সফল যারা কেমন তারা – পর্ব ১১

Corporate Trainer (Leadership, Supply Chain, Safety), Motivational Speaker & Professional CV Writer niazabeed@gmail.com

বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে অনেকে উজ্জ্বল  ক্যারিয়ারের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু এমন মানুষ কতজন আছেন যারা দেশের বাইরে পড়াশোনা করে ক্যারিয়ার গঠনের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেন?

এদেশের অন্যতম স্বনামধন্য প্রশিক্ষক রুশদিনা খান তাদেরই একজন। তিনি দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে গ্র্যাজুয়েশন এবং লন্ডন থেকে মানব সম্পদ বিষয়ে মাস্টার্স করার পর অনায়াসে লন্ডনে ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন। কিন্তু তা না করে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ক্যারিয়ার নতুন করে ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেন। আই সি ডি ডি আর বি, বাংলালিংক এবং অ্যাকর্ড এর মত প্রতিষ্ঠানে মানব সম্পদ উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে তার।

বর্তমানে তিনি তার নিজের প্রতিষ্ঠান “ট্রেনিং উইথ রুশদিনা”তে প্রধান পরামর্শক এবং প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিভিন্ন কোমল দক্ষতা এবং যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ প্রদান করেন। কীভাবে পরিমিত মাত্রায় বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব, কীভাবে নিজেকে সাবলীল ভাবে প্রকাশ করা সম্ভব এবং কীভাবে ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব এসব বিষয়েও বিভিন্ন কর্পোরেট হাউসগুলোতে তিনি প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন।

প্রশ্নঃ১। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের গল্পগুলো শুনতে চাচ্ছিলাম?

উত্তরঃ ক্যারিয়ার এর শুরুতে বয়সটাই ছিল আমার জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যারা আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর পদে অধিষ্ঠিত আছেন, তাদের অনেকেই নতুনদেরকে সহজে সুযোগ দিতে চান না। অনেকে অনিশ্চয়তায় ভোগেন এই ভেবে যে নতুনরা আসার কারণে তাদের  কর্মসংস্থান ও পদবীর রদবদল হয়ে যেতে পারে। দেশের বাইরে পড়াশোনা করার কারণে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। প্রতিষ্ঠানে আগে কীভাবে কাজ হয়েছে সেই ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে বরং ভবিষ্যত পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সিদ্ধান্ত নিতাম।

আমার প্রত্যেকটি পদক্ষেপ ছিল পরিবর্তিত, পরিবর্ধিত এবং নতুন। যার কারণে অভিন্ন চিন্তাধারার কারো কারো সাথে আমার মতের মিল থাকতো না। আমি আমার প্রতিদিনের কাজের বাইরেও কোম্পানির উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন পদক্ষেপ নেই। যাতে করে কোম্পানির মূল লক্ষ্য অর্জন সহজতর হয়ে ওঠে। একটা সময়ে আমার দায়িত্ব পরিবর্তন করে দেয়া হয় এবং পরিবর্তিত দায়িত্বগুলোও আমি যথাযথভাবে পালন করি। ক্যারিয়ারের শুরুতে এই চ্যালেঞ্জগুলো ছিল বলেই আমি আজকের রুশদিনা খান।

[tmsad_ad type=”video”]

 

প্রশ্নঃ ২। যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধানত আপনি কী কী অসামঞ্জস্যতা ও দূর্বলতা দেখতে পান?

উত্তরঃ

১। আমরা যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য মাথায় রাখি না।

২। আমরা সংক্ষেপে গুছিয়ে কথা বলতে পারি না।

৩। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমরা আলাপচারিতা শেষ করতে পারি না।

৪। কোথায় কোন উদাহরণ দিতে হবে, সেটা বুঝি না।

৫। না বুঝে আঞ্চলিক ভাষা এবং অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে বসি।

৬। নিজেই সব কাজের বাহবা নিতে চেষ্টা করি।

৭। পরনিন্দা, পরচর্চা।

৮। সাধারণ ব্যাপারকে তিক্তভাবে উপস্থাপন করি।

৯। অপরের সহযোগিতা অস্বীকার করি।

১০। সমাধান নিয়ে চিন্তা না করে সমস্যা নিয়ে সময় নষ্ট করি।

প্রশ্নঃ ৩। চাকরিতে ঢোকার পূর্বে কী কী প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে হবে?

উত্তরঃ শিষ্টাচার, সময়ানুবর্তিতা, যোগাযোগ দক্ষতা, আচরণবিধির উপর প্রশিক্ষণ থাকা ভাল। সেই সাথে এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট এবং ইংরেজিতে দক্ষতা তো লাগবেই।

প্রশ্নঃ ৪। চাকরিতে ঢোকার পর কী কী প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করতে হবে?

উত্তরঃ কী কী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তা আসলে নির্ভর করে আপনি কোন ইন্ডাস্ট্রি বা কোন বিভাগে কাজ করতে চাচ্ছেন তার উপর। এক্ষেত্রে আপনাকে একজন আইকন কিংবা রোল মডেল নির্ধারণ করতে হবে তার ক্যারিয়ার পথচলা সময়ে কবে কী প্রশিক্ষণ করেছেন সেগুলো তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া আপনার নিজের দক্ষতা প্রতিনিয়ত আপনাকে পরিমাপ করতে হবে আপনার দক্ষতা, দুর্বলতা সুযোগ এবং বাধাগুলোকে নির্ধারণ করতে হবে এবং ওই অনুযায়ী আপনার দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কী কী বিষয়ে প্রশিক্ষণ দরকার সেটা নির্ধারণ করতে হবে ।

প্রশ্নঃ ৫। যোগাযোগের দুবর্লতা কীভাবে কাটিয়ে উঠা সম্ভব?

উত্তরঃ যোগাযোগ দূর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হলে সর্বোপরি আপনাকে কার সঙ্গে কথা বলছেন কী উদ্দেশ্যে কথা বলছেন এবং কতটুকু সময়ে কী বুঝাতে হবে সেটা নির্ধারণ করতে হবে বলতে হবে কম শুনতে হবে বেশি। ভদ্র, নমনীয় এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যোগাযোগ করতে হবে কোনক্রমেই কারো সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়ানো যাবে না।

প্রশ্নঃ ৬। মেয়েদের ক্যারিয়ার গড়তে গেলে তাদের উপরে নানারকম সাইকোলজিক্যাল এবং ইমোশনাল অত্যাচার হয়ে থাকে। এটা কে তারা কীভাবে সামলে নিবে?

উত্তরঃ কে প্রথমত বুঝতে হবে যে সে কী চায়, সে কী করতে পারে এবং তার সামনে কী কী পথ খোলা আছে যেমন আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনেক সময় দেখা যায় সন্তান জন্মলাভের পর মেয়েরা আর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে না। কিংবা যারাও ভাবেন তাদের সামনে অনেকগুলো বড় ধরণের প্রশ্ন এসে হাজির হয় যেমন চাকরি সংসার নাকি বাচ্চা কোনটা সামলাবো? এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আপনাকে বুঝতে হবে আপনি আসলে কতটুকু পরিমাণে ছাড় দিতে পারবেন। তবে চাকরি, সংসার এবং বাচ্চা, এই তিনটিকে একসাথে চালিয়ে যেতে হলে প্রবল মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকা দরকার।

আমাদের দেশে হাতেগোণা যারাই সফল হয়েছেন তাদেরকে কোন না কোনভাবে এই তিনটির মধ্যে সমন্বয় করতে হয়েছে। এখন আপনি আসলে কোনটিতে কী পরিমাণ ছাড় দিবেন সেটা আসলে আপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপরেই নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে সুশান্ত পালের একটা কথা না বললেই নয়, “ঘুমে থাকার আনন্দ আর সূর্যোদয় দেখার আনন্দ একসঙ্গে পাওয়া যায় না।” 

প্রশ্নঃ ৭। কোন তিনটি কারণে মেয়েদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া সহজ বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর : ১/ মেয়েরা সাধারণত সম্পর্কগুলোকে মূল্য দেয়। কোন একটা কোম্পানিতে তার যদি সবার সঙ্গে মোটামুটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাহলে সে সহজে কোম্পানি ছাড়তে চায় না।

২/ মেয়েরা দায়িত্বশীল এবং নরম স্বভাবের হয়, সাংসারিক কোন কাজে কখনো যদি অফিসে একটু কম সময়ও কাটানো হয়ে যায়, অধিকাংশ নারীই অতিরিক্ত সময় কাজ করে সেটা পুষিয়ে দিতে কোন আপত্তি করেন না ।

৩/ মেয়েদেরকে অনুপ্রাণিত করা খুবই সহজ, তবে কিছু কিছু মেয়েদের মাঝে ইগো দেখা যায়। যার কারণে তারা বুদ্ধি এবং কৌশল দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা না করে আবেগী হয়ে হুট করে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে ।

প্রশ্নঃ ৮। নারীদের ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে হলে কোন তিনটি বিষয়ে কম্প্রোমাইজ করা যাবে না ?

উত্তরঃ প্রথমত, নিজের মূল্যবোধ সবসময় ঠিক রাখতে হবে ভালো এবং মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, পারিবারিক কোন সমস্যা যদি থেকেও থাকে, তাহলে সেটাকে নিজের মতো করে মীমাংসা করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে একেকজনের পরিবার যেহেতু একেকরকম, কাজেই ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমস্যার সমাধান করেই আপনাকে ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে হবে ।

তৃতীয়ত, আপনার জীবনে নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে সুস্পষ্ট ক্যরিয়ার পরিকল্পনা থাকতে হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করবেন ধাপে ধাপে তার উপায়গুলোও জানা থাকতে হবে।

প্রশ্নঃ ৯। নারীদেরকে উদ্যোক্তা হতে হলে নিজেকে কিভাবে প্রস্তুত করতে হবে?

প্রথমত, মানসিক দৃঢ়তা থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আপনি কোন ধরণের উদ্যোক্তা হতে চাচ্ছেন, সেই ব্যাপারে আপনার কিছুটা হলেও দক্ষতা থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ থাকতে হবে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণের আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হবে, তবে যে কাজ সম্পর্কে একেবারেই আপনার ধারণা নেই, শুধু অন্যের দেখাদেখি সেই পথে পা বাড়ানো নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয় ।

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?