পৃথিবীর যত মৃত্যুপুরী

ভ্যালি অফ ডেথ, কামচাটকা, রাশিয়া


রাশিয়ার এ মৃত্যু উপত্যকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই; Image Source: www.airpand.com
 
কথায় বলে, MUN is fun!
বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি কম্পিটিশানের নাম MUN বা Model United Nations। কিন্তু কি এই মডেল ইউনাইটেড নেশন্স? কিভাবে ভালো করতে হয় এটিতে? নিজেই দেখে নাও এই প্লেলিস্ট থেকে!

ভ্যালি অব ডেথ, রাশিয়া; Image Source: www.rbth.com


পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানের মধ্যে এটি একটি। সোজা কথায় মৃত্যুপুরী বলা হয় একে। রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপে এ মৃত্যু উপত্যকার অবস্থান। কামচাটকা রাশিয়ার পূর্ব প্রান্তে সাইবেরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত আগ্নেয় পর্বতময়, তুষারাচ্ছন্ন এক উপদ্বীপ। কামচাটকায় অনেকগুলো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে। কামচাটকা উপদ্বীপের পূর্বাংশে রয়েছে কেহিন্নাইক আগ্নেয়গিরি। এই আগ্নেয়গিরির পাদদেশেই তৈরি হয়েছে এ মৃত্যু উপত্যকা।

১৯৭৫ সালের জুলাই মাস আবিষ্কৃত হয় এ মৃত্যু উপত্যকা। ১৯৭৫ সালে আবিষ্কারের পর থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত রিজার্ভ কর্মীরা নিয়মিতভাবে রহস্যজনক এই এলাকাটি পরীক্ষা করে দেখেন। তারা প্রায় ২০০টি মৃত প্রাণী এবং পাখি সংগ্রহ করে। মৃত এসব প্রাণীদের মধ্যে ছিল ১২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৫ টি প্রজাতির পাখি এবং নানাপ্রকার কীটপতঙ্গ। মৃত পাখিদের মধ্যে কাক ও বেশ কয়েক প্রজাতির ঈগল ও ছিল। এমনকি রিজার্ভ কর্মীদের সাথে যেসব সেসব কুকুরও মারা যায়। অনেকটা চক্রের মত চলতে থাকে এখানকার মৃত্যু যাত্রা। বসন্তের সময় এখানকার এক প্রকার ছোট চড়ুই পাখি মারা যেতে থাকে। মৃত পাখিদের দেহের গন্ধে আকৃষ্ট হয় শিয়াল, ভলভেরিন, ভালুক, কাক এবং গোল্ডেন ঈগল এবং খাদ্যের সন্ধানে এখানে পাড়ি জমায়। কিন্তু এ মৃত্যু উপত্যকায় একে একে সবাই মারা যায়। এ মৃত্যু উপত্যকার মৃত প্রাণীদের সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। 

গবেষণায় দেখা যায়, মৃত্যুপুরী হয়ে উঠবার মূল কারণ এখানকার বিষাক্ত বাতাস। এখানকার বাতাস এতটাই বিষাক্ত যে এই বিষাক্ত বাতাসে এখানকার পাখি ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রানী মারা যায়। আগ্নেয়গিরির বিষাক্ত গ্যাসই এখানকার বাতাসকে এতটা বিষাক্ত করে তুলেছে। এই বিষাক্ত গ্যাসের কারণে এখানে জীবন ধারণ একেবারেই অসম্ভব। এক গবেষণায় দেখা যায়, বিষাক্ত গ্যাসের উচ্চ ঘনত্বের কারণেই মূলত এখানকার  প্রাণী ও পাখিরা মারা যায়। প্রধানত হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাসের উপস্থিতিই এখানকার বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলেছে।

এত কিছু শোনার পরও এখানকার কিছু ফটোগ্রাফি দেখলে যে কারো এখনই সেখানে ছুটে যেতে ইচ্ছে করবে। কামচাটকার ভ্যালি পব ডেথ তার অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ করে মৃত্যুর হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে। বিশেষ করে যারা একা থাকতে পছন্দ করেন, নির্জন পরিবেশ যাদের বেশ ভাল লাগে এই ভ্যালি অব ডেথ তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান। কিন্তু এখানে কিছুক্ষণ থাকলেই আপনার মাথা ঘোরানো শুরু হবে, অসুস্থ হয়ে পরবেন। এখানকার বিষাক্ত বাতাস আপনাকে দ্রুতই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে। 

ভ্যালি অব ডেথ এর পরতে পরতে যেমন রয়েছে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্যের নিদর্শন তেমনি এর পরতে পরতে রয়েছে রহস্যময় মৃত্যুর আশংকা। 



ডেথ ভ্যালি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র


ডেথ ভ্যালি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; Image Source: AltPhotos

ডেথ ভ্যালির রহস্যময় চলমান পাথর; Image source: Mike Reyfman


রহস্যপ্রেমী মানুষদের কাছে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ডেথ ভ্যালি খুবই পরিচিত এক নাম। পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এই স্থানটির সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। কিন্তু এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত স্থান। ১৯১৩ সালের জুলাই মাসে ১৩৪ ফারেনহাইট বা ৫৬.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়েছিলো। তারপর ১৯৭২ সালে এখানকার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় যা ছিল প্রায় ২০০ ফারেনহাইট। ডেথ ভ্যালির এ তাপমাত্রা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিকেও হার মানিয়ে দেয়। কিন্তু তারপরো রহস্যেঘেরা এ  ডেথ ভ্যালি দেখতে প্রতিবছর প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ সেখানে ভিড় করে।

ডেথ ভ্যালি’র নামকরণের পিছনে রয়েছে এক ইতিহাস। কথিত আছে ১৮৪৯ সালে একদল স্বর্ণ সন্ধানী দল ডেথ ভ্যালীর মরুভূমি পার হয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বর্ণের সন্ধানে যেতে চেয়েছিল। পথিমধ্যে প্রচন্ড গরমে অসুস্থ হয়ে এক সহযাত্রীর মৃত্যু ঘটে এবং বাকিরা অনেক কষ্টে মৃত্যুর দোরগোড়া হতে ফিরে আসে। তাদের একজন মৃত্যুর দোরগোড়া হতে ফিরে আসার সময় পিছে তাকিয়ে বলে,
“বিদায়, মৃত্যু উপত্যকা। (ডেথ ভ্যালি)”

সেখান থেকেই এর নামকরণ করা হয় মৃত্যু উপত্যকা (ডেথ ভ্যালি)। নানা রহস্য ও বিস্ময়ের দেখা মিলে এই ডেথ ভ্যালিতে। ডেথ ভ্যালিতে চলন্ত পাথর দেখা যায়। যে পাথরগুলোকে দেখলে মনে হয় এরা নিজেরাই নিজেদের স্থান পরিবর্তন করেছে। পাথরগুলিকে অবশ্য চলমান অবস্থায় কেউ কখনো দেখেনি কিন্তু  বালুর উপর রেখে যাওয়া ছাপ থেকে বোঝা যায় এরা স্থান পরিবর্তন করেছে। কয়েকশ পাউন্ড ওজনের এসব ভারি পাথরগুলো কিভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায় সে রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি।


ডেথ ভ্যালির রহস্যময় এই পাথর গুলো নিয়ে আছে নানান কল্পনা। কেউ কেউ মনে করেন, এখানে এক বিশেষ ধরনের চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যার প্রভাবে পাথরগুলো স্থান পরিবর্তন করে। আবার কারো কারো ধারণা, এগুলো আসলে এলিয়েনদের কারসাজি। ডেথ ভ্যালি তে এলিয়েনদের আগমন ঘটে প্রায়ই। আর তারাই পাথরগুলো স্থানান্তর করে দিয়ে যায়। তবে অধিকাংশ এটা বিশ্বাসই করেন না যে, এই পাথর গুলোর স্থান পরিবর্তন ঘটে।  


বিকিনি আটোল


 মার্শাল আইল্যান্ড

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বিকিনি আটোল ‘মার্শাল আইল্যান্ড’ নামে অধিক পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে ভ্রমণপিপাসু মানুষদের কাছে বেশ আলোচিত এই বিকিনি আটোল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই বিকিনি আটোল বেশি আলোচিত তার পারমাণবিক ইতিহাসের কারণে। এই দ্বীপেই আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে চল্লিশের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলো। জাপানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর এটিই প্রথম স্থান, যেখানে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।

একসময় এই দ্বীপ হয়ে ওঠে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ পরীক্ষা কেন্দ্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ দ্বীপে ২৩টি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। ১৯৫৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে এমন এক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, যা হিরোশিমায় ফেলা পারমাণবিক বোমার চেয়েও ১,১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিলো। এমন ক্রমাগত পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এ দ্বীপ হয়ে ওঠে মৃত্যুপুরী। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর কেটে গেছে ৭০ বছর। কিন্তু এখনও এই দ্বীপের তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা অনেক বেশি। কিন্তু এতকিছুর পরও পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তাকে ছাপিয়ে বিকিনি আটোল তার নিজ রূপে সকলকে আকর্ষিত করে। মৃত্যুপুরীর মত হাতছানি দিয়ে ডাকে বিকিনি আটোল। যে কেউ বিকিনি আটোলের ছবি দেখলেই জীবনের শেষ সময় গুলো কাটানোর সর্বোত্তম স্থান হিসেবে বেছে নিবেন। কিন্তু এখানকার তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তায় দীর্ঘসময় থাকলে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে ক্যান্সার ও। 



দ্য দানাকালি ডেজার্ট


দানাকালি ডেজার্ট উপভোগ করতে মৃত্যু কে উপেক্ষা করে ছুটে যায় অনেকে
 Image source: The Telegraph

‘দ্য দানাকালি ডেজার্ট’ ইথিওপিয়ার ইরিত্রিয়ায় অবস্থিত। ইথিওপিয়ার সীমান্ত ঘেষে অবস্থিত এ মরুভূমি পৃথিবীর বিপদজনক পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। ভূতাত্ত্বিক নানা প্রতিকূল পরিবেশের জন্য এ মরুভূমিকে বলা হয়ে থাকে ‘এলিয়েনদের স্থান’। কেননা সাধারণ মানুষদের পক্ষে এ মরুভূমিতে থাকা সম্ভব নয়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রার স্থানগুলোর একটি এটি। এখানকার তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এ মরুভূমির মাঝে নদীর মত বয়ে গেছে লাভার হ্রদ। বিশাল মরুভূমির মাঝে নানা জায়গা থেকে ক্রমাগত লাভা নির্গত হয়। লাভার সাথে বেরিয়ে আসে বিষাক্ত গ্যাস। আর এই বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে বিষাক্ত করে তোলে এ মরুভূমির পরিবেশ।

বিষাক্ত বাতাসে পুরো মরুভূমির বাতাস ভারী হয়ে থাকলেও পর্যটকের অভাব নেই এ মরুভূমিতে। দানাকালি মরুভূমির সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। আর ফটোগ্রাফির নেশা থাকলে এই মরুভূমি হয়ে উঠতে পারে একজন ফটোগ্রাফারের আদর্শ গন্তব্য। তবে চাইলেই যে কেউ একা যেতে পারবেন না এখানে। ভয়ংকর সুন্দর এ মরুভূমি উপভোগ করতে চাইলে সাথে অভিজ্ঞ গাইড নিয়ে যেতে হবে। অভিজ্ঞ গাইড ছাড়া এ মরুভূমিতে পা রাখার অনুমতি দেবে না ইথিওপিয়ার সরকার। 


মাদিদি উদ্যান, বলিভিয়া


 মাদিদি জাতীয় উদ্যান; Image source: internationalrivers.org

বলিভিয়ার মাদিদি উদ্যান হল বলিভিয়ার জাতীয় উদ্যান। এ উদ্যান যেকোনো মানুষকে মুগ্ধ করে ফেলতে পারে তার নিজ সৌন্দর্যে। মাদিদি উদ্যানে প্রথম পা রাখলে মনে হবে, এখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেয়া গেলে মন্দ হত না। কিন্তু বাস্তবে এটি মারাত্মক বিষাক্ত ও ভয়ংকর এক স্থান।


পৃথিবীর বিষাক্ত ও ভয়ংকর সব উদ্ভিদের দেখা পাওয়া যায় এখানে। এ উদ্যানে এমন সব বিষাক্ত উদ্ভিদ রয়েছে যা পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজেও পাওয়া যায় না। এসব উদ্ভিদ এতটাই বিষাক্ত যে, মানবদেহের সাথে সামান্য স্পর্শে চুলকানি  থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। এমনকি কিছু উদ্ভিদের সংস্পর্শে এলে মৃত্যুও অনিবার্য। শরীরের সামান্য কোনো ক্ষত নিয়ে এই উদ্যানে এলে সেই ক্ষত এখানকার পরজীবী দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে। সংক্রমিত হয়ে সামান্য এসব ক্ষতই হয়ে উঠতে মৃত্যর কারণ। 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?