মঙ্গল আমাদের জন্য কতটুকু মঙ্গলজনক?

January 18, 2019 ...

ঘটনা ১ :

বাসে করে যাচ্ছিলাম  লাইব্রেরীতে নতুন সেমিস্টারের বই কিনতে । সঙ্গী হলো এক সিনিয়র আপু। বাসে হকার থেকে একটি পত্রিকা কিনে পাতা উল্টাচ্ছিলো সে। হঠাৎ দেখলাম সে খুব মনমরা হয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম,  “কি হলো আপু?

পাতা উল্টিয়ে একটা প্রতিবেদন দেখালো যাতে লেখা “জরিপ অনুসারে প্রতিবছর অন্তত ১.২ মিলিয়ন মানুষ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায় এবং ৫০ মিলিয়নের মতো মানুষকে বরণ করে নিতে হয় পঙ্গুত্ব। বিভিন্ন সড়ক দূর্ঘটনার ছবি ছাপা হয়েছিলো। দেখে খুব মন খারাপ হলো আমারও।

আপু বললো, “পৃথিবীটা বসবাসের উপযুক্ততা হারিয়ে ফেলছে আসলে, বুঝলি রে! মন চায় পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকি!”

আমি ভাবতে থাকলাম “অন্য কোথাও!”

বাহ! চমৎকার হবে না? খুঁজতে থাকলাম আপুর জন্য অন্য একটি পৃথিবী।

ঘটনা ২:

আমি আর আমার এক বন্ধু ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য বের হলাম। আমাদের গলি থেকে বের হলে মেইন রোড যেখানে তিনটি রাস্তা একসাথে মিলিত হয়েছে। এই রাস্তায় সকালের দিকে সবসময় খুব মানুষ থাকে।তো হাঁটতে হাঁটতে সে হঠাৎ করে প্রচন্ড জোরে এক লোকের সাথে ধাক্কা খেলো। লোকটা তো রেগেমেগে আগুন! সজোরে তেড়ে এসে বললো, “অই মিয়াঁ চোখ কি হাতে লইয়্যা হাটেন নাকি”! আমার বন্ধু কি করবে বুঝতে পারছিলো না।তারপর আমি গিয়ে কোনোমতে লোকটাকে শান্ত করে বিদায় দিলাম।

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সে বললো, ধ্যাত! আর ভাল্লাগেনা প্যারা! পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলগ্রহে গিয়ে উঠবো আমি।

পৃথিবীর প্রতি সবার এতো বিরক্ত। কথায় কথায় ছেড়ে যেতে চায়। তা চায় যখন তখন তাদের ইচ্ছেটাও তো পূরণ হওয়া উচিত! এই নিয়ে ভাবতে পোঁছে গেলাম সৌরজগতে। নতুন বাসস্থল খুঁজতে!

নাহ! শারীরিকভাবে যেতে পারিনি। মনে মনেই গিয়েছি। তবে মানুষ খুব তাড়াতাড়ি নতুন  বাসস্থল খুঁজে পাবো বলে ধারণা করা হচ্ছে। আজকে আমরা জানার চেষ্টা করবো পৃথিবীর পরে আরো কোনো পৃথিবী আছে কি?

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে পেলাম পৃথিবীর জমজ ভাইকে। নাম কেপলার ২২বি। ২০০৯ সালে আবিস্কৃত হয় “কেপলার ২২বি” নামের একটি গ্রহ। আর এই গ্রহটি আবিস্কারের পরে টানা দুই বছর গবেষনার পরে ২০১১সালে বিজ্ঞানীরা ঘোষনা দেন যে এটি পৃথিবীর জমজ ভাই।  গ্রহটি পৃথিবী থেকে ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত আর এর বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা জীবনধারণের জন্য উপযোগী।

Q5Rcs2DjahaB4n8p940naSVt tGY

(Source: NASA)

কিন্তু বিপত্তি বাধায় দুরত্বটা প্রায় ৬০০ আলোক বর্ষ! আমরা অনেকেই জানি যে এক আলোক বর্ষ বলতে বুঝায় ১০ ট্রিলিয়ান কিঃমিঃ বা ৬ ট্রিলিয়ান মাইল। অন্যভাবে বলতে গেলে ১ আলোক বর্ষ মানে হল  আলোর গতিতে ১ বছরে যে পরিমান দূরত্ব পার করা সম্ভব। কেপলার ২২বি’র অবস্থান পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০০ আলোক বর্ষ দূরে অর্থাৎ আপনি যদি আলোর গতিতে টানা ৬০০ বছর ধরে ছুটতে পারেন তাহলে আপনি ৬০০ বছর পরে পৌঁছে যাবেন কেপলার ২২বি গ্রহটিতে। একজন মানুষ আজকাল গড়ে ৬০ বছরও বাঁচেনা সেখানে ৬০০ বছর!

প্রচন্ড হতাশ হয়ে অন্যদিকে গেলাম। দেখলাম মঙ্গলগ্রহ নিয়ে খুব তোলপাড় হচ্ছে।পৃথিবীর মতো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে নাকি এতে। পুনরায় আশা খুঁজে পেলাম।  দেখা যাক এই মঙ্গলগ্রহ কতখানি মঙ্গলজনক হয় আমাদের জন্য।

মঙ্গলগ্রহ সম্পর্কে কিছু ব্যাসিক তথ্য:

মঙ্গলগ্রহ,  ইংরেজি নাম মার্স(Mars). রোমান রণদেবতা মার্স (Mars), যার গ্রীক নাম এরিস (Ares The God of War), এর নামানুসারে মার্সের নামকরণ করা হয়েছে বলে জানা যায়।

প্রশ্ন হতে পারে, এমন অদ্ভুত নামকরণের কারণ কি?  যুদ্ধদেবতার সঙ্গে গ্রহের সম্পর্ক কোথায়? এই নামকরণটি করা হয়েছে মূলত মঙ্গলগ্রহের রংয়ের কারণে। মঙ্গলগ্রহের রঙ অস্বাভাবিক রকমের লাল।  রং লাল হওয়ার কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের রক্তাক্ত পরিবেশের সঙ্গে মিল রেখে  রোমানরা মঙ্গলের এই নামকরণ করেছিলো।

TkHZiYQ7gtn4J2A8zvlthgjuR NmLWRdL7yygZmcgRAdM ukVa V6uBUNAI7gi4y yZ

মঙ্গলগ্রহ সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ। একে পার্থিব গ্রহও বলা হয়ে থাকে কারণ পৃথিবীর সাথে এর বেশ কিছু মিল দেখা যায়।  এই গ্রহটিরও পৃথিবীর মত ভূ-ত্বক রয়েছে। ভূ-ত্বকে রয়েছে  পৃথিবীর মত পাহাড়, উপত্যকা, আগ্নেয়গিরি, মরুভূমি এবং মেরুদেশীয় বরফ। আর  রয়েছে অতি ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল। পৃথিবীর মতোই মঙ্গলগ্রহে রয়েছে ম্যাগনেটিক ফিল্ড। তাছাড়া মঙ্গলের ঘূর্ণনকাল এবং ঋতু পরিবর্তনও অনেকটা পৃথিবীর মত।

ZBU4vGTXmAwmAg1uuD5Y MjTrDcIssC9iPnQTCErMotjuvABOWJWZYsEVSLqQPoOSvwtJgoIoKQL75eg4alVS6O9XaP9Gr54K1jKEBdtfg5CS1h3duppEfceB 5d YzQ97yrj9fe

সৌরজগতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম গ্রহ হলো মঙ্গল। ব্যাসার্ধের দিক দিয়ে এই গ্রহটি পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক সমান। তবে পৃথিবীর ভূ-ত্বকের ৭০ শতাংশেই জলের উপস্থিতি থাকার কারণে এদের ভূ-খণ্ডের পরিমাণ প্রায় সমান।

হিসাব মতে ৬৮৭ দিনে মঙ্গলগ্রহ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবীর মতোই মঙ্গলেও ঋতুবৈচিত্র্যের দেখা মেলে। কিন্তু মঙ্গলের একটি ঋতু পৃথিবীর তুলনায় দ্বিগুণ সময় স্থায়ী হয়।

সৌরজগতের সর্ববৃহৎ পর্বতটির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে মঙ্গলগ্রহে। পর্বতটির নাম অলিম্পাস মন্স।উচ্চতা ২৭ কিলোমিটার যা কিনা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতগুলো যেমন মাউন্ট এভারেস্ট,মাওনা কেয়া থেকে তিনগুণেরও বেশি উঁচু।

LcZ2pWIsOby55rEJpKGZqv3HFNK2YPFA2u8dF3J5 JaDABdYSx9ono1kQRk3 imf5PISTwHL0dFmd4rp1cf49HiPj pMRfXdUS1KSdj7LpjiQuCC71N zuwdjitMI6Ds5kTWo2Z7

মঙ্গলের দুটি চাঁদ (উপগ্রহ) রয়েছে। ফিবোস(Phobos) এবং ডিমোস(Deimos)। গ্রিক যুদ্ধদেবতা এরিসের দুই পুত্রের নামে নামকরণ করা হয় এই দুই উপগ্রহের। আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী আসফ হল ১৮৭৭ সালে এই দুটি উপগ্রহ আবিষ্কার করেছিলেন।

দুটি উপগ্রহই মঙ্গল পৃষ্ঠ থেকে খুব কাছাকাছি। ফিবোস(Phobos) এর গড় ব্যাসার্ধ ১১ কিঃমিঃ এবং মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬০০০ কিঃমিঃ দূরে থেকে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করছে। আর ডিমোস(Deimos) এর গড় ব্যাসার্ধ ৬.২ কিঃমিঃ এবং মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে ২৩,৪৬০ কিঃমিঃ দূরে থেকে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করছে।

Gw8EvR6c2Mdjmr6bjkDI8LiBj1kdCgT9q4lzpXND Ntsi s3t7eORQ9ya4CJLZwSnce7UB4PXDJ dCpeKfZYD2pwp6KGYXDtXsz7Cvj9C6nZ2bzC585J7HUmb PwEskTWOJfaeM9

(Source: mars.nasa.gov)

মঙ্গলগ্রহের ভূ-পৃষ্ঠের মধ্যাকর্ষণ শক্তির পরিমাণ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৩ ভাগের ১ ভাগ। অর্থাৎ পৃথিবীতে কারও ওজন যদি ১০০ কেজি হয় মঙ্গলগ্রহে তা দাঁড়াবে ৩৮ কেজিতে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো সমপরিমাণ বল প্রয়োগ করেও পৃথিবীর তুলনায় অন্তত ৩ গুণ বেশি উচ্চতায় লাফানো যায় মঙ্গলগ্রহে।

 একনজরে মঙ্গলের কিছু অভিযান :

মেরিনার ৪ :

এটি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (NASA) কর্তৃক প্রেরিত মহাকাশযান প্রকল্প। এর সহযোগী সংস্থা ছিল Jet Propulsion Laboratory (JPL)।  ১৯৬৫ সালে মেরিনার ৪ মহাকাশযান প্রথমবারের মত মঙ্গল গ্রহ অভিযানে যায়। এই মহাকাশযানটি মঙ্গলগ্রহের ৬,১১৮ মাইল ভিতরে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এই নভোযান মঙ্গলের খাদ এবং এর ধূলিময় রুক্ষ প্রান্তরের ছবি তুলে পাঠায়। অভিযানের পর থেকে অনেকেই ধারণা করে আসছিলেন যে মঙ্গলে তরল পানির অস্তিত্ব আছে।

 মেরিনার ৯ :

এই নভোযান দুটি তৈরি করা হয়েছিল সহযোগী হিসেবে। ১৯৭১ সালের ৩০শে মে উৎক্ষেপণ করা হয় মেরিনার ৯।  মেরিনার ৯ মূলত মঙ্গল-পৃষ্ঠের তথ্যাদি পাঠায়। এই নভোযান থেকে মঙ্গলের উপগ্রহ ফোবোস ও ডিমোস সম্পর্কে তথ্য জানতে পারা যায়।

গ্লোবাল সার্ভেয়ার :

১৯৯৬ সালের নভেম্বরের ৭ তারিখ উৎক্ষেপণ করা হয় গ্লোবাল সার্ভেয়ার। এর কাজ ছিলো ভুপৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ, পদার্থের গঠন সম্পর্কে ধারণা প্রদান, গ্র্যাভিটেশনাল ফিল্ড এবং ম্যাগনেটিক ফিল্ডের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয়, বায়ু ও ধুলিকণার গঠন জানা ইত্যাদি। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে এটি তার প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হয়।  তবে ২০০৬ সালের ৫ নভেম্বর মার্স গ্লোবাল সার্ভেয়ার পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়ে ফেলে। নাসা ২০০৭ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি।

মার্স ওডিসি ও মার্স এক্সপ্রেস :

২০০১ সালে নাসার মার্স ওডিসি অরবিটার মঙ্গলে নামে। এর কাজ ছিল মঙ্গলে বর্তমান ও অতীতে জল ও অগ্ন্যুৎপাত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা। ২০০২ সালে জানা যায়, গামা রশ্মি স্পেকট্রোমিটার ও নিউট্রন স্পেকট্রোমিটার ব্যবহার করে সেখানে প্রচুর হাইড্রোজেনের খোঁজ মিলেছে, যার থেকে বোঝা যায় মঙ্গলের দক্ষিণ মেরু থেকে ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে মাটির ৩ মিটার উপর পর্যন্ত জলীয় বরফ রয়েছে।

অরবিটার এবং বিগল টু :

২০০৩ সালের দুটি সমসাময়িক অভিযানের নাম। বিগল টু ২৫ ডিসেম্বর মঙ্গলের কক্ষপথে প্রবেশ করে। যাত্রার কিছুসময় পরে আর  এর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।আর অরবিটার গ্রহের দক্ষিণ মেরুতে জলীয় বরফ এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। নাসা এর আগেই উত্তর মেরুতে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিল।

এক্সপ্লোরেশন রোভার মিশন :

নাসার মার্স এক্সপ্লোরেশন রোভার মিশন একটি চলমান রোবট চালিত মহাকাশ অভিযান। এতে দু’টি যান আছে।  স্পিরিট এবং অপরচুনিটি। এদের কাজ মঙ্গল সম্পর্কে জানা। এটি ২০০৩ সালে শুরু হয়, লক্ষ্য ছিল মঙ্গলের মাটি ও ভূতত্ত্ব সম্পর্কে জানা, মঙ্গলের পাথর ও মাটির বিশ্লেষণ করে অতীতে সেখানে জল ছিল কি না, তা দেখা।

মার্স রিকনিসন্স অরবিটার :

এটি একটি বহুমুখী মহাকাশ যান। এর লক্ষ্য কক্ষপথ থেকে মঙ্গলকে পর্যবেক্ষণ করা। ২০০৫ সালের ১২ আগস্ট এটি রওনা দিয়েছিল এবং ২০০৬ সালের ১০ মার্চ মঙ্গলের কক্ষপথে পৌঁছে। এর আগে মঙ্গলে পাঠানো যানগুলির তুলনায় এটা উন্নত। এর সঙ্গে তথ্য আদানপ্রদান অনেক ছিলো সহজ ও সাবলীল।

কিউরিওসিটি রোভার :

নাসার মঙ্গল বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র কিউরিওসিটি নামে এই যানটি পাঠায় ২০১১ সালের ২৬ নভেম্বর। এতে যে যন্ত্রগুলি ছিল, তার লক্ষ্য ছিল মঙ্গলের আদি ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খতিয়ে দেখে সেগুলি বসবাসের উপযুক্ত কি না, তা যাচাই করা। এটি ২০১২ সালের ৬ আগস্ট মঙ্গলের পিস ভ্যালি ও মাউন্ট শার্প-এর মাঝে নামে।

uWGmK4NrLn02KAlFdPzAZO88rjnGJjnRDX2KtcMSkIBZLOtcJ8H7xeCGYxDeuIhER oe6NywYEXvhv2KD8H9OsRTpMe2tvqGlvCsxemWvebXDIbjJPRsKbGX9 Yi6FA8C6sn16d

(Source: NASA JPL)

মাভেন:

নাসার মাভেন একটি কক্ষপথ অভিযান, এর লক্ষ্য মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ। মাভেন ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর যাত্রা শুরু করে এবং ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পৌঁছায়।

ইনসাইট রোবট :

২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর সাফল্যের সাথে মঙ্গলের ইলিসিয়াম প্ল্যানিশিয়ায় অবতরণ করেছে রোবট ‘ইনসাইট’। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার হয়ে জেট প্রোপালসন ল্যাবরেটরি এই রোবটটির তত্ত্বাবধান করছে।  ২০১৮সালের ৫ মে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যানডেনবার্গ বিমান ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে রোবট ইনসাইট। ৪৮৩ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ২৬ নভেম্বর সফলভাবে মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ করে এটি।

মঙ্গলপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, অনুরণন, কম্পনের মতো অত্যাবশ্যক লক্ষণসমূহ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজ করবে রোবট ইনসাইট। বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত আশা প্রকাশ করে ধারণা করছেন যে এই রোবট মঙ্গলে প্রাণের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে আমাদের পথ প্রদর্শক হতে পারে।


(Souce: mars.nasa.gov)

মার্স ওয়ান :

মার্স ওয়ান হল মঙ্গল গ্রহে স্থায়ী মানব বসতি স্থাপনের মিশন। যে সংস্থা এই মিশন পরিচালনা করছে সেটির নামও মার্স ওয়ান। এটিকে বলা হয় মঙ্গলযাত্রায় একমুখী টিকেট । কারণ বর্তমান প্রযুক্তিতে মঙ্গল থেকে রকেট উৎক্ষেপণের কোনোপ্রকার সুযোগ নেই। তাই যারা যাবেন তাদের সেখানাই থেকে যেতে হবে। অর্থাৎ এক হিসেবে পৃথিবীতে যেন মৃত্যু ঘটবে তাদের।  ২০১২ সালে ‘মার্স ওয়ান’ তাদের পরিকল্পনা প্রকাশ করে।

শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ২০২৩ সালে মঙ্গলে মানববসতি স্থাপন করা হবে। পরে সেটা পিছিয়ে ২০২৫ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে দু’জন পুরুষ ও দু’জন নারী নিয়ে চারজনের দলটি পৃথিবী ছেড়ে যাবে আর পৌঁছুবে ২০২৫ সালে।

A Z6d5wgnu2VQ0M8rBE2aUb3SauyURNMZmi pmXZsS3AypG h5rZ1cwn8nxOSKPSaKSbGZME9QrtTDqFIit0k TcAHG0jqP6uKNCf E0Z3KyZtC9rj94gkmcCjbDzDENN46SkJWz

(Source: Space News)

মঙ্গলে প্রাণের বিস্তার :

কোনো স্থানে প্রাণের উৎপত্তি সম্পূর্ণ নির্ভর করে জলবায়ুর উপর। তাছাড়া প্রাণের বিস্তারে মূখ্য একটি উপাদান হচ্ছে পানি।

প্রশ্ন হচ্ছে মঙ্গলগ্রহে কি পানি রয়েছে?

নাসার দাবি, মঙ্গলগ্রহের তাপমাত্রা শূন্য থেকে পঁচিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেই পানির দেখা পাওয়া যাচ্ছে৷ কিন্তু এই পানি কোথা থেকে আসছে? বিষয়টি নিয়ে এখনও নিশ্চিত নয় নাসা৷ তবে তাদের ধারণা, মঙ্গলের মাটির নীচে স্তূপীকৃত বরফ বা নোনা কোনো বস্তু থেকে জল আসতে পারে৷ এই সম্ভাবনার হাত ধরেই কাজ করে চলেছে নাসা। বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে,অনুসন্ধান চলছে পানি খোঁজার। এর জন্য ২০২০ সালে নাসার আরেকটি অনুসন্ধান যান মঙ্গলে পাঠানোর পরিকল্পনা চলছে। জানা যায় রোভার নামের মিশনটি ২০২০ সাল পৃথিবী ত্যাগ করবে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে। প্রাণের সন্ধান মিললে মঙ্গল যাতে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, তার জন্যও অক্সিজেন তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শুরু করেছে নাসা৷

অপরদিকে মার্স ওয়ান নামক মিশনটির উদ্দেশ্য হচ্ছে মঙ্গলে মানব বসতি স্থাপন করা।তাদের পরিকল্পনা হচ্ছে ওরা প্রথমে একটি এক্সপ্লোরার রোবট পাঠাবে যা অবতরণের জন্য একটি উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করবে। তারপর প্রাইমারি সাপ্লাইয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দেওয়া হবে। পরবর্তী পর্যায়ে পাঠানো হবে ফাইনাল সাপ্লাই যেখানে থাকবে মানুষের থাকার নির্দিষ্ট জায়গা, অক্সিজেন উৎপাদক , সোলার প্লেট, বিদ্যুৎ উৎপাদন সুবিধা ইত্যাদি । সাথে যাবে স্বয়ংক্রিয় রোবট এবং রোভার যারা কিনা বাকি কাজগুলো সম্পন্ন করবে। পরিকল্পনা অনুসারে, অভিযাত্রীদল যাওয়ার আগেই পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়ে যাবে। অভিযাত্রীরামঙ্গলে পৌঁছে নিজেদের কাজ শুরু করবে।

একজন মানুষের বেচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ দেওয়া হবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট ঘর ছাড়া বাইরে বের হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের পোষাক যা মানুষকে সেখানকার বৈরী পরিবেশ থেকে বাঁচাতে পারবে।

যেসব প্রশ্নের মুখে মঙ্গলে মানব অভিযান :

১। সমীক্ষা মতে মঙ্গলগ্রহের গড় তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রির নিচে। এত কম তাপমাত্রায় কোন প্রাণীর বাস করা অসম্ভব। এক্ষেত্রে তারা কিভাবে বেচে থাকবে?

২। উন্নতমানের টেলিস্কোপ দিয়ে তোলা ছবিগুলো দেখার পরও জ্যোতির্বিদরা মঙ্গলে কোনো আশানুরূপ জলাশয়ের দেখা  পাননি।পানি ছাড়া কোনো জীব বেঁচে থাকবে কিভাবে?

৩। মঙ্গলগ্রহে একটি খুব সাধারণ ব্যাপার হচ্ছে ধুলিঝড়। এই ঝড় ধূলির কুণ্ডলী কয়েক হাজার ফুট পর্যন্ত উঠে যায় এবং তীব্র বেগে ঘুরতে থাকে। ধূলিঝড়ের স্থায়িত্ব কয়েকমাস পর্যন্ত থাকে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উথছে যে, মঙ্গলগ্রহে যদি দীর্ঘ ঘূর্ণিঝড় হানা দেয় তাহলে মানুষ সেখানে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবেন?

৪। মঙ্গলে নির্দিষ্ট বাসগৃহ ছাড়া বাইরে বের হওয়ার জন্য আপনাকে এক ধরণের বিশেষ পোষাক দেওয়া হবে। এখন আপনি যদি ভুলবশতও শুধুমাত্র মাথার হেলমেটটা  খুলে ফেলেন,  সাথে সাথেই আপনার শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যেতে থাকবে কারণ এখানে বাতাসে কোন আদ্রতা নেই বললেই চলে। পাশাপাশি ভূপৃষ্ট থেকে আসা অতিবেগুনী রশ্মি নিমিষেই আপনার DNA’র গঠন পরিবর্তন করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার মস্তিষ্কে এবং দেহের চামড়ায় মারাত্মক ক্ষতিসহ প্রাণনাশের সম্ভাবনাও খুব বেশি। এই প্রতিবন্ধকতা কিভাবে দূর করা যায়?

মঙ্গলে প্রাণের বিস্তার বা প্রাণের সন্ধান পাওয়া নিয়ে রয়েছে সন্দিহান, রয়েছে ভিন্ন মতামত এবং তর্ক বিতর্ক। তবে একটা কথা ভুলে গেলে চলবেনা যে বরাবরই অসম্ভবকে  সম্ভব ট্যাগ লাগানো ছিলো বিজ্ঞানের অর্জন।

মার্কিন জ্যোতি বিজ্ঞানী  কার্ল স্যাগান স্বপ্ন দেখেছিলেন, মঙ্গলে একদিন মানুষ  স্থায়ী বসতি স্থাপন করবে। তাঁর স্বপ্নের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরাও সেই সুদিনের অপেক্ষায় থাকবো। অপেক্ষা মঙ্গল জয়ের!

তথ্যসূত্রঃ

1. https://www.space.com/16907-what-is-the-temperature-of-mars.html 

2.  www.nasa.gov/mission_pages/mars/main/index.html

3.https://www.nasa.gov/mission_pages/mars/missions/marssciencelab-index.html

4.  http://www.mars-one.com/

আপনার কমেন্ট লিখুন