বর্তমান সময়ে পাওয়ারপয়েন্টের যে দশটি টিপস না জানলেই নয়!

February 9, 2022 ...

প্রফেশনাল কাজের জগতে মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্টের গুরুত্ব নতুন করে বলার কিছু নেই। কর্পোরেট জগতে অফিস সফটওয়্যারগুলোর পুরোপুরি বিকল্প আজ অবধি বাজারে আসেনি। আর পাওয়ারপয়েন্টের যেকোনো স্লাইডের গুরুত্ব বহুলাংশ নির্ভর করে তার আউটলুক এবং উপস্থাপনার উপর। একই লেখা কেউ সুন্দর করে উপস্থাপন করে সবার প্রশংসার পাত্র হতে পারে, সেই কথাই আবার উপস্থাপনা দৈন্যদশার দরুন সবার হাসির খোরাকও হতে পারে! তাই পাওয়ারপয়েন্টের খুব গুরুত্বপূর্ণ দশটি টিপস নিয়ে আজকের এই নিবন্ধ!

১. ফন্টে নজর দিন 

একটি প্রেজেন্টেশনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে লেখাটুকু আর লেখার দ্বারা ঠিকঠাক বার্তা যাচ্ছে কিনা এটা নিশ্চিত করে তার ফন্ট। বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে যে, ফন্টের দ্বারা কথার টোন পর্যন্ত বদলে যেতে পারে। ফন্টের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় খুব খেয়াল রাখতে হবে। তা হলো ফন্ট এমবেড করা। অনেকসময়ই দেখা যায় প্রেজেন্টেশন শেয়ার করার দরকার পড়ে, তখন যাতে অন্যের পিসিতে স্লাইডের লেখাগুলো ফেটে না যায়, সেজন্য এটি খুবই কার্যকরী পদ্ধতি। আরেকটি বিকল্প হতে পারে প্রেজেন্টেশন সব সময় পিডিএফ হিসেবে একটা কপি সেভ করে রাখা, কোনো অনিচ্ছাকৃত কারণে ডাটা করাপ্ট হলেও যেন ব্যাক-আপ থাকে।

২. ডিজাইনের আগে দরকার লিখে নেয়া

থ্রি সিক্সটি এইট নামে একটি ডিজাইন এজেন্সির সিইও কেনি নগুয়েন বলেন, একটি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বক্তার বলাকে সাহায্যটুকু করে থাকে। অর্থাৎ এটা আপনার মাথায় রাখতে হবে যে, স্লাইড কিন্তু কখনই বক্তব্যের বিকল্প নয়। তাই ডিজাইন যদি একশতে একশ থাকে, আর আসল স্পিচ তথৈবচ হয়, তাহলে কিন্তু চলবে না। এজন্যই বলা হয়, ডিজাইনের আগে দরকার হল মূল বিষয়বস্তু লিখে নেয়া, আসল স্পিচ রেডি রাখা। দরকারে হ্যান্ডনোট ব্যবহার করা। 

হাতে-কলমে, কাগজে এই গ্রাউন্ডওয়ার্ক করা যেতে পারে, এতে আসল রাফ বিষয়াদি সেরে যায়। রাফ সাজানোর জন্য প্রতি পেজের জন্য একটি করে হেডলাইন দিয়ে লেখা শুরু করতে পারেন, এরপর যা যা মাথায় আসে সব এলোমেলো চিন্তাগুলো খাতায় প্লট করে ফেলুন। রাফ পাতায় সব উগড়ে দেয়ার পর, ঠাণ্ডা মাথায় সাজিয়ে নিতে পারেন। এতে কোনো পয়েন্ট আর বাদ যাবে না। 

৩. চিত্র এবং লেখার মাঝে প্রতিসমতা নিশ্চিত করা

 

চিত্র এবং লেখার মাঝে প্রতিসমতা source -Slide Hunter
চিত্র এবং লেখার মাঝে প্রতিসমতা source -Slide Hunter

আমেরিকান বিজ্ঞানী অ্যালান লাইটম্যান বলেন, মানবমস্তিস্ক প্রতিসমতার মাঝে ভালো কাজ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এর কারণটা কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক, প্রতিসমতা বিভিন্ন বস্তুর মাঝে একটি নিয়মতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। আর আমরা এমনভাবেই ডিজাইন করা যাতে যেকোনো অর্ডার (নিয়মতন্ত্র) মেনে চলা সহজ হয়। তাই স্লাইডের মধ্যের অবজেক্টগুলো যাতে প্রতিসম থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটা অবজেক্টের মাঝের প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ একটা একটা সিলেক্ট করে অ্যালাইন করা কঠিন, এর থেকে সবগুলো একসাথে সিলেক্ট করে অ্যালাইন করা বেশি সময়সাশ্রয়ী। 

৪. স্লাইডে অডিও যোগ করা যেতে পারে  

কিছুদিন দারুণভাবে ব্যবহার করতে পারলে দেখবেন, এটাই আপনার প্রেজেন্টেশনের সবথেকে পছন্দের পার্ট হয়ে যাবে। এই অংশেই সবচেয়ে সৃজনশীল হওয়া যায়। আলতু ফালতু অডিও মোটেও যোগ করা যাবে না, যেটা বক্তব্যের টোনের সাথে যায়, এমন কিছুই যোগ করবেন। সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, অডিও যেন কোনোমতেই বক্তব্যের থেকে বেশি লাউড হয়ে না যায়। লঘু চালের হোয়াইট ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ দিতে পারেন, এমন মিউজিক অনলাইন থেকে সহজেই নামিয়ে নিতে পারবেন। 

৫. ফেইড অ্যানিমেশন হতে পারে সহজ সমাধান

স্লাইডের শুরুতে এবং শেষে ইন্ট্রো আর আউট্রো নিয়ে চিন্তিত? সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন না? ফেইড অ্যানিমেশন হতে পারে আপনার মহৌষধ। কারণ ফেইড ইফেক্ট যেমন আপনার স্লাইডকে করবে স্মুদ, তেমনি দেখার এক্সপেরিয়েন্সটাকেও আরও শাণিত করবে। এই একই কথা কিন্তু খাটে ভিতরের এলিমেন্টগুলোর জন্যও। যেখানেই কোনো জেনেরিক সল্যুশন দরকার, ফেইড ব্যবহার করে দিতে পারেন নিশ্চিন্তে। তাই বলে আবার একটা স্লাইডের সবকিছুতেই ফেইড দিবেন না, কোথায় লাগামটা টানতে হবে এটা ঠিক করতে হবে আপনাকেই। পরিমিত ব্যবহার করলেই এক ধরনের ওয়ান স্টপ সল্যুশন হয়ে যেতে পারে এই ফেইড অ্যানিমেশন।

৬. নিজস্ব অ্যানিমেশন বানিয়ে নিন 

পাওয়ার পয়েন্টের এনিমেশন Source-Envato tuts+
পাওয়ার পয়েন্টের এনিমেশন Source-Envato tuts+

সুনির্দিষ্ট কোনো ডিজাইনের দরকার? যা অন্য কোথাও মিলছে না? আপনার মাথায় আইডিয়াটা ঘুরছে কিন্তু সেই টেম্পলেট বিভিন্ন জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজেও পাচ্ছেন না? সহজ সমাধান, নিজেই বানিয়ে ফেলুন! হ্যাঁ, নিজের ওপর আস্থা রাখুন, এমনও হতে পারে, এক্সিস্টিং টেম্পলেটগুলোর থেকে আপনার বানানো কাস্টমমেড অ্যানিমেশনটাই বেশি ভালো লাগছে। এজন্য যা করবেন, অ্যাড অ্যানিমেশন থেকে মোশন পার্টস, তারপর কাস্টম পাথসে গিয়ে নিজের দরকারমত ডিজাইন দিয়ে দিন। আঁকা শেষ হলে এস্কেপ বাটন চেপে বেরিয়ে আসুন। ব্যস, তৈরি হয়ে যাবে আপনার কাঙ্ক্ষিত অ্যানিমেশন!  আবার ওখানে আগে থেকে দিয়ে রাখা মোশন পাথগুলো থেকেও এডিট করে করতে পারেন, যেভাবে আপনার সুবিধা হয়, সেটিই করবেন আরকি। 

৭. পাওয়ারপয়েন্টের সাইজ কমিয়ে ফেলুন

এত পরিশ্রম করে সুন্দর একটা প্রেজেন্টেশন বানালাম আর তারপর বড় সাইজের বিড়ম্বনায় কাউকে সেন্ড করতে পারছি না, এই সমস্যায় হামেশাই আমাদের পড়তে হয়, তাইনা? এখন বলছি তার সমাধান। সবগুলো ছবিকে কমপ্রেস করে সাইজ অনেকটা কমিয়ে ফেলা যায়। এর জন্য যেতে হবে, ফরম্যাট, তারপর কমপ্রেস পিকচার, তারপর একটা ছবিতে কমাতে চাইলে তো কাজ শেষ। কিন্তু মজার বিষয় হল, এখানেই একবারে সবগুলো ছবির সাইজ কমপ্রেস করে ফেলা যায়, শুধু অ্যাপ্লাই অনলি টু দিস পিকচার এই অপশনটা ডিসিলেক্ট করে দিলেই হবে! 

আরেকটা টোটকা বলি, স্লাইড একদম রেডি হয়ে গেলে, যখন দেখবেন আর কোনো প্রকার এডিট দরকার নেই, সেসময় নিশ্চিন্তে পিডিএফ আকারে সেভ করে ফেলুন! বুম, দেখবেন সাইজ অনেকটাই কমে গেছে। কাহিনি এখানেই শেষ নয়, আইলাভপিডিএফ ডট কম বা অ্যাডোবি অ্যাক্রোব্যাট প্রো… এদের কোনো একটির সাহায্যে এই পিডিএফের আকারও অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারবেন! আর যদি প্রোজেক্টরে দেখানোর জন্য বানিয়ে থাকেন, সবশেষে ১৫০ ডিপিয়াই দিয়ে ওয়েব ভার্সন হিসেবে সেভ করে রাখতে পারেন। আর ফাইনালি ইমেল করতে হলে ৯৬ ডিপিয়াইই যথেষ্ট! তাই, সাইজ নিয়ে দুশ্চিন্তা- আর না, আর না! 

৮. দরকারে ভিডিওতে কনভার্ট করুন 

পাওয়ারপয়েন্টের ভিডিও কনভার্ট
পাওয়ারপয়েন্টের ভিডিও কনভার্ট-source- vesual sculptors

হাবস্পটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেজেন্টেশনে ভিডিওর ব্যবহার শুধু কার্যকরীই নয়, বরং দর্শকপ্রিয়ও। তাই নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা যেতে ভিডিও। আর হ্যাঁ, স্লাইডকে ভিডিও বানানো কিন্তু খুব একটা কঠিন কাজ নয়। তুড়ি মেরে করে ফেলুন, স্লাইডটি শুধু ভিডিও হিসেবে সেইভ দিয়েই! তবে একটা জায়গায় সাবধান, স্লাইড দেখে দেখে একটু যাচাই বাছাই করে টাইমিংটা দিবেন। নচেৎ দেখা যাবে, কোথাও লেখা না বুঝে উঠতেই পার হয়ে যাবে, আর কোথাওবা বসে থাকতে থাকতে দর্শক বিরক্ত হয়ে যাবে। এ অংশটা ঠিকঠাক করতে পারলেই অসাধারণ দর্শকনন্দিত ভিডিও তৈরি! সাথে হালকা চালে একটা থিম মিউজিক দিয়ে দিলেন নাহয়, একদম লা’জবাব প্রেজেন্টেশন হাজির।  

৯. গ্রাফ-চার্ট ব্যবহারে সবকূল রক্ষা হয় 

 পাওয়ার পয়েন্টের গ্রাফ চার্ট
পাওয়ার পয়েন্টের গ্রাফ চার্ট

এটা আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানি যে, যেকোনো বিষয়েরই তথ্য যখন টেক্সটের আকারে আসে তখনকার চেয়ে লোকজন পড়তে বা দেখতে পছন্দ করে যখন তা কোনো গ্রাফ বা পাই চার্ট অথবা বার ডায়াগ্রামের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। এজন্যে স্লাইডের মাঝে কিছু গ্রাফ বা চার্ট ব্যবহার করা সবসময়ই পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। এতে যেমন তথ্য সুন্দর করে উপস্থাপনও করা যায় সাথে দর্শকও খুশি থাকে। তাই সবকূলই রক্ষা হয় আরকি! 

১০. জ্যামিতিক শেইপ এবং ড্রয়িং কাজে আসতে পারে 

বিভিন্ন আকার আকৃতির জ্যামিতিক শেইপের ব্যাপারটা কিছুটা গ্রাফ চার্টের সাথে মিলে যায়, কিন্তু ড্রয়িং-এর দিকটা আবার স্বাতন্ত্র্যকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে চাইলে, কিছু হালকা-পাতলা ড্রয়িং হতে পারে তার সমাধান। কারণ, নরমাল এসব উপরোল্লিখিত টিপস তো যে কেউ অ্যাপ্লাই করতে পারে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আপনার ড্রয়িং বাকিদের থেকে আলাদা এবং সুন্দর হবে। আর সবথেকে দারুণ যে ব্যাপার, তা হল এটা আপনার প্রেজেন্টেশনকে দিবে ইউনিকনেস তথা স্বকীয়তা। এতে আপনার স্লাইড পাবে তার অসাধারণত্ব! 

পাওয়ার পয়েন্টের শেপ
পাওয়ার পয়েন্টের শেপ Source- ‍Slideegg

এইসব হ্যাকস ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি চাইলেই আপনার প্রেজেন্টেশন সুন্দর করে ফেলতে পারেন। সাথে এই দক্ষতাকে নতুন এক মাত্রা এনে দিতে ১০ মিনিট স্কুল আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছে পাওয়ারপয়েন্টের জন্য এক সম্পূর্ণ কোর্স। এই কোর্সের ম্যাটেরিয়ালসগুলো আপনার পাওয়ারপয়েন্ট এক্সিলেন্সকে দিবে অনন্য এক স্তর, হয়ে উঠবেন পাওয়ারপয়েন্ট প্রো! তাহলে আর দেরী না করে, এখনই জয়েন করে ফেলুন আমাদের পাওয়ারপয়েন্ট কোর্সটিতে!

তথ্য: ভিজুয়াল হ্যাকারস, মনস্টার, ইনডিড। 

আপনার কমেন্ট লিখুন