আদর্শ দেশ চেনা, নয় সহজ কাজ!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

ফারহান একটি আমেরিকান চলচ্চিত্রে দেখল যেখানে বলা হচ্ছে আমেরিকা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ। চলচ্চিত্রটি দেখার পর সে তার বড় ভাই ফারদিনকে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, ভাইয়া, আমেরিকা কি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র?”

ফারদিন: “কোন একটা দেশকে এভাবে চাইলেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে দেওয়া যায় না। কারণ, বিভিন্ন রকম সূচকের ভিত্তিতে বিভিন্ন রকম তালিকা রয়েছে। একেকটি তালিকায় একেকটি দেশ শীর্ষে অবস্থান করছে। এজন্যই সর্বজন স্বীকৃত সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র বলে আসলে কিছু নেই। দেশপ্রেম থেকে অনেকেই অবশ্য এই দাবি করে থাকেন।”

ফারহান: “আচ্ছা, ভাইয়া, বড় মামা যে বলেন বাংলাদেশের মত খারাপ দেশ পৃথিবীতে আর একটাও নেই। এই দেশে ভালো কোনো কিছুই হয় না, সেটা কি সত্যি? আমরা কি সব তালিকার শেষে রয়েছি?”

ফারদিন: “দেশ হিসেবে আমাদের উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে। তার মানে এই নয় যে আমাদের দেশে ভালো কিছু হচ্ছে না।”

ফারহান: “কোন কোন তালিকার গুরুত্ব আসলে বেশি?”

ফারদিন: “প্রতিবছর অনেক তালিকাই তৈরি হয়। আমি এখন তোকে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ তালিকা কীভাবে তৈরি হয়, সে ব্যাপারে বলব।”

জিডিপিভিত্তিক তালিকা: 

ফারদিন শুরু করলো,Gross Domestic Product (GDP) একটি দেশের অভ্যন্তরে এক বছরের মধ্যে উৎপাদিত পণ্য এবং সেবার মোট মূল্য হিসাব করে। বর্তমানে এই হিসাবটি করার সময় একটি নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতাকেও আমলে নেয়া হয় এবং এটিকে বলা হয় GDP at Purchasing Power Parity (GDP at PPP)।

ek

GDP at PPP-কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করার মাধ্যমে মাথাপিছু জিডিপি পাওয়া যায়। এই সূচকটির ওপর International Monetary Fund, World Bank কাজ করে এবং তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকা অনুসারে সবার প্রথমেই রয়েছে কাতার। World Bank এর হিসাব অনুযায়ী তাদের মাথাপিছু জিডিপি ১,২৭,৫২৩ ডলার। বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু জিডিপি ৩,৫৮১ ডলার।”

মানব উন্নয়নের তালিকা: 

ফারহান বলল, “কাতার তো তাহলে অনেক অগ্রসর রাষ্ট্র। এত বেশি ওদের মানুষের আয়!”
ফারদিন বলল, “হ্যাঁ, ওদের দেশ অনেক আধুনিক। কিন্তু মাথাপিছু আয়ই সবকিছু নয়। ওদের মানব উন্নয়ন সুষম নয়। এত বেশি মাথাপিছু আয় থাকার পরও Human Development Index-এ তাদের অবস্থান ৩৩ তম।”

ফারহান: “এই তালিকা কারা তৈরি করে?”

ফারদিন: “UNDP এই তালিকা তৈরি করে। তারা Human Development Index এর মাধ্যমে মানব উন্নয়নের একটি পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করে। জিডিপিভিত্তিক তালিকাগুলো শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়ে আমাদের ধারণা দেয়।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন থাকলেও একটি দেশে মানুষের অধিকার সুনিশ্চিত নাও হতে পারে। এজন্য এই ইনডেক্সে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা চিন্তা না করে মানব উন্নয়নকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সন্নিবেশিত করা হয়।

এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল, গড় পড়ালেখার ব্যাপ্তিকাল, মাথাপিছু আয় প্রভৃতি হিসাব করা হয়ে থাকে। বর্তমানে এই তালিকায় সবার ওপরে অবস্থান করছে নরওয়ে, বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯।”

লিঙ্গভিত্তিক সমতা বিষয়ক তালিকা:

ফারহান: “ভাইয়া, নারীদের ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কেমন করছে?”

ফারদিন: “নারী-পুরুষের মাঝে সমতা নিশ্চিতকরণ একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই লক্ষ্য পূরণে দেশগুলোর অবস্থান কেমন, সে বিষয়ে বিভিন্ন তালিকা রয়েছে। United Nations Development Programme (UNDP) Gender Inequality Index প্রকাশ করে থাকে। এই ইন্ডেক্সটিতে নারীদের প্রজননকালীন স্বাস্থ্য, তাদের ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা হয়।

একদিন খবরে দেখছিলাম যে সুখী দেশেরও নাকি তালিকা হয়

এই ইন্ডেক্সে একটি রাষ্ট্রের নম্বর যত বেশি, সেই রাষ্ট্রের অসমতা তত বেশি। বর্তমানে নরওয়ে এই ইন্ডেক্সের শীর্ষে অবস্থান করছে অর্থাৎ নরওয়েতে নারী-পুরুষের মাঝে অসমতা সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৩৯। বাংলাদেশের এখনো নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে আরও অনেক কাজ করতে হবে।”

দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকা:

ফারহান: “ভাইয়া, দুর্নীতি একটি দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর অন্যতম। এই সমস্যা নিয়ে কোন তালিকা নেই?”

ফারদিন: “আছে। এই বিষয়ে ট্রান্সপ্যারান্সি ইন্টারন্যাশনাল Corruption Perception Index নামে একটি তালিকা তৈরি করে থাকে। সেই তালিকায় মূলত একটি দেশের সরকারি খাতে দুর্নীতির অবস্থার ওপর ভিত্তি করে দেশকে ০ (প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ত) থেকে ১০০ (অত্যন্ত স্বচ্ছ) এর মাঝে নম্বর প্রদান করা হয়।

এই তালিকা থেকে একটি দেশের জনগণ দুর্নীতির কারণে ঠিক কী রকম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, সে ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের তালিকা অনুসারে ডেনমার্ক এবং নিউজিল্যান্ড যৌথভাবে ১ নম্বর স্থানে অবস্থান করছে, দেশগুলোর নম্বর ৯০। তালিকার সর্বশেষ দেশ হচ্ছে সোমালিয়া, তাদের নম্বর ১০।

বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ১৪৫ এবং নম্বর হচ্ছে ২৬। এই তালিকার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও অনেক কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।”

Screen Shot 2018 02 15 at 19.27.32

সুখী দেশের তালিকা:

ফারহান: “ভাইয়া, একদিন খবরে দেখছিলাম যে সুখী দেশেরও নাকি তালিকা হয়। এই তালিকা কারা করে?”

ফারদিন: “ভূটানে সর্বপ্রথম GDP এর বদলে Gross National Happiness (GNH) হিসাব করা হয়। এক্ষেত্রে একটি দেশের জনগোষ্ঠীর সুখ এবং স্বাস্থ্যের হিসাব করার মাধ্যমে মান নির্ধারণ করা হয়। ভূটান ২০০৮ সাল থেকে তাদের সংবিধানে এটিকে তাদের রাষ্ট্রের একটি মুখ্য লক্ষ্য হিসাবে নির্ধারণ করেছে।

২০১২ সাল থেকে তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এবং ভূটানের প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলের উদ্যোগে প্রথম World Happiness Report প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ রিপোর্টে নরওয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে এবং বাংলাদেশের অবস্থান ১১০।”

ফারদিন: “একটা ব্যাপার মনে রাখবি। সকল তালিকারই বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, জিডিপির মাধ্যমে যেমন সম্পদের অসম বণ্টনের বিষয়ে কোন ধারণা পাওয়া যায় না। একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক অবস্থাকে একটি তালিকার পক্ষে সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা অত্যন্ত কষ্টসাপেক্ষ কাজ। তবে এগুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ হচ্ছে, সূচকগুলোকে আরও পরিশীলিত করা হচ্ছে।”

ফারহান: “আচ্ছা, ঠিক আছে। ভাইয়া, আমাদের দেশের অবস্থা এই সূচকগুলোতে খুব একটা ভালো নয়। আমাদের এক্ষেত্রে কী করা উচিত?”

ফারদিন: “বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সকল সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি ঘটানোর জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া! এজন্য নিজের নিজের জায়গা থেকে চেষ্টা করে যেতে হবে।

ব্যক্তিগতভাবে আমরা দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে পারি, ভালোমত পড়ালেখা করতে পারি। পরবর্তীতে আমাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের সামনে কোন খারাপ কাজ না হয়, দেশের সকল মানুষ যেন সকল ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পায়।

তাহলেই আমরা জাতি হিসেবে সকল ক্ষেত্রেই অনেক উন্নতি করবো।”


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন