রাজার অসুখ আর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

এক রাজার গল্প বলি। রাজার বিশাল রাজ্য, বিশাল রাজপ্রাসাদ। সেখানে তিনি মহানন্দে খানাপিনা করেন আর সুখে থাকেন। জীবনে সুখের কোন শেষ নেই! এমন একটা অবস্থায় হুট করে রাজার এক অসুখ হলো। এত সুখ মনে হয় তাঁর কপালে সইলো না, তাই এমন এক অদ্ভুত রোগ হলো যে সে রোগের দাওয়াই দিতে পারলো না রাজার যত জ্ঞানী-গুণী বৈদ্য। রাজার অবস্থা দিনকে দিন খারাপের দিকে যেতে থাকলো।

রাজার রোগটা বড়ই আজব। তিনি চোখে দেখেন না। না, তার মানে এই না যে তিনি অন্ধ। তাঁর সমস্যাটা হলো, তিনি হুট করেই চোখে ঠিকমতো দেখতে পারছেন না। বিষয়টা এত অদ্ভুত, বলার মতো না। রাজা তাঁর নিয়মমত একদিন ঘুমোতে গেলেন তাঁর চার রাণীকে নিয়ে, ঘুম থেকে উঠে দেখলেন যে তিনি চোখে ঠিকমতো আর দেখতে পারছেন না।

রাজ্যময় ধুন্ধুমার পড়ে গেল, রাজার কী হলো কী হলো রব। হাজারো বৈদ্য বৃথা গেল, অনেকে আবার শূলেও চড়লো দাওয়াই না বের করতে পেরে। অবশেষে রাজা পেলেন এক বৃদ্ধ সাধুর দেখা। এই সাধু নাকি পৃথিবীর যাবতীয় রোগের উপশম করতে পারেন। সব শুনে তো রাজা বড় খুশি, এইবার বুঝি তাঁর চোখটা বেঁচেই গেল! তিনি খোঁজ লাগাতে বললেন, যে যেখানে আছে, যেখান থেকে পারে, সাধুকে যেন প্রাসাদে তুলে আনে!

সাধু এলেন। রাজাকে একনজর দেখলেন। দেখেই বলে বসলেন, “এ রাজার চোখে বিচিত্র এক রোগ আছে। এ রোগের দাওয়াই একটাই!”

সবাই হাঁ হাঁ করে উঠলো, বললো, “কী দাওয়াই, সাধুমশাই? বলুন না একটিবার।”

নিজের দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে অন্যকে পাল্টাতে না বলে, নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই পালটে ফেললেই পৃথিবীটা আরো সুন্দর হয়ে যায়।

সাধু বলে দিলেন সেই মহৌষধ। আসলে, সেটাকে ওষুধ না বলে বরং বলা উচিত কায়দা। তিনি রাজাকে বললেন বেশি বেশি করে লাল রং দেখতে। রাজা যতো লাল দেখবেন, তার চোখ ততো পরিষ্কার হবে।

সে যুগে তো আর ফটোশপের বায়না নেই, প্রযুক্তির ছোঁয়া আসে নি সেখানে।

রাজামশাই ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে তাঁর চারপাশের সবকিছু যেন লাল রং করে দেয়া হয়। দেয়াল লাল, প্রাসাদ লাল, রাণীর প্রসাধনী লাল, বাঈজির নাচের জামা লাল, প্রহরীর শিরস্ত্রাণ লাল- সবকিছু যেন লালে লাল হয়ে গেল! রাজামশাই দিব্যি খুশি। একগাদা লালের মাঝে বসে তিনি আবার আগের মত ঝকঝকে দেখতে পান সবাইকে।

একদিন সাধুর খুব শখ হলো, রাজামশাই কেমন আছেন, সেটা দেখার। তিনি হাজির হলের প্রাসাদে। প্রহরীসহ সবাই তাঁকে চিনে গেছে এতোদিনে, হাজার হোক রাজার অসুখ সারানোর বদ্যি পুরো দেশে আর একজনও তো নেই! প্রহরীরা তাঁকে ভেতরে নিয়ে গেল বটে, তবে আসার আগে তাকে বলা যায় লাল রং দিয়ে একরকম গোসলই করে দেয়া হলো! বিষয়টা সাধুর ঠিক পছন্দ হলো না।

রাজার মহাসভা। সবাই উপস্থিত। রাজা তো সাধুকে দেখে মহাখুশি। বললেন, “আসুন, আসুন, সাধুবাবা। আপনার দিব্যিতেই আমি চোখ ফিরে পেয়েছি, বলুন আপনি কী চান!”

সাধু কিছুই বললেন না। একটু পর উঠে রাজার কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বললেন, “পুরো দেশটাকে লাল রং করে ফেলার থেকে আপনি নিজেই একটা লাল কাঁচের চশমা পরে নিলে কি হতো না? নিজের জন্যে পুরো দেশকে লাল করে দেয়ার কী দরকার ছিল, রাজামশাই?”

রাজার কাছে সে প্রশ্নের উত্তর আর ছিল না।

গল্পটা এখানেই শেষ। এই গল্পের একটা মোরাল আছে। মোরালটা হলো, নিজের দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে অন্যকে পাল্টাতে না বলে, নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটাই পালটে ফেললেই পৃথিবীটা আরো সুন্দর হয়ে যায়।

গল্পটাকে রূপক ধরা যাক। বাস্তব জীবনে, নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যের উপরে চাপানোর দোষে দুষ্ট কিন্তু অনেকেই। এখানে খুব সোজা বাংলায় বলতে গেলে, অন্যের কোনকিছুকে জাজ করা বা সেটা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করার থেকে দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টিয়ে ফেললেই অনেক ভালো হয় না?

সম্প্রতি দেখলাম একটা ভিডিও আলোড়নে এসেছে, সেখানে বেশ মোটা দাগে ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে, সেটা আবার অনেকে সাপোর্টও করছে! এখানেও সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই সমস্যা। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিটা পালটে দিতে পারলে দেশ এবং পৃথিবী আরো অনেক বেশি ভালো হয়ে যাবে। নিষ্কলঙ্ক সেই পৃথিবীর প্রত্যাশাই করি আমরা, প্রতিনিয়ত।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের ‘নেভার স্টপ লার্নিং‘ বইটি থেকে। পুরো বইটি কিনতে চাইলে ঘুরে এসো এই লিংক থেকে!

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.