আমরা কি সত্যিই চাঁদে গিয়েছিলাম? কন্সপিরেসী থিওরী পর্ব-৩

July 11, 2018 ...
পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বেশিরভাগ কন্সপিরেসী থিওরী ছিল ফটোগ্রাফি নিয়ে। এই পাথরে এমন দাগ কেন, এক এক বস্তুর ছায়ার দিক একেক কেন, এত গরমে ক্যামেরা পুড়লো না কেন- ইত্যাদি ইত্যাদি নানা অভিযোগে জর্জরিত ছিল মানুষের এই গৌরবের অর্জনটি। আজ তৃতীয় পর্বে আমরা কিছু গভীর যুক্তিখন্ডনের মাধ্যমে কন্সপিরেসী থিওরীগুলো মোকাবেলা করবো।

তবে শুরু করা যাক।

250 থেকে 350 ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো তীব্র তাপামাত্রাযুক্ত পরিবেশে ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা একদমই অসম্ভব কারণ তা ক্যামেরাকে গলিয়ে দিতে সক্ষম

কন্সপিরেসী থিওরীস্টরা এই অভিযোগ করেছেন নরমাল ডিএসএলআর ক্যামেরার মতো প্লাস্টিক কোটিং ব্যবস্থার সাথে নাসার দেয়া ক্যামেরার মধ্যে পার্থক্য না বুঝার কারণে।

Screen Shot 2018 07 11 at 17.47.13

এটি হচ্ছে Hasselblad 500 EL Data Camera। প্রথম চন্দ্র মিশনে যতগুলো ছবি দেখতে পাবেন তার বেশিরভাগই হচ্ছে অলড্রিনের। নীল শুধু অন্যের ছবি তুলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। যাই হোক মূল কথায় আসি।

250 থেকে 350 ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উন্মুক্ত স্থানে রাখা যে কোনো সাধারণ ফিল্ম প্রকৃতপক্ষে গলে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে একটি চন্দ্রমিশনে ব্যবহৃত ক্যামেরা ফিল্ম সাধারণ কোনো ফিল্ম ছিল? উত্তর হচ্ছে- “না”।

উপরের ক্যামেরাটি যে সাধারণ কোনো ক্যামেরা নয় তা আপনি সহজেই বুঝতে পারছেন। অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা চাঁদের মত প্রতিকূল পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা একটি বিশেষ স্বচ্ছ ফিল্ম সমৃদ্ধ ক্যামেরা ব্যবহার করেছিল তবে তা নাসার চুক্তির অধীনে।

কোডাকের ভাষ্য মতে, এর ফিল্মটি কমপক্ষে 500 ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছানো না পর্যন্ত গলে যায় না। ক্যামেরাগুলোকে শীতল রাখার জন্য ডিজাইন করা একটি বিশেষ ক্ষেত্রে সুরক্ষিত করা হয়। আবার সাদা রঙের বস্তুতে আলো সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয় এবং কালো রঙের বস্তুতে আলো বেশ শোষিত হয়। তাই ক্যামেরার কোটিং ব্যবস্থাও সাদা রঙের মোড়কে আচ্ছাদন করা ছিল। সুতরাং ক্যামেরা বা ফিল্ম গলে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।

চলে যাই তার পরের অভিযোগে।

C চিহ্নিত পাথরটি সরাতে ভুলে গিয়েছিল নাসা? নাকি কন্সপিরেসী থিওরীস্টদের ষড়যন্ত্র?

আগে ছবিটি লক্ষ্য করি:

Screen Shot 2018 07 11 at 17.47.21

স্পেস রিলেটেড কোনো মুভিতে যদি পাথর ব্যবহার করা হয় তবে হলিউড নির্মাতারা পাথরের গায়ে কোনো লেটার বা সংখ্যা দ্বারা দাগাঙ্কিত করে থাকেন যেন কোন পাথর কোন পজিশনে রাখা হবে তা নিশ্চিত করে সাজাতে পারেন। কন্সপিরেসী থিওরীস্টরা এই ঘটনাকে বেশ জোরেসোরে ধরেই নিলেন যে নাটক করতে গিয়ে নাসা ধরা খেয়েছে, এখন কী উপায় হবে? চলুন সমাধানে যাই।

যদি আপনি এই ছবি দেখে এখনও এই দাবি বিশ্বাস করেন যে, পাথরটির ছবিতে বাড়তি দাগ কিংব বস্তুর উপস্থিতি এই প্রমাণ করে যে চন্দ্রাভিযান পৃথিবীতেই শ্যুটিং করা হয়েছিল, তাহলে আসুন সত্যিই কী হতে যাচ্ছে তা বিশ্লেষণ করি। আপনি কি কখনো কোনো ছবি স্ক্যান করেছেন বা কিছু ফটোকপি করেছেন? যদি তাই হয়, আপনি জানেন যে আপনার মূল ছবি এবং আপনার ইমেজিং ডিভাইসের মধ্যবর্তী কোনও ময়লা, চুল, বা আর যাই হোক না কেন তা স্ক্যান করে বের হওয়া কপিটিতে প্রদর্শিত হবে। কুখ্যাত “সি” পাথরটির ক্ষেত্রে কি ঘটেছিল?

আসলে এটি একটি চুল বা একটি ছোট্ট কিছুর টুকরো যা ইমেজ এবং ইমেজিং মেশিনের মধ্যে ধরা পড়ে যখন এটির অনুলিপি তৈরি কর হচ্ছিলো।

তাহলে নিচের ছবিটি দেখে নিশ্চিত হয়ে যান:

Screen Shot 2018 07 11 at 17.47.33

সুতরাং দেখতেই পাচ্ছেন যে এখানে কোনো C আকৃতির কিছু নেই। আর এটিই হচ্ছে আসল ছবি যা অ্যাপোলো ১৬ মিশনে ধারণ করা হয়। তার মানে প্রথম ছবিটি কি নকল? না নকল নয়। প্রথমটি ছিল স্ক্যান করা ছবি। যেহেতু আসল ছবিতে কোনো ‘C’ নেই সেহেতু এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণে আর কোনো যুক্তি দাঁড় করানোর কারণ দেখছি না।

পরের অভিযোগে আলোকপাত করি।

একেক বস্তুর ছায়ার উৎস একেক দিকে কেন?

Screen Shot 2018 07 11 at 17.47.42

ছবিটি অ্যাপোলো ১৪ মিশনের। কন্সপিরেসী থিওরীস্টরা বলেন যে অ্যাপোলো মিশন যদি সত্যিই চাঁদে হতো তবে সেখানে একমাত্র আলোর উৎস সূর্যের আলোতে ভিন্ন ভিন্ন দিকে ছায়া পড়তো না। খুবই চিন্তার বিষয়। চলুন সমাধান করি।

চাঁদের ভূমিপৃষ্ঠ অনেক আড়াআড়ি এবং এবড়োথেবড়ো, সম্পূর্ণরূপে সমতল নয়। বিভিন্ন পাথর এবং ছোট পাহাড়গুলির সাথে অসম পৃষ্ঠের কারণে উল্লম্ব কোণগুলোর সাথে ছায়ার বড় বড় অনুভূমিক কোণীয় পার্থক্য রয়েছে। উপরের ছবিতে, লুনার মডিউল এবং পাথরগুলির ছায়া সামান্য ভিন্ন দিক নির্দেশ করে। কারণ লুনার মডিউলটি পাথরের চেয়ে অধিক উঁচু, এবং তা ভিন্ন ভূমিতে অবস্থান করছে। যার ফলে পতিত আলোর কারণে সৃষ্ট ছায়ায় কৌণিক ব্যবধান পাথরের চেয়ে বেশি, কারণ পাথরের অবস্থান এমন একটি ভূমিতে যার পৃষ্ঠ লুনার মডিউলে অবস্থিত পৃষ্ঠের চেয়ে ভিন্নতর।

প্রকৃতপক্ষে একটি রুক্ষ, অসম পৃষ্ঠে সূর্যের মতো একক আলোর উৎসের সাথে বিভিন্ন কোণে সব ধরণের ছায়া সৃষ্টি করতে পারে, তবে হ্যাঁ, তা ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতায় কেবল পার্থক্য দেখাবে। এমন পরীক্ষা সহজেই বাড়িতে বসে করা যায়। চন্দ্রের রুক্ষ পৃষ্ঠের সংমিশ্রণ এবং আকাশে সূর্যের নিচ থেকে দীর্ঘ ছায়া সহজেই জটিল ছায়া তৈরি করতে পারে। উপরের ছবিতে এই ছায়াটি সম্ভবত একটি অপরিবর্তিত রিজ দ্বারা নির্মিত যা নভোচারী এবং একটি নিম্ন কোণের দ্বারা সৃষ্ট ছায়া সূর্যের দিকে প্রসারিত।

নিচের ছবিটি ল্যাবে একটিমাত্র আলোর উৎস ব্যবহার করে পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানেও চাঁদের মত একই ফলাফল প্রদর্শন করে।

Screen Shot 2018 07 11 at 17.47.50

(অনুরূপ একটি পরীক্ষা Mythbusters Program দ্বারা নির্মিত হয়েছিল যেখানে এই অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দেখে নিতে পারেন ভিডিওটি: https://youtu.be/vbqBD-zJizc )

তাহলে নিজেই দেখে নিলেন কীভাবে ল্যাবে বসেই এক আলোর উৎসের সাহায্যে ভিন্ন উচ্চতায় বসানো বস্তুর ছায়ার দিক ভিন্ন হতে পারে! এই সমাধানও হয়ে গেলো তবে!

পায়ের ছাপ অক্ষত অবস্থায় কীভাবে থাকবে?

চাঁদে পা রাখতেই এত সুন্দর পায়ের ছাপ পড়লো কিন্তু তা অক্ষত অবস্থায় কিভাবে থাকছে? চাঁদে তো পানি নেই, এরকম গর্ত সৃষ্টি তো কাদামাটিতে হওয়ার কথা, তবে কেন শুষ্ক মাটিতে এমন স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে?

Screen Shot 2018 07 11 at 17.47.57

প্রথমে আমরা তবে আবার আগের কথায় ফিরে যাই। তা হলো চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই, তাই না? তাহলে বায়ুমণ্ডল যেহেতু নেই সেহেতু প্রাকৃতিকভাবে একটি বালুর কণাও এদিক সেদিক হওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ পায়ের ছাপ কখনোই মাটিতে মিশে যাবে না। যতদিন চাঁদ আছে ততোদিন এভাবেই অক্ষত থাকবে।

আর চাঁদের মাটির সাথে পৃথিবীর মাটি এক ভেবে নিলে তা সম্পূর্ণ ভুল হবে। কেননা অলড্রিন চাঁদের মাটি হাতে নিয়ে (যখন ঈগলে ফিরে আসেন) বলেছিলেন যে চাঁদের মাটি অনেকটা গানপাউডারের মতো, যেখানে পা রাখলে সহজেই এরকম গর্ত সৃষ্টি হতে পারে। সুতরাং এই অভিযোগও একদম ভিত্তিহীন যে পৃথিবীতে কাদামাটিযুক্ত পরিবেশে চন্দ্রাভিযানের নাটকটি করা হয়।

পরের অভিযোগটি ছিল

নীল আর্মস্ট্রং নামার সময় তো চাঁদে কেউ ছিল না। তবে ছবি তুললো কে?

ছবিটি আগে দেখে নিই:

Screen Shot 2018 07 11 at 17.48.03

এটি আসলে লুনার মডিউলে যুক্ত টিভি ক্যামেরা যা নামার সময় ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তকে ধারণ করার জন্য স্পেসক্রাফট থেকেই সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এটি লুনার মডিউলেই সংযুক্ত করা, বাইরে থেকে ধারণ করা নয়। নীল নামার সময় বলেছিলেন ‘’Camera 4 ready?’’

নিচের ছবিটি হলো সেই ঐতিহাসিক টিভি ক্যামেরা যা প্রথম একটি গৌরবের মুহূর্তকে ধারণ করেছিল:

Screen Shot 2018 07 11 at 17.48.11

এবং এটি এভাবে লুনার মডিউলে সংযুক্ত ছিল:

Screen Shot 2018 07 11 at 17.48.19

সুতরাং এই নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ রইলো না।

আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি। পরের পর্বে থাকবে আরো কিছু অভিযোগের যুক্তি খণ্ডন।

এখন পর্যন্ত অনেক কন্সপিরেসী থিওরীর সমাধান হয়ে গেলো। তাই চন্দ্রপৃষ্ঠে মুক্ত বিচরণে আপনার আর বাধা রইলো না। পরের পর্ব প্রকাশের আগ পর্যন্ত চাঁদ থেকে আমাদের পৃথিবীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে থাকুন।

ধন্যবাদ।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন