প্রেরণামূলক গল্পের ঝুলি

সফলদের স্বপ্নগাঁথাঃ সুন্দর পিচাই যেভাবে গুগলের CEO হলেন

শুরু করছি ছোট একটা গল্প দিয়ে। সকাল বেলা, বেশ জমজমাট একটি রেস্টুরেন্ট। দুজন ভদ্রমহিলা সবে এসে বসেছেন, এমন সময় কোত্থেকে একটা তেলাপোকা উড়ে এসে ঠিক তাদের সামনে বসলো! ভদ্রমহিলা দুজন তো রীতিমত লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে ফেললেন।

পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো এক ওয়েটার, তেলাপোকাটি সবার চেঁচামেচিতে বিরক্ত হয়ে সেই ওয়েটারের কাঁধে এসে উঠলো। সবাই চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে কী কাণ্ড হয় দেখার জন্য।

ওয়েটার করলো কী, খুব শান্তভাবে তার হাতের খাবার পাশের টেবিলে রেখে এক টোকায় তেলাপোকাটাকে রেস্টুরেন্টের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলো! তারপর আবার খাবার পরিবেশন শুরু করলো, যেন কিছুই হয়নি এতক্ষণ!

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ।

ব্যাপারটাতে সবাই বেশ মজা পেয়ে আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। কিন্তু রেস্টুরেন্টের কোণার টেবিলে চশমা পরা খোঁচা খোঁচা দাড়ির একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কিন্তু ঘটনাটি দেখে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।

তাঁর মনে হলো, মানুষের চিৎকারে কোন লাভ তো হয়ইনি, বরং গণ্ডগোল তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ঠান্ডা মাথায় ওয়েটারের দারুণ সিদ্ধান্তে ব্যাপারটা আর কোনরকম ঝামেলায় গড়ায়নি!

আমাদের জীবনটাও ঠিক তেমনই, একটি ঘটনায় আমরা যদি অকারণে React করি তাহলে ঝামেলা আরো বাড়তে থাকে। অন্যদিকে আমরা যদি Respond করি, তাহলে কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই অন্যরকম হয়ে যাবে! ছোট্ট দুটি শব্দ React আর Respond, কিন্তু দুটির পার্থক্য পুরো ঘটনাকেই পাল্টে দেয়!

চশমা পরা রোগাপাতলা সেই মানুষটির নাম সুন্দর পিচাই, গুগলের বর্তমান CEO, টাইমস ম্যাগাজিনের তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন। চলো, আজ জেনে নেওয়া যাক কীভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গ থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে ভারতের এক সাদামাটা পরিবারে বেড়ে ওঠা পিচাই বনে গেলেন প্রযুক্তি জগতের নায়ক।

শুরুর গল্প

সুন্দর পিচাইয়ের জন্ম ১৯৭২ সালের ১২ জুলাই, দক্ষিণ ভারতের চেন্নাইয়ে। তাঁর বাবা রঘুনাথ পিচাই পেশায় ছিলেন তড়িৎ প্রকৌশলী, মা লক্ষ্মী পিচাই ছিলেন শ্রুতিলেখক শিক্ষা-দীক্ষায় সবাই অগ্রসর হলেও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না তেমন

ঘুরে আসুন: গুগলে চাকরি পেতে জানতে হবে যে বিষয়গুলো

দুই রুমের ছোট্ট, ঘিঞ্জি এক ফ্ল্যাটে থাকতেন তাঁরা মেধাবী বাবা-মায়ের সাহচর্যে পিচাই শৈশবেই নিজের মেধার বিচ্ছুরণ ঘটাতে শুরু করেন। একবার শুনেই যেকোন টেলিফোন নাম্বার মুখস্থ হয়ে যেতো তাঁর, স্কুলে পড়াশোনায় দারুণ ফলাফল করে তাক লাগিয়ে দিলেন সবাইকে।

পদ্ম সেশদ্রি বালা ভবন নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন তিনি, সুযোগ পান সুবিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় আইআইটি খড়গপুরে। সেখানে পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি বৃত্তি পেলেন সুন্দর

পরিশ্রম সফলতার চাবিকাঠি!

আমাদের ছোট-বড় অনেকরকম স্বপ্ন থাকে। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারি কতগুলো?

এই দ্বিধা থেকে মুক্তি পেতে চল ঘুরে আসি ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্ট থেকে!

লাইফ হ্যাকস সিরিজ!

স্বপ্ন ছুঁতে বিদেশ গমন

সেই ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে গল্প শুনতে শুনতে পিচাইয়ের মনে একটি স্বপ্ন গড়ে উঠেছিল- প্রযুক্তির তীর্থভূমি হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করার। স্ট্যানফোর্ডে পড়ার সময়ও মাথার ভেতর সে স্বপ্নের কথাই যেন ঘুরছিলো তাঁর, তাই অধ্যাপকেরা তাকে পিএইচডির জন্য সুপারিশ করলেও পিচাই পিএইচডি না করে ধাতব বিজ্ঞান অর্ধপরিবাহী পদার্থবিজ্ঞানের ওপর মাস্টার্স করলেন

তারপর পিএইচডি করতে এসে মন টিকলো না, হয়ে গেলেন ড্রপআউট! এরপর কিছুদিন সিলিকন ভ্যালিতে অ্যাপ্লাইড ম্যাটেরিয়ালস নামে একটি অর্ধপরিবাহী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে আবার পড়াশোনায় ফিরে আসেন, পামার বৃত্তি নিয়ে ২০০২ সালে পেনিসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন

আবার ফিরলেন কর্মক্ষেত্রে, ম্যাককিনসে অ্যান্ড কোম্পানিতে ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করলেন।

গুগলের সাথে এগিয়ে যাওয়া

গুগলে ইন্টারভিউ দিতে এলেন যেদিন, কাকতালীয়ভাবে দিনটি ছিল গুগলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় একটি মুহূর্ত- ২০০৪ সালের সেই দিনটিতেই জিমেইল চালু করে গুগল!

ইন্টারভিউতে নিজের জাত চেনাতে সময় নেননি পিচাই, প্রথম দফাতেই চাকরি পেয়ে গেলেন। জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে গুগলের সার্চ টুলবারকে উন্নত করার জন্য নিয়োজিত ছোট একটি দলে কাজ শুরু করার মাধ্যমে।

তাঁর কাছে গুগলের অবস্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে

সেখান থেকেই শুরু সাফল্যের পথচলা। গুগলের সার্চ টুলবারে দারুণ কিছু আইডিয়া যোগ করে গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সার্গেই ব্রিনের নজরে চলে আসেন তিনি। সুযোগটি কাজে লাগাতে দেরি করেননি পিচাই, তাঁদের অনুমতি আদায় করে গুগলের নিজস্ব ব্রাউজার তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন কাজে।

ফলাফল? ২০০৮ সালে চালু হওয়ার পর মাইক্রোসফটের ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার আর মজিলা ফায়ারফক্সকে হটিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্রাউজার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে গুগল ক্রোম। সে বছরই পণ্য উন্নয়ন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন সুন্দর, কাজের পুরস্কার স্বরূপ চার বছরের মাথায় ক্রোম ও অ্যাপ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্টের আসন অলংকৃত করেন।

প্রযুক্তি জগতের মহারথী হওয়ার পথে

টুইটার, মাইক্রোসফট ইত্যাদি কোম্পানি থেকে অনেকবার লোভনীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব পেয়েও সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন পিচাই। তাঁর কাছে গুগলের অবস্থান সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কারণ পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে মানুষ গুগল ব্যবহার করে জ্ঞান অর্জন করতে পারে, বৈষম্য দূর করতে পারে।

তাঁর বিশ্বস্ততার প্রতিদান স্বরূপ গুগলের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)-ঘোষিত হন ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট । আনুষ্ঠানিকভাবে ল্যারি পেজের সেকেন্ড ইন কমান্ড , অর্থাৎ গুগলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ ‘প্রোডাক্ট চিফ’ ঘোষিত হন সুন্দর। তাকে এই পদে অধিষ্ঠিত করার ঘোষণাপত্রে ল্যারি পেজ পিচাই সম্পর্কে বলেন ‘ওর চেয়ে ভাল আর কেউ হতে পারতো না এই পদে’।

ঘুরে আসুন: সফল ব্যক্তিদের অবসর কীভাবে কাটে?

সুন্দর পিচাই সম্পর্কে কিছু তথ্য

  • গভীর চিন্তায় ডুবে গেলে পায়চারি করতে থাকেন সুন্দর। মিটিং এর মাঝেও কোন বিষয়ে গভীর মনোনিবেশের প্রয়োজন হলে ঘরভর্তি লোকের মাঝেই পায়চারি করে বেড়ান তিনি।
  • নিজের হাইস্কুলের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি। এখনো পাঁড় ক্রিকেট ভক্ত হিসেবে পরিচিত।
১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে অনলাইন লাইভ ক্লাসের! তা-ও আবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!
  • সুন্দর পিচাই নিজেই স্বীকার করেন, কেবল মেধার জোরে কখনোই এতদূর আসেননি তিনি। গুগলে তাঁর চেয়েও তুখোড় মেধাবী অনেকেই আছে, কিন্তু মানুষের মন বুঝতে পারা, কাজ আদায় করিয়ে নেওয়ায় পারদর্শিতাই তাঁকে সাফল্যের শীর্ষে তুলে এনেছে। শোনা যায়, ইয়াহুর CEO মারিসা মেয়ারের সঙ্গে দেখা করতে পিচাই তাঁর অফিসের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন, কাজ আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত দেননি।
  • পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সুন্দর পিচাইয়ের নীতি বেশ কড়া। তাঁর অফিস সারাক্ষণ থাকে ঝকঝকে-তকতকে, ছিমছাম।
  • যে কোনো নাম্বার একবার শুনলেই বহুদিন মনে রাখতে পারেন পিচাই। কারও ফোন নাম্বার লিখে রেখে বা সেইভ করে রাখার প্রয়োজন পড়ে না তাঁর!
  • সুন্দর পিচাইকে একনজর দেখলে কিছুটা গোবেচারা এবং রাশভারী মনে হলেও ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, বন্ধুত্বপরায়ণ ও পরোপকারী হিসেবে পরিচিত। তিনি এখনো প্রায়ই ভিডিও কনফারেন্সে নিজের আইআইটি খড়গপুরের ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে কথা বলেন, পরামর্শ দেন, সহযোগিতা করেন।

১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]