ব্যাংক জব প্রিলিমিনারি পরীক্ষার খুঁটিনাটি

December 7, 2021 ...

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে সব থেকে লোভনীয় চাকরি হচ্ছে ব্যাংক জব। তাছাড়া অন্যান্য যেকোনো চাকরির থেকে ব্যাংক জবের কারণে সামাজিক সম্মান, আকর্ষণীয় বেতন, দ্রুত পদোন্নতিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বেড়ে যাওয়ার কারণে এই চাকরির চাহিদাও বেড়ে গেছে। তাছাড়া মুক্তবাজার অর্থনীতিও ব্যাংক জবের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। 

৪টি সরকারি, ৩৯টি বেসরকারি, ৪টি বিশেষায়িত ও ৯টি বিদেশি ব্যাংকসহ বাংলাদেশে এখন মোট ব্যাংক সংখ্যা ৫৬টি। তাছাড়া প্রতিটি ব্যাংকের অঞ্চলভেদে শাখার ব্যবস্থা করায় বাড়ছে পদের সংখ্যাও। 

ব্যাংক জব যোগ্যতা:

বিসিএসের মতন ব্যাংক জবেও যেকোনো বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি থাকলেই চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। তবে অন্যান্য চাকরির পরীক্ষার তুলনায় ব্যাংক জবের পরীক্ষার ধরন একটু আলাদা, তাই প্রস্তুতিটাও হতে হবে জুতসই। তাই স্নাতক পাশ করেই ব্যাংক জব প্রস্তুতি শুরু করে দিন।

ব্যাংক জব সিলেবাস ও মানবন্টন:

পরীক্ষার নাম নম্বর
প্রিলিমিনারি ১০০
লিখিত ২০০
মৌখিক ২৫

প্রিলিমিনারি:

যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রথম ধাপ প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। পরিক্ষার্থীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে এইখানেই বাদ পড়ে যান অনেকে৷ একটু কৌশলী না হলে প্রিলিতে টেকা মুশকিল। ব্যাংকভেদে পরীক্ষার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হলেও মানবন্টনের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ প্যাটার্ন অনুসরণ করা হয়৷ তাছাড়া পদভেদে ভিন্নতা আসে পরীক্ষার প্রশ্নেও৷ তবে আপনি যেখানেই পরীক্ষা দেন না কেন, আপনাকে প্রথমেই প্রিলিমিনারি উতরে যেতে হবে। 

সরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১০০ নাম্বারের এমসিকিউ পরীক্ষা হয়। এতে উত্তর করতে হয় ৮০ নাম্বার। প্রতিটি সঠিক উত্তর এর জন্য ১.২৫ নাম্বার ও ভুল উত্তরে ০.২৫ নাম্বার কাটা যায়। সাধারণত বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সাধারণ জ্ঞান, কম্পিউটার, বিজ্ঞান, সমসাময়িক বিশ্ব থেকে প্রশ্ন করা হয়। 

প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি:

বাংলা: 

আপনার যদি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ভালো দখল থেকে থাকে, তাহলে আপনি খুব সহজেই ২৫-৩০টি প্রশ্নের উত্তর করতে পারবেন। 

ব্যাকরণ অংশ থেকে ভাষা, বর্ণ, শব্দ, বাক্য, লিঙ্গান্তর, সন্ধি-বিচ্ছেদ, বচন, বানান শুদ্ধিকরণ, সমাস, কারক ও বিভক্তি, পদ, প্রকৃতি-প্রত্যয়, বাগধারা, এককথায় প্রকাশ, অর্থনীতিবিষয়ক প্রবন্ধ, অনুবাদ প্রভৃতি বিষয় থেকে প্রশ্ন হয়ে থাকে।

আর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থেকে ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ, বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী, তাঁদের কাজ, উক্তি, বিখ্যাত পত্রপত্রিকার সম্পাদক ইত্যাদি সম্বন্ধেও প্রশ্ন এসে থাকে।

ইংরেজি:

কোনো এক অজানা কারণে সব ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ইংরেজিতে অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যা অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। সেজন্য যেসব ইংরেজির যেসব বিষয় না পড়লেই নয়, সেগুলোর দিকে ভালো নজর দিতে হবে। যেমন:  

  • Parts of Speech
  • Sentence 
  • Tense
  • Person
  • Narration 
  • Voice
  • Correction ইত্যাদি।

এছাড়াও বাংলার মতো ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ও এর রচয়িতা, কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে।  

গণিত:

ব্যাংক জব পরীক্ষায় গণিত ও মানসিক দক্ষতা থেকে প্রশ্ন আসে সবচেয়ে বেশি৷ তাই পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হলে গণিতকে হেলাফেলা করা চলবে না। তবে জ্যামিতির তুলনায় বীজগণিত ও পাটিগণিত থেকে প্রশ্ন আসে বেশি। তাই আপনার হাতে যদি প্রস্তুতি নেওয়ার মতন পর্যাপ্ত সময় না থাকে, তাহলে জ্যামিতির অংশটা বাদ দিতে পারেন। 

গণিত থেকে শতকরা, সুদ-আসল, লাভ-ক্ষতি, বিন্যাস-সমাবেশ, অংশীদারি কারবার, বয়স, অনুপাত, লসাগু-গসাগু, সরল, ঐকিক নিয়ম, বর্গ, মান নির্ণয়, ধারা, জ্যামিতিক সূত্র ও সংজ্ঞা এবং সমীকরণের মতো বিষয় থেকে প্রশ্ন এসে থাকে। 

মানসিক দক্ষতা:

পরীক্ষার্থীর বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে এই বিষয়ের উপর প্রশ্ন করা হয়। 

সাধারণ জ্ঞান:

বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর বাইরে সাম্প্রতিক সাধারণ জ্ঞান থেকে ৪/৫ নাম্বারের প্রশ্ন আসে। সাম্প্রতিকের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রতিদিন পত্রিকা পড়া বা খবর দেখার অভ্যাসই যথেষ্ট। 

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বিষয়াবলি, সীমানা, সম্পদ, নদ-নদী, শিল্প ও বাণিজ্য, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ছাড়াও বিশ্ব রাজনীতি, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি, মহাদেশ, সীমারেখা ও স্থান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠন, চুক্তি ও সনদ বিশ্ব অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হবে।

কম্পিউটার:

কম্পিউটার যন্ত্র পরিচিতি, বাইনারি নাম্বার, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড এবং এক্সেল শর্টকাট, সোশ্যাল মিডিয়া, গেইট মেকানিজম ইত্যাদি বেসিক জিনিস থেকে প্রশ্ন এসে থাকে। 

এছাড়াও বিজ্ঞান থেকেও টুকটাক সাধারণ প্রশ্ন এসে থাকে। যেমন বিভিন্ন আবিষ্কার ও আবিষ্কারক, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, উদ্ভিদ ও প্রাণিবিদ্যা, মানবদেহ, খাদ্য ও পুষ্টি ইত্যাদি।

প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতির পাঁচটি ধাপ:

১. আপনি যেখানেই যেকোনো পরীক্ষা দিতে যান না কেন, পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে ভালো গাইডলাইন হচ্ছে সেখানকার বিগত দশ বছরের পরীক্ষাগুলোর প্রশ্ন সমাধান করা। বাজারে ব্যাংক জবের জন্য অসংখ্য বই পাওয়া যায়। আপনার কাজ হচ্ছে এগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি প্রকাশনীর গাইড কিনে তা সমাধান করা। কারণ কোন প্রকাশনীর বই পড়ছেন সেটা জরুরি না, জরুরি হলো বই পড়ে আপনি কতটা জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন। তাছাড়া প্রশ্নের ধরন বোঝাটাই কিন্তু সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। 

বিগত বছরের প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সচরাচর আসে এমন প্রশ্নগুলোর ধরন কী, কোন কোন টপিক থেকে প্রশ্ন থাকার প্রবণতা বেশি, সেগুলো খুঁজে বের করুন।

২. অনেকেই প্রশ্ন করেন দৈনিক কত ঘণ্টা পড়াশোনা করলে প্রিলিতে টিকতে পারবেন? কিংবা কীভাবে একইসাথে ব্যাংক জব ও স্নাতকোত্তরের পড়া কীভাবে পড়লে চান্স পাবেন? তাদের উদ্দেশ্যে ৩৮ তম বিসিএসের সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “আপনি যদি অন্তত টেবিলে বসে পড়ার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে দিনে কয়েক ঘণ্টা পড়া আপনার জন্য কোনো বিষয়ই না। স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা বিজ্ঞান বিভাগের রয়েছেন, তাদের হয়তো গণিত, সাধারণ বিজ্ঞান ও ইংরেজির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না৷ তাহলে তিনি একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞানের পেছনে সময় দিতে পারেন। আবার আর্টস ফ্যাকাল্টির কারো যদি সাধারণ জ্ঞানে ভালো দখল থেকে থাকে, তাহলে তিনি যদি প্রতিদিন গড়ে গণিত ও বিজ্ঞানের প্রশ্নগুলোর সমাধানে দেড়-দুই ঘণ্টাও সময় দেন তাহলে আপনার প্রস্তুতি অনেকটুকুই এগিয়ে যাবে।” 

তিনি আরো বলেন, “সপ্তাহের যেকোনো একদিন টানা বারো ঘণ্টা পড়ে বাকি দিনগুলোয় আমরা বইটাই ধরলাম না, এমনটা করলে হবে না। যেটা করতে হবে সেটা হলো প্রতিদিন এক-দুই ঘণ্টা যেসব বিষয়ে আপনি দুর্বল, সেসব বিষয়ে সময় দেওয়া।” 

অর্থাৎ পড়াশোনা ধরাবাঁধা ঘণ্টায় সীমাবদ্ধ না রেখে যতটুকু পড়লে মনে রাখা যায় সেটুকু সময় অবশ্যই দিতে হবে। 

৩. আমাদের মধ্যে সবসময়ই একটু বেশি পড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মনে হয় পুরো বইটা শেষ না করলে হয়তো আমি একটা প্রশ্নেরও উত্তর দাগিয়ে আসতে পারবো না৷ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ক্ষেত্রে মনে রাখবেন আপনি ‘কত ঘণ্টা’ পড়াশোনা করছেন তার চেয়েও বড় কথা হলো আপনি ‘কীভাবে’ পড়াশোনা করছেন। সারা দিন শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকলেই যে পড়ালেখা ভালো হবে, এমন কিন্তু কোনো কথা নেই। 

পরীক্ষায় কী ‘পড়বেন’, তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো ‘কী বাদ দেবেন’। প্রশ্ন সমাধান করতে করতে যখন জানা হয়ে যাবে যে কোন ধরনের প্রশ্ন পরীক্ষায় বেশি আসে, কোন কোন টপিক থেকে বেশি বেশি প্রশ্ন আসে, তখন সেসব বিষয় নিয়ে নিজেই একটা সাজেশন বা গাইডলাইন তৈরি করতে পারবেন। 

৪. ভালো ফলাফলের জন্য শুধু অধিক অনুশীলনই যথেষ্ট নয়, পরীক্ষার হলে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর সঠিক করার জন্য যথাযথ প্রস্তুতিও থাকা প্রয়োজন। 

অনেকের মতে স্বল্প মানসিক চাপ অনেক সময় পড়ার উন্নতি করতে পারে, তবে তা যদি বাড়তি হয়ে যায়, তাহলে সে চাপকে উপেক্ষা করবেন না। ঠিক কী কারণে মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে, তা জেনে নিন এবং বিষয়গুলোকে উপেক্ষা না করে মোকাবিলা করুন। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে আমরা অনেক সময় পারা প্রশ্নের উত্তরও পরীক্ষার হলে যেয়ে ভুলে যাই। 

৫. প্রিলিতে টিকে গেলে এবার লিখিত ও ভাইভার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করুন। লিখিত পরীক্ষার ২০০ ও ভাইভার ২৫ নম্বর মিলে মেধাতালিকা তৈরি করা হয়। তবে লিখিত পরীক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সিলেবাস না থাকার বিগত সালের প্রশ্ন থেকে ধারণা নিতে হবে।

আপনার কমেন্ট লিখুন