ক্রিপ্টোগ্রাফি: সহজ ভাষাও যায় না বোঝা সহজে (পর্ব-১)

Dreams don't let him sleep at night. Though he roams and finds himself here and there, he only loves to see a bluish sky in a moonlit night. A tranquil moonshine...

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।
আমার বান্ধবী তোয়াহা কিন্তু খুবই রহস্যপ্রেমী। এজন্য সে আমাকে মাঝেমধ্যে এমন সব সমস্যায় ফেলে যে তা থেকে উত্তরণ পাওয়াটা বেশ মুশকিলের হয়ে পড়ে। এই তো সেদিনের কথাই ধরা যাক, যেদিন আমি আমার এক বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে যাবার জন্য রেডি হচ্ছিলাম। তো বন্ধুকে জন্মদিনে গিফট করার জন্য আমি তার আগের দিনই পেটমোটা সাইজের দুইটা বিশাল আকারের ফিকশন বই কিনে রেখেছিলাম। বের হবার আগে বই খুঁজতে গিয়ে দেখি সেগুলো বেমালুম উধাও!
 
আমার তো কাহিল অবস্থা। এখন কী উপায় তুমিই বলো! শেষ পর্যন্ত তোয়াহা উদ্ধার করলো। তবে পুরোটা শুনলে বুঝবে এটা উদ্ধারের নামে ছাই। উদ্ধার তো নয়; বরং আরো সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে। আমার হাতে একটা ছোট্ট চিরকুট টাইপের কাগজ গুঁজে দিয়ে তোয়াহা নিজেও আমার বইয়ের মত হাওয়া হয়ে গেলো। উপায়ান্তর না দেখে হাতের মুঠোয় থাকা চিরকুট খুললাম।
 
সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘যদি থাকে নসীবে, নিজে থেকেই আসিবে’। অনেক ভেবেও এর কোন মানেই আমি বুঝলাম না। তোয়াহা কী আমার সাথে মজা নিলো? নাকি এই ছোট্ট দু’লাইনের মাঝেও কোন অর্থ লুকিয়ে আছে? নিজেকে বোকা ভাবতে ভাবতেই চোখ পড়লো পড়ার টেবিলের উপর। টেবিলের উপর ছড়ানো ছিটানো কয়েকটা অফসেট পেপার আর একটি মাত্র বই। বইটির নাম ‘নসীব’।
 
কিছু না বুঝেই বইটা হাতে নিলাম। সাথে সাথেই সেখান থেকে আরেকটা কাগজ নিচে পড়ে গেলো। উঠিয়ে দেখলাম সেখানে তিনটা ভিন্ন ভিন্ন শব্দ।
শোক
কেতলি
জবা
 
অনেক চিন্তা করে বের করলাম ব্যাপারটা। প্রতি শব্দের অক্ষর অর্থাৎ আদ্যক্ষর মেলালে একটি নতুন শব্দ হচ্ছে ‘শোকেজ’। শোক থেকে ‘শো’, কেতলি থেকে ‘কে’ আর জবা থেকে ‘জ’। সব মিলে শোকেজ। বুঝলাম আমার পরবর্তী গন্তব্য শোকেজ। অন্য রুমে গিয়ে শোকেজের সামনে যেতেই দেখি তার উপর কালো মার্কারের কালিতে লেখা ‘দানে দানে তিন দান’। বুঝতে বাকি রইলো না তিন নম্বর ড্রয়ারটা খুলতে হবে। খুশী হয়ে তিন নম্বর ড্রয়ার খুলে আমার মুখ চিমসে গেলো। সেখানে কয়েকটা ভাজ করা কাপড় ছাড়া তেমন কিছুই নেই। একটা বক্স ও পার্স। বক্সে তেমন কিছু নেই তবে পার্সের মাঝে আরেকটা ক্লু পেলাম।……

এ তো দেখি আমার পুরো কাহিনীই তোমরা শুনে ফেলছো। এই কাহিনী না শুনলেও চলবে তবে অনেকেই হয়তো এই খেলার সাথে পরিচিত। বিশেষ করে যারা ছোটবেলা থেকেই তিন গোয়েন্দা কিংবা মাসুদ রানার মত থ্রিলার পড়ে আসছো। তাছাড়া যারা অনুবাদ বই পড় তারা হয়তো জানো এটাকে ক্রিপ্টোগ্রাফি বলে। যদিও ক্রিপ্টোগ্রাফি এত সহজ হয় না, তবে এটাকে ক্রিপ্টোর মধ্যেই ফেলা যায়। তবে ক্রিপ্টোগ্রাফি কী বা এর মাহাত্মই বা কী তা নিয়ে আলোচনা করার আগে একদম শুরুতে আমরা ঢুকবো গুপ্ত সংকেতের সেই রাজ্যে যেখানে মানুষের ভাষায় মানুষ বুঝতে পারে না। তো চলো দেখা যাক।

গুপ্ত সংকেত কেনই বা প্রয়োজন ছিলো আর তার ব্যবহারই বা কী, তা সহজভাবে বুঝতে কিছুক্ষণের জন্য নিজেদেরকে কয়েক হাজার বছর আগের মানুষ হিসেবে কল্পনা করা যাক। ধরো, তুমি আমার বন্ধু। তোমাকে আমার একটি চিঠি দিতে হবে। যেখানে তোমার পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য শত্রুরা আক্রমণ করতে পারে, এই খবর দিতে হবে। যদি এক লাইনে তোমাকে সাবধান করতে হয় তবে হয়তো লিখবো ‘এটা করলে বিপদ’ অথবা ইংরেজিতে শুধুই লেখা যায় ‘Don’t do this!”।
 
কিন্তু সমস্যা হলো এই চিঠিটা তো মেইলের মত নিরাপদে সহজেই তোমার কাছে পৌছানো সম্ভব না। কারণ আমরা আছি হাজার বছর আগের কোন সময়ে। আমাদের এই চিঠি কত মত ও পথের কত জনের হাত দিয়ে যে যাবে, তার যে কোন ইয়ত্তা নেই। আর শত্রুদের হাতে যদি চিঠি পড়ে আর সে যদি বুঝে যায় আমি তোমাকে তাদের ব্যাপারে সতর্ক করছি তাহলে তো দুজনের জীবন নিয়েই সংশয়! এখন উপায়?

এই উপায় হলো গুপ্ত সংকেত। খুবই সোজা কনসেপ্ট। এমন সংকেত লিখতে হবে যে, যার মর্মার্থ আমি আর তুমি ছাড়া কেউই বুঝবে না। উদ্দেশ্যও সফল আবার কেউই টের পাবেনা। ওই যে তোমাদের বাংলা ২য় পত্র বইতে একটা প্রবাদ আছেনা? ‘সাপও মরলো আবার লাঠিও ভাঙলো না’, ওরকম আর কী!

 
 
 
তো চলো আগে একটু গুপ্ত সংকেতের ব্যাকরণ জেনে নেই। তিনটা শব্দ প্রায় পুরো পৃথিবীতে প্রচলিত। আর সেগুলো হলো,
১. অ্যালিস
২. বব এবং
৩. ইভ
 
এই তিন শব্দের ব্যাখ্যা দেবার পূর্বে তোমার কাছে আমার পাঠানো গুপ্ত সংকেতের চিঠিটা শেষ করে দিলে ভালো হয়। ধরো আমি সেসময় সাবধানের জন্য তোমাকে চিঠিতে লিখলাম epou ep uijt! সবার কাছে এই তিনটা শব্দ অর্থহীন বলে মনে হতে পারে৷ কিন্তু খেয়াল করো, আমি যেসব বর্ণ ব্যবহার করেছি তুমি যদি তার আগের বর্ণ লিখে শব্দগুলো সাজাও তবে সব কিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমি প্রথম শব্দ লিখেছি epou।
 
এখন এখানে প্রদত্ত প্রত্যেকটি বর্ণের আগের বর্ণ লিখবো। e এর আগের বর্ণ হলো d। আবার p এত আগের বর্ণ হলো o। আবার o এর আগের বর্ণ হলো n। এবং সবশেষ u এর পূর্বের বর্ণ হলো t। এবার দেখো শব্দটি হচ্ছে dont। অর্থাৎ আমার কাছে epou=dont। এভাবে প্রত্যেকটা বর্ণের আগের বর্ণ লিখলেই বেরিয়ে আসবে Don’t do this। এখন দেখো এই যে আমি যেটা লেখা দরকার তার পরের বর্ণ ব্যবহার করেছি সেটা হয়তো তোমাকে আগেই বলে রেখেছিলাম। এর মানে তুমি আর আমি ছাড়া কেউই এই রহস্য জানেনা। তুমিই এরকম যে কোন ম্যাসেজ উদ্ধার করতে পারবে।
 
এবার চলো ফিরে যাই গুপ্ত সংকেতের ব্যাকরণের ভাষায়। আগেই বলেছি অ্যালিস, বব আর ইভ নামের তিনটি শব্দ এই গুপ্ত সংকেতের ভেতরে খুব পরিচিত৷ অ্যালিস মানে যে গুপ্ত সংকেত পাঠায়। বব মানে হলো যার কাছে ম্যাসেজ পাঠানো হয়। এবং ইভ মানে যারা এই ম্যাসেজের কিছুই বুঝবেনা। খুব সহজ করে বললে এই যে আমি তোমাকে Don’t do this এর পরিবর্তে গুপ্ত সংকেত ব্যবহার করে epou ep uijt! লিখেছিলাম বা এই গুপ্ত চিঠি পাঠিয়েছিলাম। সুতরাং এখানে আমি হলাম ‘অ্যালিস’। আর তোমাকে পাঠিয়েছি এই চিঠি তাই তুমি হলে ‘বব’। যে প্রেরণ করে সে অ্যালিস, আর যে প্রাপ্ত হয় সে বব। বাকি থাকলো অন্য সবাই। যাদের কাছে এই চিঠি দুর্বোধ্য বা অর্থহীন৷ তারা সবাই হলো ‘ইভ’।

ছোটবেলায় আমার মত থ্রিলারপ্রেমীরা অনেকেই এরকম গুপ্ত সংকেত নিয়ে খেলা করতো তা আর বলার কিছু নেই। বন্ধুদের মাঝে হয়তো আগেই বলে দেয়া থাকতো যেটা বলা হবে সেটার অর্থ কিভাবে বের করতে হবে। সুতরাং বন্ধুদের সার্কেলের বাইরে সবার কাছেই এসব সংকেত ছিলো সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য। অর্থাৎ তারা এখানে ছিলো ‘ইভ’। তখন অবশ্য জানতাম না যে এই বিষয়টা নিয়ে চর্চাও চলে। এটাকে যে ক্রিপ্টোগ্রাফি বলে তা তো প্রথমেই জেনে গেছো। এক কথায় প্রেরক আর প্রাপক ছাড়া সবার কাছে দুর্বোধ্য যেই সাংকেতিক ভাষা সেটি চর্চা করার নামই হলো ক্রিপ্টোগ্রাফি। বায়োলজি শব্দটা কিভাবে এসেছে তা নিশ্চয়ই তোমরা জানো! গ্রিক শব্দ ‘বায়োজ’ ও ‘লগোজ’ থেকে বায়োলজির উদ্ভব। ঠিক তেমনিভাবে গ্রিক শব্দ ‘ক্রিপ্টোজ’ এবং ‘গ্রাফেইন’ থেকে মুল শব্দ ক্রিপ্টোগ্রাফির উদ্ভব।

আচ্ছা তোমরা কি জানো জ্যামিতি মানে কী? নিশ্চয়ই এখন তুমি বলছো এ তো খুবই সোজা! জ্যা অর্থ “ভূমি” আর মিতি অর্থ “পরিমাপ”৷ কিন্তু আমি ছোটবেলায় একদমই জানতাম না জ্যামিতি দুটো আলাদা শব্দ থেকে গঠিত। আচ্ছা জ্যামিতিতে না গিয়ে আমরা আপাতত ক্রিপ্টোগ্রাফিতেই থাকি। ক্রিপ্টোজ শব্দের অর্থ হলো গোপনীয় এবং গ্রাফেইন মানে হলো লেখা। এই দু’য়ে মিলে হয় ‘ক্রিপ্টোগ্রাফি’ যার মানে হলো ‘গোপন লেখা’। অর্থাৎ ‘গোপনীয় সংকেতভিত্তিক লেখা-বিষয়ক চর্চা’।

 
এ ধরণের লেখা কিভাবে আবিস্কার হলো তা কী ভেবে পাচ্ছো। আসলে এগুলোর উদ্ভব হয়েছিলো গোপনীয় কোন সংবাদ প্রেরণের উদ্দশ্যেই। সে হিসেবে এর ব্যবহারের ক্ষেত্র হিসেবে সবার আগেই চলে আসে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা। মুলত যুদ্ধেই গোপনীয় সংবাদ বা পরবর্তী কৌশল ছড়িয়ে ছিটিয়ে যোদ্ধাদের মাঝে পৌঁছে দেবার দরকার বেশি ছিলো। সেক্ষেত্রে এই গোপন সংকেতের আদান প্রদানও সেখানেই বেশি হতো। মজার ব্যাপার হলো বর্তমানের একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগেও কিন্তু গণিতশাস্ত্র, কম্পিউটার বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস যন্ত্রাদি সহ বিভিন্ন জায়গায় ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। তবে আমরা ধীরে ধীরে এই গুপ্ত সংকেতের সেকাল থেকে একালের ব্যাপারে আলোচনা করবো।
 
আদতে আধুনিক সময়ের আগ পর্যন্ত ক্রিপ্টোগ্রাফি বলতে প্রধানত কোন একটি কথাকে আপাতদৃষ্টিতে ‘অপাঠযোগ্য’ করে তোলাকেই বোঝানো হতো। যেন যারা বা যাদের উদ্দেশ্যে এই বার্তা লেখা হয় তারা ব্যতিত অন্য কেউ  এ লেখার পাঠ উদ্ধার করতে না পারে। অর্থাৎ ‘অ্যালিস’ আর ‘বব’-এর খেলা এখানে। ‘ইভ’রা এখানে সবাই নির্বোধ দর্শক।
 
আবার চলে আসি যুদ্ধক্ষেত্রে। যুদ্ধবিগ্রহের সময় এই ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার যে বহুলাংশে ছিলো তা নতুন করে বলতে হবেনা। অবাক করা ব্যাপার হলো, সেসময় ‘রটর মেশিন’ নামে রীতিমতো একটা ডিভাইসও তৈরী হয়ে যায় এ কাজে ব্যবহার করার জন্য। ক্রিপ্টোগ্রাফির ক্ষেত্রে স্বর্ণযুগ জানতে চাইলে উত্তর আসবে ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর ব্যবহার ব্যাপক আকার ধারণ করে। তবে শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়; বরং গোয়েন্দাগিরি, ব্যবসায় নতুন বা গোপন কোন কৌশল, টাকার হিসেব ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ক্রিপ্টোগ্রাফির চর্চা কিন্তু নতুন কোন ব্যাপার নয়।
 
ক্রিপ্টোগ্রাফি বা গুপ্ত সংকেত প্রেরণে যে বার্তাটি পাঠানো হবে তাকে সাধারণ অবস্থায় বলা হয় ‘প্লেইন টেক্সট’৷ যখন এটাকে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না। আর যখন এটিকে রূপান্তর করা হবে অর্থাৎ পাঠ উদ্ধারের পর তার নাম হয় ‘সাইফার টেক্সট’। আর ‘ডিক্রিপশন’ হচ্ছে সাংকেতিক ভাষায় লেখা বার্তাটির উদ্ধার করে পাঠযোগ্য অবস্থায় নিয়ে আসার পদ্ধতি। আর এই পদ্ধতি শুধু জানা থাকে সাংকেতিক বা গুপ্ত ভাষায় লেখা বার্তাপ্রেরক এবং বার্তা গ্রহীতার, যার মাধ্যমে শুধু তারাই ওই গোপন বার্তার মর্মার্থ ধর‍তে পারেন।
 
তবে একদম শুরুর দিকে শুধু লেখাকেই ক্রিপ্টোগ্রাফির একটা অংশ ধরা হতো। কেননা আদিযুগে পড়তে পারার মানুষের সংখ্যা ছিলো নেহায়তই কম। তবে মানুষ যখন পড়াশুনা শুরু করলো তখনও কিছুটা ঘুরিয়ে ফিরিয়েই গুপ্ত সংকেত বার্তা লেখা যেতো।
 
আমরা পরের পর্বে আলোচনা করবো যুদ্ধক্ষেত্রে কিভাবে ব্যবহার হতো গুপ্ত সংকেত। আর এও জানবো কিভাবে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কঠিন সব সাংকেতিক ভাষার পাঠ উদ্ধার করে ফেলতো মিত্র দলের হাজার হাজার কিশোর কিশোরী। সাথে এও জানবো বিখ্যাত সব মানুষের গোপন কোড ব্যবহারের গল্প।
 
ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সবাই ‘ভাকলোক থাকলোক। সুকস্থ্যক থেকলোক’

কী উপরের সহজ সাংকেতিক ভাষা বের করে ফেললে তো!


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি আপনার লেখাটি ই-মেইল করুন এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.