সফল যারা কেমন তারা – পর্ব ৩

Abeed Niaz

Corporate Trainer (Leadership, Supply Chain, Safety), Motivational Speaker & Professional CV Writer niazabeed@gmail.com

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নে যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে আয়মান সাদিক অন্যতম। আয়মান সাদিক হচ্ছেন একজন বাংলাদেশী শিক্ষা উদ্যোক্তা এবং ইন্টারনেট ব্যক্তিত্ব। তিনি ২০১৫ সালে ১০ মিনিট স্কুল (Website: www.10minuteschool.com) প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা এমন এক প্রতিষ্ঠান; যা অনলাইনে শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য এবং সহযোগীতা বিনামুল্যে দিয়ে থাকে। টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিকের সাক্ষাতকারে তার এই পথচলার গল্প তুলে ধরেছেন কর্পোরেট আস্কের প্রতিষ্ঠাতা ও রিজুমি ডেভলপমেন্ট স্পেশালিস্ট নিয়াজ আহমেদ।

নিয়াজ আহমেদ: টেন মিনিট স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কি কি চ্যলেঞ্জএর  সম্মুখীন হতে হয়েছে?

আয়মান সাদিক: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায়ই টেন মিনিট স্কুলের ভাবনা মাথায় এসেছিল বিভিন্ন ওয়েবসাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তখন থেকেই যোগাযোগ চলতে থাকে এবং একটি কোম্পানিকে আমরা টেন মিনিট স্কুলের নির্মাণ বাবদ অগ্রীম ৫০ হাজার টাকাও দেই দীর্ঘ ৬ মাস চেষ্টা করার পর যখন কোন ফলাফল পাওয়া গেল না তখন কিছুটা মন ভেঙ্গে যায় কিন্তু দমে যাইনি, আবার নতুন করে ওয়েব নির্মাতা কোম্পানির সন্ধান শুরু করি এবার অবশ্য আগেরবারের মত পুরো টাকা অগ্রীম না দিয়ে অর্ধেক দিয়ে কাজ শুরু করা হলো

পর্যায়ক্রমে ওয়েব নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পিছনে প্রায় দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করি এভাবে দেখতে দেখতে দেড় বছর সময় পার হয়ে গেল এরপর একদিন সন্ধায় একছোট ভাইকে আমার স্বপ্নের টেন মিনিট স্কুলের কথা জানাচ্ছিলাম সে সবে মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র ‘আরেকটা বার চেষ্টা করে দেখি, স্বপ্নটা সত্যি হয় নাকি’, এই চিন্তা ভাবনা থেকে তার সাথে আবার ওয়েবসাইট নির্মাণের কাজ শুরু করি

প্রতিটা মুহূর্তে একটু একটু করে তৈরী হচ্ছিল টেন মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইট ইতিমধ্যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার লেখালেখির সুবাদে এবং ফেসবুকের কল্যাণে হাতে গোনা কিছু মানুষ আমাদের টেন মিনিট স্কুলের কথা জানতে পারে২০১৫ সালের ১০ মে ওয়েবসাইট লঞ্চ করার দিন নির্ধারণ করি, কিন্তু হঠাৎ করে ওয়েবসাইট লঞ্চিং এর ঠিক ৭ দিন আগে আমাদের সব কোডিং গুলো কিভাবে যেন মুছে যায় এবং ওয়েবসাইটটি তার কার্যক্ষমতা হারায়

এর মাঝে আমি ব্রুনেইতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন শীর্ষক একটি সেমিনারে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করার সুযোগ পাই ব্রুনেই তে যখন সবার সামনে টেন মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইট দেখাবো এরকম একটি উত্তেজনা কাজ করছিল ঠিক সেই মুহূর্তে নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের ওয়েবসাইট আর কাজ করছিল না ১৭ই মে আমরা আবার লঞ্চিং এর দিন নির্ধারণ করে এই সাতদিনের মাথায় আমরা সবাই দিন রাত পরিশ্রম করে পুনরায় টেন মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইটটি দাড় করাই

আমার স্বপ্নের টেন মিনিট স্কুল ১৭ ই মে লঞ্চ হয় এবং লঞ্চিং এর কার্যক্রম শেষ করে ওইদিন রাতেই আমি ব্রুনেই এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি আমি যখন ট্রাঞ্জিশনের জন্য বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলাম তখন জানতে পারলাম আমাদের সার্ভার ক্রাশ করেছে অথচ ঘণ্টা খানেকের পরেই আমাকে টেন মিনিট স্কুলকে রিপ্রেজেন্ট করতে হবে পুরো বিশ্বের সামনে তখন আমার ক্রেডিট কার্ড ছিল না এয়ারপোর্টে বসে এক বড়ভাইয়ের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে নতুন সার্ভার কিনা হল এবং সারারাত কাজ করার পরে সকালবেলা আবার টেন মিনিট স্কুল চালু হল আমি ও ব্রুনেইতে গিয়ে পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে আসলাম টেন মিনিট স্কুল এরপর থেকে আজ পর্যন্ত আর কোনদিন আমাদের সার্ভার ডাউন হয় নি

নিয়াজ আহমেদ: বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আয়মান সাদিক এর স্বপ্ন?

আয়মান সাদিক: আমরা অনেকে না জেনে না বুঝে মুখস্ত করি। আমি এমন শিক্ষা ব্যবস্থা স্বপ্ন দেখি যেখানে সবাই বুঝে বুঝে পড়বে। পড়াশুনাটা কোন ভীতি না, আনন্দের সাথে হবে। আমি এমন একটি শিক্ষা ব্যাবস্থার স্বপ্ন দেখি যেখানে সবাই সিলেবাসের বাইরেও নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী হবে। আমি এমন শিক্ষা ব্যবস্থা স্বপ্ন দেখি যেখানে একজন ছাত্রকে সিজিপিএ না বরং মেধা দিয়ে মূল্যায়ন করা হবে। সবাই নিজেদের পছন্দের মতো বিষয় পড়বে, শিখবে।

নিয়াজ আহমেদ: টেন মিনিট স্কুলের বর্তমান কার্যক্রমগুলো কী কী?

আয়মান সাদিক: প্রতিদিন প্রায় ২ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী টেন মিনিট স্কুলের মাধ্যমে পড়াশুনা করছে প্রথম শ্রেনী থেকে শুরু করে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিষয়ের প্রত্যেকটি চ্যাপ্টারের উপর মোট সাড়ে ৬ হাজারের উপরে ভিডিও রয়েছে ২১ টি প্রফেশনাল কোর্স রয়েছে টেন মিনিট স্কুলের সাইটেমাইক্রোসফট অফিস এবং এডবির প্রতিটি সফটওয়্যারের উপরে সম্পূর্ণ কোর্স রয়েছে আমাদের সাইটটিতে

২১৭ টি স্মার্ট বুক ও ৩৫০টির বেশি ব্লগ রয়েছে আমাদের সাইটে ৪৮০০০ এর অধিক কুইজ আপলোড করা আছে আমাদের এই সাইটটিতে লাইভ ক্লাস আছে ৩৫ টির ও বেশি ইউটিউবে আছে ২ লক্ষের অধিক সাবস্ক্রাইবার ফেসবুকে লক্ষাধিক মেম্বারের কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দিয়ে থাকি ৫৩ জন নিবেদিত প্রান টিম মেম্বার এবং ৬০ জনের অধিক শিক্ষকের নিরলস পরিশ্রমের ফলাফল আজকের এই টেন মিনিট স্কুল

 

 

 

নিয়াজ আহমেদ: আয়মান সাদিকের পুরস্কার ও তিরস্কার?

আয়মান সাদিক: ২০১৮ তে আমরা পেলাম কুইন্স ইয়াং লিডার এ্যাওয়ার্ডএছাড়াও ২০১৬ সালে লন্ডনে ফিউচার লিডারস লিগ চ্যম্পিয়ান এ্যাওয়ার্ড পাই শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য টেন মিনিট স্কুল সুইস এমব্যাসি এ্যাওয়ার্ড, গ্লোমো এ্যাওয়ার্ড এ ভুষিত হয়েছে আমরা পেয়েছি এপিক্টা এ্যাওয়ার্ড যেটাকে কিনা আইসিটি এর অস্কার বলা হয় এছাড়া আমরা জাতীয় পর্যায়ে আইসিটি পুরস্কার, ইয়োরথ এ্যাওয়ার্ড ছাড়া ও অর্ধ শতাধিক বিভিন্ন ধরনের সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছি

এবারে আসা যাক একটু তিরস্কারের গল্পে, টেন মিনিট স্কুলের শুরুর দিকে আমরা সারা রাত জেগে একটা স্টুডিও তে ভিডিও বানাতামগ্রেজুয়েশন শেষ করার পর পাড়া প্রতিবেশিরা আমার মাকে জিজ্ঞাসা করত,

‘ভাবি,আয়মান কী করে?’

আমার মা উত্তর দিত সেতো ভিডিও বানায়

আন্টিরা জিজ্ঞাসা করত, ‘ভাবি, কিসের ভিডিও বানায়?’  

আমার মা উত্তর দিত ভাবি, ‘তাতো জানি না

প্রতিবেশিরা দেখতো আমি প্রতিদিন রাতে ভিডিও বানানোর জন্য যাই আর প্রতিদিন সকালে ফিরি এতে করে তাদের মনে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রশ্নের জন্ম দিত, আমার মা প্রথমদিকে এর জন্য কিছুটা কষ্ট পেতেন

প্রথমদিকে আমি যখন বিভিন্ন ইভেন্ট এ বক্তা হিসেবে যেতাম আমি টেন মিনিট স্কুলের টি শার্ট পরতাম একবার একটি ইভেন্টে কথা বলতে যাই এবং সেখানকার দাড়োয়ান আমাকে আটকে দেয় তাকে যখন জানালাম আমি একজন এই সেমিনারের বক্তা, তখন সে মিনমিনিয়ে বলে উঠল এই ছোকরা বক্তা হয় কিভাবে? অতপর সে আয়োজককে ফোন দিয়ে জানালো এক পোলা তাকে এসে বলছে সে নাকি স্পিকার এরকম স্পিকার থেকে ছোকরা আর ছোকরা থেকে পোলা আবার পোলা থেকে স্পিকার, এই ঘটনাগুলোর কথা ভাবলে এখন হাসিই পায়

নিয়াজ আহমেদ: আয়মান সাদিকের কাছে সফলতার মানে কি?

আয়মান সাদিক: সফলতার মানে হচ্ছে প্রতিদিন নতুন কিছু শিখা, মানুষকে নতুন কিছু শিখানোমানুষকে হাসানো এবং মানুষের জীবনে ভেল্যু সংযোজন করা

নিয়াজ আহমেদ: টেন মিনিট স্কুলের সফলতার প্রধান টি কারণ?

আয়মান সাদিক: আমাদের চারপাশে আমরা প্রায়ই দেখি কেউ নতুন কিছু করতে চাইলে সবাই তার বিরোধিতা করে এবং সে যাতে বেশিদূর এগোতে না পারে সেজন্য সবাই পেছন থেকে আকড়ে ধরে। আমার ক্ষেত্রে হয়েছে ঠিক তার উল্টোটা। আমি যখনি  যাকে যা রিকোয়েষ্ট করেছি তার কাছ থেকে তাই পেয়েছি। মানুষের মাঝে আমি বিশ্বাস দেখতে পাই। সরকারের আইসিটি মন্ত্রনালয় আমাকে বিশ্বাস করেছে, রবি আমাকে বিশ্বাস করেছে।

আমার টিম মেম্বাররা আমাকে বিশ্বাস করেছে। টেন মিনিট স্কুল বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা শুধুমাত্র বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা চালাচ্ছে। আর টেন মিনিট স্কুলের সফলতার সবচেয়ে বড় অংশীদার হচ্ছে এর শিক্ষার্থীরা। আমার শিক্ষার্থীদেরকে আমি যখন যেটা করার জন্য অনুরোধ করেছি তখন তারা সেটাই করেছে।

নিয়াজ আহমেদ: শিক্ষাব্যবস্থা  ডিজিটাল তো হলতবুও দেশে এতো বেকার কেন?

আয়মান সাদিক: শিক্ষাব্যবস্থা এখনও ডিজিটাল হচ্ছে। আগামীতে এটা আরো উন্নত হবে এবং সহজতর হবে। এখন পর্যন্ত দেশে এক লাখ সত্তর হাজার স্কুল আছে, আমরা পৌছেছি ২০০০ স্কুলে। দেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ কোটি ২৮ লাখ আর আমরা পড়াই ২ লাখ শিক্ষার্থীদের। সুতরাং এখনও আরো অনেক কাজ করা বাকি। এই মুহূর্তে একুশ শতাব্দির দক্ষতাগুলো নিয়ে নতুন কোর্স এবং কন্টেন্ট সাজানোর কাজ চলছে। এই কাজ সম্পূর্ণ হলে তা বেকার সমস্যা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি

নিয়াজ আহমেদ: মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকতৃণমুল পর্যায়ে শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতি উন্নয়নে টেন মিনিট স্কুলের কোন পদক্ষেপ আছে কী?

আয়মান সাদিক: আমরা খুব শীঘ্রই শিক্ষকদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষনগুলো অনলাইনে আনছি। কিভাবে ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে ইন্টারেক্টিভ কন্টেন্ট দিয়ে ক্লাসে পাঠদান করানো সম্ভব তা নিয়ে সরকারেরও বড়সর পরিকল্পনা আছে। তবে সর্বোপরি আমাদের টেন মিনিট স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সহায়ক। আর এই সহায়তা যে কেউ পেতে পারে, তাও আবার একদম ফ্রি।   


 

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?