বিবিধ, বিজ্ঞান

তিনজন একইরকম দেখতে অপরিচিত মানুষের গল্প

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

অনেকেই বলে থাকেন যে একই চেহারার সাতজন মানুষ পৃথিবীতে আসে। এটা কি সত্য নাকি শুধুই আষাঢ়ে গল্প তা পরীক্ষা করার সুযোগ আমাদের কখনোই হয় নি। কিন্তু আমরা একই চেহারার দু’জন মানুষ প্রায়ই খুঁজে পাই। আমেরিকায় যমজ সন্তান জন্ম নেয়ার হার হল ৩%। যমজরা দেখতে একইরকম হবে এটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু যদি দু’জন অপরিচিত মানুষ হঠাৎ করে আবিষ্কার করে যে তারা দেখতে একই রকম, তাহলে এ ঘটনা কি পুরো বিশ্বকে অবাক করবে না? হ্যাঁ, ১৯৮০ সালে ডেভিড, এডি আর রবার্ট তাই অবাক করেছিলো পুরো পৃথিবীকে।

ডেভিড, এডি আর রবার্ট

১৯৮০ সাল, নিউইয়র্ক শহরের সালভিয়ান কান্ট্রি কমিউনিটি কলেজে ক্লাস করতে গেছে রবার্ট শাফরান। কিন্তু কোনো একটা অদ্ভুত কারনে তাকে সবাই এডি বলে ডাকছে। ছেলেমেয়েরা তাকে জড়িয়ে ধরছে, পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে। রবার্ট বুঝতে পারলো না কি হচ্ছে। সবাই তাকে এডি বলে কেন ডাকছে। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত যে এডি নামের মানুষটির চেহারার সাথে অবশ্যই তার চেহারার মিল ভীষণ!

এডি গ্যালান্ড ওই একই কলেজে পড়তো। রবার্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার আগের বছরই এডি কলেজ ড্রপ আউট হয়। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, রবার্ট আর এডির চেহারায় ভীষণ মিল! কোকড়ানো চুল থেকে শুরু করে চোখ, মুখ, চোয়াল… সব! যেন যমজ দুই ভাই! কিন্তু দুজন অপরিচিত মানুষের মধ্যে এরকম মিল থাকা কিভাবে সম্ভব? এই ধাঁধাঁর সমাধান করলো মাইকেল ডমনিটজ। সে ছিল রবার্টের রুমমেট। কাকতালীয় ভাবে, এডিও মাইকেলের সাথে একই রুমে থাকতো। মাইকেল জানালো যে রবার্ট আর এডির জন্মদিন আসলে একইদিনে। জুলাই ২১, ১৯৬১। এর মানে হল এডি আর রবার্ট আসলে যমজ ভাই, যাদের জন্মের পরই আলাদা করে দেয়া হয়েছিল।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

রবার্ট আর এডি দেখা করার পর আবিষ্কার করল, তারা শুধু দেখতেই এক না। তাদের আচার আচরণ, কথা বলার ধরণ, হাসি সবই একরকম। এবং তাদের দুজনকেই দত্তক নেয়া হয়েছিল। হতেই পারে যে তারা যমজ ভাই। তাই তারা ডি এন এ টেস্ট করলো এবং রেজাল্ট পেয়ে নিশ্চিত হল যে তারা দুজন ভাই।

কিন্তু রবার্ট বা এডি কাউকেই কখনও জানানো হয়নি যে তাদের ভাই আছে। যদিও তারা জানত যে তাদের দত্তক নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা বুঝতে পারছিলো না, ঠিক কী কারণে দুজন যমজকে আলাদা পরিবারে দত্তক দেয়া হবে। এমনকি তাদের পরিবারও জানত না যে তারা যে শিশুকে দত্তক নিচ্ছেন তার যমজ আছে।

লোকাল নিউজপেপারগুলো এই ঘটনায় ঠিক এরকমই বিস্মিত হয় যেমনটা তুমি হচ্ছ। তাই কদিনের মধ্যেই নিউজপেপারগুলো ছেয়ে যায় রবার্ট আর এডির ছবিতে!

প্রতি সকালের মতই ডেভিড, পত্রিকা উল্টাচ্ছিলো। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা ছবির দিকে। দু’জন ছেলে, তারই বয়সী এবং তার মত দেখতে! হ্যাঁ, তার মত দেখতে! একই চুল, নাক, চোখ, চোয়াল! ডেভিড তখনই দেখা করতে গেলো রবার্ট আর এডির সাথে! এরপর দেখা গেলো, ডেভিড, এডি আর রবার্টের ডি এন এ সম্পূর্ণ ম্যাচ করছে!

ডেভিড কেলম্যান, রবার্ট শাফরান আর এডি গ্যালান্ড, তিনজন অপরিচিত মানুষ! একই বয়সের এবং ঠিক একই রকম দেখতে। কারণ তারা তিনজন একইসাথে জন্ম নেয়া ত্রয়ী, যাদের জন্মের পরই আলাদা করে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এর পেছনে রহস্যটা কী? এটা কী করে সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের দিয়েছেন সাংবাদিক লরেন্স রাইট!

এই গল্পের শুরুটা অনেক আনন্দের সাথে হলেও শেষটা ছিল প্রচণ্ড বিষাদময়। ১৯৯৫ সালে যখন এডি গ্যালান্ড আত্মহত্যা করলো তখন বুঝতে পারা গেল ভেতরে এমন কিছু লুকিয়ে আছে যা গ্যালান্ডের মধ্যে তৈরি করেছে চরম বিষাদ! তার ঠিক দু’মাস পরেই লরেন্স রাইট পৃথিবীর সামনে নিয়ে আসলেন এর পেছনের গল্প।

পেছনের গল্প

এডি, রবার্ট আর ডেভিড ভালই দিন কাটাচ্ছিলো। টক শো তে একই জামা পড়ে ইন্টারভিউ দেয়া থেকে মুভিতে মজার চরিত্রে অভিনয় করা কিছুই বাদ যায় নি। তারা একই সিগারেট নিত, তিনজনই ইতালিয়ান খাবার পছন্দ করত। ট্রান্সফার হয়ে তারা তিনজনই একই কলেজে চলে গেল। পড়াশোনা শেষ করে নিজেরাই খুলে ফেললো ‘ট্রিপলেট’ নামের একটা রেস্টুরেন্ট। তারই মাঝে তারা জানতে চাইলো তাদের আলাদা করার পেছনে কারণ কী?

তাদের দত্তক নেয়া হয়েছিলো ‘লুইস ওয়াইস সার্ভিস ‘ নামের একটা এজেন্সি থেকে। যারা ইহুদি বাচ্চাদের দত্তক দিত। তাদের যখন দত্তক নেয়া হয় তখন পরিবারের কাছ থেকে এই সত্যটা লুকানো হয় যে তাদের যমজ ভাই আছে। যখন পরবর্তীতে তাদের এই মিথ্যার কারণ জিজ্ঞেস করা হয়, তারা বলে দত্তক দেবার ব্যাপারটা একটা চাইল্ড ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রামের অংশ। এবং সত্যটি লুকানো প্রয়োজনীয় ছিল।

কিন্তু এখানেই শেষ না। রবার্টের বাবা ত্রয়ীর পুনর্মিলনীর পর একদিন এজেন্সিতে এ ব্যাপারে জানতে যান। তাকে এই কথাগুলোই বলা হয়। এবং তিনি বের হয়ে চলে আসেন। এবং তিনি খেয়াল করলেন তার ছাতাটি রেখে এসেছেন। ছাতা আনতে গেলে সে দেখতে পান, এজেন্সির লোকেরা স্কচের বোতল খুলে সেলিব্রেট করছে, এবং বলছে, ‘বুড়ো কে ভুলভাল বুঝিয়ে পাঠিয়ে দেয়া গেল’।

 
মজায় মজায় ইংরেজি শিখ!
 
 

আরও একটা জায়গায় এজেন্সিকে সন্দেহ করা যায়। তারা বলেছিল, কোন পরিবারগুলোকে এই তিন শিশু দত্তক দেয়া হবে তা ঠিক করা হয়েছে একদম র‍্যান্ডমলি। কিন্তু, এই একই পরিবারদের কাছে তারা দু’বছর আগে আরো তিনটি শিশু দত্তক দেন। এর মানে এই পরিবারগুলো টার্গেটেড ছিল। তারা কীরকমভাবে সন্তান বড় করেন তা দেখা হয়েছে, তারপর ত্রয়ীদের তাদের পরিবারে পাঠানো হয়েছে।

তখনই বোঝা যায়, আসলে তাদের কাছ থেকে আসল সত্যিটা লুকানো হয়েছে। ডেভিড, রবার্ট আর এডি আসলে কোনো পরীক্ষার গিনিপিগ। কিন্তু সেটা কী পরীক্ষা?  

নেচার Vs. নারচার

নেচার মানে আচরণগত বৈশিষ্ট্য, যা একজন পায় তার জিন থেকে। আর নারচার, মানে বড় করে তোলার প্রক্রিয়া, আশেপাশের পরিবেশ। একজন মানুষের চরিত্র গঠিত হয় কোনটির ভিত্তিতে? নেচার নাকি নার্চার?  

এ নিয়ে প্রশ্ন বেশ পুরোনো, মানুষের আচরণে কোনটির প্রভাব বেশি, পরিবেশ নাকি জিনের? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ডক্টর পিটার শুরু করেন এই পরীক্ষা। যমজদের আলাদা করে ভিন্ন পরিবেশে বড় করার পর, তাদের আচরণ পরীক্ষা করে বোঝা যাবে কোনটির প্রভাব বেশি। জিন নাকি পরিবেশ?

রবার্ট, এডি এবং ডেভিডকে যখন দত্তক নেয়া হয়েছিলো তখন তাদের দত্তকী পরিবারের উপর একটা শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়। একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর তাদের চেক আপের জন্য এজেন্সিতে নিতে হবে। ইহুদী সন্তান দত্তক পাওয়া বেশ কঠিন হওয়ায়, পরিবারগুলো শর্ত মেনে নেয়। তারা ডেভিড, এডি আর রবার্টের আই কিউ, মানসিক অবস্থা, পারসোনালিটি সবই খতিয়ে দেখতেন। তারা যখন এই ত্রয়ীর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল তখন এজেন্সিতে বসে কিছু মানুষ তাদের তিনজনের মানসিক অবস্থার উপর গবেষণা চালাচ্ছেন।

ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে আমাদের নতুন গ্রুপ- 10 Minute School English Language Club-এ যোগদান করতে পারো!

এই ত্রয়ী ছিল একটা বিশাল এক্সপেরিমেন্টের অংশ। যেটি ন্যাচার Vs. নারচার নামে পরিচিত। এই পরীক্ষা করার জন্যই তিনি এই ত্রয়ীকে একেক পরিবারে পাঠান, ভিন্ন পরিবেশে বড় হওয়ার জন্য। পর্যবেক্ষণ করতে থাকে তাদের জীবন এবং অবাক হয়ে দেখেন তারা আলাদা ভাবে বড় হলেও তাদের সাইকেলে ওঠার ভঙ্গী পর্যন্ত একই রকম।

কিন্তু এই পরীক্ষার সবচে’ বাজে ব্যাপার ছিল এই তিনজনের জীবন নিয়ে পরীক্ষা করা। দীর্ঘ ১৯টি বছর তারা জানতোই না যে তাদের যমজ ভাই আছে। এমনকি তাদের প্রতি মুহূর্তে নজরে রাখা হত। হিউম্যান গিনিপিগের মতই তাদের বড় করা হয়েছে।

জিনগত প্রভাব মানুষের চরিত্রে বেশি এর মানে এই না যে পরিবেশগত প্রভাব একদমই নেই। বরং, পরিবেশগত প্রভাব যে ভালমতই আছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন এই ত্রয়ী তাদের রেস্টুরেন্ট ‘ট্রিপলেট’ বন্ধ করে দেয়। তাদের মধ্যে সম্পর্ক ফিকে হওয়া শুরু করে। এবং ত্রয়ীর একজন এডি ভুগতে থাকে ডিপ্রেশনে।

এবং শেষমেষ এডি এই মানসিক চাপ নিতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। ২০১৮ সালে ৫৬ বছর বয়সী রবার্ট বলেছেন, ‘এই পরীক্ষাটি ছিল নাৎসিদের চালানো এক্সপেরিমেন্টের মত’।

তো আপাতত এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে নেচার ও নারচার, মানুষের জীবনে দুটোর ভূমিকাই প্রবল। একটা আচরণ নির্ধারণে, অপরটি আমাদের চয়েস নির্ধারণে।

Tim Wardle এর ডকুমেন্টারি Three Identical Strangers

এই তিন ভাইয়ের পুনর্মিলন আর এর পরে এই গোপন পরীক্ষার কথা ফাঁস হয়ে যাওয়া এসব নিয়েই তৈরি হয়েছে ৯০ মিনিটের ডকুমেন্টারি Three Identical Strangers। পরিচালক Tim Wardle চাচ্ছিলেন এই মর্মস্পর্শী কাহিনী এবং তার পেছনের এই পরীক্ষাটি সবার সামনে আনতে।

এরকম বাস্তবে কখনোই হয়না যে আমরা হঠাৎ করে এমন একজন অপরিচিতকে পেলাম যাকে আমরা চিনিই না। কিন্তু, ডেভিড, রবার্ট আর এডি সেই অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। এবং তাদের এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি একটা অদ্ভুত সত্য। মানুষের আচরণে, পরিবেশের চেয়ে জিনের প্রভাবই বেশি। কিন্তু তাই বলে পরিবেশগত প্রভাবকে অস্বীকার করা যায় না মোটেও।

তথ্যসূত্র :

১) https://www.express.co.uk/news/world/926676/triplets-three-identical-strangers-adopted-social-experiment

২) http://www.newsweek.com/three-identical-strangers-tim-wardle-robert-shafran-david-kellman-1004014

৩) https://youtu.be/gUCQaPyG6CE

৪) http://www.dailymail.co.uk/news/article-5337323/Triplets-separated-birth-sinister-social-experiment.html


 

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]