একটি মজার গল্প: ঘোড়ার গোবর

Tashfikal Sami is a diehard wrestling & horror movie fan. Passionately loves bodybuilding, writing, drawing cartoons & a wannabe horror film director. He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমি তখন মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত অবস্থায় আছি। ডিপ্রেশনে ভুগি সবসময়। কিছু খেতে পারি না, ঘুমাতে পারি না, কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারি না। একদিন কি মনে করে একটা ম্যাগাজিন পড়ছিলাম, সেখানে দেখলাম একটা মানুষের সাক্ষাৎকার। একটা প্রশ্ন ছিল এমন, ‘আপনি প্রতিদিন সকালে উঠে কি করেন সবার প্রথমে?’ মানুষটি উত্তর দিলো, ‘আমি প্রতিদিন সকালে উঠে নাচি! বিছানার উপর আনন্দে লাফাই! পুরো ঘর জুড়ে একটা দৌড় দেই! কারণ সারাদিনে আমার চমৎকার সব কাজের পরিকল্পনা আছে সেগুলোর কথা ভেবে আমার মনে বড় আনন্দ হয়!’

মানুষটির কথা পড়ে আমার বিশ্বাস হতে চায় না! একটা মানুষের ভেতর এতো উৎসাহ কোত্থেকে আসে?! আমার তো সকালে বিছানা থেকে উঠতেই জান বেরিয়ে যায় যায়! উৎসাহ দূরের কথা, আমার শুধু মনে হয়, ‘জীবনটা অনেক কঠিন। এতো স্বপ্ন-টপ্ন দেখে লাভ নাই। কিচ্ছু হবে না!’

ক্লাস করতে যাই। সেখানে গিয়ে চোখ বাঁকা করে একেকজনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে ষড়যন্ত্রীদের মতো বলি, ‘এইটাকে আমি বন্ধু ভাবসিলাম। কিন্তু আসলে এইটা একটা সাপ। এই দ্যাখ কেমন হিসহিস করে!’

কাউকে আমি বিশ্বাস করতে পারি না। সারাক্ষণ  ঠোঁট বাঁকিয়ে ভাবি, ‘মানুষের ভেতর থেকে ‘loyalty’ জিনিসটা একেবারে উঠে গেছে! এখন আর কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। কেউ বিশ্বাসের মর্যাদা রাখে না, সবাই সুযোগের সন্ধানে থাকে।‘

কেউ দুটো ভাল কথা বলতে আসলে আমি চোখ কপালে তুলে হা হা করে ছুটে যাই, ‘আরি বাবা! মোটিভেশন! মোটিভেশন দিতে এসেছেন দেখছি! জ্বী বলুন বলুন!’

কেউ আমার একটা ভুল ধরিয়ে দিতে আসলে আমি তেড়ে যাই, ‘তুমি নিজে কোন মহাপুরুষ?! আসছে আমার ভুল ধরতে! আগে নিজেকে দেখো! হেহ!’

মানুষটি ঘাবড়ে উঠে মানে মানে সটকে পড়ে। দেখে আমার পৈশাচিক একরকম আনন্দ হয়!

অবসর সময়ে আমি ফেসবুকে বসে মানুষজনের দোষ খুঁজে খুঁজে বের করি। সেগুলো নিয়ে হাসাহাসি করি। গবেষণা করে অমুক কেন ‘Cringy’, তমুক কেন ‘ভণ্ড’, এই লোকটা ‘এভাবে কেন হাত নাড়ে’, ‘এভাবে কেন কথা বলে’ এবং সেটা কতো ‘cringy’ ইত্যাদি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করি, মনে হয় জীবনে যেন একটা কিছু করলাম!

এই যে এতো ভয়াবহ নেতিবাচক মানসিকতা- এর পেছনে প্রধান কারণ ছিলো আমার ভেতর কোন কিছু নিয়ে সত্যিকারে উৎসাহ ছিল না। আমি কাজের কাজ কিছুই করতাম না। নিজের জীবন নিয়ে খুব হতাশ ছিলাম।

একটি ব্যাপার আছে- যেই মানুষটি মানসিকভাবে খারাপ অবস্থায় থাকে, তার কাছে দুনিয়ার সবকিছুর খারাপ দিকগুলোই বেশি করে চোখে পড়ে। আমিও তেমনই অবস্থায় ছিলাম। কিন্তু তারপর একটু একটু করে নিজেকে অনেক বদলে ফেলেছি। এখন পেছন ফিরে দেখলে মনে হয়, ‘আমি ছিলাম একতাল ঘোড়ার গোবর!’

কীভাবে? নেতিবাচক মানসিকতার সাথে ঘোড়ার গোবরের কি সম্পর্ক? সেটি নিয়ে শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের খুব মজার একটি গল্প আছে। সেটি পড়লেই বুঝতে পারবে!

এক পরিবারে বাবা-মা আবিষ্কার করলেন তাদের ছোট ছেলেটির সবকিছুতেই ভীষণ উৎসাহ! সে কোন কিছুতেই নিরুৎসাহিত হয় না! সবকিছুতেই সে কীভাবে কীভাবে একটা ভাল দিক আবিষ্কার করে এবং সেটা নিয়ে আনন্দে ঝলমল করতে থাকে!

 

বাবা-মা চিন্তিত মুখে ভাবলেন, ‘এটা তো খুব মুশকিল হলো! পৃথিবী বড় কঠিন জায়গা। ছেলে যখন বড় হবে, তখন জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সে একদম মুষড়ে পড়বে। নানা রকম ব্যর্থতায় সে একদম ডিপ্রেশনে ভুগতে শুরু করবে। তাই তার মাথায় ঢুকানো দরকার- জীবনের সবকিছুই যে সহজ নয়, আনন্দের নয়। কঠিন বাস্তবতাও তাকে শেখানো দরকার।

তখন বাবা-মা অনেক ভেবে চিন্তে একটি অভিনব পরিকল্পনা করলেন! ছেলে যখন বিকেলে খেলতে গেছে, তখন তারা ঘোড়ার গোবর দিয়ে ছেলের রুম বোঝাই করে ফেললেন! পড়ার টেবিলে গোবর, বিছানার উপর গোবর, মেঝেতে গোবর! বইয়ের উপর গোবর, খেলনার উপর গোবর, ফ্যানের উপর গোবর! বাবা-মা মোটামুটি নিঃসন্দেহ হলেন আজকে ছেলে রুমে ঢুকে বড়সড় একটা ধাক্কা খাবে। এই গোবর পরিষ্কার করতে করতে তার মাথায় ঢুকবে- জীবনের সবকিছুই যে আনন্দময় নয়।

যথারীতি ছেলে সন্ধ্যাবেলা খেলা শেষে বাসায় ফিরে তার রুমে এসে ঢুকলো। একটু পর বাবা-মা শুনতে পেলেন তাদের ছেলে আনন্দে চিৎকার করছে! বাবা-মা দৌড়ে ছুটে এলেন, দেখলেন ছেলের মুখ আনন্দে একদম ঝলমল করছে! তাদের দেখে ছেলে লাফিয়ে উঠে বললো, ‘মা! বাবা! এই দেখো কতো গোবর! এর মানে কি বুঝতে পারছো?’

বাবা-মা কিছু বুঝতে না পেরে মাথা চুলকে অবাক হয়ে বললেন, ‘কী?!’

‘তার মানে হচ্ছে, ঘোড়াটা নিশ্চয়ই এই রুমে কোথাও লুকিয়ে আছে!’

 

এবং যখন থেকে আমি পৃথিবীটাকে এভাবে দেখতে শুরু করলাম, তখন আমার নিজের ভেতরটা একদম পাল্টে গেল! এখন আমি চেষ্টা করি সবসময় সবকিছুর ভাল দিকটি খুঁজে বের করার। আমার জীবনে এখনও অনেক মন খারাপ করা ব্যাপার আছে। কিন্তু আমার সাথে এখন যদি খারাপ কিছু ঘটে, আমি সেটাকে ঘোড়ার গোবর হিসেবে দেখি এবং ভাবি- এখান থেকে কি ভাল কিছু বের করা সম্ভব? হয়তো সত্যিই টগবগে একটা ঘোড়া লুকিয়ে আছে আশেপাশে!

আগে যখন আমি মোটা ছিলাম, তখন কেউ আমাকে মোটা বললে আমি অনেক মন খারাপ করতাম। ভাবতাম, ‘তুই আমাকে মোটা বলছিস তুই নিজের চেহারা আয়নায় দেখসিস হাতি কোথাকার!’

এখন আমাকে কেউ সমালোচনা করলে মানুষটার পাল্টা দোষ বিচার করতে যাই না। (মানুষটা তার নিজের সময় খরচ করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তোমার দোষ খুঁজে খুঁজে বের করে দিচ্ছে সেজন্য তাকে বরং তোমার ধন্যবাদ জানানো উচিত!) আমি ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখি মানুষটি যা বলেছে সেটি সত্যি কিনা। যদি সত্যিই আমার ভুল থেকে থাকে তাহলে আমি সেটি সংশোধনের চেষ্টা করি আর যদি দেখি মানুষটি অহেতুক গালিগালাজ করছে কোন যুক্তি ছাড়া তাহলে সেটিকে পাত্তা দেই না।

খুব সহজ একটা উদাহরণ দেই। মনে করো তুমি পরীক্ষায় খুব খারাপ করেছ। তোমার মন অসম্ভব খারাপ,এবং এখান থেকে আদৌ ‘ভাল’ কিছু বের করা সম্ভব বলে তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি বলবো এটাই হতে পারে তোমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি ঘটনা! পরীক্ষায় মোটামুটি ফলাফল করে উতরে গেলে তুমি হয়তো সেটি নিয়ে মাথা ঘামাতে না। কিন্তু এখন যেহেতু গোবরের ভেতর পড়তেই হয়েছে, এখন এটিকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তোমার ভেতর একরকম জিদ চলে আসবে, ‘আর কখনো যেন এমন খারাপ ফলাফল না হয়!’ এবং দেখা যাবে সত্যিই টগবগে ঘোড়ার মতো ছুটে চলবে তুমি নিজেকে প্রমাণ করতে।

আমার কাছে অনেকে এসে বলে, ‘ভাইয়া আমি একজনকে ভালবাসতাম, সেই মানুষটি আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এখন জীবন আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়। আমার নিজেকে মূল্যহীন মনে হয়।‘

আমি বলি, ‘এটা তো তোমার জীবনের সবচেয়ে চমৎকার একটি ব্যাপার! সবসময় দেখবে কষ্টকর জিনিসগুলো আমাদের জন্য ভাল। তিতা সবজিগুলোতে পুষ্টি বেশি, আইসক্রিম-বার্গার এমন সুস্বাদু খাবারই ক্ষতিকর! ব্যায়াম করতে অনেক কষ্ট, কিন্তু শুয়ে-বসে মুটিয়ে যাওয়ার চেয়ে কষ্ট করে ব্যায়াম করলে শরীরটা অনেক ভাল থাকে। ঠিক সেরকম, কষ্টের বিষয়গুলো আমাদের ভালোর জন্যই ঘটে। কিন্তু কষ্টের কাজটি করতে আমাদের ভয় হয়। তুমি কি ভীষণ সৌভাগ্যবান, তোমাকে স্বেচ্ছায় কষ্টের কাজটি করতে হয় নি, কষ্ট নিজেই তোমার কাছে চলে এসেছে!

এখন তোমাকে সেটি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। তুমি এখান থেকে জিদ নাও, জিদকে একটি ঘোড়া বানিয়ে ছুটে চলো নিজেকে প্রমাণ করতে। একদিন যেন মানুষটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে ভাবে, ‘ওকে ছেড়ে চলে যাওয়াটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত।‘

কেন এই গল্পটি এতো কাজের? এমন না যে পৃথিবীটাকে এভাবে দেখলে তোমার জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যাবে। তোমার জীবনে অনেক মন খারাপ করা ব্যাপার থাকবে, অনেক ঘাত-প্রতিঘাত থাকবে সেগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তুমি সেগুলোকে কিভাবে নিচ্ছো সেটাই হচ্ছে আসল। একদল মানুষ অনেক মুষড়ে পড়ে বিপদে, আরেকদল মানুষ বিপদের সময় জ্বলে উঠে বারুদের মতো!

তাই তোমার আশেপাশে ঘোড়ার গোবরের মতো যে মানুষগুলো আছে যারা সবসময় মন খারাপ করা কথা বলে- তাদের কখনো পাত্তা দিও না। তাদের কথাগুলোকে জিদ হিসেবে নিও, সেই জিদকে একটা ঘোড়া হিসেবে কল্পনা করো। তারপর সেই ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে যাও নিজেকে প্রমাণ করার জন্য।

খুব প্রিয় একটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি-

‘If you change the way you see the world, the world around you will change’


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.