জানা সূত্রের অজানা গল্প (রসায়ন)

ভালবাসি বই পড়তে আর টুকটাক লিখতে পছন্দ করি।

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

রসায়নের দুইটি তত্ত্ব:

রসায়ন বা কেমিস্ট্রি; নামটি শুনে রসে ভরপুর মনে হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা নয়। বরং অনেকের মতে এই বিষয়টিতে রসের বড়ই অভাব। কেননা তত্ত্ব ও উপাত্তের যেন কোন শেষই নেই রসায়নে। রসায়ন পড়তে বসে পর্যায় সারণীর মৌলিক পদার্থের তালিকা দেখেই ভড়কে যায় অনেকে। এরপর ধীরে ধীরে হাজির হতে থাকে নিত্য নতুন তত্ত্ব ও সূত্রের সমাহার। প্রতিটি সূত্র বা তত্ত্বের পিছনেই রয়েছে কিছু মজার গল্প ও অজানা ইতিহাস। চলুন জেনে নেয়া যাক, রসায়নের দুটি পরিচিত তত্ত্বের পিছনের ইতিহাস কেমন ছিল?

পরমাণু তত্ত্ব:

রসায়নের ভিত্তি হল পরমাণু। পরমাণু নিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্ন মতবাদ প্রদান করেছেন। কিন্তু মূলত একটি তত্ত্বই সর্বত্র গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে। জেনে নেই কীভাবে এল সেই পরমাণু তত্ত্ব।

প্রায় ২০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেন, পদার্থ কে অসীম সংখ্যকবার ভাগ করা যায়। কিন্তু আরেক বিজ্ঞানী ডেমোক্রিটাস তা মেনে নিতে পারলেন না। তিনি বললেন, একটি পদার্থকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিভাজিত করা সম্ভব যতক্ষণ না ক্ষুদ্রতম কণা পাওয়া যায়। অ্যারিস্টটল বিভিন্ন পরীক্ষা দ্বারা তাঁর মতবাদটি প্রমান করার চেষ্টা করেন। যার ফলে কিছুটা হলেও অ্যারিস্টটলের মতবাদ গ্রহণযোগ্যতা পায়।

১৮০০ শতকে এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। জন ডাল্টন নামে একজন বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটলকে ভুল প্রমাণিত করেন। তিনি নিজেই একটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে তিনি বলেন,পদার্থ অসংখ্য ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত যার নাম পরমাণু। একে আর ক্ষুদ্রতম অংশে ভাগ করা যায় না। তিনি আরও বলেন, একই পদার্থের পরমাণুগুলোর মধ্যে ধর্মের মিল রয়েছে। কিন্তু তাঁর এ মতবাদে তিনি পরমাণুর গঠন নিয়ে কিছু উল্লেখ করেন নাই।

১৮৯৭ সালে জে. জে. থমসন ক্যাথোড রে টিউবের সাহায্যে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন যা রসায়ন বিজ্ঞানে আনে যুগান্তকারী পরিবর্তন। থমসন তার আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়ে ডাল্টনের মতবাদ ভুল প্রমান করেন এবং একটি পরমাণু মডেল আবিষ্কার করেন যা পাল্ম পুডিং মডেল বা কিসমিস মডেল নামে পরিচিত। তাঁর মতে পরমাণুর মাঝে ইলেকট্রন এমনভাবে সজ্জিত থাকে দেখে মনে হয় যেন কিসমিস দিয়ে সাজানো পুডিং।

১৯০৯ সালে একদিন থমসনের ছাত্র আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ল্যাবে কাজ করছিলেন। তিনি একটি পাতলা স্বর্ণপাতের মধ্য দিয়ে কিছু আলফা কণিকার বিক্ষেপণ ঘটান। এরপর তিনি লক্ষ করেন পরমাণুর মাঝে এমন কিছু আছে যা আলফা কণিকাকে এর ভিতর দিয়ে যেতে বাধা দেয়। পরবর্তীতে তিনি এর নাম দেন নিউক্লিয়াস। তিনি বলেন পরমাণুর কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস এবং ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। রাদারফোর্ড তার পরমানু মডেলকে সৌরজগতের সাথে তুলনা করেন। তাই এই মডেলটি সৌর মডেল নামে পরিচিত।

ম্যাক্স প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কারের পর নীলস বোর আরও একটি পরমাণু মডেল প্রস্তাব করেন। যেখানে ইলেকট্রনের গতি এবং শক্তিস্তর সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। তাই এ মডেলটি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। এরপর আরও অনেক বিজ্ঞানী পরমাণু মডেল আবিষ্কার করেন।

পর্যায় সূত্র:

রসায়ন বিজ্ঞানে অন্যতম একটি টপিক হল পর্যায় সারণি। এটি বিজ্ঞান বিভাগের সকলের কাছেই খুব পরিচিত।

যখন পঞ্চাশটির মতো মৌল আবিষ্কৃত হয় তখনই বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্ন উঠে কিভাবে সমধর্মী মৌলগুলোকে বিশেষ পদ্ধতি বা সূত্রের ভিত্তিতে একটি টেবিল বা চার্টরূপে সাজানো যায়! সর্বপ্রথম মৌলগুলোকে ধাতু ও অধাতু এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। কিন্তু দেখা গেল, এভাবে বিন্যাস করলে চার্টটি সম্পূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট হয় না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৮১৭ সালে জার্মান ডোবেরিনার সমধর্মী মৌলগুলোকে বিন্যস্ত করার জন্য একটি সূত্র আবিষ্কার করেন। তিনি দেখান যে,সমধর্মী তিনটি মৌলের মধ্যে উচ্চতর ও নিম্নতর পারমাণবিক ওজনের মৌল দুটির ওজন যোগ করে ২ দ্বারা ভাগ করলে যা পাওয়া যায় তা প্রায় মধ্যবর্তী মৌলের ওজনের সমান। এজন্য এর নাম দেয়া হয় ট্রায়োড বা ত্রয়ী সূত্র।

সূত্রটি কিছু কিছু মৌলের জন্য সঠিক হলেও সমস্ত মৌলের জন্য যথার্থ নয়। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা আরও কিছু সূত্র আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চালান। এর ধারাবাহিকতায় ১৮৬৪ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নিউল্যান্ড অষ্টক সূত্র প্রদান করেন। তার মতে, মৌলগুলোকে যদি তাদের পারমানবিক ওজন অনুযায়ী পর পর সাজানো হয় তাহলে অষ্টম মৌলটি হবে প্রথম মৌলটির সমধর্মী। কিন্তু এভাবে ১৭ টি মৌলকে শ্রেণীবদ্ধ করা গেলেও বাকিগুলোকে শ্রেনীবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি।

১৮৬৯ সালে রূশ বিজ্ঞানী মেন্ডেলিফ একটি কার্ডের উপর সকল মৌলের পারমাণবিক ওজন এবং এদের ধর্ম লিপিবদ্ধ করেন। তিনি আবিষ্কার করলেন মৌলের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক ওজন অনুযায়ী পুনরাবৃত্ত হয়। মেন্ডেলিফ-এর সূত্রের ভিত্তিতেই ৬৭ টি মৌল নিয়ে গঠিত হয় পর্যায় সারনী। নতুন আবিষ্কৃত মৌলের জন্য সূত্রটিতে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা যায়।

তাই ১৯১৩ সালে বোর এক্স রে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখান মৌলের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি তাদের পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটন সংখ্যার উপর নির্ভর করে। ১৯৮৯ সালে ইউপ্যাকের (IUPAC – International Union Of Pure And Applied Chemistry) সিদ্ধান্তক্রমে মৌলের সর্ব বহিঃস্তরের ইলেক্ট্রন সংখ্যা অনুযায়ী মৌলের শ্রেণীসংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এভাবেই যাত্রা শুরু হয় আধুনিক পর্যায় সারণীর।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.