কী করে কাটাবেন গড়িমসি করার অভ্যাস?

Assistant Professor of the University of Dhaka & PhD researcher at Monash University Sunway Campus.

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

‘Action is the foundational key to all success’ – Pablo Picasso

সব সাফল্যের মৌলিক চাবিকাঠি হচ্ছে কর্ম- পাবলো পিকাসো

হাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকলেও গড়িমসি করে সময় চলে যাচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ ব্যাপারটাকেই কাজে দীর্ঘসূত্রিতা বা গড়িমসি করা বলে। কাজে গড়িমসি করার ঘটনাটা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কমবেশি আমাদের সবার মাঝেই তা দেখা যায়।

কারও কারও ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকে যে তাদের দ্বারা গুরুত্বপূর্ণ কিছুই করা হয়ে ওঠে না। ব্যর্থতার চক্রে ঘুরতে থাকে। একপর্যায়ে জীবনের সব আশা ছেড়ে দিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজতে থাকে। যে জীবনে থাকে না আনন্দ, প্রাপ্তি, সম্মান।

কাজ ফেলে রাখা, গড়িমসি করা সাঙ্ঘাতিক খারাপ একটা মানসিক ভাইরাস। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ভাইরাস শনাক্ত করে ডিলিট করতে হবে। আজ আমরা সেই লক্ষ্য নিয়েই এগোব।

[tmsad_ad type=”video”]

কাজ ফেলে রাখার এই ভাইরাসটা আমার মধ্যে মারাত্মকভাবে ছিল। এর পেছনে একটা যুক্তি কাজ করতো। কী দরকার এখন করার? যে কাজ আছে, এক রাতের ব্যাপার। অযথা আগে থেকে টাইম নষ্ট করার কোনো মানে আছে?

হ্যাঁ, অনেক সময়। হয়তো আমি কাজটা একবারেই করে ফেলতে পারতাম, সমস্যাও হতো না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভয়ানক বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। হয়তো অ্যাসাইনমেন্টটা ঠিকই করেছি, কিন্তু শিক্ষকের নামের বানান ভুল করেছি! শেষ রাতে পড়ব বলে ঠিক করে রেখেছি, টেবিলে গিয়ে দেখি আমার যে বইটা দরকার, সেটা এক বন্ধুর কাছে। যেহেতু আগে থেকে দেখিনি, তাই আনতেও পারিনি।

‘শেষরাতের মাইর’ দিতে গিয়ে তখন অবর্ণনীয় দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়তে হয়। কোনো উপায় না পেয়ে ভাবতে থাকি, কীভাবে, কোনোমতে এবারের মতো পার পাওয়া যায়। পরেরবার আগে থেকেই সচেতন থাকব। কিন্তু আবার যখন নতুন কোনো কাজ আসে, সেই একই গড়িমসি। এ যেন রক্তের সাথে মিশে গেছে। হতাশা দেখা দিত প্রায়ই। নিজের প্রতি বিরক্তবোধ হতো। মনে মনে গালি দিতাম।

এরকম অবস্থা চলতে থাকলে কি গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে? মানুষ কি আমাকে বিশ্বাস করতে পারবে? না, কখনোই না। গড়িমসি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর্মক্ষমতা বাড়াতে হলে, দীর্ঘসূত্রিতাকে ডিলিট করতে হবে।

নিজেকে প্রশ্ন করলাম, কেন আমি এত গড়িমসি করছি? এর গভীরে কী রয়েছে? প্রচুর পড়াশোনা আর কাউন্সেলিং নেওয়ার ফলে উপলব্ধি করলাম, কী আছে এর পেছনে।

কাজে গড়িমসি করার মূলে দু’টি মৌলিক বিষয় জড়িত। আকাঙ্ক্ষা/বাসনা এবং ভয়

কোন কাজ হাসিল করার আকাঙ্ক্ষা বা বাসনা কতটা তীব্র, আর সেই কাজটা করতে গিয়ে কোনো ভয় আছে কিনা? থাকলে সেটা কতটা তীব্র? যদি আকাঙ্ক্ষার থেকে ভয়ের তীব্রতা বেশি হয়, কাজটা ফেলে রাখি। শুরু হয় গড়িমসি। আর যদি ভয়ের চেয়ে আকাঙ্ক্ষার মাত্রা বেশি হয়, সময়ের কাজ সময়ে শেষ হয়। দীর্ঘসূত্রিতা থাকে না।

আপনার মধ্যেও যদি গড়িমসি করার প্রবণতা থাকে, এখনই উদ্যোগ নিন, কীভাবে তা মোকাবিলা করবেন। মনোযোগ দিয়ে নিচের অংশটুকু পড়ুন। দীর্ঘসূত্রিতা মোকাবিলা করার আগে খুঁজে বের করুন কেন আপনি তা করছেন। এর গভীরে কী রয়েছে? কীভাবে তা করবেন, ধাপে ধাপে তা বলছি।

ধাপ এক

গড়িমসি করছেন এরকম দু-একটা কাজ প্রথমে খুঁজে বের করুন। পেয়েছেন? ভালো। ধরলাম, থিসিস রিপোর্ট লিখতে হবে। তিন মাস পর জমা, অথচ আপনি কিছুই লিখছেন না। যতই সময় যাচ্ছে দুশ্চিন্তা বাড়ছে, কিন্তু কাজ এগুচ্ছে না।

এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন, কেন আমি থিসিস লিখতে গড়িমসি করছি?

উত্তর হতে পারে, থিসিস লিখতে আমার ভালো লাগে না। রিপোর্ট লেখা বিরক্তিকর। কোথায় থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছি না। লেখা কেমন হবে, সেটা নিয়ে ভয়ে আছি। গুড, উত্তর যা-ই হোক, সেটাকে পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে চ্যালেঞ্জ করুন।

‘থিসিস লিখতে আমার ভালো লাগে না।’ কেন থিসিস লিখতে আমার ভালো লাগছে না? এর পেছনের কারণ কী?

‘রিপোর্ট লেখা বিরক্তিকর।’ রিপোর্ট লেখা আমার কাছে বিরক্তিকর লাগছে কেন?

‘কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।’ কেন বুঝতে পারছি না? কীভাবে শুরু করবো, তা বোঝার জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছি?

যে কাজটা করতে এত গড়িমসি করছেন, সেটাকে বিশ্লেষণ করুন

‘লেখা কেমন হবে, সেটা নিয়ে ভয়ে আছি।’ কীসের ভয় কাজ করছে আমার মধ্যে? খুব খারাপ হবে? ফেল করবো? না লিখলে কি পাস করতে পারবো?

এভাবে কয়েকবার চর্চা করলে বেরিয়ে আসবে, কেন আপনি দিনের পর দিন কাজটা ফেলে রাখছেন। আর এই উপলব্ধিই আপনাকে পথ দেখাবে কীভাবে গড়িমসি করা থেকে বেরিয়ে আসবেন।

ওপরের আত্মবিশ্লেষণ কৌশলের ফলে অনেক সময় খুব গভীর এবং অবচেতন মন থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু বের হয়ে আসতে পারে। যেমন- এক মেয়ে ক্লায়েন্ট চাকরির আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে করতে পারে না। প্রতিবারেই কিছু না কিছু ভুল হয়, ফলে আর সম্পন্ন আবেদন জমা দিতে পারে না। তিন বছর ধরে একই কাহিনী। গভীর আত্মবিশ্লেষণ করে সে বের করেছে, এর মূলে রয়েছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার উদ্বেগ। চাকরি পেলে বাইরে যেতে হতে পারে, অথবা দ্রুত বিয়ে হয়ে যাবে। তার বাবা-মা একলা হয়ে যাবে। সেটা সে কল্পনাতেও আনতে পারছে না!

এরকম ক্ষেত্রে ওই গভীর ইস্যু নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্টের সহযোগিতা নিতে হবে।

তবে সাধারণত আকাঙ্ক্ষার অভাব, অস্পষ্ট লক্ষ্য, সাথে ভয়- এই তিনে মিলে গড়িমসি করার তেলের যোগান দেয়।

এবার যখন আপনার কাছে পরিষ্কার কেন আপনি গড়িমসি করছেন, তাহলে সেটাকে মোকাবিলার জন্য পদক্ষেপ নিন।

ধাপ দুই

খেয়াল করুন, যে কাজটা নিয়ে গড়িমসি করছেন, সেটা কি আপনার জীবনের লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ? সেটার প্রতি কি আপনার আবেগ জড়িত? সেটাকে কি সত্যিই আপনি মনেপ্রাণে চান? সেটা কি আপনার মূল্যবোধের সাথে যায়?

উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে কল্পনা করুন কাজটা হয়ে গেলে কেমন লাগবে। চোখের সামনে নিয়ে আসুন, বাঁধাই করা তিন কপি থিসিস হাতে সুপারভাইজারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আরও কল্পনা করুন সেই থিসিস শেষ করে আপনার কোন কোন জায়গায় জ্ঞান দক্ষতা বেড়েছে। কীভাবে সেই জ্ঞান দক্ষতা কর্মজীবনে কাজে লাগবে। কল্পনা করুন থিসিস নিয়ে চাকরির ভাইভায় আপনাকে প্রশ্ন করছে, আপনি ঝরঝর করে তার উত্তর দিচ্ছেন।

শুধু কল্পনা না, ভালো হয় এগুলো নোট করে রাখুন। সেই নোট যেন সব সময় চোখে পড়ে- এমন জায়গায় স্টিক করে রাখুন। প্রয়োজনে এর সাথে নিজের মত ড্রয়িং, কার্টুন, কোলাজ এঁকে রাখুন। দেখবেন কীভাবে আপনি সেই ফেলে রাখা কাজটি করার জন্য আগ্রহ বোধ করছেন। আপনার অবচেতন মন থেকে কাজটি করার তাড়না অনুভব করবেন। আগের অলস ব্রেন নতুন করে একটিভেট হচ্ছে। এটাকে বলে নিউরোপ্লাস্টিসিটি। মস্তিষ্কের পরিবর্তন হয়। নতুন নতুন নিউরাল কানেকশন সৃষ্টি হয়।

ধাপ তিন

এবার উজ্জীবিত আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। এর জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি দরকার। প্রতিদিন অন্তত তিরিশ মিনিট এমন কিছু কায়িক পরিশ্রমের কাজ (যেমন- ব্যায়াম, খেলাধুলা, ঘরের কাজ) করুন, যাতে আপনার ঘাম ঝরে। কায়িক পরিশ্রম মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা, মনোযোগ ধরে রাখার জন্য এক যুগান্তকারী মহৌষধ।

বিমর্ষ লাগছে, ফুর্তি পাচ্ছেন না, দশ মিনিটের একটা দৌড় দিয়ে আসুন। এরপর ফ্রেশ হয়ে বসুন। কেমন লাগে, আমাকে জানান। বিমর্ষতা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যাবে। এর কারণটাও বৈজ্ঞানিক। কায়িক পরিশ্রমের ফলে শরীরে যে পরিবর্তন আসে তাতে মন খারাপের, বিমর্ষতার রাসায়নিক উপাদানগুলো দূর হয়ে যায়। বেড়ে যায় মন চাঙ্গা করার রাসায়নিক কণা (নিউরোট্রান্সমিটার)।

ধাপ চার 

এত কিছুর পরেও যদি আপনার কাজ ফেলে রাখেন, তাহলে বুঝতে হবে, আপনার মাথায় শুধু একটা না, হাজারটা জিনিসে ঠাসা। আপনার ঘর, কাজের বা পড়ার টেবিলে অপ্রয়োজনীয় যা কিছু সব সরিয়ে ফেলুন। কাজ করার সময় যা কিছু বাধা হয়ে দাঁড়ায় সেগুলোকে বন্ধ রাখুন। যেমন- মোবাইল, ফেসবুক, ইমেইল, টিভি ইত্যাদি। যত বেশি অপ্রয়োজনীয় জিনিস কমিয়ে ফেলবেন, তত বেশি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হবে। কাজটাও হবে।

ধাপ পাঁচ 

যে কাজটা করতে এত গড়িমসি করছেন, সেটাকে বিশ্লেষণ করুন। একটা আউটলাইন তৈরি করুন। প্রথম দিকে সহজ লক্ষ্য ঠিক করুন। আস্তে আস্তে কঠিনের দিকে যাবেন। প্রতিদিন কতটুকু এগোলেন, সেটা দিন শেষে পর্যালোচনা করুন। দেখবেন ভালো বোধ করছেন। যেটুকুই অগ্রগতি হোক না কেন, তার জন্য নিজেকে ধন্যবাদ দিন। যাক আজকে এতটুকু তো করতে পারলাম।

ওপরের এই পাঁচটি ধাপ সঠিকভাবে অনুসরণ করলে কাজে আর গড়িমসি থাকবে না। এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। এগিয়ে যান। আপনি পারবেন। আপনার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই থাকবে।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের “মানসিক প্রশান্তি আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জাদুকাঠি” বইটি থেকে। বিশেষ ছাড়ে বইটি কিনতে চাইলে চলে যান এই লিংকে!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

What are you thinking?