ভাষা আন্দোলন: জাতির গর্বের ইতিহাস

মনে-প্রাণে এবং ঘ্রাণে একজন লেখক। কলমের শক্তিতে দেশটাকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি। পৃথিবীর অলি-গলি-তস্যগলি পর্যন্ত ঘুরে দেখার ইচ্ছে নিয়ে দিন কাটছে। ভালোই তো কাটছে!

২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮। করাচি শহরে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসেছে। গণপরিষদ এলাকায় উৎসব মুখর পরিবেশ; নিরাপত্তার কড়াকড়ি।

বেশ কয়েক দিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে রয়েছে। পাকিস্তান নামের সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রটির রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাবে কোন ভাষা, তা নিয়ে তুমুল আলোচনা এখন পথেঘাটে। প্রতিনিয়ত চায়ের কাপে ঝড় উঠছে রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত আলোচনায়।

পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে এখনো এক বছর হয়নি। প্রায় দু’শো বছরের ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান, ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করলো। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সীমারেখা নির্ধারণের এক অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বেনিয়া শক্তি। তার চেয়েও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তানের দুটি অংশ এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, একটি অংশের সাথে অপরটির দূরত্ব প্রায় দুই হাজার মাইল! মাঝখানে রয়েছে ভারতের বিশাল ভূখণ্ড!

পাকিস্তানের স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে! পাকিস্তানের প্রায় ৬ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষেরই মাতৃভাষা বাংলা। বাকি আড়াই কোটি পাকিস্তানির বেশিরভাগেরই মাতৃভাষা পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বালুচি। উর্দু ছিল হাতে গোণা কিছু লোকের কথ্য ভাষা। অথচ পাকিস্তানের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা কিনা উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চিন্তাভাবনা করছেন!

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এমন চিন্তাভাবনা চলছিলো। কংগ্রেস সরকার হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার চিন্তাভাবনা করছে। এদিকে দক্ষিণ ভারতের তামিলরা কিছুতেই হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে না। চললো ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম! ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলো!

এদিকে পাকিস্তানের ব্যাপারটাও ঠিক সুবিধার ঠেকছে না যে! প্রায় এক দশক আগেই নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে এ নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্ক বেঁধে গিয়েছিলো শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সঙ্গে উর্দু ভাষী নেতাদের। ব্যাপারটা তখন সামলে নেয়া গিয়েছিলো। কিন্তু এখন তো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেই গেছে!

১৯৪৭ এর সেপ্টেম্বরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিশ গঠিত হলো। তমদ্দুন মজলিশ “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে? বাংলা নাকি উর্দু? ” নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে যেখানে সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার দাবি করা হয়।

সেই সময়ে সরকারি কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট, পোস্ট কার্ড, ট্রেন টিকেটে কেবল উর্দু এবং ইংরেজিতে লেখা থাকতো । পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা সংস্কৃতিকে হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি এবং বাংলা ভাষাকে হিন্দুত্ববাদী ভাষা হিসেবে অভিহিত করে এবং তারা পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতিকে তাদের দাবি অনুযায়ী ‘ইসলামিকরণ’ এর চেষ্টা চালাতে থাকে।
তমদ্দুন মজলিশের সভায় সর্ব প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানাতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৮ ডিসেম্বর একটি সমাবেশ থেকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা বাংলা করার দাবি উত্থাপিত হয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসলো ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবটি আলোচিত হয়।

তার পরপরই গণপরিষদে তুমুল তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল! প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে বক্তৃতা করেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, মোহাজের ও পুনর্বাসনমন্ত্রী গজনফর আলী খান, পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং গণপরিষদের সহ-সভাপতি তমিজউদ্দিন খান।

খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন এই বিরোধিতার শীর্ষে এবং তার সক্রিয় সমর্থনে এই বিলটিকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতিকে পাকিস্তানের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং বিলটি বাতিল করা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দমে না গিয়ে তিনবার বিভিন্ন সংশোধনী সহ বিলটি পুনরায় উত্থাপন করেন কিন্তু প্রতিবারই তা একই ভাগ্যবরণ করে।

১১ মার্চ গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা উর্দু বিল পাস হয়ে যায়। সেদিন সারা পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিরোধ দিবস ও বিক্ষোভ ধর্মঘট পালিত হয়। প্রতিরোধ মিছিল থেকে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ সহ ৬৮ জন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করা হয়।

  ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত করাচির অধিবেশন থেকে ঢাকায় ফিরে এলে ছাত্রজনতা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়। প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত মূলত সেখান থেকেই।

এরপর রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবি আরো জোরালো হয়। ১৫ মার্চ ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে একটি অঙ্গীকারনামা স্বাক্ষর করেন। পরবর্তীতে পরবর্তীতে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ অঙ্গীকারনামাটি বাতিল করেন।

২১ মার্চ ও ২৪ মার্চ যথাক্রমে রেসকোর্স ময়দানে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জিন্নাহ সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ উপস্থিত ছাত্রজনতা ঘৃণা ভরে ‘না না’ কণ্ঠে তা প্রত্যাখ্যান করে।

মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত থাকে। পাকিস্তান সরকার আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সহ বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি আরো বেগবান হয়।

এদিকে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানের জনসভায় পুনরায় উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা করেন। ক্ষোভে ফেটে পড়া ছাত্ররা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ২১শে ফেব্রুয়ারি স্পমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে।

১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার ২১শে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশেপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এক মাস ধরে চলা ধর্মঘটের প্রস্তুতি হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হবে কিনা তা নিয়ে নেতৃবৃন্দ সংশয়ে থাকেন।

২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১০ জন করে ছাত্র মিছিলের মাধ্যমে বাইরে বেরিয়ে এসে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গ্রেফতার বরণ করতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ছুঁড়লে পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে পড়ে, শুরু হয় সংঘর্ষ। পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত নিহত হন। এছাড়া রফিক উদ্দিন ও আবদুল জব্বার নামে আরো দুই তরুণ নিহত হন। পরবর্তীতে হাসপাতালে আবদুস সালাম নামে একজন সচিবালয়ের কর্মকর্তা এবং অহিউল্লাহ নামের এক কিশোর মৃত্যুবরণ করে।

ঢাকায় ছাত্রহত্যার খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লো। বিকেল ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটে হাজারো জনতা জড়ো হলো। আন্দোলনের দাবানল সমগ্র দেশকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিলো। ২২শে ফেব্রুয়ারি নিহতদের স্মরণে শোক মিছিল বের হয়। এ মিছিলে পুলিশের গুলিতে শফিউর রহমানসহ আরো চারজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। উপায়ান্তর না দেখে মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে একটি বিল উত্থাপন করেন যা সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। ২৪শে ফেব্রুয়ারি একটি শহির মিনার নির্মাণ করা হয়। শহিদ শফিউরের বাবা তা উদ্বোধন করেন। ২৬শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ শহিদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়।

 এরই মধ্যে ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৬ এপ্রিল আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হয়। অবশেষে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর, ২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। অর্জিত হয় সাফল্য, বুকের তাজা রক্ত ঢেলে বাঙালি দাবি আদায় করে নেয়, ছিনিয়ে আনে ভাষার সম্মান।

বাঙালির ভাষা আন্দোলন মূলত একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল। নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সম্মান রক্ষার্থেই এই আন্দোলন সংঘটিত হয়। তবে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য সব কিছুকে ছাপিয়ে প্রধান হয়ে ওঠে।

স্ফূলিঙ্গ একটি কণার চেয়েও ক্ষুদ্র কিন্তু জ্বালিয়ে দিতে পারে সবকিছু। আবার সেই ধ্বংসের স্ফূলিঙ্গ হয়ে উঠতে পারে প্রেরণার উৎসমুখ। যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ বাঙালির ভাষা-আন্দোলন। 
পৃথিবীতে স্বাধীন রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৪টি। প্রতিটি দেশেরই রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস-ঐতিহ্য। এতগুলো রাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশ নিতান্তই ছোট্ট একটি রাষ্ট্র। অথচ ছোট্ট এই রাষ্ট্রের অধিবাসীরাই সৃষ্টি করেছিলো এমন এক ইতিহাস – পৃথিবীর বাঘা বাঘা জাতিগুলোও যা করতে পারেনি। ছোট্ট এই দেশটি পৃথিবীর একমাত্র দেশ – যে দেশের মানুষ নিজেদের ভাষার মান রক্ষার্থে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিলো। ভাষাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের মানচিত্রে একটিই জাতির অভ্যুদয় হয়েছে,  সেই দেশটির নাম বাংলাদেশ। ভাষাকেন্দ্রিক জাতি গোষ্ঠীর উদ্ভব, বিকাশ ও অগ্রসরমানতার এ আকাশস্পর্শী অর্জনের মূলে রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারির সেই রক্ত ঝরানো তারুণ্য। সেই পটভূমি এক আগুনঝরা ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়, বেদনা ও বিসর্জনের বিষাদ বারিধারা, থই থই আবেগ এবং আত্মনিবেদনের অভূতপূর্ব এক বিস্ময়-জাগরণ প্রদর্শিত হয়। রক্তমাখা পিচ্ছিল পথ ধরে অবিনাশী মিছিলের মধ্য দিয়ে বাঙালি নির্ভীক এগিয়ে গেছে। যে বাঙালিকে ভেতো ও ভীতু বলে আখ্যা দেয়া হয়েছিলো – তারাই ঘটিয়েছিলো এক অবিস্মরণীয় চেতনার বিস্ফোরণ। বায়ান্নর রক্তমাখা আন্দোলন তাই নিছক দাবি আদায়ের আন্দোলন নয় – পৃথিবীর বুকে জাতীয়তাবাদী শক্তির এক অবশ্যম্ভাবী বিজয়। 
ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও ইতিহাস নিয়ে মহাকাব্য রচনা করে ফেলা যায় সহজেই। কিন্তু এর ইতিহাস বা পটভূমি জানা যতটা জরুরি, এর চেতনাকে ধারণ করা তার চেয়ে কোনো অংশেই কম জরুরি নয়; বরং ভাষা আন্দোলনের চেতনার স্বরূপ বিশ্লেষণের মধ্যেই বাঙালি জাতির মুক্তি নিহিত।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রস্তুত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তীব্র অনীহা সত্ত্বেও বাঙালির অবিস্মরণীয় গণ-আন্দোলন সরকারকে দাবি মেনে নিতে বাধ্য করে। রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের তাজা প্রাণের বিনিময়ে বাঙালিরা ছিনিয়ে আনে মায়ের মুখের বুলির সম-অধিকার। ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতিগত চেতনার মূলে বিস্ফোরণ করেছিলো। এই আন্দোলন থেকেই বাঙালির আত্ম-চেতনার জাগরণ ঘটতে থাকে। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সীমারেখার বিভাজন যে ভুল ছিল, তা প্রথমবারের মতো সামনে আসে। বাঙালি যে সম্পূর্ণ আলাদা একটি জাতিসত্ত্বা, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একইসাথে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভুলগুলোও ধরা পড়ে।
পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ভাষা আন্দোলন প্রেরণা যুগিয়েছে। একুশের চেতনায় ভাস্বর বাঙালি আর কখনো অপশক্তির কাছে মাথানত করেনি। একুশের চেতনা বাঙালিকে যে আত্মমর্যাদা ও আত্মসচেতনতার জগতে প্রবেশ করিয়েছে, সেই জগত বাঙালির প্রতিবাদী চেতনার চিরায়ত প্রতিমূর্তিকে গড়ে নতুন ছাঁচে গড়ে তুলেছে। মূলত একুশের পর থেকেই বাংলার আকাশে-বাতাসে যে স্বজাতিপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী চেতনার বুনিয়াদি ঘ্রাণ ভেসে বেড়াতে শুরু করে – সেই চেতনাই বাংলাদেশ নামের সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ থাকার রহস্য; জাতিগত উন্নয়নের চালিকাশক্তি। 
বর্তমানে বাংলাদেশ ইতিহাসের এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বিশ্বায়নের ফলে হঠাৎ ধরা দেয়া একবিংশ শতাব্দীর কঠিন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজটা ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশে শুরু হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারলে সম্ভাবনাময় তারুণ্যের হাতে নবজাগরণের স্বপ্ন দেখা এ রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল হয়ে পড়তে বেশি সময় নেবে না। কাজেই বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে রোল মডেলে পরিণত করার দক্ষযজ্ঞের জন্য আমাদের সবাইকে প্রস্তুত হতে হবে। একুশের যে চেতনা আমাদের সেই সময়ে ঐক্যবদ্ধ করেছিলো, শক্তি যুগিয়েছিলো পরাক্রমশালী শোষকদের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে লড়াই চালিয়ে যেতে – সেই চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েই এগিয়ে যাবে বাংলার তারুণ্য; গড়ে তুলবে স্বপ্নের সোনার বাংলা।

আর সেদিন বাংলার আকাশজুড়ে প্রকাণ্ড লাল সূর্য হাসবে, বাংলার চাঁদ নির্ভয়ে জ্যোৎস্নার আলোকচ্ছটা বিলোবে, বাংলার বাতাসে ভেসে বেড়াবে জাতির পিতার স্বপ্ন, বাংলার শ্যামল প্রান্তর হয়ে উঠবে সাক্ষাৎ স্বর্গ! গড়ে উঠবে নতুন এক বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশের বুনিয়াদ হবে একুশের হার-না-মানা চেতনা!


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?

GET IN TOUCH

10 Minute School is the largest online educational platform in Bangladesh. Through our website, app and social media, more than 1.5 million students are accessing quality education each day to accelerate their learning.