেহেতু ইলেকট্রন আর অন্য সকল কণা এভাবে আমাদের আশেপাশে ঘুরছে সেহেতু আমাদের দৈনন্দিন কাজের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য ফলাফলে এমন আলাদা সময়রেখা তৈরি হচ্ছে। সব রকমের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে তৈরি হওয়া মাল্টিভার্স বেড়ে চলেছে ক্রমাগত।

চলুন প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে কিছু মতবাদ আর মতবিরোধ জানার আগে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা জেনে নিই যেগুলোকে এখনও প্যারালাল ইউনিভার্স এর কারণে ঘটেছে বলে মনে করা হয়।

রহস্যময় লোক:

১৯৫৪ সালে টোকিও শহরের হানেডা বিমানবন্দর এর একটি কর্মব্যস্ত দিন। সবকিছু বেশ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। একটি ইউরোপিয়ান বিমান যাত্রীদের নামিয়ে দিলে কাহিনীর শুরু। যাত্রীরা কাস্টমস এ পৌঁছালে পরিপাটি পোশাক পরিহিত এক মধ্যবয়সী লোক কাস্টমস এর কর্মকর্তাদের জানালেন যে, তিনি ব্যবসার খাতিরে জাপানে এসেছেন। সে বছরে তিনি আরও দুইবার এসেছিলেন জাপানে। লোকটির প্রধান ভাষা ফরাসি হলেও তিনি জাপানিজ ভাষায় কথা বলছিলেন। এছাড়া তিনি আরও বেশ কয়েকটি ভাষা জানতেন। তার মানিব্যাগ এ থাকা বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোর মুদ্রা দেখে বোঝা যায় যে তিনি নিয়মিতই বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেন।

irt1s3VQwBlestUOTaN4DeAWNWhDD38MjDN7Ch 5GrqHGUbbSFIMtjYtTCU4CCicDhW1

যখন তাকে তার দেশ কোথায় এটি জিজ্ঞেস করা হয় তখনই গোলমেলে ব্যাপারটি শুরু হয়। লোকটি বেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই উত্তর দিলেন তার দেশের নাম টরেড। এটি ফ্রান্স আর স্পেন এর সীমানা ঘেষে অবস্থিত। তার উত্তর শুনে কর্মকর্তারা নিজেদের মাঝে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তারা লোকটিকে বললেন যে, টরেড নামের কোনো দেশ নেই। কর্মকর্তাদের কথা শুনে লোকটি তার পাসপোর্ট বের করে তাদেরকে দেখান। পাসপোর্টটি ইস্যু করা হয়েছে সেই টরেড দেশটি থেকে যেটির কোনো অস্তিত্বই নেই। এমনকি তার সেই পাসপোর্ট এ জাপান ও অন্যান্য দেশগুলোতে ব্যবসার জন্য যাতায়াতের ভিসা স্ট্যাম্প লাগানো।

পাসপোর্ট এর এই ব্যাপারটি নিয়ে সেখানকার কর্মকর্তারা যারপরনাই অবাক হলেন। তারা লোকটির যে কোম্পানির সাথে সাক্ষাৎকার এর কথা সে কোম্পানির নাম আগে কখনও শোনেননি। লোকটি যে হোটেলে তার থাকার জন্য রুম রিজার্ভ করে রেখেছেন সে হোটেলে তার নামে কোনো রিজার্ভেশন নেই। এমনকি লোকটির কাছে থাকা চেকবুকে যে ব্যাংক এর নাম ছিল সেই নামেও কোনো ব্যাংক নেই।

3DRRdCwiyaORG l12i09tFdmc1ETCgDnK8WxA1IIMUFBTeB1VGimFeDfYXJGaERG2BGYsmoI b623yyXyJ pHKVrWtzcz qIUjb6N8QUZDM XvdsbUwAchq3tRvK1Jk2yFtTSdQp

কাস্টমস এর কর্মকর্তাগণ তাকে একটি বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে অ্যান্ডোরা দেশটি দেখালেন। তারা ভাবছিলেন লোকটি খুব সম্ভবত অ্যান্ডোরা থেকেই এসেছে এবং কোনোভাবে মজা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু লোকটি মানচিত্রটি দেখে হতচকিত হয়ে যান। তিনি বলেন কয়েক হাজার বছর ধরে তার দেশ টরেড আছে সেখানে, অ্যান্ডোরা কী করে এলো। লোকটিকে সেই অবস্থাতেই কাস্টমস এর লোক পার্শ্ববর্তী হোটেল এর একটি রুমে সেই রাতের জন্য রাখেন।

                                        অ্যান্ডোরার মানচিত্র; যেটিকে টরেড ভাবা হয়।

পরের দিন সকালে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। সারা রাত ধরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারি আর পাহারা থাকার পরেও লোকটি তার ঘরের ভিতর থেকে উধাও হয়ে যায়। ব্যাপারটি আরও ধোঁয়াশায় পরিপূর্ণ হয় যখন দেখা যায় যে, বিমানবন্দর এর নিরাপত্তা কক্ষ থেকে লোকটির ব্যক্তিগত কাগজপত্র, রহস্যময় দেশ টরেড থেকে ইস্যু করা পাসপোর্ট আর ড্রাইভিং লাইসেন্স উধাও হয়ে গেছে। পুলিশ আর বিমানবন্দরের কর্মকর্তাগণ লোকটিকে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও পাননি। শেষমেশ ব্যাপারটা এমন দাঁড়ালো যে, মনে হতে পারে এই ঘটনাটি কখনও ঘটেইনি।

ঘটনাটিকে এখনও অনেকে প্যারালাল ইউনিভার্স এর কারণে ঘটেছে বলে মনে করে। প্যারালাল ইউনিভার্স এ শুধু একই দেখতে জায়গাই নয় বরং আমাদের মত দেখতেই মানুষ রয়েছে। এদেরকে ব্রায়ান গ্রিন তাঁর ‘দ্য হিডেন রিয়্যালিটি’ বই এ ‘ডপলগ্যাংগার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে তত্ত্ব:

এতদিন প্যারালাল ইউনিভার্সকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হিসেবে অনেকে চালিয়ে দিলেও সেটির দিন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সম্প্রতি ‘ফিজিক্যাল রিভিউ এক্স’ জার্নালে প্রকাশিত কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর নতুন র‍্যাডিকেল থিওরিতে বলা হয় – অন্য ইউনিভার্স এর ব্যাপারগুলো সত্য এবং একটি বিশাল সংখ্যায় এই ইউনিভার্সগুলো রয়েছে।

এই থিওরি আবিষ্কারক বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের পরিচিত যে ইউনিভার্স, তার ওপরে অন্যান্য সব ইউনিভার্স একটি সূক্ষ্ম বিকর্ষণ বল প্রয়োগ করে, আর এ কারনেই কোয়ান্টামের জগত এতো অদ্ভুত আর দুর্বোধ্য। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির এক পদার্থবিদ প্রফেসর হাওয়ার্ড ওয়াইজম্যান হাফিংটন পোস্টকে একটি ই-মেইল এ বলেন যে, “কোয়ান্টামের ব্যাপারে যে কোনো ব্যাখ্যা শুনতে উদ্ভট লাগবে, আর গতানুগতিক কোয়ান্টাম মেকানিক্স আসলে কোনো ব্যাখ্যাই দিতে পারে না, তা কেবল ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্টের ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে।”

“many interacting worlds”  থিওরি এর অন্যতম এই প্রবক্তা বলেন, “আমাদের এই ব্যাখ্যাটি হচ্ছে, আমাদের ইউনিভার্স এর আশেপাশে আরও অনেক প্যারালাল ইউনিভার্স রয়েছে যেগুলোর প্রত্যেকের মাঝে একটি সূক্ষ্ম সংযোগ বিদ্যমান।” এই থিওরিটি ১৯৫০ সালের কোয়ান্টাম মেকানিক্স থিওরি “many worlds interpretation” এর সাথে সম্পর্কিত।

ওয়াইজম্যান একটি লিখিত বক্তব্যে বলেন, “many worlds interpretation অনুযায়ী প্রতি বার একটি কোয়ান্টাম পরিমাপ করার ফলে একটি ইউনিভার্স থেকে আরও অনেকগুলো শাখা ইউনিভার্স তৈরি হয়। ফলে সমস্ত রকমের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়। এমনও কোনো একটি ইউনিভার্সের অস্তিত্ব থাকবে, যেখানে ডায়নোসর বিলুপ্তকারী গ্রহাণু পৃথিবী ঘেঁষে অন্য কোথাও চলে গেছে। কোনো এক ইউনিভার্স এ হয়ত অস্ট্রেলিয়াকে পর্তুগাল দখল করে রেখেছে। তবে যেহেতু এই ইউনিভার্সগুলো আমাদের ইউনিভার্সকে প্রভাবিত করে না, তাই সমালোচকেরা এসব নতুন ইউনিভার্সের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আর এখানেই আলাদা আমাদের many interacting worlds থিওরি।”

এই থিওরির প্রবক্তাদের মতে, মলিকুলার ডাইনামিক্সের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এই থিওরি যেটি কিনা রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই থিওরি যদি সত্যি হয় তাহলে মানুষ কখনো অন্য ইউনিভার্সের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে কিনা – এই প্রশ্নের উত্তরে ওয়াইজম্যান বলেন, এমন সম্ভাবনা তাদের থিওরির মাঝে অন্তর্ভুক্ত নয় বটে, কিন্তু তা এখন আর নিছক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে মতবিরোধ:

যদিও আমরা জানিনা আসলেই প্যারালাল ইউনিভার্স এর অস্তিত্ব আছে কি নেই, কিন্তু এটুকু এত বছরে জানা হয়ে গেছে যে অনেক মানুষ এই প্যারালাল ইউনিভার্স এর তত্ত্ব যে শুধু অবিশ্বাস করে না তা না; তারা এই প্যারালাল ইউনিভার্স এর তত্ত্বকে একেবারেই পছন্দ করে না। আর এজন্যই কোনো পদার্থবিদ যদি প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে বই লিখে, তবে একের পর এক লোকজন পদার্থবিদ এর কথা এবং বই এর লেখাগুলোকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দেয়।

বিশেষত প্যারালাল ইউনিভার্স এর প্রধান তত্ত্বটিতে উল্লেখ করা হয়েছে বিগ ব্যাং এর পর থেকে কণাগুলোর মাঝে বার বার করে বিন্যাস ঘটে চলেছে এবং আমাদের ইউনিভার্স এর বর্ধিত হওয়ার সাথে সাথে প্যারালাল ইউনিভার্স এর সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে বলা হয় যে আমাদের ইউনিভার্স এর বয়স মাত্র ১৪ বিলিয়ন বছর। অর্থাৎ যেটি অবশ্যই অসীম কোনো সংখ্যা নয়। এতে করে আমাদের আশেপাশের সেই কণাগুলোর নিজেদের মাঝে বিন্যস্ত হওয়ার পরিমাণ বা সংখ্যা অবশ্যই সসীম সংখ্যক। এতে করে অগণিত সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়ে প্যারালাল ইউনিভার্স এর জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

আবার এটা বলা হয় যে, বিগ ব্যাং এর পর থেকে ইউনিভার্স এর যে বর্ধিত হওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে তা সময়ের সাথে সাথে কমে এসেছে। আমাদের ইউনিভার্স এর ক্ষেত্রে এই বর্ধিত হতে থাকার অবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। তেমনি অন্যান্য ইউনিভার্স এর ক্ষেত্রে এই বর্ধিত হওয়ার হার আমাদের থেকে স্পষ্টতই আলাদা। আর সে হিসেবে অন্য ইউনিভার্সগুলোতে অর্থাৎ মাল্টিভার্স এ আমাদের মতই আরেকটি ইউনিভার্স বা প্যারালাল ইউনিভার্স থাকার সম্ভাবনা একেবারেই কমে যায়।

শেষের কথা:

প্যারালাল ইউনিভার্স নিয়ে যেমন বিভিন্ন তত্ত্ব হাজির করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, তেমনি এর বিপরীতে অনেক যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেখানো হয়েছে মতবিরোধ। আমরা জানিনা, আমাদের ইউনিভার্স এর বাইরে আসলেই আরও একটি বা কয়েকটি কিংবা শতশত পৃথিবী আছে কিনা। আমাদের এই ইউনিভার্স আর আমরা কি আসলেই অদ্বিতীয়? নাকি একই প্রশ্ন এই মুহূর্তে মহাকাশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা আমাদের প্রতিরূপরাও বসে বসে ভাবছে?

KCUVcj5pMrUZo nyMfLO 9syyv8PVoeMLy e3j7aYdk78HJ2u4 fwYeOobfm4YHeeutYrWkDDrCeo8Sh6Pgv1bcsbDYoUJm3qtC2mp8TUsJalLx8ZhaScLDgrdCz45kLN9Sg3i j

[Source: Shutterstock]

 

তথ্যসূত্র-

https://blog.usejournal.com/why-do-physicists-believe-in-parallel-universes-e16aee491f42

https://www.huffingtonpost.com/2014/11/04/parallel-universes-quantum-mechanics-theory_n_6091438.html

https://www.space.com/32728-parallel-universes.html

Book:

The Hidden Reality (Brian Greene)

আপনার কমেন্ট লিখুন