সত্য মিথ্যার চন্দ্রাভিযান: কন্সপিরেসি থিওরি পর্ব-৭

February 26, 2019 ...

এই পর্বেও আমি আপনাদের সামনে বেশ কিছু প্রমাণ সম্বলিত তথ্যাদি হাজির করবো যা গত পর্ব থেকে শুরু করেছি। এই পর্ব লিখতে গিয়ে একটি বিষয় আমাকে বেশ অবাক করলো, আর তা হলো তৎকালিন সময়েই বিভিন্ন স্পেস এজেন্সি বা অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠান নাসার নভোযানগুলোর গতিবিধি ট্র্যাক করে আসছিল। এই বিষয় আমার কাছে পুরোপুরিই অজানা ছিল। তবে যাই হোক আজ তবে বেশি কথা না বাড়িয়ে মূল পর্বে প্রবেশ করি।

নাসার পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তি বিভিন্ন উপায়ে অ্যাপোলো মিশনগুলির গতিবিধি নিজ উদ্যোগে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছিল। এটা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। স্নায়ু্যুদ্ধের সময় চাঁদে মানুষ পাঠানো ব্যাপারটা তৎকালিন পরিস্থিতির সাথে বেমানান ছিল বলেই অনেকে নিজ উদ্যোগে সরাসরি মিশন চলাকালিন নভোযানের গতিবিধি সহ অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে নাসা জনসাধারণের কাছে সেসকল তথ্য প্রকাশও করে, যেখানে তৃতীয় পক্ষের পর্যবেক্ষক দ্বারা নির্ধারিত স্পেস শাটল লঞ্চ থেকে শুরু করে পরিকল্পিত ট্রাজেক্টোরি অনুসারে নভোযানগুলো ট্র্যাক করা হয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন, হ্যাঁ সোভিয়েত ইউনিয়নের কথাই বলছি, তাদের ‘স্পেস ট্রান্সমিশন কর্পস’ এ অ্যাপোলো মিশনগুলির নজরদারি সার্বক্ষণিক করেছিল যা অত্যাধুনিক বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক ও নজরদারি সরঞ্জাম দ্বারা পুরোপুরি সজ্জিত ছিল। সোভিয়েত রকেট ইঞ্জিনিয়ার ভাসিলি মিশিন, “দ্য মুন প্রোগ্রাম দ্যাট ফ্যাল্টারড” প্রবন্ধের একটি সাক্ষাৎকারে বর্ণনা করেছেন যে কিভাবে অ্যাপোলো অবতরণের পর সোভিয়েতের চাঁদ নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী হ্রাস পেয়েছে।

আমি অ্যাপোলো ১১ থেকে শুরু করে ১৭ মিশন পর্যন্ত থার্ড পার্টি এজেন্সি বা ব্যাক্তি দ্বারা প্রমাণের কথাগুলো উল্লেখ করছি।

Apollo 11

বোচাম অবজার্ভেটরির পরিচালক(অধ্যাপক হীনজ কামিনস্কি) রাশিয়ান ও মার্কিন মহাকাশ সংস্থাসহ উভয়েরই ঐতিহাসিক ইভেন্টগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য নিশ্চিত করতে সক্ষম হোন।

‘স্কাই এন্ড টেলিস্কোপ’ নামক ম্যাগাজিনের নভেম্বর ১৯৬৯, (অনুচ্ছেদ ৩৫৮-৫৯) এ ‘’অ্যাপোলো ১১ পর্যবেক্ষণ” কলামে নভোযান সাইটিং সংক্রান্ত বিস্তারিত লেখা প্রকাশিত হয়েছিল।

যুক্তরাজ্যের জোদ্রেল ব্যাংক অবজার্ভেটরীতে রাখা টেলিস্কোপটি চন্দ্রমিশন পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল, কারণ এই টেলিস্কোপ দ্বারাই কয়েক বছর আগে স্পুটনিককে ট্র্যাক করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। একই সময়ে, জোদ্রেল ব্যাংকের বিজ্ঞানী সোভিয়েতের মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান লুনা-১৫ কে ট্র্যাক করেছিলেন, যা চাঁদে অবতরণের উদ্দেশ্যে আরও আগেই রওনা হয়েছিল। জুলাই ২০০৯ সালে জোদ্রেল তাদের তৈরি কিছু রেকর্ডিংও প্রকাশ করেন।

লুইভিলি, কেনটাকিতে অবস্থিত WHAS রেডিওর একজন প্রযুক্তিবিদ, ল্যারি বাইসিংগার, চন্দ্র পৃষ্ঠ এবং লুনার মডিউল এবং অ্যাপোলো ১১ মহাকাশচারীদের যোগাযোগের ডাটা স্বতন্ত্রভাবে সনাক্ত এবং রেকর্ড করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বায়সিংগারের তৈরি রেকর্ডিংগুলির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বা অংশ কামিনস্কির বোচাম অবজার্ভেটরিতে তৈরি রেকর্ডিংয়ের সাথে শেয়ার করা হয়েছিল। কামিনস্কি এবং বায়সিংগারের রেকর্ডিংগুলিতে হিউস্টন, টেক্সাসের ক্যাপসুল কমিউনিকেটার (CAPCOM) এবং নাসার অডিওতে যুক্ত কুইন্ডার টোন অন্তর্ভুক্ত ছিল না। যার ফলে হিউস্টন বা মিশন কন্ট্রোল থেকে অ্যাপোলো ১১ নভোচারীদেরকে দেওয়া ট্রান্সক্রিপ্ট ট্র্যাক করা সম্ভব হয়নি। ফলে শুধুমাত্র চাঁদ থেকে পৃথিবীতে পাঠানো ট্রান্সমিশন ধরতে পারা যায় কিন্তু পৃথিবী থেকে চাঁদে প্রেরিত ট্রান্সমিশন ট্র্যাক করা সম্ভব হয়নি। তবে যাই হোক চাঁদ থেকে পৃথিবীতে প্রেরিত ট্রান্সমিশন ট্র্যাক করেই দুজন নিশ্চিত হয়েছিলেন মানুষের এই চিরস্মরণীয় পদক্ষেপে কোনো ধাপ্পাবাজি করেনি নাসা।

Apollo 12

পল মালে অ্যাপোলো ১২ কমান্ড মডিউলকে সরাসরি দেখতে পাওয়ার বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রদান করে মিশন চলাকালিন সময়েই।

Apollo 13

১৯৭০ সালের ১৭ই এপ্রিল, চ্যাবোট অবজার্ভেটরির ক্যালেন্ডারটি অ্যাপোলো ১৩ মিশনের শেষ কিছু পর্যায়ের একটি অ্যাপ্লিকেশন অপটিক্যাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে রেকর্ড করে।

রাচেল হলো চ্যাবোট অবজার্ভেটরির একটি ২০ ইঞ্চি লম্বা রিফ্রেক্টিং টেলিস্কোপ। যা অ্যাপোলো ১৩ নভোযানকে ক্রু সহ পৃথিবীতে আনতে সহায়তা করে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে মহাকাশযানটির পুনরায় প্রবেশের আগে লুনার ল্যান্ডারের ইঞ্জিনগুলোর একটি শেষ ধাপের বার্ন প্রয়োজন ছিল। শেষ বার্নটি গণনা করার জন্য নাসাকে মহাকাশযানের একটি নির্দিষ্ট অবস্থানের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল, যা শুধুমাত্র টেলিস্কোপিক পর্যবেক্ষণ দ্বারা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। আর নাসার মিশন কন্ট্রোলে ঐ সময়ে কম্পিউটারভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ছিল।

আবার তখন ওকল্যান্ডের চ্যাবোট অবজারভেটরি ব্যতীত এই অন্য সমস্ত অবজারভেটরি কেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত ঘন মেঘের জন্য পর্যবেক্ষণে ব্যর্থ হয়। তাই একমাত্র ভরসা ছিল চ্যাবোট, যেখানে ইস্টবে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সদস্যরা চন্দ্রাভিযানের সমস্ত ফ্লাইট অনুসন্ধান করেছেন। আবার তখন ইএএস(EAS)এর সদস্যরা নাসা এ্যামেস রিসার্চ স্টেশন থেকে একটি জরুরী কল পায়, যারা ষাটের দশক থেকে চ্যাবট এর শিক্ষা কর্মসূচির সাথে একতাবদ্ধ ছিল। এরপর সেই ঐতিহাসিক ২০ইঞ্চি লম্বা রিফ্রেক্টরি টেলিস্কোপকে প্রস্তুত করা হয়। এর মাধ্যমে নাসার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যগুলি নাসা এ্যামেসে পাঠাতে সক্ষম হয় এবং অ্যাপোলোর ক্রুরা প্রয়োজনীয় ত্রুটি সংশোধন করে ১৯৭০ সালের ১৭ই এপ্রিল তারিখে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

Apollo 14

করালিটোস অবজার্ভেটরি মিশন চলাকালেই অ্যাপলো ১৪ নভোযানের প্রয়োজনীয় ছবিগুলো ধারণ করতে সক্ষম হয়।

Apollo 15

পল উইলসন এবং রিচার্ড টি নাডেল জুনিয়র, ১লা আগস্ট ১৯৭১ সালের সকালের দিকে চাঁদের কক্ষপথে আবর্তিত কমান্ড মডিউল/সার্ভিস মডিউল থেকে ভয়েস ট্রান্সমিশন পেয়েছিলেন। আর তা ছবি ও প্রমাণসহ QST ম্যাগাজিনের একটি নিবন্ধে তারা তাদের কাজের বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করে।

Apollo 16

ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির জিউয়েট অবজার্ভেটরি অ্যাপোলো ১৬ এর বেশ ভালো পর্যবেক্ষণ করেছিল।সেখানে দুটি ভিন্ন রেডিও W4HHK ও K2RIW এবং সাথে গৃহনির্মিত বিভিন্ন সরঞ্জাম দ্বারা অ্যাপোলো ১৬ থেকে প্রাপ্ত সংকেতের বিশদ বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছিল।

আবার বোচাম অবজার্ভেটরিও অ্যাপোলো ১৬ নভোচারীদের এবং তাদের পাঠানো ইন্টারসেপ্টেড টেলিভিশন সিগন্যালগুলিকে শনাক্ত করতে সফলভাবেই সক্ষম হয়েছিল। তারপর প্রাপ্ত চলচিত্রকে ৬২৫ লাইন, ২৫ফ্রেম/সেকেন্ড টেলিভিশন স্ট্যান্ডার্ডে ২-ইঞ্চি ভিডিও টেপে সাদা কালো ইমেজে পুনরায় রেকর্ড করা হয়েছিল।

আর এই প্রাপ্ত ট্রান্সমিশনে শুধুমাত্র মহাকাশচারীদের কথোপকথোন ছিল। হিউস্টন থেকে কোন ভয়েস রেকর্ড বা ট্রান্সমিশন সম্ভব হয়নি কারণ আগেই বলেছি বোচামে শুধুমাত্র চাঁদ থেকে পৃথিবীতে প্রাপ্ত সংকেতকে ট্র্যাক করা হয়। যাই হোক ভিডিওট্যাপগুলি অবজার্ভেটরিতে এখনো রাখা আছে।

Apollo 17

সুইডিশ স্পেস প্রোগ্রামের সভান গ্রান, অ্যাপোলো ১৭ মিশনের ট্র্যাক করা বিভিন্ন দর্শনের বর্ণনা দিয়েছিলেন।

তাহলে অন্যান্য বিভিন্ন অবজার্ভেটরি বা স্পেস এজেন্সি যে চোখ কান বন্ধ করে বসে ছিল, তা কিন্তু নয়। এখন তো জানতেই পেরেছেন। চলুন আরো একটি প্রমাণের সাথে সময় ব্যয় করা যাক।

Reflectors

M1zbq0lBJP rJfAACox1fcmZyVKfj3c4ccmGXUIF1IuVRjyMd6g5zWne0UUtB78OflCoX jCObeJoKVfjIq3O0tlA1IkIKjhZ5Pdt61erBlcJGtz5sYcTc098TMAoXhRn4ZKIVAV

Lunar Laser Ranging Experiment with the stereo camera in the background (NASA image number AS11-40-5952). This Retroreflector was left on the Moon by astronauts on the Apollo 11 mission. Astronomers all over the world have reflected laser light off the reflectors to measure precisely the Earth-Moon distance.

nYApfzaU5b

A close-up view of the laser ranging retro reflector (LR3) which the Apollo 14 astronauts deployed on the moon during their lunar surface extravehicular activity (EVA). While astronauts Alan B. Shepard Jr., commander, and Edgar D. Mitchell, lunar module pilot, descended in the Lunar Module (LM) to explore the moon, astronaut Stuart A. Roosa, command module pilot, remained with the Command and Service Modules (CSM) in lunar orbit.

Image Collection: 70mm Hasselblad
Mission:          11
Magazine:         40
Magazine Letter:  S
Film Type:        SO-368
Film Width:       70 mm

আমার অন্য একটি ব্লগে আমি হয়তো এই লেজার বীমের ব্যাপারে একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়েছিলাম। এটি একটি লেজার রেঞ্জিং রেট্রো-রিফ্লেক্টর (LRRRs, বা একে এক ধরণের আয়না বলতে পারেন যা পৃথিবী থেকে চাঁদে এক ধরণের লেজার ভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা)। এই পাঠানো লেজারের প্রতিফলনই চাঁদে মানুষ যাবার ব্যাপারে নি:সন্দেহ প্রমাণ বহন করে। অ্যাপোলো ১১ মিশনেই নীলরা এই লেজার বীম স্থাপন করে এসেছিলেন। চলুন এখন আলোচনায় যাই যে এই লেজার দিয়ে পরে কি এমন হলো!

জেমস হ্যানসেনের নীল আর্মস্ট্রংকে নিয়ে লেখা জীবনী(First Man: The life of Neil A. Armstrong) থেকে উদ্ধৃত:


‘’এই LRRR পরীক্ষা (লেজার পরীক্ষা) কয়েকটি অবিশ্বাসী আত্মার জন্য যারা চাঁদে আমাদের অবতরণ কখনোই স্বীকার করে নিতে চায় না। পাঁচ দশক ধরে চলা পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ এবং ফলাফলগুলো সেসব অবিশ্বাসীদের জবাব দিতে বেশ প্রয়োজনীয়।’’

পর্যবেক্ষনকারী গবেষণা সংস্থা ‘’দে লা কোট ডি আজুর, ম্যাকডোনাল্ড, আপ্যাচি পয়েন্ট এবং হালেকালা সহ ইত্যাদি অবজার্ভেটরি এজেন্সি নিয়মিত এই অ্যাপোলো LRRR প্রযুক্তি ব্যবহার করে। লিক অবজার্ভেটরি দাবি করেছিল যে তারা অ্যাপোলো ১১ মিশন চলাকালে নীল এবং অলড্রিনের রাখা রেট্রোরিফ্লেক্টরটি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পুনরায় এই পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য তাদেরকে ১৯৬৯ সালের ১লা আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

আবার অ্যাপোলো ১৪ মিশনের নভোচারীরাও চাঁদের মাটিতে আরেকটি পুনর্নির্মাণকারী রিফ্লেক্টর স্থাপন করেন এবং ম্যাকডোনাল্ড অবজার্ভেটরি একই দিনে তা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

একই সাথে ১৯৭১ সালের ৩১শে জুলাই সংগঠিত অ্যাপোলো ১৫ মিশনের পাঠানো রেট্রোরিফ্লেক্টরটিও কয়েক দিনের মধ্যে ম্যাকডোনাল্ড অবজার্ভেটরি দ্বারা সনাক্ত করা হয়েছিল।

এই ছিল রেট্রোরিফ্লেক্টরের সাফল্য।

আজকে এই পর্যন্তই শেষ। পরবর্তী পর্বে সংগ্রহ করা পাথরের নমুনা নিয়ে আলোচনা করা হবে।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি অনলাইন ব্যাচ ২০২৩

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঘরে বসেই দেশসেরা শিক্ষকদের সাথে যুক্ত হও ইন্টারেক্টিভ লাইভ ক্লাসে, নাও ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণির সম্পূর্ণ সিলেবাসের 💯তে💯 প্রস্তুতি!

আপনার কমেন্ট লিখুন