বিখ্যাত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টা


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিরা সকাল বিকাল রাত কিভাবে কাটান? তারা কি আমাদের মতোই দিন পার করতেন? এগুলো জানার খুব ইচ্ছা কি হয়না আমাদের? দেখুনতো আমাদের প্রাত্যহিক অভ্যাসের সাথে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অভ্যাসে মিল পাওয়া যায় কিনা?

১. সকালটা কীভাবে শুরু হতো?

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের কথা আগে বলি। প্রতিদিন রুটিন করে ভোর ৫টায় উঠতেন আর সারাদিন কী কী করবেন তার একটি রুটিন বানাতেন। নিউরোলজিস্ট অলিভার স্যাক্সও প্রতিদিন ভোরবেলা ৫টায় ঘুম থেকে উঠে নিজের সকালের নাস্তা নিজেই তৈরি করতেন, সাঁতার কাটতে যেতেন এবং নিজের ব্যক্তিগত সাইকোঅ্যানালিস্টের সাথে পরামর্শ করতেন। আর অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই কাজগুলো সকাল ৯টার আগেই সেরে ফেলতেন। এমনকি ছুটির দিনেও!

লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, আমরা কি প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠি? দেখুন তো তারা সকাল ৯টার আগেই কতগুলো কাজ সেরে ফেলতেন!  প্রাইম্যাটলজিস্ট জেন গুডলাল সর্বদা দিনের প্রারম্ভিক সময়েই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সেরে ফেলতেন। তিনি যেহেতু পড়াশোনা করতেন পশুদের নিয়ে, তাই ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে এই স্নিগ্ধ সকালটা পশুদের পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবেই ধরে নিতেন। তাই নাইজেরিয়ার গোমেতে শিম্পাঞ্জিদের দেখভাল করার জন্য তিনি ভোর ৫.৩০টায় ঘুম থেকে উঠতেন। কেবলমাত্র কফি আর রুটির একটি টুকরা খেয়েই বেরিয়ে পড়তেন পর্বতের উদ্দেশ্যে, তাঁর শিম্পাঞ্জিদের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু সব বিজ্ঞানীই ভোরবেলার পাখি নন।

পদার্থবিজ্ঞানী ব্রায়ান কক্স বলেছিলেন যে তিনি ৯টার দিকে উঠতেই পছন্দ করেন, যদি না তিনি এর ফলে রুটিনে কোনো ব্যাঘাত খুঁজে পান।

অপরদিকে আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলকে আমরা সবাই-ই চিনি। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই সকালের নাস্তার জন্য বিছানা থেকে উঠে যেতে বাধ্য করা হতো তাঁকে। খ্যাতিমান লেখক অরিসন মার্ডেনকে মাঝে মাঝে সকাল ১১টা পর্যন্তও বিছানায় ঘুমোতে দেখা গিয়েছে। এমনকি সর্বকালের সেরা পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সকাল ৯টায় নাস্তা দিয়ে প্রতিদিনের রুটিন শুরু করতেন এবং ১১টার দিকে তাঁর প্রিন্সটন অফিসে কাজ শুরু করে দিতেন।

দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো মহৎ ব্যক্তি ভোরবেলা উঠেও জগৎখ্যাত, আবার কেউ ৯টা পর্যন্ত ঘুমিয়েও বিশ্বজয় করেছেন। কিন্তু বাকি সময়? অবশ্যই কাজ আর কাজ। আমরা সকালে একটু দেরী করে উঠি মানে এই না যে আমাদের দিয়ে কিছুই হবে না। কিন্তু সবাই যেহেতু সমান না, তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠার অভ্যাসই কিন্তু ভালো!

২. মধ্যাহ্নভোজ এবং দুপুরের হাঁটাহাঁটি:

চার্লস ডারউইনের মধ্যাহ্নভোজের জন্য সাধারণ খাবারের চেয়ে একটু বেশি আয়োজনই করা হতো। তবে দুপুরের খাবার খেতেন অদ্ভুত নিয়মে, আমার কাছে বেশ অদ্ভুতই লেগেছে। খাবারের মাঝে একটু বিরতি নিতেন। ঐ সময়ে তাঁর পোষা কুকুরকে সাথে নিয়ে বনের মাঝে হাঁটতে বের হতেন। কুকুরটি কিছু দূর হাঁটার পর একটু বিরতি নিলে, তিনি তাঁর আবিষ্কারগুলো নিয়ে ভাবনার সম্ভার গড়ে তুলতেন ঐ ফাঁকেই। আবার ফিরে এসে হালকা মধ্যাহ্নভোজের পর টাইমস পত্রিকা পড়তেন এবং তাঁর কাছে আসা চিঠিগুলোর উত্তর দিতেন।

বিশ্বের অন্যতম সেরা বুদ্ধিমান বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলা প্রতিদিন দশ মাইল হাঁটতেন। নতুন নতুন উদ্ভাবনা তাঁর মাথায় এই সময়টুকুতে একটু বেশিই ঘুরপাক খেতো। তাই এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন তিনি দুইবার করে একই ব্লক ঘুরে আসতেন তা খেয়ালই করতেন না।

অর্থাৎ দুপুরের সময়টা তিনি পেটে না যতটুকু খাবার পাচার করতেন, তার চেয়ে মস্তিষ্কের সাথে ধাঁধাঁ খেলেই খাবার ভেবে খেয়ে নিতে পারতেন, আর হ্যাঁ এই জন্যই হয়তো আইনস্টাইন তাঁকে সেরা বুদ্ধিমান বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। অদ্ভুত চিন্তাশক্তিই ছিল টেসলার সারাদিনের খাবার।

দুপুরের সময়ে কেউ বেশ ভোজনরসিক, কেউবা খেতেও চাইতেন না। পড়াশোনায় মগ্ন থেকে খাবারের কথাই ভুলে যেতেন এমনই এক বিজ্ঞানী ছিলেন নোবেলখ্যাত আত্মত্যাগী মাদাম কুরী। সোর্বনের ছাত্রী থাকাকালিন মাদাম কুরি তাঁর গবেষণায় এতটাই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন যে তিনি দুপুরের খাওয়া দাওয়াই ছেড়ে দিতে লাগলেন। যার দরুণ অপুষ্টিতে ভুগতে শুরু করলে পরে তাঁর ভাই তাকে যথোপযুক্তভাবে খাওয়া শুরু করতে বাধ্য করে।

আপনি দুপুরবেলা যা-ই করুন না কেন, সময়মতো খাবার খেয়ে নিন। লক্ষ করে দেখুন এই বিখ্যাত ব্যাক্তিরা খাবার খাওয়ার আগে কিংবা পরে এমনকি মাঝ বিরতিতেও গবেষণায় মগ্ন থাকতেন। কিন্তু অলস সময় পার করতে দেখেছেন কি? অবশ্যই না।

৩. বিকেলবেলা: ঘুম নাকি কাজ?

পড়ন্ত বিকেল কারোর কাছে ছিল কেবল কাজের উদ্দেশ্য। আবার কেউবা তাদের রুটিন ভেঙ্গে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমোনোর লোভ সামলাতে পারতেন না।

স্যার আইনস্টাইন মধ্যাহ্নভোজের পর কাজ সেরে বাড়িতেই ফিরে আসতেন এবং বাড়ির ল্যাবেই কাজ করতে থাকতেন। মাঝে মাঝে তার কাছে আসা দর্শকদের সাথেও সময় ব্যয় করতেন।

মনোবিজ্ঞানী বিএফ স্কিনার দাবি করেছেন যে বিকেলের সময়টিকে তিনি আহামরি কোনো কাজে ব্যয় করতেন না। খুব ক্লান্ত থাকলে ঘুমিয়ে পড়তেন, কিংবা বাগানে কাজ করতেন, অথবা সুইমিং পুলে সাঁতার কাঁটতেন।

 
জেনে নাও প্রয়োজনীয় লাইফ হ্যাকসগুলো!
 
 

 

ডারউইন বিকেলবেলা সোফাতে শুয়ে বিশ্রাম নিতেন হালকা, তারপর একটু হাঁটতে বের হতেন। ফিরে আসতেন সাড়ে ৪টায়। এসেই বাকি কাজে মনোনিবেশ করতেন।

অলিভার স্যাক্স লিখতে চেষ্টা করতেন এই সময়ে। কিন্তু জীবনের বেশিরভাগ বিকেলেই নিজেকে ঘুমাচ্ছন্ন আবিষ্কার করেছেন। এই সময়ের গভীর দিবাস্বপ্ন নাকি কখনও কখনও তার চিন্তাশক্তিকে শান দিতে সাহায্য করতো।

ব্রায়ান কক্সের মতে, সিইআরএন নিউক্লিয়ার রিসার্চ কমপ্লেক্সে ক্যান্টিনে বসে এই সময়ে একটুখানি অ্যালকোহল পরিবেশন নাকি বিজ্ঞানীদের মধ্যে আরো সৃজনশীলতার সঞ্চার করে। তাই বলে আপনারা আবার সেটা অনুসরণ করতে উদগ্রীব হবেন না আশা করি।

লক্ষ করুন বিকেলের সময়টা বেশিরভাগ মহৎ ব্যক্তিরাই নিজেকে বিশ্রাম দিতে পছন্দ করতেন। কেউ ঘুমিয়ে পড়তেন, কেউবা টুকটাক কাজ সেরে নিতেন বিশ্রামের মধ্য দিয়েই।

৪. সন্ধ্যাবেলা: ঘুরতে বের হওয়া নাকি কাজেই মগ্ন থাকা?

পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যান্ড্রা ফেবার উভয়ই দিনের শেষে বন্ধু এবং পরিবারের সাথে সময় সময় কাটানোর গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার বিরতি তাদেরকে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে কাজ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। অর্থাৎ কিছু হলেও কাজ করতেন।

ব্রায়ান কক্স সার্নে গবেষণার সময় সহকর্মীদের সঙ্গে একটু বিয়ার পানের জন্য বের হলেও দ্রুত ফিরে এসে পদার্থবিজ্ঞানে সময় দিতেন। আর তা চলতো সাঁঝভোজের আগ পর্যন্ত। এই সময়ে তিনি কিছু হলেও পড়তেন, যদি পদার্থবিজ্ঞানে সময় দিতে না চাইতেন বা ভালো না লাগতো। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়তেন না।

রসায়নবিদ ডোরথি হডকিন তার স্থূল ইনসুলিন গবেষণায় কাজ করতে থাকাকালিন সন্ধ্যাবেলায় একটু বিরতি নিয়ে তার স্বামী থমাসকে চিঠি লিখতেন, যার সাথে সপ্তাহে মাত্র একবার ছুটির দিনে দেখা হতো।

আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব কাজ সেরে ফেলতেন। ধরতে গেলে বিরতি নিতেন। তবে ৭টায় কাজ থামাতেই হবে। কারণ তাঁর স্ত্রী তার সাথে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ১০টা পর্যন্ত সময় চাইতেন। অত:পর তিনি তাঁর বাকি কাজ শেষ করার জন্য আবার কাজে বসে পড়তেন এবং গভীর রাত জেগে কাজ করতে থাকতেন।

৫. রাতের ঘুম

নিদ্রা, জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিও কখনও কখনও আবার কিছু সৃজনশীল উদ্ভাবকদের কাছে বাঁধা হিসেবে আসে।

যেমন আবারও নিকোলা টেসলার কথায় আসি। একবার তিনি তাঁর ল্যাবে টানা ৮৪ ঘণ্টা কাজ করেছিলেন, তাও মাঝে মাত্র ২ ঘন্টারও কম সময়ের বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

অন্যদিকে চার্লস ডারউইন এমন এক ধরণের রুটিন অনুসরণ করতেন যা আমাদের জন্য ঐ রুটিনটি বেদনাদায়ক বলাই চলে! এই রুটিন অনুসারে তাঁকে বিছানায় যেতে হতো রাত ১০:৩০ এর মধ্যেই। পরের দিন সকাল ৭টার মধ্যেই ঘুম থেকে উঠে যেতেন। শরীর সুস্থ রাখার জন্য এটি আদর্শ রুটিনের চেয়েও কম না। আবার স্যার অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আপাতদৃষ্টিতে রাতে ১০ ঘন্টা পর্যন্ত ঘুমাতেন এবং এই অভ্যাসের জন্য যথেষ্ট সন্তুষ্টও ছিলেন, আবার দিনের বেলা কাজের ফাঁকে ফাঁকেও কিছু সময়ের জন্য ন্যাপ নেয়ার অভ্যাস করতেন।

তবে সবচেয়ে হতাশাজনক ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন মাদাম কুরি। রেডিয়াম নিয়ে গবেষণা করতেন নিজের বাড়িতে ল্যাবে বসেই। এমনকি রেডিয়ামের জারটি নিজের বেডরুমে বেডের পাশে রেখেই ঘুমোতেন। যা পরবর্তীকালে অতিরিক্ত রেডিয়েশনের দরুণ বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন এবং মৃত্যুবরণ করেন।

মনোবিজ্ঞানী বিএফ স্কিনার রাতের ঘুমের জন্য একটি কঠোর শিডিউল আবিষ্কার করে বসেন। তিনি গবেষণার জন্য মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে কাজ করার একটি অভ্যাস গড়ে তুলেন। সেক্ষেত্রে ক্লিপবোর্ডে তিনি একটি ফ্ল্যাশলাইট সেট করেন। এর ফলে এটি তাঁকে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে দিতো এবং স্কিনার রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতেন। আবার ঘুমিয়ে যেতেন এবং ভোর ৫টার দিকে আবার ঘুম থেকে তুলে দিতো তার সেট করা ফ্ল্যাশলাইটটি। ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত কাজ করে মর্নিং ওয়াকে বের হতেন। বছরের পর বছর এই গবেষণার ফলে তিনি নিজের জীবনে সফলতার সুবাস পেয়েছিলেন দ্রুতই। কাজগুলো নিঁখুত ফলাফল উপহার দিতো তাঁকে।

বিজ্ঞানীরা স্বাভাবিক জীবন যাপনই করতেন। উপরের সব কিছু উপলদ্ধি করার পর আপনি নিজেই মিলিয়ে নিন আপনার নিত্যদিনের রুটিনের সাথে বিজ্ঞানীদের রুটিন। যদি দেখেন আপনাকে আরও কাজ করতে হবে, অলস সময় পার করার জন্য ঐ সময়টাকেই কোনো শিক্ষণীয় কাজে লাগাতে হবে, তবে আজ থেকেই অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন। একটি সত্য কথা কি জানেন? সাফল্য প্রতিবারেই আমাদের দরজায় একটি করে টোকা দিয়ে যায়, হয়তো বেশিরভাগ সময় ঘুমেই কাটিয়ে দেই বলে শব্দটা কানে আসে না, দরজা খুলে তাকে বরণও করা হয় না।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author
Zehad Rahman
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?