ঘনাদা-টেনিদা: পড়া আছে তো?

February 2, 2019 ...
পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

ছোটবেলায় সবচেয়ে বেশি মার খেতে হতো যে কারণে, তা হচ্ছে পড়ার বইয়ের নিচে লুকিয়ে গল্পের বই পড়া! কতবার এজন্য পিঠে ডালঘুটনি ভাঙা হয়েছে তার কোন হিসেব নেই! কত কত রাত কাঁথা মুড়ি দিয়ে বই পড়তে পড়তেই ঘুমিয়ে গেছি,মাথার পাশে পড়ে থেকেছে সেসব প্রিয় বই!

আজকাল আমাদের বেশিরভাগেরই অবসর কাটে ফেসবুক-মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করে কিংবা স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে ভিডিও গেমস খেলতে খেলতে। অথচ  স্কুলের গণিত-বিজ্ঞান কিংবা ইংরেজি বইয়ের নিচে লুকিয়ে রেখে গল্পের বইগুলো কী ভীষণ উত্তেজনা নিয়ে শেষ করতাম, সে কথা মনে পড়লে অদ্ভুত রকমের আনন্দ হয় এখনও।

‘বই মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু’ কিংবা ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’ জাতীয় কথাবার্তা তোমরা নিশ্চয়ই হাজার বার শুনেছো। বই পড়ার অভ্যাসও নিশ্চয়ই তোমাদের আছে।

তোমাদের প্রিয় লেখক কে? কিংবা প্রিয় চরিত্র কী? প্রিয় বই-ই বা কোনটা?

এই তো, সামনেই বইমেলা আসছে, নিশ্চয়ই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করবে না?

বাংলা কিশোর সাহিত্যের বিস্তৃতি বিশাল। এই বিশাল সাহিত্যাঙ্গণের মধ্যে কিছু এমন জায়গা আছে, যেখানে বিচরণ করতে না পারলে আসলে কৈশোরটাই বৃথা হয়ে যায়। সেরকম সামান্য একটু অংশ, বাংলা কিশোর সাহিত্যের ভীষণ জনপ্রিয় দুটি সিরিজ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

ঘনাদা

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাস। মানবজাতির অনেক বড় দুর্ভাগ্য, এক নিদারুণ বিভীষিকার এই মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাংঘাতিক সব মারণাস্ত্রের ঝনঝনানির চূড়ান্ত প্রয়োগ এই মাসেই প্রত্যক্ষ করে পুরো পৃথিবী, বিশ্ব মোড়লদের লড়াইয়ে পারমাণবিক বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত হয় জাপানের হিরোশিমা আর নাগাসাকি।

ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া দূর প্রাচ্যের সেই ক্রন্দনধ্বনি বাংলাকে কিন্তু স্পর্শ করতে পারেনি মোটেও! করবে কী করে?

আকাশ থেকে যে বর্ষার কালো মেঘ কেটে শরতের নীলিমা ফুটে উঠলো, নদীর দু ধারে জাগলো কাশফুলের ঢেউ, সেই সাথে এসে গেলো পূজো! সেই সঙ্গে দেব সাহিত্য কুটিরের ১৩৫২ বঙ্গাব্দের পূজাবার্ষিকী আলপনা থেকে বেরিয়ে এলেন এক কালজয়ী চরিত্র, ঘনশ্যামদা!

কি, নামটা বিদঘুটে লাগছে খুব? তাহলে তোমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই পারো, নামটা ঘনশ্যামদা হলেও সংক্ষেপে সেটা ঘনাদা!
সেই পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত ‘মশা’ গল্পটি থেকেই ঘনাদার ইতিহাস শুরু। কিশোর গল্প হিসেবে লেখা হলেও প্রকাশের সাথে সাথে সব বয়সী পাঠক মহলে অভাবনীয় সাড়া পড়ে যায়। ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ায় এরপর থেকে প্রতি বছরই পূজা বার্ষিকীতে প্রকাশ পেতে থাকে ঘনাদার একটা করে গল্প। দিন যায়, উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে ঘনাদার জনপ্রিয়তা, স্থায়ী আসন গেড়ে বসে বাংলা সাহিত্যে। অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন, “ ঘনাদার জন্য তাঁর স্রষ্টার নাম চিরস্থায়ী হবে।”
ঘনাদা ফেলুদার মতো কোন গোয়েন্দা চরিত্র নয়। ঘনাদার কাহিনিকে চাইলে সায়েন্স ফিকশন বলা যায়, অ্যাডভেঞ্চারের সাথেও তুলনা করা যায়, কিংবা চালিয়ে দেয়া যায় গা ছমছম ভৌতিক কাহিনি হিসেবেও! তবে তার সবটাই আসলে ঘনাদার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র, চাপার জোরে!

 বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের বাসিন্দা ঘনাদা। মেসের আরো চার বাসিন্দা শিবু, গৌর, শিশির আর গল্প কথক তথা “আমি”। এই “আমি”র নাম লেখক খোলাসা করেছেন অনেক দেরিতে।

ঘনাদা কথা প্রসঙ্গে নিজের বিভিন্ন বাহাদুরির বানোয়াট গল্প বলেন তার সঙ্গীদের। ‘ঘনাদা গপ্পো ছাড়ছেন’, এ কথা সহজেই বুঝতে পারলেও অসাধারণ সেই ‘গপ্পো’ গুলোর লোভ সামলাতে পারে না ঘনাদার সঙ্গীরাও, বরং কোন কারণে ঘনাদা অভিমান করলে ‘গপ্পো’র লোভেই তার অভিমান ভাঙাতে নানা কায়দা-কানুন করতে হয় ওদের। এমনকি ঘনাদার মেসে থাকা-খাওয়ার খরচও ঘনাদার গুণমুগ্ধ শ্রোতৃবৃন্দ বহন করে পরম আগ্রহে।
তবে ঘনাদার বাহাদুরি নিছক কাল্পনিক তত্ত্ব-তথ্যের উপর ভিত্তি করে নয়! কাহিনিগুলোকে লেখকের কল্পিত বা বিরচিত মনে হলেও আসলে সেগুলো সত্যই! আশ্চর্য কল্পনার জটিল স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া অজস্র জ্ঞাতব্য বিষয়, এটাই লেখকের গল্পগুলো বলার জন্য ভেবে ঠিক করা কায়দা বা ধরন। নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক ও জ্ঞানমুখী করে গড়ে তোলাই ছিল প্রেমেন্দ্রর জীবনের সাধনা, আর ঘনাদার গল্পগুলোকে তিনি ব্যবহার করেছেন সে সাধনা বাস্তবায়নের এক বিরাট প্ল্যাটফর্ম রূপে।

প্রথমদিকের ‘মশা’ ও ‘পোকা’ গল্পে দেখা যায় জীববিজ্ঞানের মজার সব গল্প; ‘কাঁচ’ ও ‘হাঁস’ গল্পে দেখা যায় পারমাণবিক গবেষণা-নির্ভর অ্যাডভেঞ্চার; আবার ‘ফুটো’ গল্পে মহাশূন্যের চতুর্থ মাত্রার জটিল গণিতকে উদাহরণ দিয়ে যেভাবে সরল করে তিনি বুঝিয়েছেন তা নবীন মনকে মহাকাশ বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহী করবে, আবার একই সাথে ডুবিয়ে দেবে নির্ভেজাল কল্পনার আনন্দময় ভুবনে।
ঘনাদার গল্প, যেগুলো আপাত দৃষ্টিতে লম্বা লম্বা গুল, সেগুলোকে আষাঢ়ে গল্প ভাবা ঠিক হবে না মোটেও। স্বয়ং প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯৭৪ এ SPAN পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “Ghana-da is a teller of tall tales, but the tales always have a scientific basis. I try to keep them as factually correct and as authentic as possible.”
ঘনাদার গল্পে ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা ইত্যাদির সমন্বয়ে ঘনাদার বাহাদুরিকে যেমন নিতান্তই জ্ঞানগর্ভ করে তোলা হয়েছে, তেমনি সেসবের বিপরীতে মেসের বাসিন্দাদের হাস্যরসাত্মক কার্যকলাপ কাহিনিকে করে তুলেছে আরো উপভোগ্য। গৌরের বাঁদরামি, শিবুর কাশি আর শিশিরের সিগারেটের টিন থেকে প্রতিবার সিগারেট বের করার সময় কততম সিগারেট ধার নিলেন সেটা গুণে দেখা, এসবই বাড়িয়েছে ঘনাদার নির্মল আনন্দের উপকরণকে। তাই তো যুগ যুগ ধরে পাঠকহৃদয়ে ঘনাদা অমর হয়েই আছেন।

টেনিদা

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচিত কিংবদন্তি টেনিদা। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা কিশোর সাহিত্য মানেই দারুণ উপভোগ্য, তবে টেনিদার ক্ষেত্রে তার মাত্রা যেন সীমাহীন! ছেলে থেকে বুড়ো সব বয়সের পাঠকদেরই আনন্দ দেয় টেনিদা। বয়স ভোলানো, প্রজন্ম পেরুনো, অবাক করা টেনিদার এই পাঠকপ্রিয়তা। ফেলুদা বা ঘনাদার সাথে কোনভাবেই মেলানো যায় না টেনিদাকে, বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য চরিত্র এই ভজহরি মুখার্জী ওরফে টেনিদা।
“টেনিদাকে চেনো না? পৃথিবীর প্রচণ্ডতম বিভীষিকা, আমাদের পটলডাঙার টেনিদা। পুরো ছ হাত লম্বা, গণ্ডারের খাঁড়ার মতো খাড়া নাক, খটখটে জোয়ান। গড়ের মাঠে গোরা ঠেঙিয়ে স্বনামধন্য। হাত তুললেই মনে হবে রদ্দা মারলো, দাঁত বার করলেই বোধ হবে কামড়ে দিলো বোধহয়!” … এভাবেই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় পরিচয় করাতেন টেনিদার সাথে।
টেনিদার কাহিনি যত এগিয়েছে, ততই তাতে যুক্ত হয়েছে কৌতুকের নতুন নতুন মাত্রা। শুরুতে টেনিদা কেবল ‘মেলা বকিসনি ’ থেমে গেছেন। এরপর একে একে যুক্ত হয়েছে নিত্য নতুন ‘প্রবচন’। কুরুবকের মতো বকবক করা, এক চড়ে কান কানপুরে পাঠানো, নাক নাসিকে পাঠানো, ঘুষি মেরে ঘুষুড়িতে ওড়ানো, চাঁটি মেরে চাঁদি চাঁদপুরে পাঠানো … তারপরে পুঁদিচ্চেরি মানে ব্যাপার অত্যন্ত ঘোরালো, এইরকম বহু চিরকালীন কৌতুকময় সংলাপ। আর টেনিদার সেই অবিস্মরণীয় চিৎকার “ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস”, সেই সাথে বাকি তিনমূর্তির “ইয়াক ইয়াক” বলে তাল মিলানো, এর চেয়ে জনপ্রিয় প্রবচন বাংলা সাহিত্যে আর নেই!

টেনিদার স্বভাব চরিত্র আড্ডাবাজ ধরনের। ম্যাট্রিকে সাত-সাতবার ফেল করেছেন, যদিও শেষমেশ ‘চারমূর্তির অভিযান’ উপন্যাসে বলা হয়েছে টেনিদা এবারে থার্ড ডিভিশন পেয়ে পাশ করে গেছেন! পটলডাঙার টেনিদা আর তার তিন সঙ্গী; মেধাবী ক্যাবলা, ঢাকাইয়া কাঠ বাঙাল হাবুল সেন আর গল্পের কথক প্যালারাম, এই নিয়ে বিখ্যাত চারমূর্তি। চারমূর্তি চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে বিস্তর আড্ডা দেয়। সেই আড্ডায় মধ্যমণি হিসেবে থাকেন আমাদের টেনিদা, নানারকম চালবাজি আর গালগল্প শুনিয়ে মাতিয়ে রাখেন আড্ডা। সেই সাথে সময়ে অসময়ে বাকি তিন মূর্তির পকেট হাতিয়ে দিব্যি চপ-কাটলেট, ডালমুট-তেলেভাজা মেরে দেন! খাওয়ার বেলায় টেনিদা ওস্তাদ, দু সের রসগোল্লা তিন মিনিটে ফুঁকে দেয়া কোন ব্যাপার না! আবার স্বভাবত বড্ড বেশি ভীরু টেনিদা, ‘চারমূর্তি’তে ভুতুড়ে হাসির শব্দ শুনেই ভয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে গিয়েছিলেন, ‘চারমূর্তির অভিযান’ এ বাঘ শিকারে যেতে হবে শুনে বাথরুমে গিয়ে লম্বা সময় লুকিয়ে ছিলেন! আবার বিভিন্ন সময়ে এই আলসে অকর্মণ্য চারমূর্তির লিডার টেনিদাই হয়ে ওঠেন সত্যিকারের নেতা, মার্শাল আর্ট আর জুডোয় পারদর্শী সুপুরুষ, চারমূর্তির ত্রাণকর্তা। প্যালার ভাষায়, “যেমন চওড়া বুক-তেমন চওড়া মন। হাবুল সেবার যখন টাইফয়েড হয়ে মরো মরো তখন টেনিদাই তাকে নার্স করেছে, পাড়ার কারো বিপদ আপদ হলে টেনিদাই গিয়েছে সবার আগে। ফুটবলের মাঠে সেরা খেলোয়াড়, ক্রিকেটের ক্যাপ্টেন। আর গল্পের রাজা। এমন করে গল্প বলতে কেউ জানে না!”
বাকি তিন মূর্তিও কিন্তু কম কৌতুহলোদ্দীপক নয়! গল্পকথক প্যালারামের মুখ দিয়ে লেখকের নিজেকে নিয়েই ঠাট্টা, “আমি রোগা ডিগডিগে প্যালারাম, পালাজ্বরে ভুগি আর বাসক পাতার রস খাই। পটল দিয়ে শিঙি মাছের ঝোল আর আতপ চাল আমার নিত্য বরাদ্দ, একটুখানি চানাচুর খেয়েছি তো পেটের গোলমালে আমার পটল তুলবার জো!” সেই সাথে হাবুল সেনের ঢাকাইয়া ভাষা আর ক্যাবলার জ্ঞানী জ্ঞানী কথা, সব সময় ভুল ধরে টেনিদার কাছে রদ্দা খাওয়া; এসবই হাসির খোরাক জুগিয়েছে প্রায়ই!
টেনিদাকে নিয়ে ৫টি উপন্যাস, ৩২টি গল্প আর ১টি নাটিকা লেখা হয়েছে। এর মধ্যে পাঠকদের অনুরোধে বেশ কিছু লেখা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আশা দেবী লিখেছেন। টেনিদার উপন্যাসগুলো অ্যাডভেঞ্চার ধাঁচের, ছোট গল্পগুলো বেশিরভাগই টেনিদার চালিয়াতি আর গুলবাজির কাহিনি। টেনিদা সিরিজ নিখাঁদ হাস্যরসাত্মক, সেই সাথে পাওয়া যায় অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ! আসলে, টেনিদাকে নিয়ে বলতে গেলে শেষ হবে না, আজ নাহয় এতটুকুই থাক!

বাংলা কিশোর সাহিত্যের অমর দুই চরিত্র; ভজহরি মুখার্জী ওরফে টেনিদা, আর ঘনশ্যামদা ওরফে ঘনাদা। দুজনই স্বমহিমায় ভাস্বর। টেনিদা আর ঘনাদা পড়া না থাকলে কিশোর সাহিত্যের আসল মজার অর্ধেকটাই মাটি। যারা পড়ে ফেলেছো ইতোমধ্যেই, তারা তো জানোই; আর যারা এখনো পড়ো নি, তাদের আমি পড়তে বলবো না।

এত ভালো সিরিজ সবাই পড়ে ফেলবে, সেটা ভাবতেই আমার হিংসে হয়।

একটু বেশিই হিংসে হয়!


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

আপনার কমেন্ট লিখুন