সফল যারা কেমন তারা – পর্ব ৫

Corporate Trainer (Leadership, Supply Chain, Safety), Motivational Speaker & Professional CV Writer [email protected]

C:\Users\Billah Mamun\Downloads\26804042_1849374108428466_941766050_n.jpg

হালিমা খাতুন
ডিজিএম ,পুবালী ব্যাংক লিমিটেড

সন্তান ,সংসার এবং ক্যারিয়ার এই তিনটি জিনিসের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রকৃত সফল হতে পেরেছেন আমাদের দেশে যে হাতেগোণা কয়জন, তার মাঝে হালিমা খাতুন অন্যতম। তিনি বর্তমানে পুবালী ব্যাংকের ডিজিএম হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ,১৯৮৭ সালে পুবালী ব্যাংকে সিনিয়ার অফিসার হিসেবে তিনি জয়েন করেছিলেন। কিভাবে তিনি সংসার সন্তান এবং ক্যারিয়ার তিনটি দিকেরই সমন্বয় ঘটিয়ে টানা একত্রিশ বছর নিরলসভাবে কাজ করে গেলেন সেই অভিজ্ঞতাই তিনি এই সাক্ষাতকারের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

নিয়াজ আহমেদ : আপনার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের চ্যালেন্জের গল্পগুলো শুনতে চাচ্ছিলাম।

হালিমা খাতুন : আমরা ছিলাম দশ ভাই বোন। আমার বাবা সেকালের একজন চাকুরিজীবী ছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি কখনো ছেলেমেয়ের মাঝে বৈষম্য করেননি। আমাদের দশ ভাই বোনকেই তিনি শিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত করেছেন তবে শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং মাস্টার্স পাস করি। আমাদের বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরত্ব ছিলো ১৪ মাইল।

প্রথমে কিছুদূর রিকশা, তারপর ট্রেন এবং সবশেষে বাসে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছাতে হত। তখন গুগল ইউটিউব এগুলো কিছুই ছিলো না, স্মার্টফোন ছিলো না, তবুও যতই কষ্ট হোক পড়াশুনা ছাড়িনি। আমি যখন প্রথম চাকরী শুরু করি তখন আমার বড় ছেলের বয়স ছিলো ছয় মাস। তাকে কাজের মেয়ের কাছে রেখে অফিস করতে বাধ্য হতাম, তবে যতটুকু সময় বাসায় থাকতাম পুরো সময়টাই আমি তাদের সাথেই কাটাতাম। এই ব্যাপারগুলো শুধু আমিই নয়, যেকোন মেয়ের ক্যারিয়ারের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। 

নিয়াজ আহমেদ : বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্হায় আপনি কী কী ক্রটি দেখতে পান ?

হালিমা খাতুন : বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা পুথিগত হয়ে গিয়েছে, তবে বাস্তবের সঙ্গে মিল রেখে যেটা শিখানো যায় বাচ্চারা সহজেই সেটা মনে রাখতে পারে। যেমন ধরুন, পাঁচটি ফুলের নাম লিখো। এই প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানোর জন্য আমরা মায়েরা বাচ্চাদের উপরে চাপ প্রয়োগ করি। তবে আমি আমার ছেলেদের ফুলের নাম মুখস্থ করানোর আগে বাগানে নিয়ে যেতাম। তাদের ফুল দেখাতে সেখানে যাওয়ার পর তারা বাগান থেকেই পাঁচটি সাদা ফুলের নাম শিখে আসে যা তাদের মুখস্থ করতে হয়নি। পক্ষান্তরে স্থায়ীভাবে মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছে।

একবার আমার বড় ছেলেকে সাম্প্রতিক সময়ে বন্যা সম্পর্কে রচনা লিখতে বলা হলো। আমি প্রথম আলো অফিসে গিয়ে বিগত কিছুদিনের পত্রিকা চাইলাম এবং তার থেকে নির্দিষ্ট অংশ ফটোকপি করে নিতে চাইলাম। পত্রিকার লোকজন আমাকে আর্কাইভ থেকে পেপার বের করে এনে দিলেন। আমি ফটোকপি চাওয়া সত্ত্বেও তারা আমাকে মূল কপি দিয়ে দিলেন। আমি তাদের জিজ্ঞাসা করলাম আপনারা আমাকে কেন বিশ্বাস করছেন? তারা উত্তর দিলো, একজন মা কখনো সন্তানের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলতে পারেনা।

নিয়াজ আহমেদ : নতুনদের মাঝে আপনি কী কী ত্রুটি দেখতে পান ?

হালিমা খাতুন : নতুনরা অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক ,অনেকে প্রবীণদের যথাযথ সম্মানটুকুও করতে মাঝে মাঝে ভুলে যায়। তবে, যদি তরুণরা আমাদের মতো প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করে, তাহলে আমি বলবো সেটা হবে ভুল পরিকল্পনা। কারণ তরুণদের উদ্যমের সাথে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা যুক্ত হলেই কেবল প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলকর হতে পারে ।

নিয়াজ আহমেদ : একজন নারী হিসেবে চাকরির পাশাপাশি ঘর সংসার এবং সন্তান লালন-পালনের বিষয়গুলো সামলেছিলেন কিভাবে ?

হালিমা খাতুন : নারীরা সবসময়ই একটু বেশি দায়িত্বশীল এবং যত্নবান। আমার চাকরি জীবনের শুরুর দিকে অফিসের ব্রেকে ছেলেকে খাওয়ানোর জন্য বাসায় আসতাম, এতে করে যদিওবা দিনের বেলায় এক ঘণ্টা কম কাজ করা হতো, তবুও আমি সন্ধ্যার পরে অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা কাজ করে প্রতিষ্ঠানের জন্য তা পুষিয়ে দিতাম। একজন নারীর কাছে প্রতিটি জিনিসই আপন। অফিস শেষ করে বাসায় গিয়ে বাচ্চাদের পড়ানো, রান্না-বান্নার কাজ করা, আবার বাচ্চা অসুস্হ হলে সারারাত জেগে থাকা এবং পরদিন সকালে সময়মতো অফিস করা, সবগুলো কাজই করতে পারতে হয়েছে কারণ এগুলো আমার কাজ। আমি না করলে করবে টা কে?

নিয়াজ আহমেদ : মেয়েদের ক্যারিয়ার উন্নয়নের জন্য কী রুপে পরিকল্পনা করা উচিত ?

হালিমা খাতুন : আমাদের সময়ে এখনকার মত এত শক্ত প্রতিযোগিতা ছিলো না। তবে, বর্তমান প্রতিযোগিতার এই যুগে  পরিকল্পিত উপায়ে ক্যারিয়ার নিয়ে না ভাবলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যায়। আমি মনে করি বাবা মায়ের ইচ্ছার সাথে নিজের ইচ্ছার সমন্বয় ঘটিয়ে ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা উচিত। নবম শ্রেণীতে উঠার পর যখন বিভাগ নির্ধারিত হয় তখন খুব সচেতনভাবে এটা নির্বাচন করা দরকার।

আবার কলেজ পাস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগের সময়টুকুও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে যথাযথ পরিকল্পনা না করে শুধুমাত্র পাস করার জন্য যেকোন বিষয়ের উপরে গ্র্যাজুয়েশন করা পুরোপুরিভাবে ভুল সিদ্ধান্ত। কার ক্যারিয়ার কীরকম হবে এটা নির্ভর করে নিজের মেধার উপর এবং ভালোলাগার উপরে। সবার মেধা হয়তো সমান নয় কিন্তু সবার সফল হওয়ার সম্ভাবনা একই।

নিয়াজ আহমেদ : নারী উন্নয়নের জন্য কী কী ধরনের পদক্ষেপ  নেওয়া যেতে পারে ?
হালিমা খাতুন : প্রথমত, সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের দেশে রান্না-বান্নার নিয়ম প্রণালী যতটা জটিল পৃথিবীর কোথাও এত জটিল পদ্ধতিতে রান্না-বান্নার কাজ করা হয় না। আমাদের দেশে একজন নারীকে দিনে গড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা সময় শুধু রান্নার কাজে ব্যয় করতে হয়। আবার পরিবারের একেকজন একেক ধরনের খাবারের আবদার করে।

একজন পুরুষ অফিস থেকে বাসায় এসে শুয়ে বসে সময় পার করতে পারে, কিন্তু একজন নারীকে বাড়ী ফিরেই তার বাচ্চাকে নিয়ে পড়তে বসতে হয়, পড়াশুনার পাশাপাশি আবার রান্না-বান্না করতে হয়, পরের দিন সকালে কে কী খাবে, বাচ্চারা কে কী টিফিন নিয়ে যাবে, এই সিদ্ধান্তগুলো একজন মাকে আগের দিন রাতেই নিতে হয়। এর কোন কাজ একজন মায়ের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।

কাজেই সংসারে পুরুষদেরও সহনশীল ও সহযোগী হতে হবে, যার যার কাজ যতটা সম্ভব তারই করতে পারা উচিত। খাওয়া-দাওয়ার পরে যার যার প্লেট যদি সেই একটু কষ্ট করে ধুয়ে রেখে দেয়, তাহলে সেটাই বাসার নারী সদস্যটির জন্য একটা বিরাট স্বস্তির কারণ হতে পারে।

নিয়াজ আহমেদ : পরিবার থেকে কিভাবে সন্তানদের মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে ?

হালিমা খাতুন : সন্তানের সাথে যতটুকু সময় পাওয়া যায়, ভালোভাবে মিশতে হবে। খুব ছোট বয়স থেকেই যতটা সম্ভব তাদেরকে কম একা থাকতে দিতে হবে। চাকরি করলেই যে সন্তানকে সময় দেওয়া যাবে না, কিংবা সন্তান ভুল পথে পা বাড়াবে এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। তাহলে তো গৃহিনী মায়েরাই বিশ্বসেরা মা হতেন। আসলে কে গৃহিনী অথবা কে কোন পেশায় কাজ করছেন তার সাথে সন্তানের বেড়ে উঠার সম্পর্ক বেশ কম। একটা বাচ্চাকে যখন প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে মূল্যবোধের শিক্ষা মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়া যায়, তাহলে কখনোই তার পক্ষে ভুল পথে পা বাড়ানো সম্ভব হয় না।

নিয়াজ আহমেদ : আপনার কাছে সফলতার মানে কী?
হালিমা খাতুন : আমার কাছে সফলতার মানে হচ্ছে কোন সন্তানের নামে কোন অভিযোগ না আসা, তাদের মধ্যে ধর্মীয় সামাজিক এবং পারিবারিক রীতিনীতি এবং মূল্যবোধগুলো গেঁথে দেওয়া, কাজকে ভালোবাসা, প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসা এবং প্রতিষ্ঠানকে ভালোবেসে প্রতিষ্ঠান এবং সন্তান উভয়ের জন্যই বিগত ৩১ বছর ধরে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাওয়া।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.