প্লাসিবো ইফেক্ট: বিশ্বাসের সুস্থতায়, শারীরিক সুস্থতা

আমি আর আমার বন্ধু আহাদ আমাদের ডিপার্ট্মেন্টের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের জন্য প্র্যাক্টিস করছিলাম, পরেরদিন ফাইনাল ম্যাচ, আমরা দুইজন আবার ওপেনিং ব্যাটসম্যান! আরেক বন্ধু শুভ খালি জায়গায় ব্যাট ঘুরিয়ে ছয় মারার প্র্যাকটিস করছিল, হঠাৎ দুইজনেরই বেখেয়ালিপনায় শুভর সজোরে চালানো ব্যাট যেয়ে লাগে আহাদের পায়ে। ওইদিনের মত প্র্যাক্টিসের ওখানেই সমাপ্তি!

আমরা আহাদকে সামাজিক বিজ্ঞান চত্বরে(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) নিয়ে আসি ধরে ধরে, সেখানে আমাদের আরেক ফ্রেন্ড হাসি পেইন কিলার নিয়ে হাজির। তো পায়ের পেইন তো কমাতে হবে, তাই সাথে সাথেই সেটা আহাদকে খাওয়াই আমরা, ৫-১০ মিনিট পর আহাদ নিজেই বলে, “একটু কমসে ব্যথা, প্যারা নাই, ব্যাটিং করতে পারব কালকে”।

হাসি বলে উঠে, “দেখসিস? পেইন কিলার আনসিলাম বলে, নাইলে এখনো ব্যথায় কাতরাইতি”। হাসির কথা শেষ হতে না হতেই আমাদের আরেক ফ্রেন্ড শাওনের আবির্ভাব। ওর বড় বোন আবার ডাক্তার, তাই সেও মেডিসিন সম্বন্ধে হাল্কা পাতলা জ্ঞান রাখে আর কি!

এসেই তাই হাসির কাছে তাঁর প্রশ্ন, “কী পেইন কিলার দিলি যে এত জলদি ব্যথা কমে গেলো?”

তখন দেখা গেল মূল ক্লাইম্যাক্স!

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

তাড়াহুড়ার মধ্যে ছিলাম বলে, হাসি আমার দিকে ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, “দাদা, তুমি একটু দাও তো আহাদকে ওষুধটা, ব্যাগে আছে”, আমি ব্যাগ খুলেই দেখি ওষুধ, তাই কিছু না পড়েই দিয়ে দিয়েছিলাম আহাদকে খেতে, যেহেতু হাসি বলেছে পেইন কিলার আছে ওতে। আসলে ওর ব্যাগে আরো অনেক ওষুধ ছিল, ঐ পকেটটায় যেটা আমি খুলেছিলাম সেটায় ছিল ‘Oradin’ যেটা আসলে সাধারণ জ্বর, ঠান্ডা হলে খায় মানুষ, খুব স্বাভাবিকভাবেই এটা তাই পেইন কিলার না মোটেও!

কিন্তু আহাদের পেইন কিন্তু কমে গিয়েছিল। তাহলে কমলো কীভাবে?

একটা জিনিস তো নিশ্চিত যে, ব্যথা কমার সাথে ঔষধটার কোন সম্পর্ক নাই, তাও যে ব্যথাটা কমলো তার কারণ হল বিশ্বাস। আহাদ এটা বিশ্বাস করেছিল যে ওষুধটা খেলে একটু হলেও ব্যথা কমবে, হয়ত সময়ের সাথে ব্যথা এমনিতেও কমত, কিন্তু বিশ্বাসের কারণে ব্যথা অনেক তাড়াতাড়ি সেরে গেছে, এটাই আসলে প্লাসিবো ইফেক্ট।

ছোট বেলায় আমরা কমিক্স পড়তাম না, চাচা চৌধুরী? ওখানে এমন একটা গল্প ছিল যে, একবার এক বিশাল মোটা লোক এসে চাচা চৌধুরীকে বলে, আমাকে ওষুধ দেন, আমি এই মোটা অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে চাই। চাচা চৌধুরী বললেন আমি তো ডাক্তার না, তাও দেখি কী করা যায়। তুমি এক কাজ কর, আমার বাসায় চল, ওষুধ দিচ্ছি। চাচা চৌধুরীর বাসা সেখান থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ছিল, ওখানে যাওয়ার পর উনি ঐ লোককে একটা ওষুধ দিলেন এবং বলে দিলেন প্রতিদিন তিন বেলা পায়ে হেঁটে ওনাকেই চাচা চৌধুরীর বাসা থেকে ওষুধ নিয়ে যেতে হবে, না হয় উনি ওষুধ দিবেন না।

উপায়ান্তর না দেখে ঐ লোকও তাই করতে থাকে, মানে ওনার যাওয়া আসায় ৪ কিলোমিটার করে হাঁটা পড়তে থাকে, এভাবে আবার ৩ বেলায় মোট ১২ কিলোমিটার। তাই তার হাঁটার কারণেই উনি অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেন মাত্র কয়েক সপ্তাহেই। চাচা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করার পর উনি বলেন, উনি ওষুধে কিছুই দেননি, ওখানে শুধু লবণের পুরিয়া ছিল!

এটা তো এত ঝামেলা না করে সরাসরি বলেই দিলেই হত, যে আপনি প্রতিদিন হাঁটবেন, তাই না? আসলে না। কারণ আমাদের বিশ্বাসটা অনেক বড় জিনিস। আমরা ওষুধ খাই, খেয়ে বিশ্বাস করি, এবার তো একটু ঠিক হবেই, হয়ত অনেক সময় কাজও হয়, আবার অনেক সময়ই হয় না, কিন্তু বিশ্বাসের জোরে দেখা যায় অসুখ ভাল হয়ে গেছে। ঐ মোটা লোকটাও বিশ্বাস করত, চাচা চৌধুরীর ওষুধে কাজ হবে, এটাও এক প্রকারের প্লাসিবো ইফেক্ট।

তো প্লাসিবো(Placebo) হচ্ছে এমন এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা ঔষধ, যার আসলে কোনো ঔষধী গুণাগুণ নেই; কিন্তু তারপরেও সেটা রোগীর উপরে কাজ করে এবং রোগ সারিয়ে ফেলে।

প্লাসিবো ইফেক্টের আরো অনেক উদাহরণ আমার নিজের চোখেই দেখা। আমার দুলাভাই নাবিব ভাইয়া গরম পানি বাথ্রুমে আনতে যেয়ে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, আর সমস্ত গরম পানি পড়ে তার গায়ে, ফলস্বরূপ বার্ন ইউনিটে ভর্তি থাকতে হয় তাকে প্রায় দেড় মাস লম্বা সময়। তো, রাতে প্রচন্ড ব্যথায় তার ঘুম আসতো না। ডাক্তার তাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য ঘুমের ওষুধ দিতেন ঠিকই, কিন্তু কাজ করত না। একদিন প্রচন্ড ব্যথায় কাতরাচ্ছেন ভাইয়া, আমরা ডাক্তারকে যেয়ে অনুরোধ করি যেন ভাইয়ার ঘুমের ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দেয়া হয়, কিন্তু ডাক্তার জানান যে, সেদিনের মত ঘুমের ওষুধ যতটুকু দেওয়া যেত তার পুরোটাই দেয়া হয়ে গেছে।

তাও অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মত ডাক্তার আমাদের কথা শুনলেন এবং ঘুমের ওষুধ ইঞ্জেক্ট না করে ভাইয়াকে একটা ট্যাবলেট খেতে দিলেন। ভাইয়া তার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন। ভাইয়ার অসহনীয় পেইন দেখতেও খারাপ লাগছিল আমাদের, তাই আমরা গেলাম ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানাতে, যেয়ে তো দেখি আরেক ঘটনা!

ডাক্তার আমাদের জানালেন, সেটা আসলে সাধারণ একটা “সিভিট” টাইপের ট্যাবলেট, যেটা আমরা অনেক সময় কিছু না হলেও চকলেটের মত করে খাই এবং মোটেও ঘুমের ওষুধ না!

দেখে নাও আমাদের Interactive Video গুলো!

তাহলে ভাইয়ার ঘুম আসলো কীভাবে? খুব সিম্পল একটা বিশ্বাসের ব্যপার এটা। ভাইয়া বিশ্বাস করেছিলেন যে, ঘুমের ওষুধ খেয়েছি, এখন ঘুম তো আসবেই, বাস্তবেও তাই হয়েছিল। এটাই প্লাসিবো ইফেক্ট।

এগুলো তো তাও সাধারণ ঘটনা, বিশ্বাস করা যায়। বেশ কিছু অবিশ্বাস্য ঘটনাও আছে প্লাসিবো ইফেক্টের।

আমার এক ফ্রেন্ড আতিকের কাছে শোনা ঘটনাটি। ওদের দেশের বাড়ি পটুয়াখালী জেলায়। তো সেখানে ওদের এক আত্মীয় থাকে, উনার হাতের কনুইতে নাকি অনেক বছর ধরেই ব্যথা। রাতের বেলা কিংবা শীতের সময় নাকি ব্যথা বাড়ে। অবস্থাপন্ন পরিবারের হওয়ায় তাকে দেশ-বিদেশের অনেক বড় বড় ডাক্তারের কাছে দেখানো হয়েছে, কেউই কোন সমস্যা খুঁজে পায়নি, তার হাতে বা কনুইতে। কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলার সময় কাঠের বল সজোরে লাগার পর থেকেই তার হাতে ব্যথা!

তো আতিকদের একজন পারিবারিক ডাক্তার ছিলেন, তিনি মোটামুটি সব রকম অসুস্থতারই ওষুধ দিতেন, যেহেতু আশে-পাশে খুব বেশি সংখ্যক ডাক্তার ছিল না। তো উনি করলেন কি, ঐ ছেলেকে ডাকলেন অপারেশন করার জন্য। রীতিমত কাঁটা-ছেঁড়া করে অপারেশনও সম্পন্ন করলেন। পরে সেলাই দিয়ে, বললেন তোমার কনুইতে যে সমস্যা ছিল সব ঠিক করে দিয়েছি; আর ব্যথা হবে না। মজার ব্যপার এরপর আর কখনো তার কনুইতে ব্যথা হয়নি।

অপারেশন হওয়ার প্রায় ৩-৪ মাস পর আবার এক অসুস্থতায় আতিক যায় ঐ ডাক্তারের কাছে। যেয়ে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করে বসে, এত বড় বড় ডাক্তাররা পারল না ওর ব্যথা সারতে আর আপনি এত সহজে সারিয়ে তুললেন? ডাক্তার সাহেব জানালেন তখন এক চমকপ্রদ কথা। বললেন, আমি অপারেশন করে ওর হাতে কোন সমস্যাই পাইনি, তাই অপারেশনের পর আবার সেলাই করে দেই, ভেবেছিলাম কাজ হয়নি। কিন্তু দেখতে চাচ্ছিলাম বিশ্বাসে কাজ হয় কি না। তাই বলেছিলাম, তোমার হাত ভাল হয়ে গেছে আর ব্যথা করবে না। তাতেই কাজ হল! ওর হাতে আর ব্যথা করেনি!

এটা প্লাসিবো ইফেক্টের একটা জ্বলন্ত উদাহরণ এবং এই ধরনের ভুয়া অপারেশনকে বলে Sham Surgery. যখন কোন কিছুতেই ডাক্তাররা কোন সুরাহা খুঁজে পান না, যে রোগীর আসলে কী হয়েছে, তখন অনেক সময় ডাক্তাররা এমন ভুয়া অপারেশন করেন। এতে রোগীর আত্মবিশ্বাসে নাড়া লাগে আর অনেক সময় প্লাসিবো ইফেক্টের বদৌলতে এভাবে Sham Surgery থেকে পজিটিভ রেজাল্টও বেরিয়ে আসে। অনেক রোগী এভাবে সুস্থতা লাভ করেছেন বিভিন্ন সময়।

কিন্তু তাই বলে সব সময়ই যে প্লাসিবো ইফেক্ট কাজ করবে এমন কিন্তু নয় মোটেও। ধরুন রোগীকে Sham Surgery করা হল, কিন্তু রোগী সেটা ধরে ফেলল যে এটা আসলে ভুয়া ছিল! তাহলে প্লাসিবো ইফেক্টের কাজ করার প্রশ্নই আসে না। কিংবা রোগী নিজেই যদি বিশ্বাস না করে যে, ঐ ওষুধে কাজ হবে তাহলেও প্লাসিবো ইফেক্ট কাজ করবে না। বিশ্বাস অনেক বড় ব্যপার, কাউকে জোর করে তো আর কিছুতে বিশ্বাস করানো যায় না, তাই যারা বিশ্বাস করবে না বলে আমরা নিশ্চিত, তাদের উপর প্লাসিবো ইফেক্ট খাটানোর চেষ্টা না করাই ভাল।

মূলত নিউরোবায়োলজিকাল রোগগুলা সাময়িকভাবে সারতে পারে প্লাসিবো। এই রোগগুলার মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরণের ব্যথা। যেমন: পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, কোমর ব্যথা ইত্যাদি। কিংবা  হতাশা, বিষণ্ণতা, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। ক্যান্সার কিংবা জটিল সার্জারির কাজ কিংবা দুরারোগ্য ব্যধি প্লাসিবো দিয়ে কমপ্লিট করা যাবেনা কখনোই।

অনেক সময় আমরা দেখি না মাজারে যেয়ে মানুষ মানত করে সুস্থতার জন্য, কিংবা বিভিন্ন প্রাণী বলি দেয়, দরবেশ বাবার কাছে যায়, তান্ত্রিকের কাছে যায়, জ্যোতিষীর কাছে যায় কিংবা ফকির বাবার কাছে যায়; অনেক সময় সুফলও পায়। আসলে এসবে ঐ সব ফকির বাবার কোন হাত নেই, সবই বিশ্বাসের খেলা, মানুষ বিশ্বাস করে বলেই তাদের কথায় কাজ হয়। অলৌকিক শক্তির অধিকারী মানুষ থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সংখ্যা অনেক কম। বেশির ভাগই ভুয়া।

তাদের কথায় না, আসলে যে প্লাসিবো ইফেক্টের বদৌলতে কাজ হচ্ছে এটা মানুষ যদি বুঝত তাহলে এসব ভন্ড মানুষের সংখ্যাও অনেক কমে আসতো। তো এতকিছু বললাম প্লাসিবো নিয়ে, একটা জিনিসতো ক্লিয়ার প্লাসিবো ইফেক্ট যেহেতু কাজ করে, তার মানে ওষুধ ছাড়াও শুধুমাত্র আমরা আমাদের বিশ্বাসের মাধ্যমেই অর্ধেক সুস্থ হয়ে যেতে পারি।

আচ্ছা আমরা না আমাদের ব্যাটিং নিয়ে কথা বলছিলাম? ভূলেই তো গিয়েছিলাম সে কথা!

তো পরেরদিনের ফাইনালে আহাদ ব্যাটিং করেছিল, ৪০ বলে, ৭৫ রানের অসাধারণ একটা ইনিংসও খেলেছিল, অথচ ও যদি বিশ্বাস করত যে ওষুধে কাজ হবে না, বা ব্যথা কমছে না, তাহলে হয়ত খেলতেই পারত না।

এখন পর্যন্ত যা বললাম তার সবই প্লাসিবো ইফেক্টের পজিটিভ দিক। এর উল্টোটাও তো হতে পারে, মানে ওষুধে কাজ হয়ত হত, কিন্তু আমাদের অবিশ্বাসের জন্য হয়ত কাজ যতটুকু করার কথা তার চেয়ে কম করল। এটাকে বলে নসিবো ইফেক্ট (Nocibo Effect)।

প্লাসিবো ইফেক্ট নিয়ে তো কিছু জানলাম, পরের পর্বে প্লাসিবো ইফেক্টের আরো কিছু ঘটনা জানব, সাথে জানব নসিবো ইফেক্ট নিয়ে।


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author
Sakib Hossain
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?