সফল যারা কেমন তারা- পর্ব ৪

Corporate Trainer (Leadership, Supply Chain, Safety), Motivational Speaker & Professional CV Writer niazabeed@gmail.com

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বিক্রয়কেই কেন পেশা হিসেবে আপনি বেছে নিবেন?

E:\Book\সফল যারা কেমন তারা\Writings\Firoz_CSMO_Beximco Petroleum\sdfg.jpg

সাক্ষাৎকার: ফিরোজ আহমেদ, চিফ অপারেটিং অফিসার, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি

ফিরোজ আহমেদ গত ২২ বছর দেশের ফার্মা ও এনার্জি সেক্টরে বিভিন্ন দেশীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিতে বিক্রয় বিভাগে চাকরি করেছেন।

রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে বায়োকেমিস্ট্রিতে বি এস সি ও এম এস সি শেষ করার পর ১৯৯৫ সালে স্কয়ারে জয়েন করেন।চাকরীর পাশাপাশি মার্কেটিং ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেসের উপর এম বি এ করেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে।দীর্ঘ এক যুগ স্কয়ারেই পার করে দেন। কঠোর পরিশ্রম ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য স্কয়ারে ৬ বার প্রমোশন দেয়া হয় তাকে।এরপর আর এ কে ফার্মায় কাজ করেন কিছুদিন।

সেখান থেকে এনার্জি সেক্টরে জয়েন করেন ক্লিনহীটগাসের ন্যাশনাল সেলস ম্যানেজার হিসেবে।৪ বছর সেখানে চাকরি করে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নেন বি এম এল পিজির। একদম শূন্য থেকে বিএম এলপিজির বিক্রয় ও বিপনন প্রক্রিয়া নিজের হাতে গড়েছেন তিনি। এরপর তিনি বেক্সিমকো পেট্রোলিয়ামের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তার হাত ধরে দেশে আসে প্রথম কম্পোজিট সিলিন্ডার। সেখানে কাজ করে তিনি পেট্রোম্যাক্স এলপিজিতে চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন।আজকের সাক্ষাৎকারে ফিরোজ আহমেদ স্যার বিক্রয় পেশার নানান দিক তুলে ধরেছেন তার নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে।চাকরীর খোঁজের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিয়াজ আহমেদ।  

১। স্যার, বিক্রকেই কেন পেশা হিসেবে বেছে নিলেন?  

ফিরোজ আহমেদ: যে কোন কোম্পানির আয়ের একমাত্র উৎস হচ্ছে বিক্রয়। কোম্পানির অস্তিত্ব নির্ভর করে তার বিক্রয়ের উপর।বিক্রিই যদি না হয় তাহলে পণ্য তৈরি করেই বা কি লাভ।বিক্রয় পেশায় আছে লক্ষ্য, লক্ষ্য পূরণের চ্যালেঞ্জ, পুরস্কার,আছে কাজ করার স্বাধীনতা, মানুষের সাথে মেশার সুযোগ।বিক্রয় পেশাকে আমি দেখি অংকের মত, যেখানে সমস্যা, সমাধান, অধিক নম্বর পাওয়ার নিশ্চয়তা, ভুল হলে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি সবই আছে।বাকি পেশাগুলো সমাজ, ভূগোল, অর্থনীতির মত। এজন্য বিক্রয় এবং কেবল মাত্র বিক্রয় পেশাতেই ১০০ বা তার চেয়েও বেশি মার্ক তোলা সম্ভব। তাই বিক্রয় পেশাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।  

২। এই পেশায় চ্যালেঞ্জ কতটুকু?

ফিরোজ আহমেদ: পুরোটাইতো চ্যালেঞ্জে ভরা। কিন্তু মজার দিক হচ্ছে, চ্যালেঞ্জ ও ফলাফল সবই হাতেনাতে পাওয়া সম্ভব। এখানে অলসতার কোন সুযোগ নেই। সময়মত ঘুম থেকে উঠতে হবে, প্রতিদিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, এদিক সেদিক ছুটে চলা, রোদে পুড়ে,বৃষ্টিতে ভিজে, কনকনে ঠাণ্ডায়ও দমে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরিশ্রম করতেই হবে।কোন শর্টকাট আমার জানা নেই। হাটে মাঠে ঘাটে ২০টি বছর ছুটে বেড়িয়েছি কর্মের প্রয়োজনে দেশের সব কয়টি জেলায়।এর মাধ্যমেই হয়েছি জেনারেল ম্যানেজার।   

৩। একজন সেলসম্যানের কিভাবে কর্ম পরিকল্পনা করা উচিৎ?

ফিরোজ আহমেদ: প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে। সারাদিন কাজে উদ্যম পাওয়ার জন্যে এটা খুবই জরুরী। প্রতিদিন সকালে উঠে ২০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সারাজীবন ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটলেন, শেষ বয়সে জটিল কোন রোগ হয়ে গেল, তাহলে জীবনভর কাজের কোন সার্থকতাই থাকবে না। সকালের ২০ মিনিটের ব্যায়াম আপনার ব্রেনের নিউরন গুলো খুলে দিবে। ঘাম আপনার আগের দিনে জমে থাকা আবর্জনা শরীর থেকে বের করে দিবে যা আপনাকে সারাদিনের জন্যে করে তুলবে আরো উদ্যমী।  তারপর ২০ মিনিটে আজ সারাদিন কী কী কাজ করার আছে সেটা কাগজে লিখে ফেলতে হবে। মনে রাখবেন যা পরিকল্পনা করা হয় না, তা কিন্তু করাও হয় না। আর অস্পষ্ট পরিকল্পনাই কিন্তু আপনাকে অস্পষ্ট লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবে। তাই যারা আজ আমার লেখা পড়ছেন, অবশ্যই নিজের কর্মপরিকল্পনা সকালে তৈরি করে নিবেন। শেষ ২০ মিনিটে পেপার পত্রিকার খবর পড়ে নিজেকে আপডেট করে ফেলতে হবে। এটাকে আমি তিন বিশের সূত্র বলি।

৪। একজন বিক্রয়কর্মীর কী কী গুন থাকা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

ফিরোজ আহমেদ: বিক্রয় পেশার মুল পুঁজি সততা এবং লেগে থাকা।সময়ানুবর্তিতা, অধ্যবসায়, নিয়মানুবর্তিতা, ভালো আচরন, নেতৃত্ব প্রদানের সক্ষমতা, নিজ থেকে কাজ করার মনোভাব, সকলের সাথে মিলেমিশে কাজ করার মনোভাব,সহিষ্ণুতা এসব গুণও একজন বিক্রয় কর্মীর থাকা আবশ্যক।  

৫। নতুনরা কিভাবে বিক্রয় পেশায় আসবে? তাদেরকে নিজেকে কিভাবে তৈরি করতে হবে?

ফিরোজ আহমেদ: একজন ছাত্র ২৫ বছর বয়সে গ্রাজুয়েট হয়। এই ২৫ বছরে কি তার কোন এক্সপেরিয়েন্স হয়নি? ইউনিভার্সিটি লাইফের চারটা বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের ছাত্র ছাত্রীরা শুধু ভালো রেজাল্ট, সিজিপিএ এসব নিয়েই ভাবে। ৪ বছরে আমাদের ছেলে মেয়েরা শুক্র শনিবার পায় কয়টি? ৫২ সপ্তাহের বছরে প্রত্যেক সপ্তাহে দুইদিন করে ছুটি। তাহলে ৪ বছরে কম করে হলেও ৪০০ দিন ছুটিই পাওয়া যায়। বাইরের দেশের ছাত্ররা কিন্তু লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করে। আমাদের দেশের মানুষ এখনো সেকেলেই রয়ে গেছে। পাস না করে কাজ করাটাই যেন মহা অন্যায় আমাদের এখানে।   

আমি বলবো প্রত্যেককেই ছাত্র অবস্থায় পড়াশুনার পাশাপাশি অন্য কাজে নিজেকে যুক্ত করতে। কোন কোম্পানির ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়া যেতে পারে, টিউশানি করা যেতে পারে, পার্ট টাইম কাজ করা যেতে পারে, বিভিন্ন প্রফেশনাল ক্লাবে যুক্ত হওয়া যেতে পারে। অলস সময় পার করলে হবে না। মনে রাখতে হবে, যারা পরিশ্রমী তারা কিন্তু ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। শত শত ল্যাব রিপোর্ট, থিসিস, প্রজেক্ট যারা করতে পারে তারা নিজেদেরকে গোছাতে পারবে না সেটা আমি বিশ্বাস করি না। বিক্রয় পেশার জন্য আমরা খুজি উদ্যমী, চটপটে তরুণ। তারা যদি ছাত্রাবস্থায় কম্পিউটার ও ইংরেজি শিখার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়, তাহলেও কর্মজীবনে অনেক উপকার পাবে। কোথাও আবেদন করার সময় বানাতে হবে নজরকাড়া সিভি। দেখেই যেন মনে হয়, আরে, একেই তো খুঁজছি আমি এতদিন।

[tmsad_ad type=”video”]

৬। বিক্রয় পেশার মজাটা কোথায়?

ফিরোজ আহমেদ: আমার কাছে মনে হয় এই পেশায় আমি জানি আমার টার্গেট কী। আমি জানি সেটা অর্জন করলে পুরস্কার কী পাবো। কাজ করতেই একটা প্রতিযোগিতা আছে। এটা মজা লাগে। নতুন জায়গায় যাওয়া, নতুন লোকেদের সাথে মিশা, কথা বলা,নতুন জায়গায় থাকা, খাওয়া, স্বাধীনতা সবই মজা। কাজকে ভালবাসলে পরিশ্রম করে আনন্দ পাওয়া যায়, অনিহা থাকলে সেটা হয় না। আল্লাহ আমাদের বানিয়েছেন, দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন ঈবাদত করতে। পরিশ্রমও ইবাদতের একটি অংশ। উদ্দেশ্যহীন জীবনের গন্তব্য নেই। তাই লক্ষ্য অটুট রেখে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যেতে হবে। স্রষ্টাকেও স্মরণ করতে হবে সব সময়।       

৭। বিক্রয় পেশার খারাপ দিক কী?

ফিরোজ আহমেদ: অতিরিক্ত টার্গেট অনেক সময় বিক্রয় প্রতিনিধিকে মানসিক চাপে রাখে, অনেক বেশি ভ্রমনের ফলে পরিবারকে সময় দেওয়াটা কিছুটা কষ্টকর হয়ে যায়।

৮। একজন বিক্রয়কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি কী কী বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেন?

ফিরোজ আহমেদ: নতুনদের ক্ষেত্রে দেখি সে পড়াশুনা ছাড়া আর কী কী করেছে।তার আচার আচরন, কথা বলার ধরণ, ইংরেজি জানা এগুলোকেই আমি বেশি গুরুত্ব দেই।মানুষের পকেট থেকে টাকা বের করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করান দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাই বাছাইয়ের সময় একটু সতর্ক হতে হয়।

৯। অনেকেই হতাশায় ভোগে এই ভেবে যে আপনারা হয়তো আগে ভাগেই লোক নিয়োগ দিয়ে ফেলেছেন, ইন্টারভিউটা লোক দেখানো? এই ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?

ফিরোজ আহমেদ: সুপারিশ ও চোখে পড়া এক জিনিস নয়। আমার কোন পুরানো কলিগ খুব উদ্যমী, পরিশ্রমী।আমি কি চাইবো না তাকে আমার সাথেই রেখে দিতে? আমি কি তার ব্যাপারে অন্যকে বলবো না? তারতো বলাও লাগবে না,আমিই তার ভালো কিছুর জন্য চেষ্টা করবো, তাই না? দেখুন, সব কিছুর মুলে কিন্তু তার পরিশ্রম। ওটা দিয়েই কিন্তু সে আমার চোখে পড়েছে। আমি কিন্তু কারো সুপারিশ শুনিনি। সুপারিশ আর নেটওয়ার্ক এক জিনিস নয়। ভালো কাজ যারা করে, যারা পরিশ্রম করে,তারা এমনিতেই মানুষের চোখে পড়ে যায়। সুপারিশ লাগে না।

১০। নতুনদের মাঝে আপনি কি কি ভুল ত্রুটি খুজে পান?  

ফিরোজ আহমেদ: অনেককেই পাই খুব অস্থির। ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছে বলে অনেকেই হোয়াইট কলার ভাবে নিজেদের।খুব তাড়াতাড়ি ফলাফল চায়। এখানে দুই দিন, ওখানে দুইদিন। আসলে কোথাও কাজ শিখা হয় না। অনেকে আছে ভালো প্রতিষ্ঠান খোঁজে।তাদের উদ্দেশে বলি, ভালো প্রতিষ্ঠানে নিজেকে প্রমান করার যতটা সুযোগ আছে, তার চেয়ে বরং নতুন প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত হন। নতুন নিয়ম তৈরি করুন।নিজেকে প্রমান করার বেশি সুযোগ পাবেন।

১১। তারা কিভাবে সেগুলো শোধরাবে?  

ফিরোজ আহমেদ: একটি কোম্পানিতে নিজেকে প্রমানের মোক্ষম সময় হচ্ছে প্রথম ৩-৪ মাস।প্রথমেই যদি কেউ লাইনচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে তার পক্ষে পরবর্তীতে নিজেকে প্রমান করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে   তদ্রুপ, একজন লোক একই জাগায়, একই পোস্টে ১০০০ দিন চাকরি করার পরও যদি তার উন্নতি না হয় তাহলে তাকে বুঝতে হবে হয় হয় তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন, না হয় প্রতিষ্ঠানকে বঞ্চিত করছেন!

তখন নিজের দর, বাজার দর বিবেচনা করে নতুন জাগায় যাওয়া উচিৎ। সব সময় নতুন কাজ করা উচিৎ।পুরানো কাজগুলো যাতে অন্য কেউ করে এজন্য কাউকে শিখিয়ে দেওয়া উচিৎ। মনে রাখবেন, মানুষ তার কাজে মাধ্যমে বেঁচে থাকে।   

জাগো জবসের পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার, আমাদেরকে আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: নিয়াজ আহমেদ

লেখক: (ট্রেইনার ও প্রফেশনাল সিভি রাইটার), সিইও, কর্পোরেট আস্ক।

ই-মেইল: niazabeed@gmail.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?