সফল যারা কেমন তারা – পর্ব ৯

Corporate Trainer (Leadership, Supply Chain, Safety), Motivational Speaker & Professional CV Writer niazabeed@gmail.com

 

E:\Book\সফল যারা কেমন তারা\Writings\Rasheduzzaman_DGM_Mobil\26856150_2257635454249487_1779662630_n.jpg

মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান বর্তমানে মবিল বাংলাদেশের উপ মহা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে তার এক্সোন মোবিল এবং সিমেন্সের মতো নামকরা বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন এ্যানার্জিপ্যাক থেকে। বুয়েট থেকে তিনি যন্ত্রকৌশলের উপর গ্রাজুয়েশন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদ এবং আইবিএ থেকে মার্কেটিং এর উপরে আলাদা ভাবে দুইবার এম বি এ করেন।

তাঁর ক্যারিয়ারের নানান দিক তুলে ধরেছেন রিজুমে ডেভলেপমেন্ট স্পেশালিষ্ট এবং কর্পোরেট আস্কের সিইও নিয়াজ আহমেদ।

  গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের শুরুতে আপনাকে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল?

উত্তরঃ “ইঞ্জিনিয়ার হবার সত্বেও কেন বিক্রয় পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে চাই?”, এই প্রশ্নটিই ছিল আমার ক্যারিয়ারের শুরুতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। “একজন বিক্রয় শিল্পীর কোন অফিস থাকতে পারে না। তাকে মাঠে ঘাটে ছুটে বেড়াতে হবে, সেলস টার্গেট সম্পূর্ণ করার জন্য।“,

অফিসের বস যখন প্রথমবার আমাকে এই কথাগুলো বলেছিলেন তখন বিক্রয় পেশাটাকে আসলেই খুব চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিলো। ক্যারিয়ারের শুরুতে নির্দিষ্ট সেলস টার্গেট পুরো করার জন্য দেশের এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়ানোটাকেই এক সময় অভ্যাস বানিয়ে ফেলেছিলাম। এর পাশাপাশি মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, যে করেই হোক আমাকে বিক্রয়পেশাতেই সফল হতে হবে। আমি ছাত্রজীবন থেকেই নিজেই নিজেকে প্রতিটি বিষয়ে টার্গেট দিতাম। এবং টার্গেট অর্জনের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করতাম।

বিক্রয় পেশায় সফল হতে হলে শুধুমাত্র পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেই হয় না, সেই সাথে থাকতে হয় সহনশীলতা এবং ধৈর্য। যেকোনো ঊপায়ে হোক কোম্পানির নিয়মের মধ্য থেকে কাস্টমারকে বুঝিয়ে কাজ আদায় করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু অনেক আগে থেকেই আমি টার্গেট অনুযায়ী পরিকল্পনা করি এবং তা বাস্তবায়নের জন্য কঠোর পরিশ্রম করি, কাজেই চ্যালেঞ্জটাকে আমার কাছে কখনোই চাপ বলে মনে হয়নি ।  

প্রশ্নঃ একজন বিক্রয় শিল্পীর কী কী গুণাবলী থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ একজন বিক্রয় শিল্পীকে নিত্যনতুন সম্ভাবনা খুঁজে বের করার মত দুরদর্শী হতে হবে। ইতিবাচক মানসিকতা আর উদ্যমী মনোভাব একজন বিক্রয়শিল্পীর অন্যতম প্রধান   বৈশিষ্ট্য। একজন বিক্রয়কর্মীর মাঝে সততা, সময়ানুবর্তিতা, কঠোর পরিশ্রম করার মনোভাব থাকতে হবে। স্কুলে লেখাপড়া করাকালীন গণিত বিষয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হত। বিক্রি অনেকটা গণিতের মত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টার্গেট সম্পন্ন করার মাধ্যমে খুব সহজেই একজন বিক্রয় শিল্পীর দক্ষতা পরিমাপ করা সম্ভব। প্রতিদিনের লিখিত পরিকল্পনা ও বিগত কাজগুলোর নিজস্ব মূল্যায়ন থাকা বাঞ্ছনীয়।

প্রশ্নঃ আপনার কাছে সফলতার অর্থ কী?

উত্তরঃ ক্যারিয়ারের সফলতার মানে হচ্ছে আপনার উপর অর্পিত দায়িত্বটা কোম্পানির নিয়ম মেনে যথাসময়ে সম্পন্ন করা। এছাড়াও সফল হতে হলে সুস্বাস্থ্যর কোনো বিকল্প নেই। কর্পোরেটে সফল হতে গিয়ে একেবারে রোবট হয়ে যাওয়াটাও আমি সমর্থন করি না। সেক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই ওয়ার্ক লাইফ ব্যালান্স করে চলতে হবে।

প্রশ্নঃ তরুণ প্রজন্মের ঢাকার বাইরে চাকরি করতে যাওয়াটা কিছুটা অনীহা দেখা যায়। এই ব্যাপারটা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

উত্তরঃ প্রকৃতপক্ষে কাজ শিখতে হলে ঢাকার বাইরে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করা, তাদের আচার আচরণ এবং চাহিদাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা, কোম্পানির পণ্য বা সেবা তাদের কাছে যথাসময় পৌঁছে দেয়া, ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ দেয়া, প্রতিযোগী কোম্পানির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা,নতুন পণ্য বা সেবার ব্যাপারে প্রচার প্রচারণা চালানো এবং সকল ধরনের প্রয়োজনীয় রিপোর্ট তৈরি করা প্রত্যকটি কাজ সম্পর্কে চমৎকার ভাবে ধারণা পাওয়া যায় ঢাকার বাইরে কাজ করার মাধ্যমে। আজ যারা বড় বড় কর্পোরেটে সফল বাক্তিত্ব, নতুন নতুন বিজনেজ প্লান দিচ্ছেন, তাদের কেউই কেবলমাত্র ঢাকায় কাজ করে আজকের অবস্থানে যাননি। সবাই ফিল্ড থেকে উঠে এসেছেন।

[tmsad_ad type=”video”]

 

 

প্রশ্নঃ বিক্রয় পেশায় মেয়েদের কম অংশ গ্রহণের কী কী কারণ আছে বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ আমাদের সমাজ এখনও পুরুষ শাসিত। এখানে মেয়েদের পক্ষে বাইরে গিয়ে কাজ করাটা পরিবারের অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া সমাজ ব্যবস্থা , শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ সর্ব দিক বিবেচনায় নারীরা এখনো পিছিয়ে। তবে যেসব নারীরা এসব প্রতিবন্ধকতা ভেঙে এগিয়ে যাবার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, তাদের আসলে কোন বাধাই দাবিয়ে রাখতে পারে না।

প্রশ্নঃ অনেকে মার্কেটিং নিয়ে পড়াশোনা করেন কিন্তু অন্য পেশায় ঢুকে যান। এ ব্যাপারটাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

উত্তরঃ এক্ষেত্রে আমি বলবো এটা তাদের দূরদর্শিতার অভাব, পরিকল্পনার অভাব। যেটা হতেই চাই না, সেটা পড়েই বা কি লাভ। বিক্রয় ও বিপননের উপর জ্ঞান লাভ করে হিসাব রক্ষনে কাজ করতে হলে, তার চেয়ে হিসাব বিজ্ঞান পড়েই হিসাব রক্ষনে যাওয়া ভালো। জীবনের শুরুতে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে, আমি বলবো এই লক্ষ্যটা কলেজ লাইফ থেকেই হওয়া উচিত। সেই লক্ষ্য বরাবর ফোকাস থাকতে হবে। এইম ইন লাইফ এবং এইম ইন ক্যারিয়ারের পার্থক্যটা নিজে থেকে বোঝা উচিত।  

প্রশ্নঃ সেলস এবং মার্কেটিং এর মধ্যে প্রধানত কী পার্থক্য রয়েছে?

উত্তরঃ সেলস হচ্ছে আগে ক্লায়েন্টের কাছে পণ্য বা সেবা পৌছে দেয়া, ধীরে ধীরে পণ্য বা সেবা ব্যাবহার করার মাধ্যমে ভোক্তা সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। অপরদিকে মার্কেটিং হচ্ছে প্রস্তাব করা, পণ্য বা সেবা সম্পর্কে ভোক্তাকে জানানো, বোঝানো। ভোক্তা যখন পণ্য বা সেবার মান ও অন্যান্য দিক জানবে, তখন সে তার পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নিবে। আগে মার্কেটিং, পরে হচ্ছে সেলস।

প্রশ্নঃ বিক্রয় পেশায় থেকে কোন একটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পরিচালক হবার সম্ভাবনা কতটুকু?

উত্তরঃ সবাই সফল হবে না, এটা মেনে নিতে হবে। আর পৃথিবীতে তারাই সবচেয়ে বেশি বেতন পান, যারা অপরকে দিয়ে কাজ আদায় করে নিতে পারে, অর্থাৎ ক্যারিয়ারে সেই এগিয়ে যাবে, যার আছে নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষমতা, যার কাছে আছে সমস্যার সমাধান। মানুষ সেই লোকটাকেই খোঁজে যে কোম্পানির হাল ধরতে পারে, যাকে বিশ্বাস করা যায়, যাকে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। অনেককে দেখবেন বার বার ফলো আপ করা লাগে, পর্যবেক্ষণ না করলেই কাজ থেমে যায়। এরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারে না।

যে কোন বিভাগ থেকেই আসা হোক না কেন, এই সাধারন দিকগুলো খেয়াল রাখলে যে কোন ব্যক্তির পক্ষেই ক্যারিয়ারের উচ্চ শিখরে পৌছানো সম্ভব। আর একজন বিক্রয় শিল্পী ভোক্তার সাথে কাজ করে, তার কী দরকার, সে কী চায়, অন্যরা কী দেয়, কী পেলে তার জন্য আরো ভালো, এসবের খবর কেবল একজন বিক্রয়শিল্পীর কাছেই থাকে। কোম্পানির ব্যাবসার ধরন অনুযায়ী কোম্পানির অধিনস্ত ডিপার্টমেন্ট গুলোর গুরুত্ব নির্ভর করে। তাহলে সেলস ড্রিভেন একটি কোম্পানির প্রধান বিক্রয় বিভাগ থেকে উঠে আসলেই কোম্পানির ব্যবসার উন্নয়ন ঘটবে।

 প্রশ্নঃ একজন মানুষের ক্যারিয়ার প্লানিং করার সময় কোন কোন দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে?

উত্তরঃ শুরু থেকেই একজন মানুষ যদি তার স্ট্রেন্থ গুলো জানে, তার দুর্বলতার দিকগুলো জানে, তার সুযোগ গুলো জানে এবং তার বাধা গুলো জানে, তাহলে সে চমৎকার ভাবে তার প্ল্যান করতে পারবে। আপনাকে আপনার প্যাসনটা আগে ভালো করে বুঝতে হবে। যে কাজটা আপনার ভালো লাগে, তার বাজারদর কেমন, তার ভবিষ্যৎ কি আপনাকে জানতে হবে। এই সবগুলো  বিষয় মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে। অন্যের দেয়া লক্ষ্য বরাবর চলতে চেষ্টা করার চেয়ে বড় বোকামি আর কিছুতে নেই।

প্রশ্নঃ বিক্রয়পেশায় যোগদানের জন্য কি কি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

উত্তরঃ প্রধান তিনটি ট্রেনিং থাকা অত্যাবশ্যক, মাইক্রোসফট অফিস প্যাকেজ, বিক্রয় পেশায় উপর প্রাথমিক প্রশিক্ষন, এবং ইংরেজি শুদ্ধ ভাবে বলতে পারা ও লিখতে পারার দক্ষতা। এরপর কারো যদি কমিউনিকেশন স্কিল জানা লাগে, প্রেজেন্টশনের উপর, সেলসের উপর আরো ট্রেনিং লাগে সে সেটা করতে পারে। এছাড়াও আমি বলবো, প্রচুর পরিমান বই পড়ার অভ্যাস করতে । নিয়মিত পড়াশুনা, জ্ঞানার্জন আজীবন আপনাকে বাকি সবার চেয়ে এগিয়ে রাখবে।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?