মানব সভ্যতা কি পারবে সূর্য জয় করতে?

January 12, 2019 ...

ইকারাসের ডানার কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। গ্রিক পুরাণের বেশ জনপ্রিয় দু’টি চরিত্র ইকারাস ও ডিডেলাস। ইকারাসের সেই করুণ পরিণতির জন্যই তার ঘটনাটি বেশ বিখ্যাত। ইকারাস ও তার বাবা ডিডেলাসকে বন্দী করেছিলো তখনকার রাজা। এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হবার জন্যেই জমানো পাখির পালক আর মৌচাক থেকে সংগ্রহ করা মোম দিয়ে ডিডেলাস দু জোড়া পাখা তৈরি করেছিলেন; এক জোড়া তার জন্য, আরেক জোড়া তার ছেলের জন্য। এই পাখায় চড়েই তারা মুক্ত হতে চেয়েছিলেন গোলকধাঁধাঁর সেই বন্দিত্ব থেকে।

পাখা তৈরি শেষ হলে তিনি ইকারাসকে পরিয়ে দিলেন পাখা। তিনি নিজেও পড়লেন তার জোড়া। উড়তে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তিনি ইকারাসকে বারবার সাবধান করে দিলেন যাতে উড়তে উড়তে সে সূর্যের কাছে না চলে যায়। ডানা ঝাপটিয়ে তারা মুক্ত হলেন বন্দিত্ব থেকে, ক্রীটকে পেছনে ফেলে চলে এলেন বহু দূরে। কিন্তু হায়, এই উড্ডয়নের আনন্দে বিভোর ইকারাস তার বাবার সাবধান বাণী ভুলে উড়তে উড়তে সূর্যের কাছেই চলে গিয়েছিল। সূর্যের উত্তাপে পাখার মোম গলে গলে পড়তে থাকলো। তার পাখা খুলে গেলো এবং সে পতিত হলো সমুদ্রের গভীর জলরাশিতে। এভাবেই সলীল সমাধি হয়েছিল তার অবাধ্য ইকারাসের।

 

AG0UxF7aqHKaf5CvPkB1WMKXonRerFeh2JpW6Zyx2zuVQ8MalmOiauwSdYi IueCZdr30KnycscDiDuCxX28vmF 1NoI K8 Y1lheaCPX6otHHpSEfSU66XnShcyjlbg

শিল্পীর ছবিতে আঁকা পাখা সহ ইকারাস; Image source: greekmythology.com

ইকারাসের সেই করুণ পরিণতির কথা ভেবেই হয়ত আজো কোনো মহাকাশযান সাহস করেনি সূর্যের কাছে যাবার। কিন্তু এবার সূর্যের রহস্য ভেদ করতে প্রথমবারের মতো সূর্যকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছে নাসার উপগ্রহ ‘পার্কার সোলার গ্লোব’। এটি সূর্যের ৬০ লক্ষ কিলোমিটারের মধ্যে গিয়ে পৌঁছাবে এবং সূর্যের এত কাছাকাছি এর আগে কোনো যানই যেতে পারেনি।

গত বছর ১২ আগস্ট রবিবার বাংলাদেশি সময় দুপুর ১টা ৩১ মিনিটে ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ডেল্টা ফোর হেভি রকেট’-এর কাঁধে চেপে মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি জমায় ‘সূর্যমুখী’ মহাকাশযান ‘পার্কার সোলার প্রোব’। চাঁদের মাটিতে পা দেওয়ার ৪৯ বছর পর এটিই হলো সূর্য অভিমুখে যাত্রা করা প্রথম নভোযান। ১১ আগস্ট শনিবারই রওনা হওয়ার কথা ছিল এ মহাকাশ যানের। কিন্তু প্রযুক্তিগত সমস্যায় শেষ মুহূর্তে এসে এ কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা পেছানোর সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।

৯১ বছরের বর্ষীয়ান সৌর জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী ইউজেন পার্কারের নাম অনুসারে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ইউজেন পার্কার। তিনিই একমাত্র জীবিত কিংবদন্তি বিজ্ঞানী, যার নামে নাসা মহাকাশযানের নাম রেখেছে। অথচ ৬০ বছর আগে ১৯৫৮ সালে সৌরবায়ু নিয়ে তার সাড়া জাগানো গবেষণাপত্রটি কিছুতেই ছাপতে রাজি হয়নি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’। গবেষণায় কোনো খাদ বা ত্রুটি আছে কিনা জানতে তার গবেষণাপত্রটি রিভিউ করানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল দুই বিশিষ্ট সৌরপদার্থবিজ্ঞানীকে। এক বার নয়। দু-দু’বার! আর দু’বারই তারা বাতিল করে দিয়েছিলেন সেই গবেষণাপত্রটি! আজ সেই ইউজেন পার্কারের নামেই ছুটে চলছে নাসার মহাকাশ যান সূর্যের উদ্দেশে।


2 y6qQkWiir6CxbzCfxByMzbIewWgumRKq3Kz8JDX7z d4 WhHjh6bOB2qWrrZcp

মহাকাশ বিজ্ঞানী ইউজেন পার্কার; Image source: Los Angles Time
qqGuPqoL7tbRgQQouHxe L1c bIyiRKBhLPVzWf3zzMqciDelN 4

‘পার্কার সোলার প্রোব’ এর মহাকাশ থেকে পাঠানো প্রথম ছবি; Image source: NASA



পার্কার সোলার গ্লোব সরাসরি সূর্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে প্রায় দেড়মাস পর পার্কার সোলার প্রোব শুক্র গ্রহে (ভেনাস) পৌঁছে অক্টোবরে। সূর্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার প্রায় এক মাস পর মহাকাশের ছবি পাঠায় পার্কার সোলার প্রোব। পার্কার সোলার প্রোবে তোলা প্রথম ছবি প্রকাশ করে নাসা। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর এই প্রোবের একমাত্র ক্যামেরার শাটার প্রথম বারের জন্য খোলা হয়েছিল। এর পরেই সুর্য পানে যাত্রার প্রথম ছবিটি তোলে পার্কার সোলার প্রোব। যদিও এই ছবিতে সূর্যকে দেখা যায় নি, ছবিতে বৃহস্পতি গ্রহ দেখা গিয়েছে।
আপাতত কোন গবেষণার কাজে নয় শুধুমাত্র সব যন্ত্র সঠিকাবে কাজ করছে কী না তা পরীক্ষা করার জন্যই এই ছবি তোলা হয়েছিল। ক্যামেরা ছাড়াও পার্কার সোলার প্রোবের অন্যান্য যন্ত্রাংশ থেকেও বিভিন্ন তথ্য প্রেরণ করেছে এর মধ্যে।

 


ইতিমধ্যে সূর্যের সবচেয়ে কাছে পৌঁছার রেকর্ড গড়ে ফেলেছে এই মহাকাশযান। এই প্রথম মানুষের তৈরি কোনো যন্ত্র সুর্যের এতটা কাছে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা।
গত বছরের অক্টোবরের শেষে এক বিবৃতিতে নাসা জানায়, গত ২৯ অক্টোবর পুরনো রেকর্ড সূর্য থেকে ২৬.৫৫ মিলিয়ন মাইলের দূরত্ব অতিক্রম করেছে মহাকাশ যানটি। এর আগে ১৯৭৬ সালে জার্মান-আমেরিকান মহাকাশযান হেলিওস টু সূর্যের সব থেকে কাছে পৌঁছে যাওয়ার রেকর্ড গড়েছিল।  গত ৩১ ডিসেম্বর সূর্যের আরো কাছে পৌঁছে যায় পার্কার সোলার প্রোব। সেসময় সূর্যের উপরিকাঠামো থেকে যানটির দূরত্ব ছিল আনুমানিক প্রায় ৩ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন মাইল।


সূর্য জয়ের এই মিশনে ‘পার্কার সোলার প্রোব’ ছয় বার শুক্রকে ও ২৪ বার সূর্যের পাশে প্রদক্ষিণ করবে। সেটিও হবে একটি রেকর্ড। সেই সাথে মানুষের তৈরি দ্রুততম যানের রেকর্ড ও ভেঙে ফেলতে যাচ্ছে এই মহাকাশযান। এখন পর্যন্ত এই রেকর্ড ধরে রেখেছে হেলিওস টু। যার গতি ছিল প্রতি ঘণ্টায় এক লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৪ মাইল।

সূর্য জয়ে আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে ‘পার্কার সোলার প্রোব’ কে। আর এই পথ পাড়ি দিতে লেগে যাবে কমপক্ষে ২ থেকে ৪ বছর। অর্থাৎ আশা করা যায়, ২০২০ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম সৌরমুলুকে ‘পা’ ছোঁয়াবে পার্কার মহাকাশযান। তার পর তা আরও এগিয়ে সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একেবারে বাইরের স্তর বা করোনায় ঢুকে পড়বে ২০২২ সালের মাঝামাঝি।

সূর্যের বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তর ‘করোনায়’ ঢুকে পড়ার পর টানা ৭ বছর ধরে বিভিন্ন কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকবে নাসার এই মহাকাশযান। সেই প্রদক্ষিণের সময় কখনও তা কাছে আসবে সূর্যের, কখনও কিছুটা দূরে চলে যাবে। নাসার মহাকাশযানটি যখন সবচেয়ে কাছে চলে যাবে সূর্যের, তখন সূর্যের পিঠ (সারফেস) থেকে তার দূরত্ব হবে মাত্র ৩৮ লক্ষ ৩০ হাজার মাইল।


গবেষণাগারে পার্কার সোলার প্রোব; Image source: Flickr.com


সূর্যের করোনার তাপমাত্রা গড়ে ১০ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মাত্র ৬ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে করোনার তাপমাত্রা সর্বত্র সমান নয়। করোনায় রয়েছে প্লাজমা, যা ইলেকট্রন আর প্রোটন কণিকায় ভরা। আর ওই দু’টি কণার ছোটাছুটি থেকেই সোলার উইন্ড বা সৌরবায়ুর জন্ম হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানী পার্কারই আজ থেকে ৬০ বছর আগে প্রথম সেই সৌরবায়ুর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তার গবেষণাপত্রে।

যে প্রশ্ন সবার মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে, এই উচ্চ তাপমাত্রায় কিভাবে টিকে থাকবে ‘পার্কার সোলার গ্লোব’ ? তার উত্তরও দিয়েছে নাসা। নাসা জানিয়েছে, করোনার ওই ভয়ঙ্কর তাপমাত্রার হাত থেকে পার্কার মহাকাশযান আর তার ভেতরে থাকা যন্ত্রাংশগুলোকে বাঁচানোর জন্য ওই মহাকাশযানে থাকছে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ‘হিট শিল্ড’। সেটাই পার্কারের ‘বর্ম’ হয়ে উঠবে। তা ছাড়াও নাসার ওই মহাকাশযানে রয়েছে বিশেষ প্রযুক্তিতে বানানো স্বয়ংক্রিয় কুলিং সিস্টেমও, যা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে। হিট শিল্ডটি বানিয়েছে জন্স হপকিন্স অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স ল্যাবরেটরি। দু’টি কার্বন প্লেটের মধ্যে স্যান্ডউইচের মতো একটি কার্বন কম্পোজিট ফোম রাখা রয়েছে হিট শিল্ডে। শিল্ডের যে দিকটি থাকবে সূর্যের দিকে, সেই দিকটিতে সাদা সিরামিক রং লাগানো হয়েছে, যাতে সূর্যের তাপ যতটা সম্ভব প্রতিফলিত করতে পারে হিট শিল্ডের ‘সূর্যমুখী’ দিকটি।

নাসার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই মহাকাশযানে যে ‘হিট শিল্ড’ রয়েছে, আর তার যে দিকটা সূর্যের দিকে আছে, তাকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা আড়াই হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রার ধকল সইতে হবে। আর ইতোমধ্যে নাসার গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, মহাকাশ যানে ব্যবহৃত হিট শিল্ড ৩ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১ হাজার ৬৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রার মোকাবেলা করতে পারবে।

BGcpCzk9gvBZ8S8YkXspKB a8NPrk9GE7WdI8igi61FeAIFTc2kNg7oBsO BabYAfqHYKViYAYE lo9lUXbmESQFWn5CleYPM2jGWHvlRIF4H93BmpCYuZz7TRa8mSNHCZff3VWu

সূর্য পানে ছুটছে পার্কার সোলার প্রোব; image source: space.com


এই মহাকাশযানের বদৌলতেই মানব সভ্যতা এই প্রথম সূর্যের এত কাছাকাছি পৌঁছতে পারছে। এমনকি এ-ই প্রথম কোনো মহাকাশ যান, যা কোনো নক্ষত্রের এত কাছাকাছি পোঁছতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হবে সৌরবায়ুর মধ্যে থাকা চৌম্বক ক্ষেত্রের শক্তি, ঘনত্ব ও শক্তিশালী কণাদের গতিবেগ। তাপগতিবিজ্ঞানের যাবতীয় নিয়ম উপেক্ষা করে কেন সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার (সর্বোচ্চ ৬ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস) চেয়ে সূর্য পৃষ্ঠ থেকে বহু বহু দূরে থাকা সূর্যের করোনার তাপমাত্রা ১০ লক্ষ ডিগ্রী সেলসিয়াসেরও বেশি হয়, সে বিষয়ে সুষ্পষ্ট ধারণা দিবে পার্কার সোলার গ্লোব। এ মহাকাশযানের মাধ্যমেই জানা যাবে কীভাবে সৃষ্টি হয় সৌরঝড়ের এবং কীভাবে সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একেবারে বাইরের স্তর (করোনা) থেকে বেরিয়ে আসে সৌরবায়ু।

সর্বোপরি, পার্কার সোলার প্রোব সূর্যের অনেক অজানা তথ্যের সন্ধান দেবে আমাদের। এর মধ্য দিয়েই মানব সভ্যতার সূর্যকে জয় করবার দীর্ঘদিনের প্রবল ইচ্ছে সত্য হতে যাচ্ছে। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা, পার্কার সোলার প্রোব মানব সভ্যতাকে কী অজানা রহস্যের সন্ধান দিতে যাচ্ছে !


 

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন