প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর সাত মন্ত্র

An enthusiast doodling with a piano in canvases

একদম সহজ করে বললে প্রোডাক্টিভিটি বলতে বোঝায় কোনো কাজের পেছনে তোমার পরিশ্রমের বদৌলতে তুমি ঠিক কতটুকু ফলাফল পাচ্ছ। মানে তোমার পরিশ্রম আর পরিশ্রমের ফলাফলের অনুপাতকেই আমরা বলছি প্রোডাক্টিভিটি।

এই প্রোডাক্টিভিটি তোমাদের অনেকেরই  উৎসাহ কিংবা হতাশার কারণ। কেননা অনেকেই পরিশ্রম অনুযায়ী অসাধারণ সব সাফল্যের মুখ দেখছো,মানে প্রোডাক্টিভিটি ঠিকঠাক মতোই কাজ করছে। আবার অনেকেই আছো, যারা শ্রম দিয়েও আশানুরূপ কোনো ফলাফল পাচ্ছো না, দিনদিন হতাশ হয়ে পড়ছ।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

সব হতাশা থেকেই পরিত্রাণের উপায় আছে। তোমার যদি মনে হয় প্রোডাক্টিভিটির ব্যাপারটি তোমার সাথে ঠিকঠাক মতোই এগুচ্ছে, তাহলে তোমাকে অভিবাদন জানাই। কিন্তু পরিশ্রম করেও নিজের মধ্যে যদি  প্রোডাক্টিভিটির দেখা না পাও, তবে আমার মনে হয় প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর কিছু মৌলিক ধারণায় তোমার ঘাটতি রয়েছে।

প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর এই সাতটি মন্ত্র মন আর মগজে এক্ষুনি গেঁথে নাও।


GIF:Giphy

GIF:Giphy

তোমার কাজটির জন্য দিনের সেরা সময় কোনটি?

সকালের পড়ালেখা কি তোমার বেশি মনে থাকে? কিংবা ধরো গীটারের প্র্যাকটিসটা বিকেল বেলাইতেই বেশি ফলপ্রসূ মনে হচ্ছে? এক কাজ করো। একটা এক্সপেরিমেন্ট করে ফেলো। ফোনের নোটে বা ডায়েরিতে তোমার দৈনন্দিন টাস্কগুলোর একটি রেকর্ড নাও। এরপরে দেখো দিনের কোন সময়ে কোন কাজটি করলে তুমি সবচেয়ে বেশিক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারছো আর কাজটিও তোমার কাছে ইফেক্টিভ মনে হচ্ছে। এভাবে রেকর্ড নেয়ার ফলে তোমার প্রোডাক্টিভিটি কার্ভ সম্পর্কে তোমার একটি সুস্পষ্ট ধারণা হবে এবং সেই অনুযায়ী তুমি তোমার রুটিন তৈরি করে ফেলতে পারবে।

এভাবে ইফেক্টিভ পদ্ধতিতে প্রোডাক্টিভ রুটিন তৈরি করতে পারলে তোমার প্রোডাক্টিভিটিও বাড়তে শুরু করবে।     

৮০/২০ রুল মেনে চলো


ছবিঃ SteemKR

১৮৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করা ইতালির  ভিলফ্রেডো ফেডেরিকো দামাসো পারেটো টাইম ম্যানেজম্যান্ট আর প্রোডাক্টিভিটির এক অসাধারণ নিয়ম রেখে গিয়েছেন, যার নাম হচ্ছে ৮০/২০ রুল বা পারেটো প্রিন্সিপাল।

পারেটো প্রিন্সিপাল বলছে  যে, শতকরা ৮০ ভাগ ফলাফল আসে শতকরা ২০ ভাগ কাজের জন্য।

আরও সহজভাবে বললে তোমার দৈনন্দিন জীবনের ২০ শতাংশ কাজই তোমাকে ৮০ শতাংশ ফলাফল এনে দেবে। আর এই ব্যাপারটিও মাথায় রেখো- কম কাজ করা মানেই কিন্তু আলসেমি নয়।

৮০/২০ রুল অনুসরণ করার জন্য প্রথমে তুমি প্রতিদিন কী কী কাজ করো তার একটা লিস্ট বানিয়ে ফেলো। এবার খেয়াল করো যে তোমার জীবনের লক্ষ্য পূরণে প্রতিদিনকার কোন কাজগুলো তোমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছে। এবারে তোমার প্রতিদিনকার প্রোডাক্টিভ আওয়ারের জন্য এই কাজগুলো বরাদ্দ রাখো। পারলে সেই কাজগুলোই আগে সেরে ফেলো।

এভাবে ৮০/২০ রুল ফলো করলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিজের মধ্যে তুমি প্রোডাক্টিভিটি খুঁজে পাবে।

ঘুম থেকে উঠে নিজের দিকে ফোকাস করো


GIF:Giphy

আমাদের অনেকের মধ্যে যেই অভ্যাসটি সবচেয়ে বেশি রয়েছে সেটি হচ্ছে ঘুম থেকে উঠেই ই-মেইল, মেসেজ আর নোটিফিকেশন চেক করে দিন শুরু করা।

এই অভ্যাসটির কারণে আপডেটেড থাকা যায় ঠিকই কিন্তু এই অভ্যাসের কারণে আজকের দিনে তুমি কী কী অর্জন করতে যাচ্ছ সেটি ঠিক করে দেয় ই-মেইল, মেসেজ কিংবা নোটিফিকেশন দেখার পর তোমার ভার্চুয়াল মাইন্ড সেট আপ।

ফটোশপের দক্ষতায় মুগ্ধ কর সবাইকে!

 

কাজেই ই-মেইল আর মেসেজ চেক দিয়ে দিন শুরু করার আগে একটু নিজের দিকে ফোকাস করো। নিজেকে সময় দাও। সকাল বেলায় উঠে হালকা ব্যায়াম কিংবা মেডিটেশন করে নিতে পারো। এরপর খবরের কাগজ পড়তে পড়তে স্বাস্থ্যসমত  একটা ব্রেকফাস্ট তোমার প্রোডাক্টিভিটি বাড়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিবে।

এরপর চাইলে মেসেজ, ইমেইল আর নোটিফিকেশন চেক করে নিতে পারবে, এতে খুব একটা বড় ক্ষতি হবে না, বরং উপকারটাই বেশি হবে তোমার।

কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়া নোটিফিকেশন বন্ধ রাখো


GIF: Stormotion

আমার মনে হয় প্রোডাক্টিভিটির সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে এই সোশ্যাল মিডিয়া। নোটিফিকেশনের বদৌলতে বার বার ফোন চেক করা, ফোনের স্ক্রিনে ডুবে থাকা এখন একটি মহামারি ব্যাধি। একবার নোটিফিকেশন চেক করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেইসবুকেই কাটিয়ে দিয়েছ এমন উদাহরণ আশা করি কম নেই।

তোমাকে ছোট একটা তথ্য দেই। এই নোটিফিকেশন চেক করতে গিয়ে তোমার কাজে যেই ব্যাঘাত ঘটে আর মনোযোগ হারায় সেই মনোযোগ পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে সময় লাগে ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। ধরলাম তুমি কোনো কাজের জন্য বরাদ্দ রাখলে  ১ ঘণ্টা। এর মধ্যে মাত্র একবার সোশ্যাল মিডিয়ায় তথাকথিত ঢুঁ মেরে আসতে গিয়ে তুমি প্রায় ৩০ মিনিটের মতো সময় হারাচ্ছো। যার মানে দাঁড়াচ্ছে তুমি তোমার কাজের জন্য বরাদ্দ এক ঘণ্টার মাত্র অর্ধেক সময় পাচ্ছো। মোট কথা কাজটি ভালোভাবে সম্পন্ন হবে না।

ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে আমাদের নতুন গ্রুপ- 10 Minute School English Language Club-এ যোগদান করতে পারো! English Language Club!

সোশ্যাল মিডিয়া নোটিফিকেশন এভয়েড করা তোমার আমার সবার জন্য খুবই কঠিন একটা কাজ সেটি আমি মানছি। কিন্তু কাজ করার সময় ফোনকে অন্তত  সাইলেন্ট মোডে রাখা যেতেই পারে। এভাবে ২১ দিন পার করলেই তুমি টাস্কটিকে একটি অভ্যাসে পরিণত করতে পারবে। এরপর দেখবে কেমিস্ট্রি কিংবা হায়ার ম্যাথের টপিকটা আরও তাড়াতাড়ি মাথায় ঢুকছে।

অযথা মাল্টি টাস্কিংকে না বলো


GIF: Tenor

তুমি প্রতিদিন যেই কাজটি করছো সেটি অবশ্যই তোমার লক্ষ্যের সহায়ক হতে হবে। তোমার অবস্থা যাতে Master of all but jack of none- এই রকমের না হয়ে যায়, প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে হলে এই দিকটায় লক্ষ রাখতে হবে। কাজেই  একসাথে অনেকগুলো কাজ করা আজকে থেকেই থামিয়ে দাও। এতে কাজের কাজ কিছুইতো হয় না উল্টো সময় নষ্ট হয়। একটা তথ্য দেই। তুমি দিনে প্রায় ১০ বারের মতো টাস্ক পরিবর্তন করলে তোমার এভারেজ আই কিউ কমে প্রায় ১০ পয়েন্ট এর মতো।

তাই কম টার্গেট রেখে সেই কাজ গুলোভাবে করতে পারলে তোমার কাঙ্ক্ষিত কাজে দক্ষতা বাড়বে, সেই সাথে প্রোডাক্টিভিটি বাড়লে তোমার কাজ করার স্পৃহা শত গুণে বেড়ে যাবে।

আমি মাল্টিটাস্কিংকে না বলছি না, “অযথা” এক সময় অনেক গুলো কাজ একসাথে করার ব্যাপারটিকে না বলছি কেননা এক্ষেত্রে কম প্রোডাক্টিভিটির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।     

ব্রেক নাও, বড় কাজকে ভেঙে ছোট করে ফেলো

কাজ করতে করতে প্রায় সময়ই আমাদের মাথা ধরে যায়। এর মানে হচ্ছে কাজ করার জন্য আমাদের ব্রেইনের গ্লুকোজ প্রায় ফুরিয়ে গেছে। এই অবস্থায় নিয়ে ফেলো ব্রেক। ব্রেক মানে সোশ্যাল মিডিয়া ব্রেক নয়। কাজ করা ফাঁকে ব্রেক হিসেবে তুমি একটু হাঁটাহাঁটি করে আসতে পারো কিংবা লাঞ্চ বা হালকা জল খাবার অথবা মেডিটেশন দিয়েই ব্রেকের পর্বটা সেরে ফেলতে পারবে। ব্রেকের ফলে তোমার ব্রেইন পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্লুকোজের যোগান পাবে যার ফলে তোমার কাজটাও হবে প্রোডাক্টিভ।

কোনো কাজ কি খুব বেশি বড় কিংবা একঘেয়ে রকমের মনে হচ্ছে? চিন্তা নেই। এই সব কাজের প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে কাজগুলোকে ভেঙে ছোট করে ফেলো। ছোট ছোট প্রোডাক্টিভ কাজ তোমাকে দিয়ে বড় কাজটি করিয়ে নেবে।   

এবার নিজেকে ট্রিট দাও

অনেক কাজ হোল। এবার নিজেকে পুরস্কৃত করো। প্রতিটি কাজের লক্ষ্য পূরণ হলে নিজেকে উপহার দাও। এই সেলফ রিওয়ার্ডের প্র্যাকটিস তোমাকে সেলফ মোটিভেটেড থাকতে সাহায্য করবে অনেক বেশি। আর সব সময় নিজে নিজেই মোটিভেটেড থাকতে পারলে প্রোডাক্টিভিটি হবে তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড।

এগুলো ছাড়াও প্রোডাক্টিভিটির আরও কিছু মন্ত্র আছে। যেমন, তোমার কাছে প্রতিদিনকার যেই কাজগুলো কঠিন মনে হবে সেই কাজগুলো পারলে দুপুরের খাবার অর্থাৎ লাঞ্চের আগেই সেরে ফেলো। টু ডু লিস্টের পাশাপাশি তোমার ডেইলি রুটিনের দিকেও মনোযোগ দাও। তার সাথে রুটিনমাফিক স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়ার গুরুত্বটাও কম না। সবশেষে, পর্যাপ্ত পরিমাণ না ঘুমালে প্রোডাক্টিভিটির জন্য যে এতো এতো প্ল্যান, সবই হবে ধূলিসাৎ।


 Infograph: www.worktime.com

উপরের ইনফোগ্রাফের দিকে তাকালে বিল গেটস, মার্ক জাকারবার্গ,  আর এলন মাস্কের প্রোডাক্টিভিটির রহস্য খুঁজে পাবে।

প্রোডাক্টিভিটি বাড়াতে এই ভিডিওটিতে তোমার জন্য কিছু অসাধারণ টিপস রয়েছে।

লিঙ্কঃ   https://youtu.be/qCTDd2_kWdM

প্রোডাক্টিভিটি ব্যাপারটি চাইলেই তুমি একদিনে অর্জন করতে পারবে না কেননা প্রোডাক্টিভিটির ব্যাপারটি অন্যান্য অনেক কাজের মতোই অনুশীলন নির্ভর। আর প্রোডাক্টিভিটির অনুশীলন করতে হলে তোমাকে  সব সময় উপরের ব্যাপারগুলো মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু এখানেও কিছু সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার তোমাকে বারবার বাধা দিবে। যেমন ধরো আমাদের নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ একটি বিষয়। কাজেই এই বাধা উৎরাতে হলে বেশ শক্তপোক্ত ইচ্ছা শক্তির প্রয়োজন।

আরও আছে এক কাজ করার সময় অন্য কাজ করার প্রবণতা। এতে আমাদের মানসিক শক্তির অপচয় ছাড়া কাজের কাজ আর কিছুই হয় না। বরঞ্চ এর ফলে আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে প্রোডাক্টিভ হওয়া আর ব্যস্ত থাকা কিন্তু মোটেও এক জিনিস নয়। তাই ব্যস্ত হওয়ার পরিবর্তে প্রোডাক্টিভ হওয়ার পেছনে বেশি মনোযোগ দাও।   

প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর প্রায় সব রসদই তোমাকে দিয়ে দিলাম। আজকে থেকেই একটা রুটিন বানিয়ে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ানোর জন্য নেমে পড়। আর নিচের উক্তিটি সব সময় মাথায় রাখবে-


 ছবিঃ RescueTime Blog

আশা করি নিজেকে প্রোডাক্টিভ হিসেবে খুঁজে পেতে তোমার বেশি একটা সময় লাগবে না!


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?